Home প্রবন্ধ আমাদের ঈদ উৎসব ও ঈদুল ফিতর ইকবাল কবীর মোহন

আমাদের ঈদ উৎসব ও ঈদুল ফিতর ইকবাল কবীর মোহন

আল্লাহ তাআলার এই বিশাল পৃথিবীতে অনেক জাতি ও গোষ্ঠীর বাস। নানা জাতির নানা রকমের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি লক্ষ্য করা যায়। তাদের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের উৎসব বা পর্ব। প্রত্যেক জাতির নিজেদের বিশেষ বিশেষ কিছু উৎসব রয়েছে। এসব উৎসব বা পর্ব ঐসব জাতির পরিচয় বহন করে। কোনো কোনো জাতির লোকেরা নিছক আনন্দ পাবার জন্য উৎসব পালন করে। কেউবা ঐসব জাতির বা গোষ্ঠীর স্বার্থগত বা ঐতিহ্যগত পরিচয় প্রকাশের জন্য উৎসব পালন করে। কোন কোন ধর্মের লোকেরাও তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি নিজ নিজ ধর্মের ঐতিহ্যের আলোকে পালন করে থাকে। তবে অধিকাংশ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এখন নিছক আনন্দ উপভোগের পর্যায়ে নেমে এসেছে।
ইসলামী সংস্কৃতির অনন্য উৎসব ঈদ। বুখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী (সা) বলেছেন, ‘প্রত্যেক জাতিরই উৎসব রয়েছে। আমাদের উৎসব হলো ঈদ।’ ঈদ উৎসব মুসলমানদের জাতীয় খুশির দিন। এটি চিরাচরিত কোনো পর্ব নয়। অন্যান্য জাতির পর্ব বা উৎসব থেকে তা সম্পূর্ণ আলাদা। এই উৎসব না কোনো গোষ্ঠীগত স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ করার জন্য পালন করা হয়, না কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে পালন করা হয়। বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত হিসেবে পালিত হয় এই উৎসব। কারো ব্যক্তিগত উৎসাহ বা চিন্তাভাবনা থেকে এই উৎসব উৎসারিত নয়। বরং শুধু আল্লাহর নির্দেশ হিসাবে চলে আসছে এসব পর্ব। ইসলামে ঈদ উৎসবের মূল লক্ষ্য মানুষের আত্মসংশোধন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
ইসলামে ঈদ এসেছে
আল্লাহর পক্ষ থেকে
ইসলামে বছরে দু’টি ঈদ উৎসব পালিত হয়। একটি ঈদুল ফিতর। এটি রমজানের পূর্ণ একমাস রোজা পালন করার পর পালিত হয়। অন্যটি ঈদুল আজহা। এটি হজ বা  কোরবানি উপলক্ষে পালন করা হয়। ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। তবে ঈদের শাব্দিক অর্থ বারবার আসা। বছরে সময়ের ব্যবধানে ঈদ বারবার ফিরে আসে বলে এর এ রকম নামকরণ করা হয়েছে। ঈদ নিয়ে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা রয়েছে। আবু দাউদ শরিফে বর্ণিত হয়েছে হজরত আনাস (রা) বলেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা) যখন মদিনায় হিজরত করেন তখন সেখানকার লোকেরা দু’টি দিনকে বিশেষ দিন বা পর্ব হিসাবে পালন করত। ঐ বিশেষ দিনে তারা খেলাধুলা ও আমোদ-ফুর্তি করে সময় কাটাত। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা) লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এ দু’টি দিন কী? তোমরা এই দু’টি দিন কেন পালন করছ? তখন লোকেরা বলল, এ দু’টি দিন জাহিলিয়াতের যুগে লোকেরা পালন করত। সেই থেকে এখনও আমরা দিন দু’টি পালন করছি। তখন রাসূল (সা) বললেন, আল্লাহতাআলা তোমাদেরকে এগুলোর বদলে দু’টি মহান দিন উপহার দিয়েছেন। এগুলো হচ্ছে, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। তখন থেকেই পালিত হচ্ছে এই দু’টি ঈদ উৎসব। বছরের নির্দিষ্ট দিনে আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি বরকত ও মঙ্গলময় দিন হিসেবে ঈদ মুসলিম সমাজে পালিত হচ্ছে। দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ ও মুক্তির দিন হিসাবে ঈদ পর্ব দু’টি আমাদের জীবনকে গৌরবান্বিত করেছে।
ঈদুল ফিতরে করণীয়
এদিন দু’টি কাজ করা ওয়াজিব। একটি ফিতরা আদায় করা। এই দিনে ধনীদের পক্ষ থেকে গরিব দুঃখীদের জন্য নির্ধারিত পরিমাণ দান করাকে আবশ্যক করা হয়েছে। একে সাদাকাতুল ফিতর বলা হয়। বুখারি শরিফের এক হাদিসে বর্ণিত ইবনে উমর (রা) বলেছেন, রাসূল (সা) জাকাতুল ফিতরকে অত্যাবশ্যক করেছেন। এবং সালাতের আগেই তা দিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।’
এদিন আরেকটি ওয়াজিব কাজ হলো ঈদের সালাত আদায় করা। ঈদের দিন ছয়টি অতিরিক্ত তাকবির সহকারে দু’রাকাত সালাত আদায় করা ওয়াজিব। খোলা ময়দানে ঈদের নামাজ পড়া উত্তম। মসজিদেও এই নামাজ আদায় করা যেতে পারে। মহানবী (সা) একবার শুধুমাত্র বৃষ্টির কারণে মসজিদে সালাতুল ঈদ আদায় করেছেন। ঈদের সালাতের সময় সূর্যোদয়ের পর থেকে সূর্য মাথার ওপর আসা পর্যন্ত বলবত থাকে। এ ছাড়া ঈদের দিন আরো কয়েকটি সুন্নাত কাজ রয়েছে।  ঈদের ইবাদতকে অর্থবহ করার জন্য প্রস্তুতিমূলক এই সুন্নাত কাজগুলো পরিপালনে সবাইকে নজর দিতে হবে। এসব সুন্নাত কাজগুলো হলো : ১. তাকবির পাঠ : শাওয়ালের চাঁদ দেখার পর থেকে শুরু করে সালাতুল ঈদের খুতবা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত যথাসম্ভব তাকবির পাঠ করা উত্তম। তাকবিরটি হচ্ছে : আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ। অর্থ হচ্ছে : আল্লাহ শ্রেষ্ঠ, আল্লাহ শ্রেষ্ঠ, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। আল্লাহ শ্রেষ্ঠ, আল্লাহ শ্রেষ্ঠ, আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা। ২. গোসল করা, সুগন্ধি ব্যবহার এবং সুন্দর পোশাক পরিধান করা : হজরত হাসান ইবনে আলী তার পিতা আলী (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন- রাসূল (সা) আমাকে দু’ঈদে সর্বোত্তম পোশাক পরিধান এবং সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যত্র বলা হয়েছে, ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূল (সা) ফিতরের দিন সকাল সকাল হওয়ার পূর্বে গোসল করতেন।’ ৩. ঈদের সালাতের আগে খাবার গ্রহণ : ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায়ের আগে কোন কিছু আহার করা উত্তম। তবে খেজুর খাওয়া সুন্নাত। আনাস (রা) বর্ণনা করেন, ‘রাসূল (সা) খেজুর খাওয়া ব্যতীত ফিতরের দিন অতিবাহিত করতেন না।’ ৪. চলার পথ পরিবর্তন করা : ঈদগাহে এক পথে যাওয়া এবং অন্য পথে ফিরে আসা সুন্নাত। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বলেন, ‘রাসূল (সা) ঈদের দিন ভিন্ন ভিন্ন পথে চলতেন।’ ৫. খুতবা শ্রবণ : ঈদুল ফিতরের দিন সালাত শেষে ইমামের খুতবা শ্রবণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘রাসূল (সা) ঈদুল ফিতর ও আজহায় বের হতেন এবং প্রথমে সালাত আদায় করে বসে থাকা জনগণের দিকে ফিরতেন, তিনি তাদেরকে উপদেশ দিতেন, দিকনির্দেশনা দিতেন।’ ৬. পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়: যুবাইর ইবনে নুফায়ির (রা) বলেন, ‘রাসূল (সা) এর সাহাবীগণ ঈদৈর দিন পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন।’ ৭. বৈধ বিনোদন : হজরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘ঈদের দিন হাবশার লোকেরা রাসূল (সা)-এর উপস্থিতিতে খেলা করতেন। আমি রাসূল (সা)-এর কাঁধের ওপর ভর দিয়ে তাদের খেলা দেখতাম।’
ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায়ের নিয়ম
ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা আদায় করার নিয়ম একই। প্রথমেই আমরা ইমামের  পেছনে কাতার করে দাঁড়িয়ে যাব। তারপর আমরা নিয়্যাত করব এই বলে, ‘আমি কিবলামুখী হয়ে এই ইমামের  পেছনে ছয় তাকবিরসহকারে ঈদুল ফিতরের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করছি।’ নিয়্যাত করে আল্লাহু আকবার বলার সাথে সাথে উভয় হাত কান পর্যন্ত উঠাব। তারপর তাহরিমা বেঁধে সানা পড়ব। সানা পড়ার পরই ইমামের সাথে তিনবার অতিরিক্ত তাকবির বলব। তিনবারই হাত কান পর্যন্ত উঠাব। প্রথম ও দ্বিতীয় বার তাকবির বলে হাত বাঁধব না, ছেড়ে দেব। তৃতীয়বার তাকবির বলে হাত বাঁধব। তারপর ইমাম সাহেব সূরা ফাতিহা এবং অন্য কোনো সূরা পড়বেন। এরপর ইমাম সাহেবের সাথে আমরা রুকু ও সিজদা করব। সিজদার পর উঠে দাঁড়াব। দ্বিতীয় রাকাতেও ইমাম সাহেব সূরা ফাতিহা এবং অন্য একটি সূরা পড়বেন। তারপর ইমামের সাথে আমরাও তিনবার অতিরিক্ত তাকবির বলব। তিন বারই কান পর্যন্ত হাত উঠাব এবং ছেড়ে দেব। হাত বাঁধব না। চতুর্থবারে ইমামের সাথে তাকবির বলে রুকু করব। অতঃপর সিজদাহ করে উঠে বসে তাশাহহুদ, দরূদ ও দোয়া মাসূরা পড়ব। তারপর ইমামের সাথে সালাম ফিরিয়ে সালাত শেষ করব। সালাত শেষে ইমাম সাহেব খোতবা দেবেন। খোতবা শোনা সুন্নাত। এভাবেই ঈদুল ফিতরের নামাজ শেষ হবে।

SHARE

Leave a Reply