Home নিবন্ধ ছড়া কবিতায় ঈদ -সাকী মাহবুব

ছড়া কবিতায় ঈদ -সাকী মাহবুব

মুসলমানদের জন্য বছরে দু’টি ঈদ রয়েছে। একটি হলো ঈদুল ফিতর অন্যটি ঈদুল আজহা। এ দুটি দিনই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং গুরুত্ববহ। এটি আমাদের জাতীয় জীবনে  ও সাংস্কৃতিক জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে একাকার হয়ে। এটা শুধু মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবই নয়, গোটা জাতির জন্য শিক্ষামূলক সামাজিক  উৎসবও বটে। সুতরাং এটি সমাজের প্রতিটি মানুষকে সমানভাবে আলোড়িত করে। আর একজন কবির সংবেদনশীল হৃদয়ে তো এর ছোঁয়া লাগবেই। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই ঈদ বাংলার কবি সাহিত্যিকদেরও দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে আলোড়িত করেছে। এই ঈদকে কেন্দ্র করে অসংখ্য কবি সাহিত্যিক গান, কবিতা, গল্প, নাটক ছড়া ইত্যাদি রচনা করেছেন, সমৃদ্ধি করেছেন বাংলাসাহিত্যের ভান্ডারকে। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে আমরা ছড়া কবিতায় ঈদ নিয়ে আলোচনা করার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ। প্রখ্যাত লেখক সৈয়দ এমদাদ আলী নবনূর পত্রিকায় ১৯০৩ সালে ঈদ সংখ্যায় ঈদ নিয়ে একটি কবিতা লেখেন। বাংলাসাহিত্যে এটাই ঈদবিষয়ক প্রথম কবিতা হিসেবে স্বীকৃত হয়ে আছে। তিনি লিখেছেন-
“কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে
অরুণ তরুণ উঠিয়ে ধীরে
রাঙিয়া প্রতি তরুর শিরে
আজ কি হর্ষ ভরে।
আজি প্রভাতের মৃদুল বায়
রঙে নাচিয়া যেনো কহে যায়
মুসলিম জাহান আজ একতায়
দেখ কত বল ধরে।”
এরপর বাংলাসাহিত্যে আর এক শক্তিমান কবি, মহাকবি কায়কোবাদ লেখেন-
“কুহেলির অন্ধকার সরাইয়া
ধীরে ধীরে ধীরে
উঠেছে ঈদের রবি
উদয় উচল গিরি শীরে?
তাই বিশ্ব ভূমে কি পবিত্র
দৃশ্য সুমহান
প্রকৃতি আনন্দময়ী
চারিদিকে মঙ্গলের গান
ঈদ ঈদ বলে আজি
বিশ্ব মাঝে পড়ে গেছে সারা
জীবজন্তু পশুপাখি
সবই যেন সুখে আত্মহারা।”
ঈদ নিয়ে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এবং ইসলামের সুগভীর মর্মবাণী সমৃদ্ধ কবিতা রচনা করেছেন বাংলাসাহিত্যের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর ভুবন কাঁপানো সুরের দোলা-
“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে
এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে
শোন আসমানী তাকিদ।”
এই গানটি বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের কাছে একটি অসাধারণ ঈদ সঙ্গীতে পরিণত হয়েছে। তার এই গান না হলে ঈদুল ফিতরই অপূর্ণ থেকে যায়। এই গানের মাধ্যমেই সবুজ বাংলায় স্বাগত জানানো হয় ঈদকে।
কবি গোলাম মোস্তফার চোখেও ঈদের ছবি ভাসছে এইভাবে-
“আজ নতুন ঈদের চাঁদ উঠেছে
নীল আকাশের গায়।
তোরা দেখবি কারা ভাই বোনেরা
আয়রে ছুটে আয়।”
তিনি ঈদ উৎসব কবিতায় লিখেছেন-
“এনেছে নব গীতি, এনেছে সুখস্মৃতি,
এনেছে প্রেম প্রীতি পূর্ণ
এনেছে নব আশা একতা ভালবাসা
নিবিড় মিলনের জন্য
ধন্য ঈদ তুমি ধন্য।”
আমাদের ঐতিহ্যের অনন্য পুরুষ ইসলামী রেনেসাঁর অগ্রপথিক কবি ফররুখ আহম্মদ লিখেছেন-
“যতদিন না কায়েম হবে
খোদার ধরায় তারই দ্বীন
কিসের আবার ঈদের খুশি
এ উৎসব অর্থহীন।”
কবি রুহুল আমিন খান লিখেছেন-
“শাওয়াল হেলাল যাও ফিরে যাও
এদিক চেয়ে আর হেসো না
আজ মাতমের দিন আমাদের
হে ঈদ তুমি আজ হেসো না
………………….
এ মিল্লাতের ভাগ্যে এবার
কেবল মাতম ঈদ আসেনি
ফিলিস্তিনে, কাশ্মীরে, আজ
কেউ হাসে নি, কেউ হাসে নি।”
প্রখ্যাত কবি-গীতিকার মতিউর রহমান মল্লিক মনের আবেগ প্রকাশ করেছেন এভাবে-
“ঈদের  রাতে হয় মুনাজাত কবুল
বলেছেন যে, মুহাম্মদ রসূল :
এই রাতে তাই প্রার্থনা তো শুধু
ইরাকিদের জয়ী করো ওগো
জয়ী করো চেচেন যোদ্ধাদেরও
কাশ্মীরে দাও বিজয় দান
মুসলমানের পানে একটু ফিরে চাও।।
ঈদের রাতে হয় মুনাজাত কবুল
ভাসিয়ে দিলাম তাই দু’চোখের কুল।”
বিশিষ্ট ছড়াকার ইকবাল কবীর মোহন তার ঈদের ছড়ায় অনুভূতি প্রকাশ করেন-
“ঈদ আসে ঘরে ঘরে দোলা দেয় মন
চাঁদ হাসে মিটি মিটি নেচে ওঠে বন।
আকাশে নীল ফুড়ে হেসে ওঠে ঈদ
খোকা খুকু নেচে ওঠে চোখে নেই নিঁদ।
ঈদ আসে গোলাপের খোশবুতে মেতে
ভালো লাগে দল বেঁধে ঈদগাহে যেতে।”
কবি আসাদ বিন হাফিজের কলমে ঈদের চিত্র ফুটে উঠেছে-
“সকল ফুলের সেরা গোলাপের ফুল
সকল মানব সেরা পেয়ারা রাসূল
সকল ঘরের সেরা কাবা মসজিদ
বছরের সেরা দিন খুশি ভরা ঈদ।”
আ শ ম বাবর আলীর কবিতায় অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে ঈদের চিত্র ভেসে ওঠে-
“ঈদটা এলো বিশ্ববুকে
শিক্ষা দিতে এই,
মানুষেতে ছোট বড়
কোনো ভেদাভেদ নেই।
ছড়াকার মসউদ উশ শহীদ লেখেন-
“ঈদরে খুশির ঈদরে তুমি
বছর জুড়েই থেকো
ঈদরে তোমার খুশির ছবি
সবার মুখে এঁকো।”
প্রখ্যাত ছড়াকার সাজজাদ হোসাইন খানের ছড়ায় ঈদের তীব্র প্রভাব লক্ষ করা যায়। তিনি লিখেছেন-
“সম্প্রীতি বন্ধন ঈদ তার নাম
¯স্নেহের সবুজ খামে মধু আনজাম।”
কবি ইসমাঈল হোসেন দিনাজীর অনুভূতি :
“ঈদ মানেতো কেমন খুশি
আমরা কি তা জানি
ঈদের মানে ভুলে যাওয়া
হিংসা হানাহানি।”
ছড়াকার মানসুর মুজাম্মিল ঈদকে নিয়ে লিখেছেন এক মুগ্ধকর ছড়া-
“ঈদ মানে খানা দানা চারিদিকে ছুটি
সারাদিন হৈ চৈ হেসে কুটিকুটি
ঈদ মানে মিলে মিশে থাকা সব জনে
ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে চলো খোলা মনে।”
আরিফুল ইসলাম “ঈদ এসেছে” ছড়া কবিতায় কলম চালিয়েছেন এভাবে-
“ঈদ এসেছে ঈদ এসেছে
নিয়ে খুশির ঢেউ,
সেই খুশির পরশ থেকে
বাদ যাবে না কেউ।”
কবি গোলাম মোহাম্মদের মায়াবী উচ্চারণ এভাবে ফুটে উঠে-
“ঈদ মানেতো শালুক ফুলের হাসি,
দুঃখগুলো হারিয়ে দেয়া মুক্ত মনে ভালো বাসাবাসি।”
এ সময়ের শ্রেষ্ঠ কবি মোশাররফ হোসেন খান ঈদ নিয়ে তাঁর মনের কথা ব্যক্ত করেছেন এভাবেÑ
“ঈদ মানেতো খুশির খেলা
ফুলের মতো গন্ধে দোলা
ছন্দে ঝরা বিষটি ধারা
টাপুর, টুপুর,
ঈদ মানেতো দেদোল দোলা
সকাল দুপুর।

ঈদ মানেতো বিভেদ ভোলা
খোকা খুকুর হৃদয় খোলা
মোমের নূপুর,
ঈদ মানেতো ভালবাসার
খুশির খেলা আপন করা
সকাল দুপুর।

ঈদ মানেতো ভোর সকালে
দুয়ার খোলা
ঈদ মানেতো
মন সাগরে ঢেউয়ের দোলা।”
এভাবেই আমাদের ছড়া কবিতায় ঈদের শিক্ষা, মহিমা এবং গরিমা ভাস্বর হয়ে উঠেছে। যুগের পর যুগ রচিত হয়ে চলেছে, ঈদের উপর কবিতা। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঈদকে কোনো কবিই খুশি ও আনন্দের কেবল ঝর্নাধারা হিসেবে চিহ্নিত করেননি; বরং তাদের দৃষ্টি ও মননের সীমা আছে সু-ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবতা, এক, সাম্য আর মহামিলনের এক  বৈশ্বিকবোধ। মূলত এটাই তাদের কবিতার কেন্দ্রীয় চারিত্র্য। রমজানুল মোবারক ও ঈদ বিষয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ও রাসূল (সা) যে ধরনের শিক্ষা গ্রহণের কথা বলেছেন, ঈদবিষয়ক ছড়া কবিতায় আমরা তারই প্রতিধ্বনি লক্ষ করি। সন্দেহ নেই, ঈদ মুসলিম মিল্লাতের জন্য একটি সার্বজনীন আনন্দ উৎসব। কিন্তু সেই সাথে আবার স্বাতন্ত্র্যিকও বটে। কারণ ঈদের এই সাম্যের শিক্ষা ও বৈশিষ্ট্য একমাত্র ইসলাম ছাড়া আর কোনো ধর্মে লক্ষ্য করা যায় না। ছড়া কবিতাও ঈদের এই সার্বভৌম উদার শিক্ষা ধারণ করেই বয়ে চলেছে খর¯্রােতা নদীর মত। ছড়া কবিতার সাহিত্যে এটাও একটি বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ঐশ্বর্য বটে।

SHARE

Leave a Reply