Home ভ্রমণ সৃষ্টির এক মহাবিস্ময় হাম হাম ঝরনা -আবদাল মাহবুব কোরেশী

সৃষ্টির এক মহাবিস্ময় হাম হাম ঝরনা -আবদাল মাহবুব কোরেশী

দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ মৌলভীবাজার। মৌলভী সৈয়দ কুদরত উল্ল্যার প্রতিষ্ঠিত রূপসী কন্যার দেশ মৌলভীবাজার। উঁচু-নিচু সমতল সবুজের চাদর দিয়ে ঢাকা চা-কন্যার দেশ মৌলভীবাজার। মর্দে মুজাহিদ মহাবীর অলি শিরোমনি হযতর শাহজালাল (রহ)-এর ঘনিষ্ঠ সহচর শেরে সওয়ার চাবুকমার হযরত শাহ মোস্তফা (রহ)-এর পবিত্র ভূমি মৌলভীবাজার। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে ধনে-জনে প্রকৃতির অপূর্ব সমাহার পর্যটন নগরী জেলা মৌলভীবাজার। এ জেলাতে আছে খোদার অসামান্য সেরা দান- চা, আনারস, কমলাসহ নানা খনিজসম্পদ আর ভ্রমণপিপাসুদের জন্য নয়নাভিরাম পর্যটন স্পট। তার মধ্যে আছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উঁচু জলপ্রপাত মাধবকুন্ড, আছে উঁচু-নিচু চা বাগানের সারি, প্রকৃতির নিজ হাতে গড়া মাধবপুর লেক, অসংখ্য হাওরের মধ্যে আছে এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকি, মৎস্যসম্পদ আর দেশী-বিদেশী পাখির অভয়াশ্রম বাইক্কা বিল, আছে জাতীয় উদ্যান লাউয়াছড়া, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধ, আছে সুলতানি আমলের স্থাপনা খোঁজার মসজিদ, খাসিয়াপল্লীসহ দেখার মতো নানা স্পট। বন্ধুরা এ রকম একটি স্পটকে নিয়েই আমার আজকের আয়োজন। স্পটটা কী? জানতে খুব ইচ্ছে করছে বন্ধুরা? হ্যাঁ বলছি। তোমাদের জন্য আমার এবারের অ্যাডভেঞ্চার ‘হাম হাম’ ঝরনার রূপকথা। বাংলাদেশের অন্যতম এ ঝরনা নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। প্রতি বছর দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শত শত পর্যটক ভিড় জমায় তাকে এক নজর দেখার জন্য। ‘হাম হাম’ ও তার সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে বিলিয়ে দেয় তাকে দেখার জন্য আসা সকল বন্ধুকে।

হাম হামের অবস্থান
সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কমলগঞ্জ উপজেলা আর কমলগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে রাজকান্দি রিজার্ভ ফরেস্টের কুরমা বনবিটের গহিন অরণ্যঘেরা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ‘হাম হাম’-এর অবস্থান। মাধবকুন্ডের পর মৌলভীবাজার জেলার নতুন আবিষ্কার বিস্ময়কর ও মনোমুগ্ধকর এ ঝরনা ‘হাম হাম’। অনেকটা মাধবকুন্ডের মতো মনে হলেও ‘হাম হাম’ তার আলাদা এক বৈশিষ্ট্য নিয়ে পর্যটকদের মুগ্ধ করে যাচ্ছে। দুর্গম গভীর জঙ্গলে এই ঝরনাটি ১৩৫ মতান্তরে ১৪৭ কিংবা ১৬০ ফুট উঁচু বলে মনে করা হয়। যদিও তা সরকারি বা কোনো প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরীক্ষিত নয়, বা কোন গ্রহণযোগ্য গবেষণারও মতামত নয়। এ সব কয়টি মতই হচ্ছে স্থানীয় আদিবাসী আর পর্যটকদের ধারণা মাত্র। তবে গবেষকরা মত প্রকাশ করেন যে, ‘হাম হাম’ এর পরিধি বা ব্যাপ্তি ব্যাপক, যা মাধবকুন্ড জলপ্রপাতের ব্যাপ্তির প্রায় তিনগুণ বড়। কিšু— আশ্চর্যজনকভাবে সত্য গহিন অরণ্যের ভেতর এ ‘হাম হাম’ ছিলো এতদিন মানুষের একেবারে দৃষ্টিসীমার অন্তরালে। নীরবে নিভৃতে চলা প্রচারবিমুখ এ ঝরনা কিন্তু তার মহিমা বেশি দিন লুকিয়ে রাখতে পারেনি। ধরা দিতে বাধ্য হয় মানুষের কাছে। অজানাকে জানার অদম্য শক্তি মানুষ তাকে শুধু আবিষ্কার করেই থেমে থাকেনি তাকে উপভোগ করার যাবতীয় কৌশল আয়ত্ত করে নিয়েছে ইতোমধ্যে। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দিয়েছে ‘হাম হাম’ এর সকল তত্ত্বকথা। সুতরাং ‘হাম হাম’ গভীর অরণ্যে অবস্থান নিলেও এখন সেটা আর অজেয় নয়, একেবারে মানুষের হাতের মুঠোয়। আর সে থেকেই ‘হাম হাম’ দর্শন করতে দেশ-বিদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে জড়ো হয় আবালবৃদ্ধবনিতা। তারা প্রাণ খোলে একনজর দেখে পিপাসা মিটায় তৃপ্তিভরে।

হাম হামের আবিষ্কার ও নামকরণ
লোকচক্ষুর অন্তরালে দীর্ঘদিন নিজের রূপলাবণ্য লুকিয়ে রাখার পর অবশেষে ২০১০ সালে আবিষ্কৃত হয় চির যৌবনা ঝরনা ‘হাম হাম’ । কিšু— ‘হাম-হাম’ ঝরনা কার দ্বারা প্রথম আবিষ্কার হয়েছে বা কারা প্রথম অভিযান পরিচালনা করেছেন এ ব্যাপারে কোন সঠিক তথ্য এখনো কারও কাছে নেই। তবে লোকমুখে শোনা যায় সেখানকার কিছু স্থানীয় আদিবাসীই বাঁশ সংগ্রহ করতে গিয়ে এ ঝরনাটির প্রথম সন্ধান পায়। মূলত ‘হাম হাম’ আবিষ্কারের পেছনে সেখানকার স্থানীয় আদিবাসীরাই কৃত্বিতের দাবিদার বলে সেখানকার মানুষ মনে করেন। অন্য এক সূত্র থেকে জানা যায়-শ্যামল দেববর্মার সাথে দুর্গম জঙ্গলে ঘোরা একদল পর্যটক এ ঝরনাটি আবিষ্কার করেন। তবে শ্যামল দেববর্মার সাথে এই পর্যটক দল স্থানীয় বাঁশ সংগ্রহকারী আদিবাসী কি না তাই হলো গবেষণার বিষয়।
পাহাড়ের স্থানীয় আদিবাসীরা বিশ্বাস করেন ‘হাম হাম’ এর স্বচ্ছ পানিতে এক সময় আতসী পরীরা গোসল করতো। অর্থাৎ এ ঝরনাকে তারা গোসলখানা হিসেবেই ব্যবহার করতো। গোসলখানাকে আরবি ভাষায় ‘হাম্মাম’ বলে, টিপরা ভাষায় পানির স্রোতধ্বনিকে ও হাম্মাম বলে তাই এ ঝরনাটির নাম হাম্মাম হিসেবেই পরিচিতি লাভ করে। আর এই হাম্মাম-ই কালের বিবতর্নে ধীরে ধীরে ‘হাম হাম’ নাম ধারণ করে। তবে ‘হাম হাম’ এর আরেকটি নামও (স্থানীয়দের কাছে বেশ পরিচিত আর তা হলো ‘চিতা ঝর্ণা’) স্থানীয় আদিবাসীরা বলেন এই গহিন বনে এক সময় হিংস্র পশুদের মধ্যে চিতা বাঘের আনাগুনা ছিলো বেশি, প্রায়ই তাদের এ বনে উক্ত ঝরনার কাছে বিচরণ করতে দেখা যেত সে কারণে কারো কারো কাছে হাম হাম ‘চিতা ঝর্ণা’ নামেও পরিচিত।

যে ভাবে যেতে হয় হাম হাম
ঢাকা থেকে ‘হাম হাম’ এর উদ্দেশে সরাসরি সড়ক, রেল ও বিমান যে কোন একটি পথ আপনি বাছাই করতে পারেন। তবে বিমানপথে আসতে হলে আপনাকে প্রথমে সিলেট আসতে হবে। সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর থেকে সোজাসুজি সড়ক অথবা রেলপথে মৌলভীবাজার আসতে পারেন। রেলপথ ব্যবহার করলে আপনি সিলেট থেকে সোজা শ্রীমঙ্গলে এলেই ভালো হবে। সিলেট থেকে মৌলভীবাজার সড়কপথের দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে সরাসরি মৌলভীবাজারের সাথে রেলযোগাযোগ রয়েছে। ঢাকা-সিলেট রুটে চলাচলকারী ট্রেনগুলো মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল স্টেশন ধরেই সিলেটে যায়। ঢাকা-সিলেট রুটে যে ট্রেনগুলো প্রতিদিন যাতায়াত করে তা হলো, উপবন এক্সপ্রেস, কালনী এক্সপ্রেস, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস, পারাবত এক্সপ্রেস আপনি এর যে কোন একটি ট্রেনের সুবিধা নিতে পারেন। তবে বাস, অথবা ট্রেন যেভাবেই যান না কেন, আপনাকে প্রথমেই মৌলভীবাজার অথবা শ্রীমঙ্গল স্টেশনে নামতে হবে। মৌলভীবাজার অথবা শ্রীমঙ্গল দুই জায়গা থেকেই আপনি ‘হাম হাম’ এর উদ্দেশে কমলগঞ্জ যেতে পারেন। শ্রীমঙ্গল থেকে লাউয়াছড়ার পথ ধরে ভানুগাছ বাসস্ট্যান্ড থেকে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে পৌঁছে যাবেন কমলগঞ্জ। কমলগঞ্জ পৌরসভার মোড় থেকে আদমপুর রোড ধরে কলাবাগান পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় ২৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে কুড়মা বাগান পর্যন্ত প্রায় ১৪ কিলোমিটার পাকা রাস্তা। কুড়মা বাগান থেকে কলাবাগান পর্যন্ত বাকি পথটা কাঁচা রাস্তা। যাওয়ার পথে রাস্তায় দেখা হবে প্রাচীনতম চা বাগান চম্পারার। উঁচ-নিচু পাহাড়ের কোলঘেঁষে চা শ্রমিকদের ছোট্ট একটি গ্রাম এই কলাবাগান। এখান থেকে ‘হাম হাম’ যাবার জন্য স্থানীয় একজন গাইড সাথে নিয়ে যাওয়া অত্যাবশ্যক। কারণ জঙ্গলের রাস্তা সব সময় ভয়ঙ্কর। একবার যদি পাহাড়ের ভেতর পথ হারান তবে সেখান থেকে বের হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। শত শত বিপদ একেবারে নাকের ডগায়, আর ভয়ঙ্কর জীব-জন্তুর কথা বাদই দিলাম। সুতরাং প্রথমবার যারা যাবেন তাদের জন্য রাস্তা ভুল করাই স্বাভাবিক। এ ছাড়া ভ্রমণের সময় পাহাড়ি পথে হাঁটার সুবিধার্থে এবং আত্মরক্ষার্থে প্রত্যেকের সাথে একটি করে বাঁশ বা লাঠি নেয়া আবশ্যক। এ ছাড়া জোঁকের হাত থেকে রক্ষা পেতে কিছু লবণ ও সরিষার তেল নিয়ে নিলে ভালো হয়।

থাকার ব্যবস্থা
দূরবতী পর্যটকেরা ‘হাম হাম’ দেখার জন্য এলে অন্ততপক্ষে সপ্তাহখানেক সময় হাতে নিয়ে এলে ভালো হয়। এ সপ্তাহখানেক সময়টাতে আপনাকে অবস্থান নিতে হবে বিভিন্ন আবাসিক হোটেল এবং রেস্তোরাঁয়। আত্মীয় বাড়ি থাকলে তো আর কোনো কথাই নেই। ‘হাম হাম’ ঝরনা এলাকায় থাকার মতো তেমন ভালো ব্যবস্থা নেই। তবে নিজেকে যদি মানিয়ে নিতে পারেন তাহলে তৈলংবাড়ী কিংবা কলাবন আদিবাসী বস্তিতে থাকতে পারেন অনায়াসে। অথবা গ্রহণ করতে পারেন আদিবাসীদের অতিথিয়ানা। তবে সবচে ভালো হয় মৌলভীবাজার অথবা শ্রীমঙ্গলের আবাসিক হোটেল ও রেস্তোরাঁয় অবস্থান নিলে। এখানে ‘দুসাই’, এবং ‘গ্রেন্ট সুলতানের’ মতো আন্তর্জাতিক মানের পাঁচতারকা হোটেলসহ আছে বিভিন্ন মানের হোটেল ও রেস্তোরাঁ। এখানে থাকার সুব্যবস্থা ও খাওয়া-দাওয়া সবই করতে পারবেন নিজের পছন্দমত।

SHARE

Leave a Reply