Home কুরআন ও হাদিসের আলো হাদীসের আলো হাদিসের – আলো

হাদিসের – আলো

“মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার তো ছুটি
ধুলোভরা পা নিয়ে নিজ ঘরে উঠি”

কবিতার এ পঙ্ক্তিটি  ইদানীং বেশ মনে পড়ছে হাসানের। শুধু মনেই পড়ছে না, রীতিমতো গুন গুন করে আবৃত্তিও করে যাচ্ছে সে। তবে যতই আবৃত্তি করুক, ছুটি তো আর চাইলেই আসে না। ঘরে ফেরার ব্যাকুলতা তাই তাকে আন্দোলিত করছে বারবার। মনে পড়ে, উঠোনের এককোণে দাঁড়িয়ে থাকা রক্তজবা গাছটির কথা। কিংবা পুকুরপাড়ের নারিকেল গাছের খোঁড়লে বাসাবাঁধা কাঠঠোকরা পাখিটির কথা। তবে মায়ের মুখটা যখন স্মৃতির ক্যানভাসে পদ্মফুলের মতো ভেসে ওঠে, তখন আর কিছুই ভালো লাগে না তার।
সামনে ঈদের ছুটি। ঢাকা নামে প্রাণহীন জনপদ ছেড়ে অন্তত বেশ ক’টা দিন সবুজ আর কাদামাটির সংস্পর্শে থাকতে পারবে সে। এই ভেবেই তার আনন্দ। এই ভেবেই যেন ঈদের খুশি শুরু হয়ে গেছে তার। সাথে নানা ধরনের পরিকল্পনা। কোথায় কোথায় বেড়াবে তারও একটা খসড়া ইতোমধ্যে তৈরি করে ফেলেছে সে।
প্রতি বছরই এ সময়টা এলে হাসানের ভেতরে এক ধরনের উত্তেজনা কাজ করে। কারণ, এটাই বছরের বড় ছুটি। সারা বছর পড়ালেখার চাপে তাকে জর্জরিত হতে হয়। এই পরীক্ষা, সেই পরীক্ষা- সবমিলিয়ে নিঃশ্বাস ফেলারও যেন সময় নেই। প্রতিযোগিতার এ বিশ্ব যেন সবাইকে ব্যস্ততায় শাসরুদ্ধ করে রেখেছে। হাসানের গ্রামের বাড়ি উপকূলীয় এলাকায়। যাতায়াত করতে হয় নদীপথে। দীর্ঘ পথ। এ জন্য ছোট ছোট বন্ধে তার বাড়ি আসারও কোনো সুযোগ থাকে না। তাই ঈদের ছুটির কথা কল্পনা করেই ঈদ-আনন্দ অনুভব করা হাসানের জন্য খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়।
একদিন-দু’দিন করে হিসাব করতে করতেই অবশেষে উপস্থিত হলো হাসানের বাড়ি ফেরার সময়। এবার ঠিকই সে ধুলোভরা পা নিয়ে নিজ ঘরে উঠবে। চেনা প্রকৃতির সতেজ ভালোবাসায় বুকভরে নিঃশ্বাস নেবে সে। লঞ্চ-কেবিনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এসব ভাবছে সে। জোসনা রাত। চাঁদের নরম আলোয় যেন ভিজে যাচ্ছে নদীর পানি!  নদীর ছোট ছোট ঢেউগুলো যেন তার বুকের ভেতরেই আছড়ে পড়ছে। নদীর কলকল ডাক যেন তারই হৃদয়ের প্রতিধ্বনি হয়ে গুঞ্জরিত হচ্ছে বারবার।
ভোরের আলো ফুটে উঠেছে চারদিকে। হাসানের নামার জায়গায় চলে এসেছে লঞ্চ। ধীরে ধীরে মাটিতে পা রাখল হাসান। কিন্তু একি! নামার পর আর পথ খুঁজে পাচ্ছে না সে। চারদিক কেমন অচেনা। সামনে আর সামান্য একটু রাস্তা রয়েছে। তারপর সবাই নৌকা দিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে। তাহলে কি সে ভুল জায়গায় নেমেছে? আশপাশ মানুষকে জায়গার নাম জিজ্ঞেস করে সে নিশ্চিত হলো যে, সে ভুল করেনি। তাহলে এ অবস্থা কেন তার প্রিয় জন্ম-মৃত্তিকার? চারদিক যেন ধ্বংসস্তূপ! অবশেষে জানতে পারল সে, কিছুদিন আগে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে সবকিছু। পথঘাট ভেঙে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে নদীর অতলে।
ঘূর্ণিঝড়ের খবর আগে থেকেই জানত হাসান। কিন্তু এতটা বিধ্বস্ত হয়ে গেছে সবকিছু, ভাবতেও পারেনি সে। তার মনে পড়ল, নদীর তীরবর্তী বাড়ি-ঘরগুলোর কথা। কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। কষ্টে হৃদয়টা যেন ভেঙে যাচ্ছে। যা-ই হোক, নৌকা পার হয়ে আস্তে আস্তে সে আবিষ্কার করল বাড়ির পথ। তাদের বাড়ি নদী-উপকূল থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত হওয়ায় তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য কী করতে পারে সে, এমন চিন্তা তাকে অস্থির করে তুলল।
ছুটি! হ্যাঁ, ছুটির এক নতুন অর্থ খুঁজে পেল হাসান। ছুটির চিন্তা তার মাথা থেকে যেন সরছেই না। সে-তো ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসেছে, কিন্তু এই অসহায় মানুষগুলোর ঈদ-ই তো ছুটিতে চলে গেছে। এদের রেখে কি তার ঈদ হবে? কখনোই না। পথে-ঘাটে, বাজারে-বন্দরে চাঁদা তুলে হলেও ঘর-বাড়িহারা মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ় অঙ্গীকার  করল সে মনে মনে। কারণ, সে জানে, রাসূল (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি পৃথিবীর কোনো মুমিনের দুঃখ-কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ তার আখিরাতের দুঃখ কষ্ট দূর করে দেবেন।…আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত তার বান্দাহকে সহযোগিতা করতে থাকেন, যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দাহ তার ভাইয়ের সহযোগিতায় লিপ্ত থাকে।” (সহিহ মুসলিম)
বন্ধুদের সাথে নিয়ে হাসান শুরু করল তার ঈদের কর্মসূচি। এবার আর কোথাও বেড়াবে না সে, বেড়াবে বন্যাকবলিত মানুষের দ্বারে দ্বারে। নিজ হাতে তুলে দেবে তাদের ঘর। ভালোবাসায় ছুঁয়ে দেবে হৃদয়। “চলো, মানুষের মুখে হাসি ফোটাই”- এটাই তার এবারের ঈদের শ্লোগান।
বিলাল হোসাইন নূরী

SHARE

Leave a Reply