Home ভ্রমণ মহাকবি ফেরদৌসীর মাজারে একদিন -মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্

মহাকবি ফেরদৌসীর মাজারে একদিন -মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্

তেহরান। ৫ জুন ১৯৯৫ খ্রি.। ফাইভ স্টার হোটেল ইস্তেকলাল (ঐরষঃড়হ) এর ৮০৫ নম্বর কক্ষে এসে ইরানি গাইড জামশেদি বলল, তাড়াতাড়ি প্রস্তুতি নিন, আমরা খোরাসানের রাজধানী মাশহাদ যাব। আমরা বাংলাদেশি ৭ জন মেহমান প্রস্তুতি নিয়ে নিচ তলায় হোটেলের সামনে অপেক্ষমাণ বিমানবন্দরগামী বাসে আরোহণ করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ বিমান শাখায় পৌঁছলাম। যেখানে ইরানের সমস্ত বড় বড় শহরের সাথে অভ্যন্তরীণ নিয়মিত বিমান যোগাযোগ রয়েছে।
আমাদেরকে ওঠানো হলো একটি মধ্যমমানের বিমানে। যেখানে একত্রে ২৫০ জন যাত্রী বহন করা যায়। এটি মূলত ইরান-ইরাক যুদ্ধকালীন একটি সৈন্যবাহী বিমান। এখন যুদ্ধ নেই বলে অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচল করে।
সকাল ১১টা ২৫ মিনিটে বিমানটি মাশহাদের উদ্দেশে রওয়ানা হলো। বিমানটি বারবার ঝাঁকুনি দিচ্ছিল। আমরা ভয় পেয়ে গেলাম। ইরানি যাত্রীগণ উচ্চস্বরে দরূদ পড়ছিলেন। আমরাও দরূদ পড়ছি। ইরানে আমরা যতদিন ছিলাম বাসে, ট্রামে, কারে, বিমানে সর্বত্রই মানুষের মুখে মুখে রাসূলে পাক (সা)-এর শানে দরূদ পাঠ শুনেছি। একবার আমাদের গাইডকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমরা সময় অসময় এত দরূদ পড় কেন? উত্তরে তিনি বললেন, দরূদ আমাদের আনন্দ বেদনা ও মুশকিল আসানের মন্ত্র। তাই আমরা সবসময় দরূদ পড়ি। আপনি দেখলেন না দরূদের মোজেযা। সত্যি এর কল্যাণ বহুবার দেখেছি।
আমরা তেহরান থেকে দু’ঘণ্টার মধ্যে ৯০০ কিলোমিটার দূরে মাশহাদ বিমানবন্দরে পৌঁছে গেলাম। আর কিছুক্ষণ পরই জোহর নামাজ। আমাদেরকে বিমানবন্দর থেকে কয়েকটি এয়ারকন্ডিশন বাসে ইমাম রেজা (রহ)-এর মাজারে নিয়ে যাওয়া হলো। ইমাম রেজা (রহ)-এর পুরো নাম আলী ইবনে মূসা আল রেজা। তিনি ইমাম মূসা আল কাজিম (রহ)-এর সন্তান। তাঁর জন্ম ১৪৮ হিজরি ১১ জিলক্বদ পবিত্র মদিনায়। তিনি অনেক বড় বুজর্গ ছিলেন।
জামাতে জোহর নামাজ পড়ে আমরা  খোরাসানের গভর্নর জেনারেলের আমন্ত্রণে একটি সরকারি অতিথিশালায় গিয়ে পৌঁছলাম। অতিথিশালাটি শুধুমাত্র একটি পান্থশাল নয়, এটি পার্ক লেকসহ বিশাল এলাকাজুড়ে অবস্থান করছে। এর গোলচত্বরে আমরা নানা দেশের অতিথিদের সাথে কুশল বিনিময় করেছি। ছবি তুলেছি আর লম্বা খোলা হলঘরে অবকাশ যাপন করেছি।
অতিথিশালার প্রবেশপথটি একটি বিশাল পাহাড়ের পাদদেশ ঘেঁষে। আমি আশ্চর্য হয়ে থমকে দাঁড়ালাম জাফরান বাগানে। থোকা থোকা বেগুনি রঙের জাফরান ফুল ফুটে আছে। জাফরান উন্নতমানের মসলা হিসেবে খাবার জর্দায় ব্যবহার করেছি, খেয়েছি ও হাত রাঙিয়েছি। কিন্তু কোনদিন জাফরান গাছ দেখিনি।
আমার সাথী বাংলাদেশি সম্মানিত প্রতিনিধিগণের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান এবং বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, বিশিষ্ট আলেম মাওলানা এ কে এম মাহবুবুর রহমান, সরকারি কর্মকর্তা মেজর (অব:) এম আবদুল ওয়াহিদ ও তাঁর স্ত্রী সৈয়দা সাহানা ওয়াহিদ, ঢাকা হোসেনি দালানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও লেখক এম এম ফায়েজ সিরাজী ও খুলনার দৈনিক হিজবুল্লাহ্র সম্পাদক ডা: আজিজুর রহমান।

ইরানের জাতীয় কবি, মহাকবি হাকিম আবুল কাসেম ফেরদৌসীর মাজার জিয়ারতের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। ফেরদৌসীর মাজার মাশহাদ হতে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরে তুস নগরীতে অবস্থিত। সুপ্রশস্ত যানঝটবিহীন সোজাসুজি রাস্তায় আমাদের নিয়ে ৫টি বাস তুস নগরীর উদ্দেশে রওয়ানা হলো।
এখানে বলে রাখা ভালো, আমরা বাংলাদেশি প্রতিনিধিগণ আমাদের গাইড প্রধান ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সরকারের উপমন্ত্রী ও পরে ভাইস প্রেসিডেন্ট জনাব আবতাহী সাহেবের কাছে প্রস্তাব রেখেছিলাম, আমরা সিরাজে গুলিস্তাঁ ও বোস্তাঁর মরমি কবি শেখ সা’দী (রহ)-এর মাজার অথবা মহাকবি ফেরদৌসীর মাজার জিয়ারত করতে আগ্রহী।
তুস নগরীর পথে যেতে যেতে আমার ভেতর দারুণ উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সে ছোটবেলায় বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সোহরাব-রুস্তমের কাহিনি পড়েছি, কবি ফররুখের কবিতায় পড়েছিÑ সিন্দাবাদ ও সি মোরগের বর্ণনা। পড়েছি মহাকবি ফেরদৌসীর শাহনামার অনেক গল্প। এখনও আমার ঠিক ঠিক মনে পড়ছে ফেনীর ঐতিহ্যবাহী দুধমুখা হাইস্কুলে দশম শ্রেণিতে অধ্যয়ন কালে আমাদের বাংলা পড়াতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম.এ পাস করা প্রধান শিক্ষক জনাব মোস্তাফিজুর রহমান। আমাদের সিলেবাসে ছিল মুহাম্মদ বরকতুল্লাহ লিখিত ‘পারস্য প্রতিভা’ নামক একটি সমৃদ্ধ প্রবন্ধ। মোস্তাফিজ স্যার শাহনামা রচনা নিয়ে মহাকবি ফেরদৌসীর সাথে গজনীর সুলতান মাহমুদের যে তিক্ত বিরোধ ও ভুলবোঝাবুঝি হয়েছিল তার বিশদ বর্ণনা দিয়ে আমাদের পড়া বোঝাতেন। আমি একজন কিশোর ছাত্র হিসেবে যেন তখনই মনোজগতে সফর করেছি গজনীতে, পিতা-পুত্র সোহরাব-রুস্তমের যুদ্ধের ময়দানে এবং এই যে দেখছি, এই তুস নগরে।
মহাকবি ফেরদৌসী ছিলেন গজনীর সুলতান মাহমুদের সভা কবি। তাঁর আসল নাম আবুল কাসেম। তাঁর কাব্য প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে বীর যোদ্ধা ও কাব্যপ্রেমিক সুলতান মাহমুদ তাঁকে ফেরদৌসী উপাধি দিয়েছিলেন। তাঁর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেছিলেন, “আবুল কাসেম তুমি কাব্য জগতের ফেরদৌসী, তুমি আমার দরবারকে তোমার কাব্যসুধায় বেহেশতে পরিণত করেছে।” ফেরদৌসীর আর এক উপাধি হাকিম।  সে মুহূর্ত থেকে আবুল কাসেম তুসী হলেন ফেরদৌসী। কবিকে পারস্যের বীরত্বগাথা ও ইতিহাস-কাব্য রচনার দায়িত্ব প্রদান করলেন সুলতান মাহমুদ। প্রতিটি শ্লোক রচনার বিনিময়ে একটি স্বর্ণমুদ্রা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিলেন। কবির স্বপ্ন, গ্রন্থখানা রচনার দ্বারা তাঁর ব্যক্তিগত অর্থাভাব তো দূর হবেই, তিনি তুস নগরের অধিবাসীদের পাহাড়ি বন্যা থেকে রক্ষা করবেন, সুপেয় পানির অভাব দূর করবেন, সেচ কাজের সুবিধা দিয়ে জনগণের সেবা করবেন।
সুদীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে রচিত হলো মহাকাব্য ‘শাহনামা’। সমাপ্তিকাল ১০১১ খ্রি.। সুলতানের হাতে সমর্পণ করলেন পা-ুলিপি এবং তারপরই যা ঘটলো, তার জন্য স্বপ্ন-জগতের একজন যুগশ্রেষ্ঠ কবি প্রস্তুত ছিলেন না। মানুষের নীচতা কোথায় গড়ালে এমন অবাঞ্ছিত একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়! হিংসুটে কোষাধ্যক্ষের কুপরামর্শে কবি পেলেন ষাট হাজার স্বর্ণমুদ্রার স্থলে ষাট হাজার রৌপ্যমুদ্রা। সুলতানের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে তাঁর সম্পর্কে কবির উচ্চ ধারণা ভূলুণ্ঠিত হলো, তাঁর স্বপ্নের প্রাসাদ ভেঙে গেলো! তুস নগরীর জনগণের সেবার স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেলো। রাগে অভিমানে ভগ্নহৃদয় কবি শাহি প্রাসাদের দূত, আগত মুসাফির, গোসলখানার রক্ষক ও পানি বিক্রেতাদের মাঝে ষাট হাজার রৌপ্যমুদ্রা বণ্টন করে দিলেন। সুলতানকে জানালেন, কবিতার সম্মানী ব্যক্তিগত প্রয়োজনে নয়, জনস্বার্থেই প্রয়োজন ছিল। সুলতান সম্পর্কে ব্যঙ্গাত্বক কবিতা লিখে তিনি জন্মস্থান তুস নগরীর পথে রওয়ানা হন। কালোত্তীর্ণ শাহনামার কাব্যকথা আজো লোকের মুখে মুখে চলে আসছে : তবুও ফেরদৌসীর এ ব্যঙ্গপঙ্ক্তি কেউ ভোলে না।
‘আগার শাহ রা শাহ্ বুদে পেদার
ব-সারে মন নেহাদে মা রা তাজ ও যার।’
অর্থাৎ- সন্তান হতে যদি বাদশাহ পিতার
শিরে মোর দিতে তাজ, রত্ন ভা-ার।
এটি মূলত সুলতানের প্রতি কবির অভিমান ও ঘৃণা মিশ্রিত একটি পঙ্ক্তিমালা।
ফেরদৌসীর মাজারে যেতে যেতে গজনীর বাদশাহ্ সুলতান মাহমুদের সেই ‘ভিখারী মানসিকতার’ কথাই মনে পড়ল। যদিও বাদশাহ্ তাঁর ধূর্ত ও বখিল মন্ত্রির কুপরামর্শ দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছিলেন।

SHARE

Leave a Reply