Home ভ্রমণ মেঘ পাহাড়ের দেশে কাঞ্চনজঙ্ঘায় অবাক সূর্যোদয় -ফজলুল হক তুহিন

মেঘ পাহাড়ের দেশে কাঞ্চনজঙ্ঘায় অবাক সূর্যোদয় -ফজলুল হক তুহিন

আমাদের গাড়ি সমতল থেকে আকাশ পানে মেঘেঢাকা পাহাড়ের পথে এঁকেবেঁকে চলেছে সাপের মতো। যদি গাড়ির দু’টি ডানা থাকতো, তাহলে উড়াল দিয়ে মুহূর্তেই পাহাড় চূড়ায় পৌঁছে যেতাম। দশজনের মতো বহন করা যায় এমন সব জিপ চলাচল করে এখানে পাহাড়ি দুর্গমপথ পাড়ি দেয়ার জন্য। আমাদের গন্তব্য দার্জিলিংয়ের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়চূড়া টাইগার হিল; যেখান থেকে হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘায় অবাক সূর্যোদয় দেখা যায়। সেই বিস্ময়কর সূর্যোদয় দেখার জন্য ভোর সাড়ে তিনটায় হুড়মুড় করে ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে জিপে গিয়ে উঠলাম। গাড়ি চলতে শুরু করলো পাহাড়ি সরু আঁকাবাঁকা পথে। দুই পাশে আকাশছোঁয়া ঝাউগাছের সারি। আমাদের দেশের ইউক্যালিপটাস গাছের সমান হবে একেকটা পাইন গাছ। পাহাড়ের চূড়া থেকে ঢাল বেয়ে একদম নিচ পর্যন্ত সমস্তটাই পাইন গাছের বন। পাশেই আবার দৈত্যের মতো ভয় দেখিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটার পর একটা পাহাড়। চূড়ায় মেঘপুঞ্জের লুকোচুরি খেলা। দূর থেকে মনে হয় নীল আকাশের ডানায় কালচে সবুজের রহস্যময় অরণ্যের মাথায় মেঘের শিশুরা ট্রেন চালাচ্ছে। গাড়ির জানালায় পলকহীন চোখ দিয়ে শুধু দেখছি আর দেখছি অসীম তৃষ্ণায় তুলনাহীন ভালোলাগায় আর অনবরত সুন্দরে ডুবে ডুবে যাচ্ছি। ভাবছি পৃথিবী ভ্রমণ না করলে উপলব্ধি করা সম্ভব নয় মহান রবের মহিমা। সম্ভব নয় জ্ঞানের দুয়ার খোলা এবং অভিজ্ঞতার গোলা ভরা।

আমাদের গাড়ি পাহাড়ের একটা বাঁকে এসে থেমে গেলো, আর সামনে যাবে না। কারণ শত শত গাড়ি চূড়া পর্যন্ত সারি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ি থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করলাম পাহাড়ি পথে। কি যে কষ্ট আর ক্লান্তি, ঘাম ঝরে যায়। হাঁটুতে ব্যথা ধরে গেলো। তবু অজানা এক টানে কাঞ্চনজঙ্ঘায় অবাক সূর্যোদয় দেখার জন্য প্রাণপণ চেষ্টায় হাঁটতে লাগলাম। একদিকে কষ্ট, অন্যদিকে উত্তেজনা। এই ভোর রাত্রে কঠিন শীতে নেপালি মেয়েরা গরম ‘কফি কফি’ বলে ফেরি করে বেড়াচ্ছে। গরম কফি খেয়ে বেশ উষ্ণতা অনুভব করলাম শরীরে। পাহাড়ের গায়ে পেঁচানো সাপের মতো পথ, পাহাড় কেটে ব্রিটিশরা এই পথ তৈরি করেছে, এমনকি রেলপথও নির্মাণ করেছে। পাইন গাছ ঘেরা পাহাড়ি পথে চলতে চলতে এক সময় টাইগার হিলের মাথায় গিয়ে উঠলাম। শত শত মানুষ এসে জড়ো হয়েছে। পুবের আকাশে হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় বড় বড় চোখ মেলে বিপুল আগ্রহে তাকিয়ে থাকলাম। বহুদূরে ধবধবে সাদা তুষার আবৃত হিমালয়ের দিকে দৃষ্টি দিতেই আমাদের সামনে প্রকাশিত হলো অপার্থিব এক সৌন্দর্য। সাদা বরফের উপর সূর্যের আলোর স্পর্শে লালচে রঙের এক আভায় উদ্ভাসিত হয়েছে চতুর্দিক। এমন কোনো ভাষা নেই যা দিয়ে এই বিশাল আয়োজনকে বর্ণনা করা যায়। অপলক চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সূর্যোদয় এক সময় সম্পন্ন হলো চোখের সামনে। যারপরনাই আত্মতৃপ্তি নিয়ে চারপাশের আলোকিত প্রকৃতি অবলোকন করলাম মুগ্ধতায়, বিস্ময়ে। মেঘাচ্ছন্ন রহস্যময় পাহাড়ের ওপাশে পাহাড়, আবার পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে গায়ে ঝাউগাছের ফাঁকে ফাঁকে চার-পাঁচ তলা বিল্ডিং। যেন স্বপ্নের মেঘপাহাড়ের দেশ আকাশ ছুঁয়েছে। মনের গহিন থেকে উৎসারিত হলো কবিতা:
বল্লমের মতো সারি সারি ঝাউ গাছের স্যালুট নিতে নিতে
আকাশের সিঁড়ি বেয়ে ঈগলের মতো পাখা মেললাম
তুলোতুলো মেঘের আকাশে, হেসে ওঠে দার্জিলিং
মেঘের পালক দুই হাতে সরিয়ে পুবের পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে
মেলে দিলাম দুচোখ- আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে
বিস্মিত বিমুগ্ধ হতে হতে আমি ডুব দিলাম সূর্যের সরোবরে
শতমুখী আলোর আশ্চর্যে হারালাম- সুন্দরের কাঞ্চনজঙ্ঘার চরাচরে ॥
সত্যিই অভাবনীয় এক সৌন্দর্যলোকে হারিয়ে যেতে যেতে আবার ফিরতি পথে এগোলাম গাড়িতে চেপে। সাত হাজার ফিট উঁচু পাহাড় থেকে এবার নামতে নামতে চোখে পড়লো বিশাল এক লেক। ভাবা যায় আকাশছোঁয়া উচ্চতায় একটা সবুজ মায়াময় লেক, যার বুকে নীলাকাশ লুটোপুটি খায়।

বাতাসিয়া ল্যুপ :
গোরখা সৈন্যের মনুমেন্ট
ফিরে আসতে আসতে বাতাসিয়া ল্যুপে উঠলাম। এখানে স্থাপন করা হয়েছে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধে শহীদ গোরখা সৈন্যদের মনুমেন্ট। শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। একটা সুউচ্চ টাওয়ার ও  বিশাল দেহের দুঃসাহসিক গোরখা সৈন্য রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।  মনুমেন্টের চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখলাম, ছবি তুললাম। পাহাড়ের চারদিকে মেঘেঢাকা আকাশছোঁয়া পাহাড়ের সারি। এখান থেকে দূরবীনের মাধ্যমে দেখা যায় সিকিমের তুষারে ঢাকা অঞ্চল, হিমালয়ের পর্বতশ্রেণি, নেপালের কিছু অংশ এবং দার্জিলিংয়ের স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী নানা স্থাপনা। মুগ্ধ চোখে বিস্মিত হৃদয়ে শুধু দেখলাম অপলক। স্থানীয় রাজার পোশাকে কয়েকজন মানুষ দেখলাম। বেশ রাজসিক পোশাক। বাতাসিয়া ল্যুপে শীতের কাপড়চোপড় পাওয়া যায় বেশ সস্তায়। মাফলার আর শীতের টুপি কিনে চললাম এবার রক গার্ডেনের উদ্দেশে।

রক গার্ডেন :
যেন জান্নাতের ঝরনা
ভাবতেই ভয় লাগে- সাত হাজার ফিট উঁচু থেকে আঁকাবাঁকা খাড়া পথে নামছি দুরুদুরু বুকে। দোয়াদরুদ পড়তে পড়তে পাহাড়ের একদম নিচে আমাদের গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে দুঃসাহসিক অভিযাত্রায় দারুণ এক উত্তেজনায়। নিচের গাড়িগুলো মনে হচ্ছে ছোট ছোট খেলনা গাড়ি। আবার মন থেকে কবিতার ধারা বের হয়ে এলো ঝরনার মতো :
পাহাড়ের ঢালু বেয়ে সাপের মতো পেঁচানো সরু পথ দিয়ে পিঁপড়ার মতো
চূড়া থেকে নামতে নামতে ভয়ে বুক কাঁপতে কাঁপতে শুনতে পেলাম
ঝরনার ধারা আছড়ে পড়ছে পাথরের গায়ে নুড়ির শরীরে
চোখে পড়তেই আমি হতবাক, কাছে আসতেই কি যে আনন্দ লাগলো
কি যে ভালো লাগলো আমার, হৃদয়ের সব দরজা জানালা যেন মুহূর্তেই
খুলে গেলো এক জাদুর ছোঁয়ায়, হিম ধারায় পা ডুবিয়ে গা ভাসিয়ে
স্নাত হতে হতে মনে হলো পেয়েছি জান্নাত, এখানেই কেটে যাক দিনরাত॥
যখন বহু কষ্টে, ভয়ে ভয়ে আর আবেগে ঝরনার কাছে পৌঁছালাম, তখন হতবাক না হয়ে পারলাম না। ঘনবন পাহাড়ের গায়ে, সেই পাহাড়ের কঠিন বুক চিরে শীতল ঝরনাধারা আছড়ে পড়তে পড়তে একদম পাদদেশে এসে কিছুটা জমে নদীর ধারায় মিশে যাচ্ছে। সে এক অবর্ণনীয় দৃশ্য। আমরা শীতল পানিতে পা ডুবিয়ে দেহমনে ঠান্ডা পরশ নিতে নিতে আকাশের দিকে চেয়ে থেকে ভাবতে থাকি আল্লাহর কি এক নিদর্শন যার কোন তুলনা নেই। কিভাবে এতো উঁচু থেকে পাথর ফেটে ঝরনাধারা বের হয়ে আসছে? এর কোন কূলকিনারা পাওয়া যায় না। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে এবার উঠতে থাকলাম চূড়ায়, এও এক দুঃসাহসিক অভিযাত্রিক রোমাঞ্চ।
রক গার্ডেন থেকে তানজিন রকে গিয়ে পাথরের পাহাড়ে ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। ছবিটবি তুলে চলে গেলাম রোফ ওয়েতে। দুই পাহাড়ের মধ্যেখানে দড়ি বাঁধা, দড়িতে ঝোলানো আছে দুইতিন জন মানুষ চড়তে পারে এমন স্টিলের খাঁচা। সাত হাজার ফিট উঁচু থেকে দড়িতে ঝুলতে ঝুলতে সারা দার্জিলিং শহর দেখতে থাকলাম যারপরনাই উত্তেজনা, আবেগ, ভয়, শিহরণ, আনন্দ, উল্লাস, বিস্ময় বুকে পুরে। জীবনে প্রথম এতো বেশি রোমাঞ্চিত হলাম। দার্জিলিং শহর যেনো মেঘপুরীতে ভাসছে। রোফের উত্তেজনা কাটিয়ে আরো এক আনন্দ ভ্রমণের জন্য ট্রেনে গিয়ে উঠলাম। ছোট্ট একটি ট্রেন পাহাড়ের কিনারা ধরে ছুটে চললো। পাহাড়ের চারপাশ জানালায় চোখ রাখতেই দেখি মেঘ জড়ো হয়েছে আমার হাতে। নিচের দিকে তাকাতেই ভয়ে আধমরা হয়ে গেলাম। ট্রেনটা কোনো রকমে লাইনচ্যুত হলেই সাত হাজার ফিট খাদে উধাও হয়ে যাবো। ভাগ্য ভালো ট্রেনটা ঠিকঠিক ঘুরে এলো গোটা শহর। স্টেশনে ব্রিটিশ আমলের ইঞ্জিন রাখা আছে প্রদর্শনের জন্য।

মিরিক :
আকাশের ঠিকানায় লেক
দার্জিলিং থেকে শিলিগুড়ি ফেরার পথে আরো যে অজানা এক বিস্ময় অপক্ষো করছিলো তা আগে থেকে বুঝিনি। দার্জিলিং শহর পাহাড়ের গায়ে গায়ে, সিঁড়ির মতো, আবার মেঘের মধ্যে। এই রোদ এই বৃষ্টি। ঝাউগাছের সারি রাস্তার দুই পাশে মাথা উঁচু করে আকাশমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কতকাল জানা নেই। এই পাইনঘেরা পথ ধরে নেপালের সীমান্ত ধরে গাড়ি এগোতে থাকলো তুমুল বৃষ্টির বল্লম খেতে খেতে। আহ্ কি যে আনন্দ লাগছে! দুই পাশে পাহাড়ের গায়ে বিশাল বিশাল সবুজিয়া চা-বাগান, অসংখ্য পাহাড়জুড়ে চায়ের সা¤্রাজ্য বিস্তীর্ণ। আমাদের রাস্তা আস্তে আস্তে উঁচুতে উঠে যাচ্ছে। আষাঢ় মাস হওয়ায় জলজ মেঘপুঞ্জ দলবেঁধে খেলে বেড়াচ্ছে, দুষ্টুমি করছে, আমাদের গাড়ির গা ছুঁইয়ে দিয়ে অজানা গন্তব্যে পাড়ি জমাচ্ছে। মেঘপাহাড় পাড়ি দিয়ে একসময় এসে পৌঁছলাম মিরিক।
মিরিক প্রায় সাত হাজার ফিট উঁচুতে অবস্থিত একটা লেক। সব সময় মেঘাচ্ছন্ন। মাঝে মধ্যেই মেঘ বৃষ্টি ঝরায়। ঘোড়ায় চড়ে বেড়াবার সুযোগ আছে। মেঘের শিশু-কিশোররা আনন্দে ঘুরে ঘুরে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে লেকময়। লেকের ধারে সুউচ্চ ঝাউবন। হালকা বাতাসে লেকে ছোট ছোট ঢেউ খেলে যায়। লেকে আছে বোট, নিজেরাই চালানো যায়। পানি ছুঁয়ে মেঘরাশি ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমারাও লেকে বোট চালিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি মেঘের ভেতরে, স্বপ্নের দেশে, কল্পনার জগতে, যেন জান্নাতের নদীতে নৌভ্রমণে বের হয়েছি। আমাদের শরীরে মেঘের কণা জমে আবার উড়ে যাচ্ছে, কিন্তু আশ্চর্য ভিজে যাচ্ছি না। কি যে আনন্দ, পুলক ও শিহরণ জাগছে কেমন করে বলি! নাহ্ এই অনুভবের কোন ভাষা নেই। এই উল্লাসের কোন তুলনা নেই।
কালিমপং :
সৌন্দর্যের স¦প্নদেশ
যে দেশে অনন্তকাল থেকে যেতে ইচ্ছে করে, যে জায়গা থেকে আর কখনো ফিরতে চায় না মন, সেই স্থানের নাম কালিমপং। দার্জিলিং থেকে দুই কি আড়াই ঘণ্টার পথ। আমরা অবশ্য যাচ্ছি শিলিগুড়ি থেকে। কিছু দূর যেতেই শীতল ছায়া ও হাওয়ার স্পর্শ পেয়ে ভালই লাগছে। সমতল থেকে আস্তে আস্তে গাড়ি পাহাড়ের পাদদেশ ধরে তৈরি সড়কে গিয়ে উঠলো। একটু পরেই দেখি পাহাড়শ্রেণির পাদদেশে বয়ে চলেছে একটা নদী। খরস্রোতা ও সরু। একদম ছবির মতো দৃশ্য। আমাদের সামনে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে গগনস্পর্শী ঘন বনঘেরা পাহাড়। পাহাড়ের পায়ে পায়ে কুলুকুলু ঢেউ খেলে বয়ে যাচ্ছে আঁকাবাঁকা নদী। পাহাড়ের মাথায় আবার বাসা বেঁধেছে সাদা সাদা মেঘপুঞ্জ। কি যে ভালো লাগলো কেমন করে বলি! আমাদের গাড়ির নেপালি ড্রাইভার মদন জানালো এই নদীর নাম তিস্তা। হায় আল্লাহ! বাংলাদেশের সেই তিস্তার উৎসধারার কাছে আমরা! সত্যিই মহাসৌভাগ্যবান আমরা! আর দুর্ভাগা হলাম যখন দেখলাম অনেক বিদ্যুৎ বাঁধ বসানো হয়েছে তিস্তার গতিপথে।
তিস্তাপাড় ধরে আমার কালিমপং গিয়ে পৌঁছলাম দুপুরের আগেই। এই রোদ এই ছায়া এই বৃষ্টি। শাল, ঝাউ, সেগুনসহ নানা ধরনের বন্য গাছপালায় ভর্তি পাহাড়, তার মধ্যে দিয়ে উঁচু-নিচু দুর্গম পাহাড়ি পথ। একটা পাহাড়চূড়ায় এসে থামলো গাড়ি। কালিমপং সাইন্স সেন্টার। এই সেন্টারের রেলিং দেয়া চূড়ার ধারে দাঁড়িয়ে চারপাশের মেঘেঢাকা পাহাড়ের দৈত্য দেখতে দেখতে দেখি আমাদেরও ঘিরে ধরেছে মেঘের দল। ভাবখানা এমন- বিনা অনুমতিতে মেঘের দেশে আসায় আমাদের পাকড়াও করা হলো। সায়েন্স সেন্টারে বিজ্ঞানের নানা আয়োজন দেয়ালে লাগানো পোস্টারে সূত্রাকারে দেখানো আছে, আবার বিভিন্ন সূত্র প্রয়োগ করে বোঝানো আছে কিভাবে বিজ্ঞান কাজ করে। যেমন একটা আয়নায় মানুষ সামনে দাঁড়ালেই লম্বা দেখায়, একটায় খাটো আর একটায় মোটা দেখায়। সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হলো আশ্চর্য কাচের বক্স। বক্সটা বুক সমান, বক্সে ঢুকলে বুক পর্যন্ত আর দেখা যায় না, অদৃশ্য। মানে অর্ধেক মানব, অর্ধেক অদৃশ্য। পদার্থবিজ্ঞানের নানান ধরনের নিদর্শন এখানে সাজানো আছে পরিপাটি করে। সেন্টারের বাহিরে বিরাট জায়গা জুড়েও বিজ্ঞানের খেলা জায়গায় জায়গায় পাতা আছে। সেখানে যেতেই কোত্থেকে বিশাল মেঘের বহর এসে আমাদের ঘিরে ফেললো চারিদিক থেকে। দেখি সামনেই বিশাল হাঁ করে দাঁত বের করে আছে ডাইনোসর, ভয়ে দৌড় দিতে যাবো, সেই সময়েই মনে হলো আরে এটা তো কৃত্রিম! আমরা মেঘের জগতে ডাইনোসরের সাথে অদৃশ্য হয়ে লুকোচুরি খেলা খেলতে লাগলাম।
সাইন্স সেন্টারে মুগ্ধ হয়ে বের হলাম ক্যাকটাস গার্ডেনের দিকে। ক্যাকটাস গার্ডেনে ঢুকতেই দেখি টিকিট হাতে দাঁড়িয়ে আছে এক গোরখা মহিলা। দেখতে রাঙ্গামাটির চাকমা মেয়েদের মতো। ১০ রুপি দিয়ে ঢুকে গেলাম ক্যাকটাস গার্ডেনে। ভাবলাম আমাদের দেশের মতো কিছু ক্যাকটাস হয়তো দেখতে পাবো। কিন্তু বিশাল বিশাল তাঁবুর মধ্যে তিন সারিতে লাগানো ক্যাকটাসের স্বর্গরাজ্যের মুখোমুখি হলাম। বিশাল গোলাকৃতির এক একটা ক্যাকটাস কাঁটা খাড়া হয়ে আছে সজারুর মতো, আমাদের দেশের মিষ্টি কুমড়ার মতো সাইজ হবে। কোনটা ছয় সাত ফিট উঁচু হবে। বিচিত্র সব ক্যাকটাস, বহু বর্ণের বহু আকৃতির বাহারি ক্যাকটাস দেখতে দেখতে বিস্ময়ের কোন কূলকিনারা পেলাম না। ক্যাকটাস যে এতো সুন্দর এতো বৈচিত্র্যময় হয় তা এখানে না এলে বোঝা যাবে না। ক্যাকটাস গার্ডেনে দাঁড়িয়ে আমরা রেলিং ধরে কালিমপং শহর দেখতে থাকলাম, মেঘেঢাকা রহস্যময় এক স্বপ্নের দেশ। এখানকার অধিবাসীদের জীবিকা ট্যুরিস্টনির্ভর। জীবন সংগ্রামী ও লড়াকু। সবুজ পাহাড়ি এই জনপদে ছোট্ট গোরখা শিশুরা পাহাড়ি পথে স্কুলে যেতে আসতে শিখে নেয় জীবন সংগ্রামের কলাকৌশল। ওরা বড় হয়ে বাপ-দাদার সাথে আওয়াজ তুলে স্বাধীন গোরখাল্যান্ডের। কালিমপং থেকে আমরা ওদের স্বাধীনতা আন্দোলনের হাওয়া খেতে খেতে শিলিগুড়ি ফিরে এলাম।
ক্যাকটাস গার্ডেন থেকে আমরা জলজ মেঘের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে ডেলোতে এসে পৌঁছলাম। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ডেলো এক মনোমুগ্ধকর জায়গা। সবুজ ঘনঘাসের বাগান, রাস্তার দু’পাশে বিচিত্র ফুলের সমাহার, চারিদিকে বিশাল বিশাল পাইন গাছের সারি, মাঝখানে খুব সুন্দর দোতলা একটা রেস্টহাউজ। শুনলাম এখানে একবার হাওয়াবদল করতে এসে ছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আমরা ছবি তুলে ফিরে এলাম।
দার্জিলিং এক রহস্যময় অদ্ভুত জায়গা। হিমালয়ের পাদদেশে অসংখ্য পাহাড়, নদী, ঝরনা, অরণ্য, তুষার, আবৃত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। আমরা গ্রীষ্মকালে গিয়ে ছিলাম বলে রক্ষা, শীতকালে দার্জিলিংয়ে তুষারপাত হয়। বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে বরফের ঠান্ডা সহ্য করা খুব কঠিন। তেতাল্লিশ জনের একটি টিম লালমনিরহাটের বুড়িমারী সীমান্ত দিয়ে শিলিগুড়ি হয়ে দার্জিলিং গিয়েছিলাম। কক্সবাজারের মতোই খরচ। হোটেলেই থাকা, খাওয়া ও গাড়ির ব্যবস্থা থাকে। ছয় দিনের স্বপ্নময় ভ্রমণ শেষে দার্জিলিংয়ের সেই ঠান্ডা আবহাওয়া পার হয়ে শিলিগুড়ি হয়ে সমতল বাংলাদেশে এসে পৌঁছালাম। এখনো চোখ বুঝলেই মনে ভেসে ওঠে সেই মেঘ পাহাড়ের দেশ।

SHARE

Leave a Reply