Home নিবন্ধ গৃহকর্মে নিয়োজিত কিশোর-কিশোরী শ -হীদুল ইসলাম ভুঁইয়া

গৃহকর্মে নিয়োজিত কিশোর-কিশোরী শ -হীদুল ইসলাম ভুঁইয়া

আমাদের দেশে মানুষের বাসা-বাড়িতে কাজ করার মাধ্যমে যারা জীবিকা নির্বাহ করে বা জীবন ধারণ করে তাদেরকে ‘গৃহকর্মী’ বলা যেতে পারে। সারা দেশে কতজন গৃহকর্মী রয়েছে, সেই পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই। তবে অনুমান করা হয় যে, এ সংখ্যা এখন ২০ লাখের বেশি। লেবার ফোর্স সার্ভে, ২০১০ অনুযায়ী, দেশে গৃহকর্মীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গৃহকর্মী হলো কিশোর-কিশোরী।
গৃহকর্মে নিয়োজিত এ কিশোর-কিশোরীদের হাহাকার, হৃদয়বিদারী আর্তনাদ ও অন্তর্জ্বালা সরাসরি চোখে দেখা যায় না। তবে প্রায়শ এক শ্রেণীর বর্বর ও পাষন্ড গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীর অকথ্য নির্যাতনের ছিটেফোঁটা কাহিনী  গণমাধ্যমের বদৌলতে আমাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে। আমরা শিউরে উঠি, বেদনার্ত হই। সভ্যতার সবটুকু রঙ তখন ফিকে হয়ে যায়।
‘হিডেন স্লেভারি : চাইল্ড ডমেস্টিক ওয়ার্কার্স’ শীর্ষক সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, ওয়ার্ল্ড ভিশন, টেরে ডেস হোমস নেদারল্যান্ডস, এডুকো ও গ্লোবাল মার্চ যৌথভাবে এ গবেষণা পরিচালনা করে। গাজীপুর, নরসিংদীসহ দেশের সাত বিভাগের ১০টি শহরে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়।
এ গবেষণায় ১ হাজার ২৬০ জন কিশোর-কিশোরীর সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। এদের ৯০ শতাংশই  কিশোরী। গড় বয়স ১৩ দশমিক ৫ বছর। তাদের ৭৫ শতাংশেরই মজুরি নিয়ে যান তাদের মা-বাবা। এক-চতুর্থাংশের বেশি কিশোর-কিশোরী বলেছে, কাজ করতে গিয়ে তারা নানা দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। অর্ধেক কিশোর-কিশোরী বলেছে, তারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার। ৭৫ শতাংশই কাজে খুশি নয়। ৯০ শতাংশ কিশোর-কিশোরীর কাজ শুরু হয় সকাল সাতটায়, শেষ হয় রাত ১২টায়। তাদের বেশির ভাগকেই কাজ করতে হয় ১৪ থেকে ১৮ ঘন্টা (প্রথম আলো, ০৭.০৪.২০১৬)। চার দেয়ালের ভেতর ঘটনাগুলো ঘটে বলে তা প্রায় ক্ষেত্রেই থাকে নজরের বাইরে।
এ প্রেক্ষাপটে ‘গৃহকর্মীদের সুরক্ষা ও কল্যাণ’ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা গত ২১ শে ডিসেম্বর, ২০১৫ মন্ত্রিসভায় পাস হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কর্তৃক গৃহীত গৃহকর্ম-সম্পর্কিত কনভেনশন ১৮৯ অনুসমর্থনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ এ নীতিমালা অনুমোদন করে। এর ফলে গৃহকর্ম শ্রম হিসেবে স্বীকৃতি পাবে এবং শ্রম আইন অনুযায়ী গৃহকর্মীরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, গৃহকর্মীকে চাকরি থেকে অপসারণ করতে হলে এক মাস আগে তা জানাতে হবে। গৃহকর্মীও যদি চাকরি ছাড়তে চান, নিয়োগকারীকে তা এক মাস আগে জানাতে হবে। তাৎক্ষণিকভাবে গৃহকর্মীকে চাকরি থেকে বাদ দিলে এক মাসের মজুরি দেয়ার বিধান করা হয়েছে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, গৃহকর্মী অপরাধ করলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে, তবে নিয়োগকারী নিজে তাকে শারীরিক বা মানসিক শাস্তি দিতে পারবেন না।
গৃহকর্মীর বয়স ন্যূনতম ১৪ বছর হতে হবে। তাকে দিয়ে হালকা কাজ করাতে হবে। এ ছাড়া ১২ বছর বয়সের কাউকে গৃহকর্মী হিসেবে রাখতে হলে তার আইনানুগ অভিভাবকের সঙ্গে তৃতীয় কোন পক্ষের উপস্থিতিতে নিয়োগকারীকে আলোচনা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে শিশুর স্বাস্থ্য যাতে বিপজ্জনক না হয় এবং শিক্ষা গ্রহণে যাতে বিঘœ না ঘটে তা বিবেচনায় নিতে হবে।
গৃহকর্মীদের শ্রমঘন্টা এবং মজুরি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করতে হবে। নীতিমালায় গৃহকর্মীদের বিশ্রামের পাশাপাশি বিনোদনের সময় দেয়ারও নির্দেশ রয়েছে। গৃহশ্রমিক নিয়োগের চুক্তিতে আটটি বিষয় উল্লেখ করতে হবে, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে নিয়োগের ধরন, তারিখ, মজুরি, বিশ্রামের সময় ও ছুটি, কাজের ধরন, গৃহকর্মীর থাকা-খাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ, শারীরিক পরিচ্চন্নতা ও গৃহকর্মীর বাধ্যবাধকতা।
গৃহকর্মীর সঙ্গে অশালীন আচরণ, দৈহিক বা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না উল্লেখ করে নীতিমালায় বলা হয়েছে, গৃহকর্মীর ওপর কোনো হয়রানি ও নির্যাতন হলে মামলা রুজু করা যাবে। কোনো গৃহকর্মী নিয়োগকারী তার পরিবারের সদস্য বা অতিথিদের দ্বারা শারীরিক, মানসিক বা যৌন হয়রানির শিকার হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, গৃহকর্মী নির্যাতন বা হয়রানির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ স্টেশন যেন দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে, সে জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দাপ্তরিক নির্দেশনা জারি করতে হবে। এ ছাড়া কোন গৃহকর্মী যৌন হয়রানি ও নির্যাতন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগের মামলা করলে সরকারকে সেই মামলা পরিচালনার খরচ দিতে হবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, পূর্ণকালীন গৃহকর্মীর মজুরি যাতে তাঁর পরিবারসহ সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের উপযোগী হয় নিয়োগকারীকে তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে গৃহকর্মীর ভরণপোষণ, পোশাকপরিচ্ছদ দেওয়া হলে তা মজুরির অতিরিক্ত বলে গণ্য হবে।
নীতিমালায় বলা আছে, প্রত্যেক গৃহকর্মীর কর্মঘন্টা এমনভাবে বিন্যস্ত করতে হবে, যাতে সে পর্যাপ্ত ঘুম, বিশ্রাম, চিত্তবিনোদন ও প্রয়োজনীয় ছুটির সুযোগ পায়। অসুস্থ অবস্থায় কোনো গৃহকর্মীকে দিয়ে কাজ করানো যাবে না এবং নিয়োগকারীকেই নিজের অর্থে তার চিকিৎসা করাতে হবে। এ ছাড়া গৃহকর্মীকে তার নিজের ধর্ম পালনের সুযোগ দিতে হবে। কর্মরত অবস্থায় কেউ দুর্ঘটনার শিকার হলে চিকিৎসাসহ দুর্ঘটনা ও ক্ষতির ধরন অনুযায়ী নিয়োগকারীকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন, ২০০৬ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিল থেকে গৃহকর্মীদের যৌক্তিক সুবিধা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।
গৃহকর্মীদের সহায়তার জন্য হেল্পলাইন চালু থাকবে। নীতিমালাটি বাস্তবায়নে শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি তদারকি সেল থাকবে। কোন গৃহকর্মী বঞ্চনা বা নির্যাতনের শিকার হলে মনিটরিং সেল, মানবাধিকার ও শ্রমিক সংগঠনের কাছে টেলিফোন, মৌখিক বা লিখিতভাবে অভিযোগ করতে পারবে।
এটি নীতিমালা হলেও অন্য নীতিমালা থেকে আলাদা। কারণ, এ নীতিমালা প্রয়োগযোগ্য, যা আইনে পরিণত হলে এর ভিত্তি আরও বেশি মজবুত হবে।
গৃহকর্মীদের জন্য এযাৎতকাল পর্যন্ত প্রতিকারধর্মী কিছুই ছিল না। এমনকি দেশে বিদ্যমান শ্রম আইনেও তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ নীতিমালা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় মাইলফলক হবে, যার ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন সহজতর হয়ে উঠবে।
নীতিমালা ও আইন ছাড়াও শিশু-কিশোর গৃহকর্মীগণের দেখভাল ও সুরক্ষার জন্য সরকারের আলাদা অধিদপ্তর গঠন করা প্রয়োজন। আর সর্বাধিক প্রয়োজন হলো- এ লক্ষ্যে গণসচেতনতা ও গণজাগরণ সৃষ্টি করা। সর্বোপরি মানুষের মাঝে মনুষ্যত্ববোধের উদ্বোধনের জন্য ধর্মীয়-নৈতিকতায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠার কোনো বিকল্প নেই।

SHARE

Leave a Reply