Home ধারাবাহিক: দুর্গম পথের যাত্রি দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ

দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ

গত সংখ্যার পর

হিন্দা ঘটনাটি ঘটিয়েছিল ইহুদিদের সাহায্য নিয়ে। কোনো কোনো ঐতিহাসিক এটা ইহুদি ষড়যন্ত্র বলেও উল্লেখ করেছে। ইহুদিরা বনু বাকারের একটি মেয়েকে খাযায়াদের এক গ্রামে পাঠিয়ে দিয়ে বনু বাকারের সরদারকে জানালো যে, খাযায়ারা বনু বাকারের একটি মেয়েকে ওই গ্রামে আটকে রেখেছে। সরদার তার নিজস্ব লোক মারফত খবর নিয়ে জানতে পারলো, সত্যি ওই গ্রামে বনু বাকারের একটি মেয়ে আছে। সরদার মেয়েটিকে উদ্ধার করার জন্য সেই গ্রামে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এদিকে হিন্দা তার স্বামী আবু সুফিয়ানকে না জানিয়ে কোরাইশ বংশের কিছু লোককে পাঠায় সরদারকে সহযোগিতা করতে। কোরাইশ বংশের বিখ্যাত সেনাপতি আকরামা ও সাফওয়ানকে সে আগেই রাজি করিয়েছিল এই অভিযানে অংশ নিতে। ফলে সেই রাতের আক্রমণে আকরামা এবং সাফওয়ানও শরিক ছিল।
রাতের এ আক্রমণটি চালানো হয়েছিল অতর্কিতে। খাযায়া সম্প্রদায়ের লোকেরা এ জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। ফলে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আগেই খাযায়া সম্প্রদায়ের বিশ জন লোক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল এবং বহু লোক আহত হয়েছিল। পরে সবার কাছেই এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, এ আক্রমণের পেছনে কোরাইশদের ইন্ধন ও সহযোগিতা ছিল। এটা ছিল হোদায়বিয়া সন্ধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর খাযায়া সরদারের কাছে এটাও স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এ আক্রমণ নিছক দুর্ঘটনা ছিল না, এটা কোন গভীর ষড়যন্ত্রেরই অংশ। খাযায়া সরদার বিষয়টি মহানবীকে জানানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন এবং কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে মদিনায় রওনা হলেন। মদিনায় পৌঁছে সরদার মহানবীর কাছে সব কথা খুলে বললেন। এটাও বললেন, এ আক্রমণ বনু বাকার করলেও এর পেছনে ইন্ধন ছিল কোরাইশদের। তারা কেবল বনু বাকারকে উসকানিই দেয়নি, সক্রিয় অংশগ্রহণও করেছিল। তিনি নাম উল্লেখ করেই বললেন, এ আক্রমণে কোরাইশদের প্রসিদ্ধ সেনাপতি আকরামা এবং সাফওয়ানও অংশ নিয়েছিল। সব শুনে রাসূলে করীম (সা) চিন্তায় পড়ে গেলেন। এমনটা তো হওয়ার কথা নয়! এটাতো হোদায়বিয়া সন্ধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন! কোরাইশরা এটা করতে গেল কেন? তবে কি তারা মুসলমানদেরকে আবারও যুদ্ধের আহবান জানাচ্ছে? বিষয়টি নিয়ে তিনি গণ্যমান্য সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন। বললেন, সন্ধির শর্ত অনুসারে এখন আমাদেরকে বনু খাযায়া বংশের সাহায্যে এগিয়ে যেতে হবে। যত কঠিনই হোক, আমরা বনু খাযায়ার আবেদনকে এড়িয়ে যেতে পারি না। সাহাবীরা একবাক্যে এ মত সমর্থন করলে রাসূল (সা) মুজাহিদদেরকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বললেন।
রাসূল (সা) এ ঘটনার অন্তর্নিহিত কারণ বুঝার চেষ্টা করছিলেন। এটি যদি বনু বাকার ও বনু খাযায়া গোত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো তবে এটিকে ভিন্ন ভাবে ভাবা যেতো। কিন্তু এ ঘটনায় কোরাইশদের সম্পৃক্ততা এবং তাদের বিখ্যাত সেনাপতি আকরামা ও সাফওয়ানের জড়িত থাকা এটাই প্রমাণ করে, কোরাইশরা হোদায়বিয়া সন্ধির শর্ত মান্য করা থেকে বেরিয়ে গেছে। প্রকারান্তরে তারা মুসলমানদের জানিয়ে দিলো, আমরা আর সন্ধির শর্ত মান্য করছি না, তোমরা যা পারো করতে পারো। এখন যদি মুসলমানরা কোনরূপ তৎপরতা না চালায় তবে অচিরেই তারা সরাসরি হামলা করতেও দ্বিধা করবে না। এর মাধ্যমে মূলত কোরাইশরা মুসলমানদেরকে যুদ্ধের জন্য আহবান জানিয়েছে। ঐতিহাসিকরা সবাই এ ব্যাপারে বলেছেন যে, রাসূল (সা) এ ঘটনায় কঠিন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং যুদ্ধের জন্য সবাইকে দ্রুত প্রস্তুতির নির্দেশ দেন। ফলে মদিনার ঘরে ঘরে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি হয়। সক্ষম প্রতিটি যুবক বাহিনীতে নাম লেখানোর জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে যায়।

আক্রমণের পরদিন আবু সুফিয়ানের কাছে খবর আসে, বনু বাকার গোত্র গতকাল রাতের আঁধারে খাযায়া গোত্রের ওপর আকস্মিক হামলা চালায়। এতে খাযায়া গোত্রের কয়েকজন নিহত এবং বহু লোক আহত হয়েছে। হঠাৎ করে এ আক্রমণের কোনো কারণ তিনি খুঁজে পেলেন না। তার মনে পড়লো, ভোরে তিনি আকরামা ও সাফওয়ানকে ঘোড়ায় চড়া অবস্থায় দেখেছেন। ঘোড়াগুলো তাজাদম ছিল না, বরং তাদের দেখে মনে হচ্ছিল, তারা বেশ পরিশ্রান্ত। তিনি আকরামা ও সাফওয়ানকে ডেকে পাঠালেন। তারা এলে তিনি তাদের বললেন, তোমরা কি শুনেছো, রাতে বাকার বংশের লোকেরা খাযায়াদের ওপর হামলা চালিয়েছিল? তারা অজ্ঞতা প্রকাশ করে বলল, কই, আমরা তো এমন কিছু শুনিনি! আবু সুফিয়ান তাদের বলল, তোমরা কোথায় গিয়েছিলে? সকালে দেখলাম, তোমরা কোথাও থেকে ফিরে আসছো। তোমাদের ঘোড়াগুলোকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। জবাবে ওরা বলল, আমরা সকালে ঘোড়দৌড় খেলছিলাম। কিন্তু আবু সুফিয়ান এ জওয়াব শুনে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তার মন বলছিল অন্য কথা। কই, তিনি তো কোন ঘোড়দৌড়ের কথা শোনেননি। আর আকরামা ও সাফওয়ানের পরনে প্রাতঃভ্রমণের পোশাক ছিল না। তাদের পরনে ছিল অভিযানের পোশাক। তিনি মাথা নিচু করে কিছু ভাবলেন। একসময় মাথা তুলে বললেন, ‘তোমরা কেমন করে আমাকে বিশ^াস করাবে যে, গত রাতে খাজায়া সম্প্রদায়ের ওপর বনু বাকার যে অতর্কিত আক্রমণ চালিয়েছিল, সে অভিযানে তোমরা দু’জন জড়িত ছিলে না?’
‘তুমি কি ভুলে গেছো বনু বাকার আমাদের বন্ধু।’ সাফওয়ান বললো, ‘যদি বন্ধু সাহায্যের জন্য ডাক দেয় তবে তুমি কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে?’
‘আমি কোন কিছুই ভুলে যাইনি।’ আবু সুফিয়ান বললো, ‘বরং তোমরাই ভুলে গেছো তোমাদের সরদার কে? আমি কোরাইশ সম্প্রদায়ের সরদার। আমার অনুমতি ছাড়া তোমরা কোন অভিযানে অংশ নিতে পারো না।’
‘আবু সুফিয়ান!’ বললো আকরামা, ‘আমি তোমাকে আমাদের সরদার মান্য করি। তোমার অধীনে আমি যুদ্ধও করেছি। তোমার প্রতিটি আদেশ নিষ্ঠার সাথে পালন করেছি। কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছি, তুমি আমাদের সম্প্রদায়ের সম্মান ও মর্যাদা ধুলার সাথে মিশিয়ে দিতে যাচ্ছো। মাদনার গুটিকয় মুসলমানের ভয়ে তুমি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছো। আমরা আমাদের বংশের মান-ইজ্জত এভাবে ধুলায় মিশিয়ে দিতে পারি না।’
আবু সুফিয়ানের চেহারা রাগে লাল হয়ে গেল। ক্ষিপ্তকণ্ঠে বলল, ‘আমি যদি কোরাইশ বংশের সরদার হয়ে থাকি তাহলে এমন অপরাধ আমি ক্ষমা করতে পারি না, যা তোমরা করেছো।’
‘আবু সুফিয়ান!’ বলল আকরামা, ‘তোমার কি সেই সময়ের কথা মনে আছে যখন খালিদ তোমাকে মদিনা যাওয়ার কথা বলতে এসেছিল, তুমি তাকেও ধমক দিয়ে থামিয়ে দিতে চেয়েছিলে। আমি তোমাকে বলেছিলাম, প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব মত গ্রহণ করার এবং তা মেনে চলার অধিকার আছে। তুমি সরদার বলেই তোমার মত অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে পারো না। তুমি তোমার এ মনোভাব ত্যাগ না করলে তোমাকে সঙ্গ দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।’
‘তুমি কি বোঝ না, কোন সম্মানিত ব্যক্তি কখনো তার অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে পারে না?’ আবু সুফিয়ান বললো, ‘তুমি বনু বাকারের সঙ্গী হয়ে মুহাম্মদদের সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ কবিলার ওপর আক্রমণ চালিয়ে নিজেই নিজের পাশে কুড়াল মেরেছো। নিজের সম্প্রদায়ের মর্যাদা রক্ষার নামে তোমরা আপন বংশের ধ্বংসের পথ খোলাসা করে দিয়েছো। যদি তোমরা মনে করে থাকো, এর ফলে মুহাম্মদ সন্ধির শর্ত রক্ষা করতে গিয়ে তাদের বন্ধু খাজায়া গোত্রের পক্ষে লড়াই করার জন্য মক্কা ছুটে আসবে এবং তোমরা সেই সুযোগে মুহাম্মদকে শেষ করে দেবে, তাহলে আমি বলবো, তোমরা বোকার স্বর্গে বাস করছো। তোমরাই বলো, কোন যুদ্ধে মুহাম্মদকে তোমরা পরাজিত করেছো? ভুলে যাচ্ছো কেন, বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিয়ে তার মোকাবেলা করতে গিয়ে তার সামান্য সৈন্যের কাছে বারবার তোমরা পরাজিত হয়েছো। কী পরিমাণ সৈন্য নিয়ে আমরা মদিনা অবরোধ করেছিলাম, সেটা তোমার অজানা নয়। তোমরা কি মুহাম্মদকে হারাতে পেরেছিলে?’
‘না, হারাতে পারিনি। আর সেটা পারিনি তোমারই জন্য। তুমিই আমাদেরকে অবরোধ তুলে নেয়ার আদেশ দিয়েছিলে।’ সাফওয়ান বলল, ‘আমরা নই, পরাজয় স্বীকার করে পিছু হটেছিলে তুমি। আমরা তোমার নির্দেশ মান্য করতে গিয়ে নিজের গায়ে পরাজয়ের গ্লানি মেখে নিয়েছিলাম মাত্র।’
‘আমি তোমাদের মত মাথামোটা ও গোঁয়ারগোবিন্দ লোকের পাল্লায় সমগ্র সম্পদায়কে অসহায়ের মত ছেড়ে দিতে পারি না। তোমরা ভুল পদক্ষেপ দিয়ে আমাদের লাঞ্ছনার পথে নিয়ে যাবে আর আমি বংশের সরদার হয়ে তা চোখ বুজে সয়ে যাবো, তোমরা এমনটা ভাবলে কী করে?’
‘তাহলে তুমি কি করতে চাও?’ আকরামা বলল।
আবু সুফিয়ান বলল, ‘সরদার হিসেবে আমার যা করার আমি তাই করবো। আমি মুহাম্মদকে জানাবো, আমাদের এক বন্ধু কবিলা তোমার বন্ধু কবিলার ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল এবং সে অভিযানে কোরাইশ বংশের কিছু লোকও অংশ নিয়েছিল। কিন্তু এটা আমাদের কোনো সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হয়নি। কিছু অতি উৎসাহী যুবক যেটা করেছে সেটা নেহাতই একটা দুর্ঘটনা। আমরা এখনো হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং সেটা মেনে চলার ব্যাপারে এখনো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ ঘটনাকে চুক্তির লঙ্ঘন মনে করে তিনি যেন কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত না নেন।’ আবু সুফিয়ান আকরামা ও সাফওয়াকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত অন্দর মহলে চলে গেলেন।

SHARE

Leave a Reply