Home গল্প নাম্মীর বাসা -শাহনাজ পারভীন

নাম্মীর বাসা -শাহনাজ পারভীন

আ…, উ…, ও  আল্লাহ, উ…
সকালের স্নিগ্ধতা মাড়িয়ে দূরাগত কোন দ্বীপ হতে ভেসে আসা কষ্টকর শব্দগুলো তিশার ভেতরটা নাড়িয়ে দেয়। ওর অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। একটু আগেই ও রান্নাঘরে ঢুকেছে। একটু স্যুপ করবে বলে। এমনিতে সারারাত প্রায় নির্ঘুম কাটাতে হয়েছে তাসফীকে নিয়ে। গতকাল সন্ধ্যা থেকেই ছেলেটার কেমন জ্বর জ্বর ভাব। ঠিক জ্বর নয়, আবার জ্বরও। এই গা গরম, আবার এই স্বাভাবিক। এটা হচ্ছে মন পোড়া জ্বর। ইদানীং ও খেয়াল করেছে, প্রত্যেকবারই যশোর থেকে আসার পর ওর এই জ্বরটা হয়। নাম্মী, নানাভাই আর মামার জন্য ওর মনটা কেমন করে। ছোট মানুষ কিছু বলতে পারে না শুধু ছট্ফট ছট্ফট করে। ভেতরে ভেতরে জ্বর আসে। এমনিতে অল্প জ্বরেই ওর খিঁচুনি হয়। ডাক্তারের নিষেধ আছে জ্বর বাড়তে না দেয়া। কোনক্রমেই জ্বর যেন একশর উপরে না ওঠে। জ্বর এলেই ওকে গা মোছাতে হবে। নাপা সিরাপ খাওয়াতে হবে। অর্থাৎ নিবিড় তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে। নইলে আবারো খিঁচুনির আশঙ্কা আছে। এ জন্য ওর জ্বরের ব্যাপারে অন্য সব কিছুর থেকে ওদের কেয়ার বেশি। একটু জ্বর জ্বর ভাব হলেই ওরা দু’জন পালাক্রমে জেগে থাকে। হয় তিয়াস নইলে তিশা। কিন্তু গত রাতে তিয়াস প্রায় ভোরের দিকে বাসায় ফিরেছে। ওর একটি বস্তিশুমারি চলছে। ঢাকা নগরীতে এই মুহূর্তে ভাসমান মানুষের সংখ্যা কত? তা নিয়ে সরকারের মাধ্যমে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা লার্জ বাজেটের প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। সেই সুবাদে পরিসংখ্যান বিভাগই কাজটির তদারকিত্ব পেয়েছে। পরিসংখ্যান বিভাগের যে ক’জন সিনসিয়ার অফিসার আছে তন্মধ্যে তিয়াস খুবই চৌকস। সে ড্যাটা সংগ্রহে বিশেষ করে এসব রিসার্চেবল কাজে খুবই পারদর্শী। এ ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে এমডি স্যার তিয়াসের নাম ঢুকিয়েছে। তিয়াসই কনভেনর। অতএব তার দায়িত্বও শতভাগ। তাই তো কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে শুরু করে গুলশান, গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম কোথাও বাদ যায় না। ঘুমন্ত মানুষদের ডেকে ডেকে সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। ড্যাটা সংগ্রহ করে। এ কাজে তিয়াসের কোন ফাঁকি নেই। তাই তো সব সময়ই এ সমস্ত প্রজেক্টে তিয়াসের নাম থাকে এক নম্বরে। তিশাও কিছু বলে না। ও জানে, ওর কাজের ব্যাপারে কারো সাথে কোন কম্প্রোমাইজ নেই। কি দিনে কি রাতে তার দায়িত্ব পালনে সে শতভাগ সচেতন। কিন্তু দেশের যে পরিস্থিতি। তাতে তো তিয়াস রাতে পথে প্রান্তরে বাইরে থাকলে তিশা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে না। ওর দাপ্তরিক দক্ষতায় ভেতরেও কিছু শত্রুর জন্ম হয়েছে। তিয়াস সে সব জানে, কিন্তু আমলে আনতে চায় না কখনো। বলে,
– কাজ করলে ভুল হবে, আর ভুল না হলে প্রাপ্তির সাথে প্রত্যাশা যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে কিছু উট্কো ঝঞ্ঝাট। শত্রুতাও হতে পারে ভেতর আর বাহির। সেটা মাথায় রেখেই আমি নির্ভুল কাজ করতে চাই তিশা। আমাকে শুধু তুমি সহযোগিতা করবে। তাহলেই আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।
– কাজ করবে তুমি, আমি কিভাবে তোমার অফিসিয়াল কাজের সহযোগিতা করব? সেটা কি করে সম্ভব?
– অবশ্যই সম্ভব। মানসিকভাবে তুমি আমার পাশে থাকলে সেটাই হবে আমার জন্য তোমার সবচেয়ে বড় সহযোগিতা।
– ও এই কথা?
– এটাকে তুমি খাটো করে দেখছো? তোমার সহযোগিতা, দৃঢ়তা আর বিশ্বাস থাকে বলেই তো আমি শতভাগ মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারি। ঐ যে মঈন আছে না? তুমি ওকে তো ভালো করেই চেন। ওর ওয়াইফের ভয়ে ও তো এই ধরনের কোন রাতের প্রজেক্টে থাকতেই চায় না, বিকেল পাঁচটা বাজলেই ঘন ঘন ঘড়ি দেখতে থাকে। বাসায় ফিরতে একটু দেরি হলেই জেরা শুরু করে ওর ওয়াইফ। বসও এ জন্য ওকে কোন কাজ দিয়ে স্বস্তি পান না। পারতপক্ষে দিতেও চান না।
– ও নিয়ে তুমি ভেবো না। তুমি তোমার কাজ করবে মন দিয়ে, ব্যস। আমি সেই ছোটবেলা থেকে আমার আব্বুকে দেখেছি। আব্বু বলেন,
– অফিসে যাওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময় আছে, কিন্তু অফিস থেকে ফিরে আসার কোন নির্দিষ্ট সময় নেই।
– সে তো আমি জানি, আমার শ্বশুর আব্বার বিশ্বস্ততার সুনাম আছে অফিসে। আসলে মানুষের নৈতিক চরিত্র গড়ে ওঠার জন্য ফ্যামিলি অনেক বড় একটা ব্যাপার। যে যেভাবে ছোটবেলা থেকে গড়ে ওঠে, বাবা মাকে যেভাবে চলতে দেখে তা  দেখেই কিন্তু সন্তানরা শেখে। তাদেরকে সবকিছু হাতে ধরে শিখিয়ে দিতে হয় না। এমনিতেই শেখে, দেখে দেখে শেখে, প্রকৃতি থেকে শেখে। নিজেরা বিশ্বস্ত না থাকলে হাজার চেষ্টা করেও সন্তানদেরকে বিশ্বস্ততার শিক্ষা দেয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
সময়ে অসময়ে স্বামী স্ত্রী এভাবে নিজেদের মধ্যে কথা বলে। কথা বলে তার ছোট্ট তিন বছরের আদরের ছেলে তাসফীকের গড়ে ওঠা নিয়ে। তাই তো মাঝে মাঝেই যখন ওর আদমশুমারি, বস্তিশুমারিসহ বিভিন্ন শুমারির কাজ হয়, তখন তিশা ইচ্ছা না থাকলেও না বলতে পারে না। কিন্তু অন্যান্য রাতে ওর এত কষ্ট হয় না। কাল রাতটা প্রায় নির্ঘুম কেটেছে। মাথাটা কেমন ভার হয়ে আছে। আবারও ভেসে আসে শব্দ টা উহু …আহ…ও আল্লারে…
ওর এবার আর বুঝতে কষ্ট হয় না শব্দটা কোথা থেকে আসছে। শব্দটা আসছে ওর বেডরুম থেকে। কিন্তু শব্দটা করছে কে? তিয়াস নাকি তাসফী। তিয়াস তো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আর তাসফী? ও তো এ রকম শব্দ করে না কখনো… তাহলে?
ও প্রায় দৌড়ে ঢোকে ওর বেডরুমে। বেডরুমের দরজা জানালা সব বন্ধ। বন্ধ কাচের জানালায় বিন্দু বিন্দু শিশির জমে আছে যেন। রুমে ঢুকতেই মনে হয় মাঘ মাসের কনকনে শীতকাল এখন। ও এসির রিমোটটা নিয়ে এসির স্কিন পাওয়ারটা বাড়িয়ে দেয়। সতেরো এর জায়গায় সাতাশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় স্থির করে। ছেলেটা জ্বর জ্বর ভাব। জানে না তিয়াস। কখন কমিয়ে দিয়েছে তাপমাত্রা…। আবারো শব্দটা ভেসে আসে ক্ষীণ কণ্ঠে
– আহ… উহ…
– এই তাসফী কি ব্যাপার তুমি এ রকম শব্দ করছো কেন আব্বু,  কাতরাছো কেন?
–  জ্বর এলে এ রকম শব্দ করতে হয়। আমি নাম্মীর কাছ থেকে শিখে এসেছি।
– মানে? মানে কী? চুপ কর। এ রকম শব্দ করো না।
– না, আমি নাম্মীর কাছ থেকে এ রকম শিখে এসেছি। জ্বর এলে এ রকম করতে হয়। তাহলে জ্বর সেরে যায়।
তিশা ভয় পেয়ে যায় যেন। গত তিন দিন আগে এসেছে যশোর বাবার বাড়ি থেকে। সেখানে গত সপ্তাহে ওর আম্মুর একটা অপারেশন হয়েছে। তার আগে খুব জ্বর ছিল ওর আম্মুর। একশ চার, তিন। তার নিচে জ্বর নামছিল না কিছুতেই। সাপোজিটর দিলে ঘন্টা দুই কমতো। আবার যা ছিল, তাই। ডাক্তার বললেন,
– অপারেশন না করা পর্যন্ত জ্বর নামবে না।
– এ রকম জ্বর থাকলে কি অপারেশন করা যাবে।
– অসুবিধা নেই। এর মধ্যেই করতে হবে। জ্বর একটু কমিয়ে নিয়েই করতে হবে। অপারেশন না করা পর্যন্ত এ জ্বর কমবে না। ভেতরে ইনফেকশন হয়ে গেছে। এটা ইনফেকশনের জ্বর।
ডাক্তারের কথামত অপারেশন করলে তারপর ঐভাবে আর জ্বর আসেনি। আম্মুর জ্বরের সময় তাসফী সারাক্ষণ আম্মুর পাশে থেকেছে। আম্মুর যখন অনেক জ্বর থাকতো, তখন সে জ্বরের ঘোরে এ রকম করে কাতরাতো। সেটাই তাসফী শিখে ফেলেছে। নইলে ওর জ্বর তো মাঝে মাঝেই হয়। কই আগে তো কখনো ও এ রকম শব্দ করেনি।
ও জড়িয়ে ধরে বাবুকে। আহারে, হাত যায় মাথায়। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে শরীর। কত হবে ওর জ্বর? একশ, এক, দুই তিন নাকি চার? ও আর বুঝতে পারে না কিছুই। জোরে ধাক্কা দেয় তিয়াসকে,
– এই ওঠো ওঠো, দেখো তাসফীর কত জ্বর!
হুড়মুড় করে উঠে পড়ে তিয়াস। কপালে হাত দিয়ে চমকে ওঠে ও,
– তাই তো! এত জ্বর কখন থেকে? আমাকে বলোনি কেন?
-এত জ্বর তো রাতে ছিল না। তুমিও তো ছিলে না। তোমাকে আর অকারণ বিরক্ত করতে চাইনি। এখন দেখ কি করবে।
– তুমি রেডি হয়ে নাও। আমি ড্রাইভারকে ফোন দিচ্ছি। আব্বুকে রেডি কর। শিশু হাসপাতালে চল।
– আগে না হয় এক ডোজ ঔষধ খাওয়াই। স্পঞ্জ করি। দেখি জ্বরটা আগে নামাই। তারপর হাসপাতালে যাই। এত জ্বর নিয়ে মুভ করা ঠিক হবে না। আমি পানি আনি। তোয়ালে ভিজাই। তুমি ওঠো।
খুব দ্রুত হাতে সমস্ত গা স্পঞ্জ করে দুজন। অনেকক্ষণ। যেভাবে জ্বরটা ধাঁ ধাঁ করে উঠেছিল। নেমেও যায় ঠিক সেইভাবে। তিশা একটু ধাতস্থ হয়ে স্যুপ করে আনে। একটু একটু করে স্যুপ তুলে দেয় ছেলের মুখে। ছেলে আবার স্বাভাবিক হয়।
বাবা মায়ের গায়ে ঘাম দিয়ে জ্বর নামে যেন। হাতের মুঠোয় ধরা হৃৎপিন্ডগুলো জায়গামত সেট হয়ে আবারো টিক্ টিক্ করে। বুঝতে পারে তাদের বাবা মাও ঠিক এরকম মমতা দিয়ে বড় করে তুলেছে তাদের।
এই তো গত দেড় মাস আগে তিশার মায়ের গলব্লাডারে স্টোন ধরা পড়ে। ডাক্তার বললেন,
– আগামীকালই অপারেশন করে ফেলুন। অকারণ দেরি করা ঠিক হবে না।
– কিন্তু আমার মেয়ে দুটোর যে সামনে পরীক্ষা। ওরা তো এই মুহূর্তে আসতে পারবে না।
– বারে, অপারেশন হবে আপনার। মেয়েদের দিয়ে আমি কি করব? মেয়েরা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিক। ওদের আসবার তো দরকার নেই। অসুবিধা থাকলে ওরা আসবে কিভাবে?
– কি যে বলেন না। ওদেরকে না দেখে আমি অপারেশন টেবিলে যাব কিভাবে?
– এটা কোন কথা হল? এই উত্তরাধুনিক সময়ে প্রযুক্তির যুগে আপনার মত একজন শিক্ষিত মানুষের মুখে এ কথা মানায়?
– তা ঠিক। তবে জানেন কি ডাক্তার সাহেব, মায়ের মনের কাছে সব যুক্তি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি অর্থহীন। সেখানে শুধু আবেগ আর ভালোবাসা থাকে। তার কাছে সব বাস্তব যুক্তিহীন অর্থহীন হয়ে যায় মুহূর্তে।
– সবই ঠিক আছে। অপিনিয়ন আমার কিন্তু ডিসিশনটা আপনার। তা ছাড়া মেয়েরা যদি আপনার দেশের বাইরে থাকত তখন কি করতেন?
– পরিস্থিতিই বলে দিত আমার করণীয়।
– ঠিক আছে আগামীকালই হবে অপারেশন। তোমার ওসব কোন যুক্তি কাজ দেবে না এখানে।
ডাক্তারকে সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছিল তিশার আব্বু। কিন্তু তারপরও তিশার আম্মু অপেক্ষা করেছে মেয়েদের জন্য।
ডাক্তারের সাথে আব্বু আম্মুর সব কথাই শুনেছে মোবাইলে। ওরাও বার বার অনুরোধ জানিয়েছে তাদের অনুপস্থিতিতেই অপারেশনটা করিয়ে নেবার জন্য। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি কিছুই। তারপর ঠিকই ইনফেকশনের প্রবল জ্বরে আম্মু ভুল বকেছে ক’দিন। আর ওদের যত্নের পরশ মেখে অপারেশনের টেবিলে নিশ্চিন্তে শুয়েছে শেষ পর্যন্ত।
– আম্মি, আমি ভাত খাব।
তাসফীর ভাত খাওয়ার কথা শুনে তিশা জেগে ওঠে যেন। ধড়ফড়িয়ে ডাইনিং রুমে যায়। ফ্রিজ থেকে তাসফীর মাংসের বক্স বের করে। ওভেনে দেয়। ছোট্ট বাচ্চা মুরগির মাংসের তরকারি গরম করে। গরম ভাতের সাথে মাংসের ঝোল দিয়ে সুন্দর করে ভাত মাখায় তিশা। রানটা ওর হাতে ধরিয়ে দেয়।
কিন্তু তাসফী হাত থেকে মুরগির রানটা এক পাশে সরিয়ে রেখে থালার অন্য পাশ থেকে শুধু ভাত খেতে থাকে।
– তুমি শুধু ভাত খাচ্ছ কেন?
-জ্বর হলে শুধু ভাত খেতে হয়। নরম ভাত। আমি নাম্মীর কাছ থেকে শিখে এসেছি।
– সে আবার কি?
– পানি ভাত। ন্যান রান্না করত নরম ভাত। তুমি রান্না করতে নরম ভাত। আমি ন্যান ভাত খাব। আমি পানি ভাত খাব।
– না, তুমি এটা খাও।
–  না না, আমি এসব খাব না। শুধু ভাত খাব। নরম ভাত। পানি ভাত। ন্যান ভাত।
ওর মায়ের যখন একশ চার জ্বর। মুখে কিছু দিলেই বমি হচ্ছিল। পেটে ব্যথা হচ্ছিল। তখন ডাক্তার শুধু নরম ফ্যানে ভাত খেতে বলেছিলেন। যেটা তিশা এবং ওর ছোট বোন তিফা রান্না করে দিত। ও সেই ফ্যানে ভাতকেই ন্যান ভাত বলছে।
ও একেক বার যশোর থেকে আসে আর একেকটা বায়না ধরে। গতবার নাম্মীর বাসা থেকে ফিরে সে কি কান্না।
– আমাকে নাম্মীর বাসায় পাঠিয়ে দাও। এখানে অনেক গরম। আমি নাম্মীর এসির ঘরে যেতে চাই। আমাকে এসি হানিফ বাসে উঠাও।
– তুমি কি একা যেতে পার?
– পারব। দেখছো না আমার গায়ে চুলকাচ্ছে। আমাকে নাম্মীর মত এসি কিনে দাও।
তিশা দেখে সত্যি সত্যি গরমে ছেলের গায়ে লাল লাল ফোস্কা পড়ে গেছে। এবারই সবচেয়ে বেশি দিন ছিল সে নাম্মীর বাসায়। সারাদিন নাম্মীর ঘরের এসি থেকে বের হইনি। এ ক’দিনেই অভ্যাস হয়ে গেছে ওর। এবার গেলে আর আসবে না কেমন? ধমক দেয় তিশা।
– তাহলে আমাকে নাম্মীর মত এসি কিনে দাও।
তখন ভীষণ গরম পড়ছিল সারা দেশে। বাধ্য হয়ে তিয়াস এয়ারকুলার থাকা সত্ত্বেও একটি এসি কিনেছে।  আর এবার শিখে এসেছে ন্যান ভাত। ও খালামনিকে ন্যান বলে। ন্যান রান্না করেছে বলে তার নাম দিয়েছে ন্যান ভাত। তিশা আবার ভাবে ছেলেটা তার মেধাবী হবে। তাসফী আবার কান্না শুরু করে,
-আমাকে ন্যান ভাত দাও।
– আচ্ছা ঠিক আছে আমি তোমাকে ন্যান ভাত দিচ্ছি। তুমি বসে বসে রানটা খাও। আমি আনছি।
তিশা কিচেনের দিকে যায়। একটু নরম ভাত করতে হবে।
পেছন থেকে তাসফী ডাকে
– আম্মু শোন, নাম্মা আমাকে অনেক ভালবাসত। নাম্মা আমার জন্য এরকম চিকেন নিয়ে আসত। বড় বড় রুই ফিশ আনত। নাম্মীও আমাকে অনেক ভালবাসত। রোজ আমার জন্য কিটকাট, ডেইরি মিল্ক আনত। মামা আমার মামা। মামা আমাকে বাইশ সিডি গেম দিয়েছে। বাস গেম, হেলিকপ্টার গেম, টেম্পল রান, সাবওয়ে সার্ফ আরও কত কি গেম দিয়েছে। আমি খেলব। আমার ট্যাব কই। আমার ট্যাব দাও। আমার ট্যাব দাও।
– তোমার নাম্মা, নাম্মী শুধু তখন ভালবাসত না, এখনো তোমাকে ভালবাসে।
তিশার আর বুঝতে বাকি থাকে না। ওর মামার জন্য নানা ভাইয়ের জন্য ওর মন কেমন করছে। ওর মনে পড়ে গতবার ওর আম্মুর একটা প্রোগ্রামে ও গিয়েছিল তাসফীকে নিয়ে। ওর আম্মু যখন মঞ্চে কথা বলছিল, ও তখন অডিয়েন্সে ওর মাথা খারাপ করে দিচ্ছিল।
– আমাকে নাম্মীর কাছে নাও। আমি নাম্মীকে অনেক লাইক করি। আমি নাম্মীকে অনেক পছন্দ করি। আমি মাইকে কথা বলতে পারব তো। আমাকে মঞ্চে বসতে দাও।
ওর আম্মু যখন নিচে নেমে ওকে কোলে নিচ্ছিল তখন তাসফী ওর আম্মুকে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিচ্ছিল। আসলে ও সবাইকে অনেক পছন্দ করে। অনেক মিস করে। ওর দাদা, দাদুমনি, ফুপি, চাচা সবাইকে অনেক পছন্দ করে। মিস করে। আসলে বাচ্চারা সবার সাথে থাকতে পছন্দ করে। তাহলে পরিপূর্ণভাবে ওদের মেধা বিকশিত হয়। কিন্তু ও তো বড় হচ্ছে ছয় তলার এই একটি মাত্র ফ্ল্যাটে শুধুমাত্র আম্মি আব্বির সাথে। এখানে দিগন্ত জোড়া আকাশ দেখা যায় না, খেলার মাঠ নেই। খোলামেলা জায়গা নেই। আব্বিকে সারাদিন পায় না। অফিসে থাকে। আর আম্মির এমবিএ নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত। ওর খুব একা একা লাগে। নিঃসঙ্গ বোধ করে ও। তাই তো ক’দিনের জন্য দাদা বাড়ি নানা বাড়ি বেরিয়ে আসার পর ওর মনের ওপর চাপ পড়ে। জ্বর এসে যায়। কিন্তু কি আর করা? এভাবেই তো ওকে বড় হতে হবে। ঢাকা শহরের লক্ষ লক্ষ বাচ্চাকে এভাবেই বড় হতে হচ্ছে। অনেক বাচ্চাকেই তো ডে কেয়ার সেন্টারে বড় হতে হয়। বাবুকে ডে কেয়ার সেন্টারে রাখবার ভয়েই তো তিশা তার কয়েকটি মাল্টি মিডিয়া কোম্পানির চাকরিকে এভয়েড করেছে। অনেকটা বাধ্য হয়েই রাত্রীকালীন কোর্সে এমবিএ ভর্তি হয়েছে।
সপ্তাহের তিনদিন সন্ধ্যার পর ক্লাস থাকে তিশার। তার মধ্যে দুদিন তিয়াসের সাপ্তাহিক ছুটি। অন্যদিন হয় তিশার হোস্টেল অথবা তিয়াসের অফিস। ক্লাসে যাবার আগে ওকে নির্ধারিত জায়গায় নামিয়ে রেখে তারপর ক্লাসে ঢোকে তিশা। সময় করে দিনের বেলা পড়তে বসে। কিন্তু ইদানীং পড়তে বসলে তাসফী খুব ঝামেলা শুরু করে। রাজ্যের প্রশ্ন তার মাথার মধ্যে গিজগিজ করে। দুনিয়ার পড়াশুনা নিয়ে হাজির হয় সে।
– আমার পরীক্ষা। আমাকে অনেক পড়তে হবে। আমাকে পড়াও। টিচার আমাকে বকবে তো!
ফোন বেজে উঠলে চেঁচামেচি শুরু করে,
– আমার টিচার ফোন দিয়েছে। ফোনটা আমাকে ধরতে হবে তো। আমাকে ফোন দাও।
একটু আগে পড়তে বসেছে তিশা। কোথা থেকে একগাদা খাতাপত্র ছড়ার বই এনে পাশে বসল পড়তে। এটা ওটা আঁকিবুকি করবার পর শুরু হলো তার অবিরাম কথাবলা আর একের পর এক প্রশ্ন,
– নানা ভাই বলে, নামিরা স্যুপটুকু খেয়ে নাও, আস্তে আস্তে খাও। নামিরা বেদানা ডালিম খেয়ে নাও। আস্তে আস্তে খাও। নানা ভাই নাম্মীকে নামিরা বলে কেন?
– কি বলবে।
– কেন, নাম্মী বলবে।
– নাম্মী কি তোমার নানাভাইয়ের নাম্মী হয়? নাম্মী তো শুধু তোমার নাম্মী।
– তাহলে কি হয়, নামিরা হয়?
– হ্যাঁ নামিরা হয়। চুপ কর তো। আর কথা বল না, আমি একটু পড়ি।
– আমার নাম্মী আমার আব্বুর কি হয়?
– চুপ করো প্লিজ।
– বলো আমাকে।
– তোমার আব্বুর আম্মু হয়।
– তোমারও আম্মু হয়, আব্বুরও আম্মু হয়?
– হ্যাঁ, প্লিজ, আর কথা বলো না।
– আমার তো পরীক্ষা। আমাকে পড়তে হবে তো। আমাকে লিখাও। আমাকে পড়াও।
তিশার মনে মনে খুব রাগ হয়। মাঝে মাঝে মনে হয় একটা আছাড় দেই। পড়তে বসলেই ছেলেটা ঝামেলা করে কেন? আবার ভাবে না, আমি ছাড়া আর কাকে ও প্রশ্ন করবে? আবার ওকে কোলে তুলে একটু আদর করে দেয়। নাক টিপে দেয়।
– ও আমার টিয়া পাখি।
– তুমি বলবে না। নাম্মী আমাকে টিয়া পাখি, ময়না পাখি, চড়–ই পাখি বলে। পাখির মত আমাকে উড়তে শিখিয়েছে নাম্মী। এই দেখ, বলেই সে পাখির মত দু’হাত দুই দিকে প্রসারিত করে ডানা মেলে উড়তে চায় যেন।
মুহূর্তেই থামিয়ে দেয় তিশা।
– ওভাবে উড়তে থাকলে তো খাট থেকে পড়ে যাবে।
– না, না আমি উড়ছি তো, পড়ব কেন?
তিশা তাড়াতাড়ি পড়া থেকে উঠে ওকে কোলে নিয়ে টিভি অন করে। ওর আর পড়া হয় না তখন।
আবার তিশা ভাবে ওকে স্কুলে দিলে কেমন হয়। ওর তো তিন বছর হবে সামনের মাসে। পাশের ফ্ল্যাটের রাইয়ানকে তো স্কুলে দিবে। তার সাড়ে তিন। সামনের এগারো তারিখ থেকে ওর স্কুল শুরু হবে। এ জন্যই তো ওর বাবা অফিস থেকে পনের দিনের ছুটি নিয়েছে। যে ছুটিটা প্রতি বছর সে পায়। অন্য বছর ছুটিটা ভোগ করে বছরের শেষে। এদেশ ওদেশ যায়। আবার গ্রামের বাড়িতেও যায়। এবার ছুটিটা সে ছেলের স্কুল শুরু উপলক্ষে নিবে। ওর মা একটি বিদেশী এনজিওতে কাজ করে। ওখানে ছুটির কোন সুযোগ নেই। গতকাল কথা হলো রঞ্জু ভাবীর সঙ্গে। তিশা ভাবে তাসফীককেও এর পরের ব্যাসে দিয়ে দিলে কেমন হয়। অন্তত ওর সারাটা দিনের কিছুটা সময় অনেকের সাথে কাটবে। নিজেও কিছুটা সময় পাবে পড়ালেখার জন্য। আবার ভাবে, না। মাত্র তিন বছর বয়সে ওকে স্কুলে দিলে ওর প্রতি অবিচার করা হবে। ওর সোনালি শৈশবকে গলা টিপে হত্যা করা হবে। বইয়ের ভারে ও হাঁপিয়ে উঠবে। তাছাড়া স্কুলে দিলেই তো হবে না। তার একটা এক্সট্রা ঝামেলা আছে। কে সামলাবে সেসব। তিয়াসের তো আর সময় নেই। তাকেই সামলাতে হবে সবকিছু। তার  চেয়ে যা আছে তাই থাক। দরকার নেই ওর স্কুলের। বরং আর একটা বছর যাক। তারপর ভাবা যাবে।
– আম্মি চল আমরা যশোর যাই। নাম্মীর বাসায় যাই। চল যাই।
– সেদিন না এলাম। এখন কি করে যাবো আব্বু।
– তাহলে স্কুলে চল। রাইয়ানের মত। রাইয়ান ভাইয়া স্কুলে যাবে।
– তুমিও যাবে। রাইয়ানের মত একটু বড় হও। তারপর যাবে।
– তাহলে নাম্মীকে আসতে বল। মামাকে আসতে বল। নাম্মাকে ঢাকায় আসতে বল। আমরা সবাই ঘুরব। শিশু মেলায় যাব। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে যাব। সবাইকে আসতে বল।
– না তাসফী তুমি কিন্তু অনেক ঝামেলা করছ। চুপ কর। নইলে মারব কিন্তু। একদম চুপ।
তিশার আকস্মিক বকা খেয়ে তাসফী কাঁদতে থাকে। ওর কন্টিনিউ কান্না থামাতে পারে না কিছুতেই। মনে হয় জোরে একটা চড় কষিয়ে দিই। কিন্তু পর মুহূর্তে আবার রাগ সামলায় তিশা। আহা রে ঔ তো বড্ড একা। আবার জড়িয়ে ধরে ছেলেকে।
– ন্যানের হোস্টেলে যাবে। তোমাকে নিয়ে যাব বিকেলে। তাহলে চুপ কর।
–  এখন চল।
– এখন ন্যান ভার্সিটিতে।
– বিকেলে তোমার ক্লাস আছে তো।
আহারে তাই তো তোমার মনে আছে সোনা পাখি। আসো কোলে আসো। একটু আদর করে দিই। তিশার মনটা এক মুহূর্তে নরম হয়ে যায়।
আসলে এরকম খালি বাড়িতে একা একা একটা বাচ্চা মানুষ করা খুব কঠিন। একক ফ্যামিলিতে যেমন সুবিধা আছে, তেমনি অসুবিধাও কম নয়। ওর ছোটবেলায় ও যৌথ ফ্যামিলিতে বড় হয়েছে। সেখানে ও সুবিধা অসুবিধা দুই ই আছে। তবে ইদানীং ওর কেন যেন মনে হচ্ছে আসলে বাচ্চা মানুষ করবার জন্য যৌথ ফ্যামিলি অনেক স্বস্তিদায়ক। সন্তানের মানসিক সুস্থতার জন্য বাবা-মায়ের পাশাপাশি আরো অনেককে প্রয়োজন। শুধুমাত্র টিভি, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব, ভিডিও গেমই যথেষ্ট নয়।
বাড়ি থেকে এসেছে ওরা কদিন। তাসফীর জ্বর, তিয়াসের বস্তিশুমারি, ওর পরীক্ষা শুরু। সব মিলিয়ে হিমশিম খাচ্ছে কয়দিন। তাসফীর জ্বরটা গেছে, তিয়াসের শুমারি শেষ। ওর পরীক্ষা আগামীকাল শেষ হবে। যদি আবার একটু আম্মুকে দেখতে যাওয়া যেত। এক সপ্তাহ ব্রেকিং ক্লাস মিস হলেও পুষিয়ে নিতে পারবে। সুযোগ পেলে যাওয়া যেত। কিন্তু তিয়াস কি এখন ছুটি পাবে? একা একা লং জার্নিতে তাসফীকে নিয়ে কষ্ট হয় অনেক। তিশার কি অবস্থা। ওকে ফোন দিতে হবে। দেখি, ওর ব্রেকিং ক্লাসের কি অবস্থা? এরই মধ্যে বেজে ওঠে তিয়াসের ফোন।
– কি ব্যাপার অসময়ে? সময় পেলেন স্যার, বউয়ের সাথে কথা বলার সময় পেলেন তাহলে?
– আরে বউয়ের সাথে কথা বলার আর সময় অসময় কি? যাবে নাকি যশোর? আমি যাচ্ছি পরশু সকালে। চারদিন ট্রেনিং। একা জিপ গাড়িতে শুমারির মালপত্র নিয়ে যাচ্ছি। রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মাগুরা, ঝিনেদা হয়ে যশোর। এবং সবশেষে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট। ভার্সিটির কি অবস্থা? ছুটি পাওয়া যাবে? আম্মুকে দেখে আসা যেত।
– আমিও তাই ভাবছিলাম। সেই যে হসপিটাল থেকে বাড়িতে এনেই চলে এলাম। মনটা পুড়ে যাচ্ছে।
– তাহলে রাজি হয়ে যাবো?
– এখনো হওনি?
– রাজকন্যার অনুমতি না নিয়ে… কি যে বল না…
– আবার অনুমতি? উয়াও…তাসফী নাম্মীর বাসায় যাবে? আমরা সবাই…
– নাম্মীর বাসায়? ও নাম্মীর বাসায় যেতে হবে তো!  হু যাবো তো! হু, মামার সাথে দেখা করব তো! নাম্মীর বাসায় যাব…। ন্যানকে নিতে হবে তো! কবে যাব, কখন যাব? চল এখুনি নাম্মীর বাসায় চল…
তিশা তাসফীর দিকে তাকিয়ে দেখে তার চোখের তারায় ফুলকি ফোটে আকাশ জোড়া…। হ

SHARE

Leave a Reply