Home গল্প আব্বুর কালো বিড়াল নূর নাকীব মন্ডল

আব্বুর কালো বিড়াল নূর নাকীব মন্ডল

সকালে শীতের ভেজা ভেজা মিষ্টি রোদে দাঁড়িয়ে কর্মব্যস্ত মানুষের চলাচল দেখতে দেখতে শ্বাসকষ্টে অসুস্থ আব্বুর কথা মনে পড়লে মুঠোফোনে কল দিলাম। আমার ছোট্ট ভাতিজি শিমু মোবাইল রিসিভ করে বলল, দাদু ঘুমাচ্ছে, তারপরও সে আব্বুর কাছে গেল আব্বুকে দাদু দাদু বলে ডাকল, শুধু আ শব্দ শুনে বললাম থাক ঘুমাক, ডেকো না ঘুম থেকে জাগলে পরে কথা বলব এই বলে মোবাইলে  আঙুল চাপলাম মুহূর্তেই বিচ্ছিন্ন হলাম।
এই বিচ্ছিন্নই যে চিরবিচ্ছিন্ন হবো তা একটুও অনুমান করতে পারিনি। কিছুক্ষণ পর আবার মিসকল এলে আবার কল দিলাম মা রিসিভ করে সালাম ফিরালেন, বললাম মা কেমন আছেন? আব্বু কেমন আছে? মা বললেন, কই তোর আব্বু ভালো! ভালো নেই, কিছুই খায় না। বললাম রংপুরে নিয়ে আসেন ডাক্তার দেখাই, বললেন ঘরেই প্রস্রাব পায়খানা করে, এতদূর নিয়ে যাওয়া যাবে না, কিছু টাকা দে কাছাকাছি সুন্দরগঞ্জে নিয়ে যাই। বললাম টাকা হলে পাঠাব, ঐ খানে ব্যবস্থা করেন বলে কল কেটে দিলাম। সাথে সাথেই একজন পরিচিত বয়স্ক চাচা এলেন। বললাম, চাচা কী করি আব্বুর হক আদায় করতে পারলাম না! এখন চিকিৎসার জন্য টাকা চাইলেন মা, দিতে পারলাম না। দুই দিন আগে আব্বু চিতল মাছ আর আইড় মাছ পাঠিয়ে দিতে বলেছিলেন, তাও পারিনি। ব্যবসার অবস্থা এতই খারাপ যে একেবারে হাত ফাঁকা। চাচা বললেন, তবুও যাই হোক বাবার প্রতি তোমার যথেষ্ট আন্তরিকতা আছে যে কারণে তুমি নিজেই বললে, বাবার হক আদায় করতে পারলাম না। যাক মনে কিছু কর না কষ্টে কেঁদ না। চেষ্টা কর মহান মালিক তো সবই দেখছেন। আমিও আমার আব্বা-মাকে হঠাৎ এক নিমিষেই হারিয়েছি। আমি তবুও চাচাকে বললাম, চাচা টাকা থাক আর না থাক নিজের সন্তানের জন্য ঠিকই কোন না কোন উপায়ে শত আবদার চাওয়া পাওয়া পূরণ করতে করতেই দিন-রাত কেটে যায় ভীষণ ব্যস্ততায়। শিশু-কিশোর বাচ্চারা বোঝে না টাকা থাকা না থাকা। এভাবেই তো আব্বু আমাদের আট ভাই-বোনকে লালন পালন করেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন! যার যার তার তার নিজের সন্তান নিয়েই ব্যতিব্যস্ত সবাই! সেই পিতা-মাতার চাওয়া-পাওয়ার তেমন গুরুত্ব নাই। হায় এই নশ্বর পৃথিবীতে যুগ-যুগান্তরে বংশ পরম্পরায় পিতৃত্বের-মাতৃত্বের ঋণ শোধের প্রেম খেলা! কবি কতই না সুন্দর করে বলেছেন, ‘লুকিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।’ চাচা মুচকি হেসে চলে গেলেন।
আমি শোরুমের ভেতরে গিয়ে চেয়ারে বসে কী যেন আনমনে ভাবছি। হয়তোবা টাকার কথাই অভাবের কথাই ভাবছিলাম। দুপুরে জোহরের নামাজ আদায় করে বাসায় খাওয়ার টেবিলে বসে আমার শ্যালক ও বিবিকে বললাম, আব্বু মনে হয় আর বাঁচবেন না। বাড়ি যেতে মন চাইছে, আগামী শুক্রবার চলে যাবো ইনশাআল্লাহ। শ্যালক বলল, না হয় আজকেই যান। আরও বেশ কিছু প্রাসঙ্গিক কথা বলে একটু বিশ্রাম নিয়ে শোরুমে গিয়ে কম্পিউটারে কী যেন করছিলাম। আসরের নামাজ পড়ে এসে পত্রিকায় কেবলই চোখ বুলাচ্ছি। ঐ মুহূর্তে বড় ভাতিজা ফোন করে বলল,
চাচ্চু আপনি কোথায়?
বললাম কেন?
দাদু মারা গেছে! তাড়াতাড়ি আসেন।
মুহূর্তেই নিস্তেজ হয়ে গেলাম নীরব নির্বাক, পিতাশূন্য, মহাশূন্য মন! একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললাম-
কে বলল? সত্যি বলছ!
বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ সুন্দরগঞ্জে, আম্মা নিয়ে গেছে ওখানেই মারা গেছে। অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ নিয়ে আসছে। চোখ গড়িয়ে পানি ঝরছে। বাসায় ফোন দিয়ে বিবিকে বললাম কিছু শুনছো? বলল না তো! আব্বু মারা গেছেন। ও আল্লাহ বলে কল কেটে দিলেন।
সকালবেলা যে চাচার সাথে আব্বুকে নিয়ে কথা বললাম, সেই চাচা পাশের একটি ডাক্তারের চেম্বারে বসে পত্রিকা পড়ছেন। চাচাকে সালাম দিয়ে বললাম, চাচা আব্বু মারা গেছেন! আমাদের চারটি চোখ স্থির অবাক। তারপরও বললেন, আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়েছেন, কিছু করার নেই, সবাইকেই যেতে হবে, কেঁদো না, দেখে শুনে যাও। সকালেই তো তুমি বললে বাবার হক আদায় করতে পারলাম না। আরও বললে, বাপের বেলায় টাকা থাকে না অথচ আমার নিজের সন্তান নিয়ে মজে আছি।
দ্রুত যাওয়ার চেষ্টা করছি বাসায়। পথ শুধু পথেই বাড়ে, শেষ যেন আর হতে চায় না। মেজো ভাই ফোন দিয়ে বললেন, বাবা নাইরে ভাই, বাবা আর নাই। আমি বজরায় আছি, আব্বা আমাকে সকালে জোর করে পাঠালেন তার মামীর কলমাখানিতে খাসি পৌঁছে দিতে, এখন সেই আব্বাই নেইÑ বলে কাঁদছেন তো কাঁদছেন। বাসায় না যেতেই কানবিদারী কান্নার আওয়াজ কানে আসছে। দেখলাম লোকভর্তি শোকাহত মানুষ মেঝেতে আব্বুকে খাটিয়ার কাফন পরিয়ে সুরমা লাগাচ্ছে, নিথর নীরব চোখের ভ্রুতে! ও বাবা বলে চিৎকার করলাম! দু’জন ধরলেন আমাকে, আমি দেখছি আব্বু চুপচাপ শুয়ে আছেন, ঘুমিয়ে গেছেন আর কোন দিন এই দুনিয়ার কারো করুণ কান্নার আবদারে জাগবেন না! গলা ফেটে ডাকলেও চোখ খুলে দেখবেন না! না না, আর কোন দিন ফিরবেন না।
আব্বুর কালো বিড়ালটি গলা ছেড়ে চিৎকার করে কাঁদছে, আব্বুর খাটিয়ার চার পাশে ঘুরছে, আবার আব্বুর লাশের নিচে বসে বসে কাঁদছে। আব্বু সকল প্রাণীকে ভীষণ ভালবাসতেন। তিনি বাহির থেকে আসার সময় তার গলার আওয়াজ শুনে সব বিড়াল মিউ মিউ স্বাগত সঙ্গীতে দৌড়ে যেত। মনে হয় তাদের মনিবকে রিসিভ করতে এগিয়ে যায়। খেতে বসলে আগেই বিড়ালগুলোকে আলাদা আলাদা করে খাবার দিতেন তার পর তিনি খাওয়া শুরু করতেন। শুধু মাছের কাঁটা দিতেন না, মাছও দিতেন। বিড়ালরা শুধু সাদা ভাত খেত না, তাই তিনি ভাত মেখে মেখে খাওয়াতেন। খাওয়া শেষ হলে আব্বুর বিছানায় ঘুমাতো। এটা ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। তাদের মধ্যে কম বয়সী কালো শিশু বিড়ালটা গলা ছেড়ে চিৎকার করে কাঁদছে। সবার চেয়ে তার কান্নার আওয়াজ বেশি। সারারাত ছোট বোন দুটি আর বিড়ালটির আর্তচিৎকারে রাতের অন্তর কেঁপে কেঁপে তুলে, পার করে দিলো শীতঝরা কালরাত্রি। বিড়ালটি সকালেও মানুষের ভিড়ের মাঝেও ধীর ধীরে কেঁদে কেঁদে ঘুরছে। পৌনে বারোটায় জানাজার নামাজ পড়ে, কবর দেয়ার দৃশ্য মোবাইলের ভিডিও যোগে আমার প্রবাসী দুই ভাই দেখছেন আর কাঁদছেন। কবরের মাটির বিছানায় আব্বুকে একাকী শুয়ে রাখা থেকে শুরু করে একটি একটি করে বাঁশের হাদলা দিয়ে আব্বুকে চিরদিনের জন্য মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া পর্যন্ত দেখালাম। দুনিয়ার আলো বাতাসে, ঘরবাড়ি, মাঠে-ঘাটে, কোথাও নেই তিনি! আব্বু এখন মাটির সাম্রাজ্যে, মাটির অন্তরে!
আব্বুশূন্য বাড়িতে এসে বাড়ির মেঝেতে বসলাম, আব্বুর কালো বিড়ালটি আব্বুকে গোসল করার জায়গার চার পাশে একবার ঘুরে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল! আমরা ভাবতেও পারিনি! এ যাওয়াই তার শেষ যাওয়া। আমরা ছয় দিন বাড়িতে ছিলাম এর মধ্যে কোন দিন অভিমানী বিড়ালটি আর আসেনি। পিতাশূন্য প্রাণ, অভিভাবকশূন্য বাড়ি, কতটা মহাশূন্য তা অনুমান করার আবেগ শুধু  ভুক্তভোগীদেরই আছে। আর অন্য কারো নেই। শোকাহত আমরা কেউ বাড়ি ছেড়ে যাইনি কিন্তু আব্বুর কালো বিড়ালটি বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, তাহলে কি আমাদের সকল সন্তান-সন্ততির চেয়েও ভালোবাসায় জিতে গেল সে!

SHARE

Leave a Reply