Home কুরআন ও হাদিসের আলো কুরআনের আলো কুরআনের – আলো

কুরআনের – আলো

সকাল থেকেই নাবিলের মন ভালো নেই। কী যেন এক অস্থিরতা বিরাজ করছে তার মানসভূমিতে! মাঝে মধ্যে সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে। আত্মবিশ্বাসে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে কখনো কখনো। কিন্তু পরক্ষণেই আবার ভেঙে পড়ে। আশা-নিরাশার দোলাচলে এভাবেই সে দুলতে থাকে সারাবেলা। কারণ একটাই। আজ এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট বের হবে। ছাত্র হিসেবে সে কখনোই মন্দ ছিল না। পরীক্ষাও খারাপ হয়নি তার। তা ছাড়া, অতীতের সব পরীক্ষায়ই সে ভালো ফলাফল করেছে। তবুও তার এই এক অভ্যাস। রেজাল্টের আগে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারে না।
ঘড়ির কাঁটায়  বেলা ২টা। ততক্ষণে অনলাইনে রেজাল্ট প্রকাশিত হয়ে গেছে। দুরুদুরু বুকে নাবিল ক্লিক করলো কম্পিউটারে। স্ক্রিনে ভেসে উঠল তার রেজাল্ট। জিপিএ ফাইভ। তারপর? তার পরের অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত। যতটা অনিশ্চয়তায় ভুগছিল সে এতক্ষণ, তারচেয়ে শতগুণ আনন্দে নেচে উঠল। যেন সমুদ্রের বুকে উত্তাল ঢেউ। যেন কত জনমের স্বপ্নের চাঁদ হাতে পেয়েছে সে। নাবিলের আনন্দে একাকার হলো তার পুরো পরিবার। এমনকি পাড়া-প্রতিবেশীরাও। কারণ, সকলের কাছেই নাবিল একজন আদর্শ কিশোরের প্রতিচ্ছবি। কী পড়ালেখা, কী আচার-ব্যবহারÑ সবদিক থেকেই সে সকলের আস্থা ও ভালোবাসা কুড়াতে সক্ষম হয়েছে। আনন্দময় এ মুহূর্তে হঠাৎ আনমনা হয়ে উঠল নাবিল। মনে পড়ল, তার জীবনের সকল আনন্দ-বেদনার সমান অংশীদার একজন মানুষের কথা। যে মানুষটি তাকে অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছে। ভালোবাসার চাদর দিয়ে আবৃত করে রেখেছে সেই শিশুকাল থেকেই। সে মানুষটি আর কেউ নয়, তার নানা। নানা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। আজ তিনি সুস্থ থাকলে তার সফলতায় কিভাবে আনন্দ প্রকাশ করতেন, ভাবতেই নাবিলের চোখ দুটো ভিজে উঠল।
নানা গ্রামে থাকেন। নাবিল সিদ্ধান্ত নিলো, নানার সাথে দুয়েক দিনের মধ্যেই সে দেখা করবে। তার ভালোবাসায় আবারও একটু প্রশান্তির অনুভব নিয়ে ফিরবে সে। যেই ভাবা সেই কাজ। নাবিল চলছে নানাবাড়ি। গাড়িতে বসে সে হারিয়ে গেল স্মৃতির সমুদ্রে। স্মৃতিরা যেন গাড়ির গতির চেয়েও বহুগুণ বেগে এসে ভিড় করছে তার মানসপটে। কত স্মৃতি…কত প্রেম! মমতার কত আলপনা! ভালোবাসার কত রঙ! আসলে নানাবাড়ির স্মৃতিরা কি এমনই হয়?
ছোটবেলা নানাবাড়ি যাওয়ার যেমন আলাদা আনন্দ ছিল, তেমনি একধরনের ভয়ও কাজ করত নাবিলের মনে। নানা শিক্ষক ছিলেন। তাই বিভিন্ন ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল নাবিলকে। প্রশ্নগুলো অবশ্য পাঠ্যবই থেকেই করতেন। প্রথমে ভয়ে ভয়ে থাকলেও নাবিল যখন সব প্রশ্নের উত্তর যথাযথভাবে দিতে পারত, তখন নিজেকে মনে হতো মহানায়ক। নানাও খুশি হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতেন বুকের মাঝে। আহা! সে ভালোবাসার কী যে উষ্ণতা!
নানাবাড়ির আঙিনায় পা রাখার সাথে সাথেই চারদিকে সাড়া পড়ে গেল- নাবিল এসেছে…নাবিল এসেছে! নানার ঘরে ঢুকে সালাম বিনিময়ের পর তার মুখে মিষ্টি তুলে দিলো নাবিল। নাতির সফলতার খবর শুনে নানা যেন সুস্থ হয়ে উঠলেন। আবার জমল আড্ডা। নানা তার চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী ফিরে গেলেন প্রশ্নে। কিন্তু এবারের প্রশ্নের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা।
নানা নাবিলকে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করতে বললেন। নাবিল তিলাওয়াত করল কিন্তু নানা মনে হচ্ছে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। এরপর নানা বললেন, আচ্ছা বলো তো, ইসলামের মূলভিত্তি কয়টি ও কী কী? নাবিল বলল, পাঁচটি। কিন্তু কী কী তা বলতে গিয়েই থমকে গেল  সে। দু-একটি বলে আর বলতে পারল না।
নানা আর কোনো প্রশ্ন করলেন না নাবিলকে। বুঝতে পারলেন, নাবিলের কুরআন তিলাওয়াত শুদ্ধ নয়। তা ছাড়া ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কেও নাবিলের সুস্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। এবার পরম মমতায় তাকে বললেন, শোনো, তোমাকে পৃথিবীর পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের পাশাপাশি আখিরাতের পরীক্ষায়ও ভালো ফলাফল করে উত্তীর্ণ হতে হবে। এ জন্য প্রথমে কুরআন শিখতে হবে। আল্লাহ বলেছেন, “তিনি পরম করুণাময়। তিনি মানুষকে কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন।” (সূরা আর-রাহমান : ১-২) তারপর তোমাকে ইসলামের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করে সে অনুযায়ী প্রাত্যহিক জীবন পরিচালনা করতে হবে। তা না হলে, তুমি পৃথিবীর সকল জ্ঞানে জ্ঞানী হলেও আখিরাতে মূর্খ হিসেবেই বিবেচিত হবে। আল্লাহর ভাষায়, “যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?” (সূরা যুমার : ৯)
নানার কথা শুনে নাবিল যেন প্রাণ ফিরে পেল। সত্যিই সে যেন নতুন একটা কিছুর সন্ধান পেল আজ। দুনিয়া-আখিরাত উভয় জগতের সফল একজন মানুষ হওয়ার স্বপ্ন তার চোখ দুটোকে যেন আরও উজ্জ্বল করে তুলছে।
বিলাল হোসাইন নূরী

SHARE

Leave a Reply