Home প্রবন্ধ ঈদ উৎসব -অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান

ঈদ উৎসব -অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান

আরবি ‘ঈদ’ শব্দটির অর্থ আনন্দ। মন থেকে স্বতঃউৎসারিত আবেগ-উচ্ছ্বাসকেই আনন্দ বলা যায়। আনন্দ অনাবিল ও স্বতঃস্ফূর্ত। সব দেশে সব মানুষের মধ্যেই আনন্দের অনুভূতি বিদ্যমান। মানুষের জীবনে প্রকৃতিগতভাবে দু’রকম অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। একটি আনন্দের, আরেকটি বেদনার। দু’টি অনুভূতির উৎসই মানুষের হৃদয় বা মন। মনে যখন কোন ভালো লাগা বা সুন্দর অনুভূতি সৃষ্টি হয়, তখন সেটাকে আমরা বলি আনন্দ। আর হৃদয়-মন যখন কোন দুঃখ-বেদনার করুণ অনুভূতিতে সিক্ত হয়, তখন সেটাকে আমরা বলি বেদনা। আনন্দ-বেদনা জীবনে পাশাপাশি বিরাজমান।
আনন্দ-বেদনাকে দু’ভাগে বিভক্ত করা যায়Ñ ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত। ব্যক্তিগত আনন্দ-বেদনার অনুভূতি ঘটে একান্তভাবে ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সমষ্টিগত আনন্দ-বেদনার অনুভূতির প্রকাশ ঘটে সমষ্টিগত বা জাতিগত কোন ঘটনা বা বিষয়কে কেন্দ্র করে। তাই আনন্দ-বেদনার উৎস যেমন বিচিত্র, তেমনি তার বহিঃপ্রকাশও ঘটে নানাভাবে। ব্যক্তিগত আনন্দ-বেদনার অনুভূতির প্রকাশ ঘটে ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে। অন্যেরা তার দ্বারা অতটা প্রভাবিত নাও হতে পারে। তবে অনেক সময় ব্যক্তিগত আনন্দ-বেদনা ব্যক্তিকেন্দ্রিক থাকে না, ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে সমষ্টির মধ্যে তার প্রতিক্রিয়া পরিব্যাপ্ত হয়।
সমষ্টিগত আনন্দ-বেদনার প্রকাশ ঘটে সাধারণত কোন বিশেষ জনমন্ডলীর জীবনে ঘটে যাওয়া কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেন্দ্র করে। সাধারণত জাতীয় ও ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, দুর্যোগ-দুর্বিপাক-দুর্ঘটনা বা অনুষ্ঠানকে ভিত্তি করে সমষ্টিগত আনন্দ-বেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। যেমন বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবসমূহ, দেশ বা জাতির জীবনে ঘটে যাওয়া কোন দুর্যোগ-দুর্বিপাক-দুর্ঘটনা এবং বিভিন্ন ধর্মের নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠান ইত্যাদি। এগুলোকে ভিত্তি করে বিভিন্ন দেশ-জাতি-সমাজ ও জনগোষ্ঠী তাদের নিজ নিজ অনুষ্ঠানসমূহ পালন করে থাকে। এসব অনুষ্ঠান কখনো আনন্দের কখনো বা বেদনার। সমগ্র জনগোষ্ঠী তাতে শরিক হয়ে আনন্দ-বেদনার প্রকাশ ঘটায়। বিভিন্ন দেশ ও জাতি তাদের জাতীয় আনন্দ-বেদনার স্মরণীয় মুহূর্তগুলোকে প্রথানুসারে অথবা নিজ নিজ ঐতিহ্যের আলোকে উদ্যাপন করে থাকে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই কথা। প্রত্যেক ধর্মেই তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের নির্দিষ্ট কতগুলো বিধি-বিধান রয়েছে। তারা সেভাবেই সেগুলো পালন করে আনন্দ-উৎসবের আয়োজন করে থাকে।
ঈদ ইসলামের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এ উৎসব একাধারে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত। ইসলামী পরিভাষায় ‘ঈদ’ শব্দের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সারা বিশ্বের মুসলিমগণ বছরে দু’দিন ঈদ উৎসব উদ্যাপন করে থাকেন। ইসলামের মহান নবী ও রাসূল মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সা: আল্লাহর পক্ষ থেকে বছরের দু’টি নির্দিষ্ট দিনে ঈদ উৎসব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। তখন থেকে বিশ্বের সকল মুসলিম নিয়মিত ঈদ উৎসব পালন করে আসছে। এ সম্পর্কে একটি প্রসিদ্ধ হাদিস উল্লেখ করা যায় :
“সাহাবা আনাস রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : ‘রাসূলুল্লাহ্ সা: যখন মদিনায় উপস্থিত হলেন, তখন তিনি দেখতে পেলেন যে, মদিনাবাসীরা (যাদের মধ্যে অনেকে ইতঃপূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিল) দু’টি জাতীয় উৎসব পালন করে। আর এ জাতীয় উৎসব পালনার্থে তারা খেল-তামাসা ও আনন্দানুষ্ঠানের আয়োজন করতো।’ রাসূলুল্লাহ্ সা: তাদের জিজ্ঞাসা করলেন : ‘তোমরা এই যে দু’টি দিন জাতীয় উৎসব পালন কর এর মূল উৎস ও তাৎপর্য কী?’ তারা বলল : ‘ইসলামের পূর্বে জাহিলিয়াতের যুগে আমরা এ উৎসব এমনি হাসি-খেলা ও আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমেই উদ্যাপন করেছি, এখন পর্যন্ত সেটাই চলে আসছে।’ এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, ‘আল্লাহ্তায়ালা তোমাদের এ দু’টি উৎসব দিনের পরিবর্তে এরচেয়ে উত্তম দু’টি দিন ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা দান করেছেন। অতএব, পূর্বের উৎসব বাদ দিয়ে এ দু’টি দিনের নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানাদি পালন করতে শুরু কর।” (আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমদ)
রমজান মাসে পুরা একমাস কঠোর সংযম সাধনার মাধ্যমে সিয়াম পালনের পর শাওয়ালের ১ম দিনে ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হয়। অন্যদিকে, জিলহজ মাসের ৯ তারিখে আরাফাত ময়দানে হজ পালনের পর জিলহজের ১০ তারিখে মিনায় হাজীগণ মুসলিম মিল্লাতের পিতা ইবরাহিম আ:-এর মহান ত্যাগের আদর্শ স্মরণে  কোরবানি করে থাকেন। ঐ দিন ঈদুল আজহা পালিত হয়। এ দু’টি উপলক্ষের একটি দীর্ঘ এক মাস কঠোর কৃচ্ছ্র সাধনা বা সিয়াম পালনের মাধ্যমে অর্জিত তাকওয়ার গুণে উদ্ভাসিত মু’মিন হৃদয়ের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ-উল্লাস, অন্যটি মহান স্রষ্টার নির্দেশে ইবরাহিম আ: তাঁর প্রিয়তম পুত্র ইসমাইলকে আ:  কোরবানি করতে উদ্যত হয়ে আত্মত্যাগের যে মহিমময় আদর্শ স্থাপন করেছিলেন, তার অনুসরণে পশু কোরবানির মাধ্যমে মহান আল্লাহর নিকট মু’মিন হৃদয়ের নিঃসংশয় আত্মত্যাগের স্মৃতি বহন করে। মানবিক সর্বোত্তম গুণাবলি অর্জনের ফলে যে সন্তুষ্টি বা আত্মতৃপ্তি ঘটে, তারই বহিঃপ্রকাশ হলো এ দু’টি  উৎসব।
জীবনে কোন কিছু প্রাপ্তি ঘটলে স্বভাবতই মানুষ খুশি হয়, আনন্দ প্রকাশ করে। প্রাপ্তির মান ও মূল্য বিবেচনায় এ খুশি বা আনন্দের প্রকাশ কমবেশি হতে পারে। আমাদের প্রতিদিনের জীবনে নানা ধরনের প্রাপ্তি যেমন ঘটে, তেমনি অপ্রাপ্তির বেদনাও আমাদের হৃদয়-মনকে ক্ষত-বিক্ষত করে। এটাই জীবন বাস্তবতা। এ বাস্তবতা নিয়েই জীবনের সকল আয়োজন সুসম্পন্ন হয়ে থাকে। হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ জীবনের চিরসাথী। সাধারণত ভাল-মন্দ বা আনন্দ-বেদনার অনুভূতি ব্যক্তিগত। ব্যক্তি-অনুভূতিতে যখন আনন্দ-বেদনার স্পর্শ অনুভূত হয়, তখন অনেক ক্ষেত্রে তা শুধু ব্যক্তিগত অনুভব হয়েই থাকে না, ব্যক্তির সীমানা ছাড়িয়ে সমষ্টির মধ্যে তা বিস্তৃত হয়। যেমন ব্যক্তিগতভাবে একজন মানুষের জীবনে যখন বিপর্যয় নেমে আসে, তখন সামাজিক জীব হিসাবে তার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট অন্যদেরকেও তা স্পর্শ করে। এভাবে ব্যক্তিগত আনন্দ-বেদনা যখন বৃহত্তর সমাজকে স্পর্শ করে তখন তা অনেকটা সামাজিক আনন্দ-বেদনার রূপ লাভ করে।
আমার জন্ম বাংলাদেশের এক নিভৃত পল্লীতে। ছোটবেলায় সেখানেই বাবা-মা, ভাই-বোন, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনদের সাথে মিলেমিশে ঈদ করেছি। আমার গ্রামের নাম চর বেলতৈল। বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত লেখক নজিবর রহমান সাহিত্যরতœ এ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাড়ির পাশেই আমাদের বাড়ি। আমার দাদা মুন্শী ওয়াহেদ আলী ১৮৯২ সালে নিজ বাড়িতে ‘খাস চর বেলতৈল বালিকা বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করে সস্ত্রীক সেখানে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। ১৯৩০ সালের দিকে আমার আব্বা পাশের বাড়িতে ছেলেদের শিক্ষার জন্য ‘খাস চর বেলতৈল বালক বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫২ সালে দু’টি বিদ্যালয় একীভূত হলে আমার আব্বা তার প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন। আজীবন তিনি সেখানে শিক্ষকতা করেন। এমন একটি বিদ্যোৎসাহী শিক্ষা-সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে  শৈশবে আমার বেড়ে ওঠা। পাশের গ্রামে ঈদের বড় মাঠ। দশ গ্রামের লোক সেখানে ঈদের দিনে নামাজ পড়েন। এখনো সে ব্যবস্থা চালু আছে। হাজার হাজার লোকের ঢল নামে ঈদের মাঠে। ছোটবেলায় ঈদের দিন খুব ধুমধাম করে নতুন জামা-কাপড় পরে দলবদ্ধভাবে ঈদের মাঠে নামাজ পড়তে যেতাম। নামাজের আগে এলাকার জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিগণ ওয়াজ করতেন। পাশের ঘোরশাল গ্রামের প্রখ্যাত লেখক সুসাহিত্যিক বরকতউল্লাহ্ও সে মাঠে ওয়াজ করেছেন। বড় হয়ে আমিও সেখানে বহুবার ওয়াজ করেছি। নামাজ শেষে কোলাকুলি চলতো দীর্ঘক্ষণ।
নামাজ শেষে আমার আব্বার নেতৃত্বে গ্রামের সকল শিক্ষিত প্রবীণ-যুবা ও ছাত্রগণ আমরা একত্রে গ্রামের পশ্চিম বাড়ি থেকে শুরু করে পূর্ব প্রান্তের শেষ বাড়ি পর্যন্ত ঘুরে বেড়াতাম। সকলের সাথে মোলাকাত, সালাম বিনিময় ও কুশল বিনিময় হতো। সাথে ভোজনের কাজটিও যথারীতি সম্পন্ন হতো। সবাই মিলেমিশে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতাম। মনে হতো আমাদের বিশাল গ্রামটি যেন এক বিশাল পরিবার। ঈদের এ আনন্দ ছিল সাম্য-ভ্রাতৃত্ব ও অনাবিল সহমর্মিতার অন্তর্লীন বহিঃপ্রকাশ।
বিকাল বেলা আমাদের বাড়ির সামনে স্কুলের মাঠে নানারকম খেলার আয়োজন হতো। ফুটবল, হা-ডু-ডু, লাঠি খেলা, কুস্তি খেলা, ছেলে-মেয়েদের কানামাছি খেলা ইত্যাদি নানারকমের খেলার হাট বসত। বর্ষাকালে হতো নৌকা বাইছ। দোকানিরাও সুযোগ বুঝে নানা পণ্যের পসরা নিয়ে টুপাইস কামাই করে নিত। সন্ধ্যার পর অনেক সময় আমাদের বাড়ির স্কুলে আমার আব্বার নেতৃত্বে নানারকম সাংস্কৃতিক আয়োজন হতে দেখেছি। আলোচনা, পারস্পরিক মতবিনিময়, ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়, আবার কখনো হয়তোবা কোনো নাটকের পরিবেশনা। এক পরিচ্ছন্ন নির্মল আনন্দঘন পরিবেশে ঈদের মধুরতম দিনগুলো শৈশবে অতিবাহিত করার স্মৃতি আমাকে আজও স্মৃতিকাতর করে তোলে।

SHARE

Leave a Reply