Home ঈদ ফ্যাশন ফ্যাশন ও রুচিবোধ -সোহাইল আহমদ

ফ্যাশন ও রুচিবোধ -সোহাইল আহমদ

আমাদের প্রতিদিনের জীবন-যাপনের অন্যতম একটি অনুষঙ্গ হচ্ছে- ফ্যাশন। কম-বেশি সবাইই চায় ‘ফ্যাশনেবল’ জীবন-যাপন করতে। কিন্তু ‘ফ্যাশন’ জিনিসটা কী? সে সম্পর্কে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। ইংরেজি ভধংযরড়হ (ফ্যাশন) শব্দের অর্থ দাঁড়ায়- ধরন, ঢঙ, রঙ, চলন ইত্যাদি। অর্থাৎ জীবন-যাপনে, চলনে-বলনে বিশেষ ধরন বা রীতি অনুসরণ করাই হলো ফ্যাশন। ফ্যাশন বলতে আমরা সাধারণত পোশাক-আশাকের বাহারি রূপকেই বুঝি। কিন্তু না, ফ্যাশন সর্বত্রই রয়েছে। শুধু পোশাক-আশাক নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে ফ্যাশনের ছোঁয়া। যেমন, ব্যক্তির আচার-আচরণ, কথা বলার ভঙ্গি, চলাফেরার স্টাইল, খাওয়া-দাওয়ার নিয়ম-রীতি ইত্যাদি। যুগে যুগে ফ্যাশনের রূপও বদলাচ্ছে এবং জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে। আধুনিককালে তো এর আকার আরো বেশি প্রসারিত হয়েছে। তবে হ্যাঁ, ‘ফ্যাশনেবল’ জীবন-যাপন করতে কোনো দোষ নেই; কিন্তু কোন ধরনের ফ্যাশন আমরা গ্রহণ করছি সেটাই হলো আলোচ্য বিষয়।
বলা যেতে পারে, মানবসভ্যতার শুরু থেকেই ফ্যাশনের আবির্ভাব। এই ফ্যাশন আবার স্থান-কাল-পাত্রভেদে বিভিন্ন রকম হয়। অর্থাৎ একেক জনগোষ্ঠী বা এলাকার ফ্যাশন একেক রকম। আমাদের মুসলিম সমাজের ফ্যাশন এক রকম; আবার হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের ফ্যাশন আরেক রকম। সুতরাং ফ্যাশনের সাথে ধর্ম-বিশ^াস, লোকাচার, চিন্তাচেতনা ইত্যাদির সম্পর্ক রয়েছে। আবার কোনো কিছুর প্রতি আগ্রহী হলে বা সেই বিষয়টি যদি ব্যক্তির ওপর প্রভার বিস্তার করতে সক্ষম হয় তাহলে ব্যক্তি ঐ বিষয়টি ফ্যাশন হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। ধরা যাক, এক বন্ধু নতুন একটি শার্ট কিনল তা দেখে অপর বন্ধুর ঐ রকম শার্ট কেনার আগ্রহ জাগল। এভাবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ফ্যাশন বিস্তার লাভ করছে। সব ধরনের ফ্যাশন যে সবাই গ্রহণ করবে বিষয়টি এমন নয়; কিছু কিছু ফ্যাশন ব্যক্তিজীবন, সমাজজীবন, পারিবারিক-জীবনে অকল্যাণ বয়ে আনে। এর উপযুক্ত উদাহরণ হচ্ছে- ‘পাখি ড্রেস’। নাটকে ‘পাখি ড্রেস’ দেখে অনেক মেয়েই তার বাবা-মাকে এই ড্রেস কিনে দেয়ার জন্য চাপ দিয়েছে। কিন্তু দরিদ্র পিতার পক্ষে সেই দামি ড্রেস কিনে দেয়া সম্ভব হয়নি। আর সেই দুঃখে, ক্ষোভে কিছু মেয়ে আত্মহত্যা করেছে- এ খবর পত্রিকায় বেরিয়েছে।
উচ্চাভিলাষী এই ফ্যাশন কতটা ভয়াবহ তা বোঝাই যাচ্ছে। ফ্যাশন গ্রহণ করার ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা উচিত। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির রুচিবোধ থাকাটা জরুরি। কারণ, রুচিবোধ না থাকলে কোনো কিছুই সহি-সালামতে সম্পাদন করা সম্ভব নয়। রুচিশীল মানুষের কাজকর্ম, কথা-বার্তা, আচার-আচরণ, চাল-চলন হয় সুন্দর এবং সাবলীল। যেমন কারো-কারো কাজকর্ম দেখে আমরা বলি- লোকটার রুচি আছে। অর্থাৎ মানুষকে আকৃষ্ট করতে হলে বা তার মন জয় করতে হলে রুচিবোধ থাকাটা আবশ্যক। রুচিহীন লোক কারো কাছে ঠাঁই পায় না। তার কথাবার্তা, আচার-আচরণে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে যায়। মানুষ তাকে ঘৃণা করে। তাহলে রুচিবোধ বলতে কোনো কিছু সুন্দর এবং সাবলীলভাবে সম্পাদনা করাকে বোঝাচ্ছে; যা সর্বজনসম্মত।
ফ্যাশনের সাথে যদি রুচিবোধটা থাকে তাহলে সে মানুষটা সর্বত্রই সমাদৃত হবে- এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
বর্তমানে ফ্যাশনের নামে আমরা যা দেখি তা অনেক ক্ষেত্রেই অসামাজিক, অনৈতিক, অশ্লীল ও আপত্তিকর। যেমন, নাটক-সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের অশ্লীল ও আপত্তিকর পোশাক-আশাক এবং তাদের রঙ-ঢঙ তরুণসমাজ অনুকরণ করছে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে যেমন তরুণরা নিজেদের অস্তিত্ব হারাচ্ছে তেমনি পরিবার ও সমাজজীবনে সৃষ্টি হচ্ছে নানারকম জটিলতা ও সহিংসতা। প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং আকাশ-সংস্কৃতির ছোবল এ ক্ষেত্রে কোনো অংশে কম দায়ী নয়। যদিও এখন জীবনব্যবস্থাই হয়ে গেছে প্রযুক্তিনির্ভর তবু সচেতন থাকলে ক্ষতি কী? তাই সুস্থ, সুন্দর জীবন-যাপনে ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি শ্রদ্ধা ও সেই মোতাবেক কাজকর্ম করাই উত্তম। এ ক্ষেত্রে আমরা প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা)কে অনুসরণ করব। তিনি কোন ধরনের পোশাক-আশাক পরতেন, কোন ধরনের জীবন-যাপন করতেন তা যদি আমরা আমাদের জীবনে প্রয়োগ করতে পারি তাহলে সুস্থ, সুন্দর সমাজগঠনে তা সহায়ক হবে।
তবে একটি কথা যদি আমরা সব সময় মনে রাখি তাহলে বিষয়টি আরো সহজ হয়ে যায়- ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ’। রাসূল (সা)-এর এই হাদিসটি আমাদের যাপিত-জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলে মনমেজাজ এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। পাঁচ-ওয়াক্ত নামাজ আদায় করলে পাঁচবার ওজু করতে হয়, এতে স্বাভাবিকভাবেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষা হয়। পোশাক-আশাক, রাস্তা-ঘাট, বাড়ির আঙিনা সর্বত্রই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আবশ্যক। দামি পোশাকই পরতে হবেÑ এমন কোনো কথা নেই; রবং অল্প-দামি পোশাক যদি সর্বদা পরিষ্কার রাখি এবং পরিধান করি সেটাই হবে যুক্তিযুক্ত। সুতি-কাপড় বা আরামদায়ক পোশাক পরার বিধান রাখা হয়েছে। অস্বস্তিকর কাপড় পরিধান কখনোই বিধিসম্মত নয়। আর এমন পোশাক পরতে হবে যাতে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তথা ইজ্জত-আব্রু পরিপূর্ণভাবে ঢেকে থাকে।
আর যে বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাহলো, মন-মানসিকতা পরিষ্কার রাখা। যার হৃদয়-মন হিংসা-বিদ্বেষে ভরপুর সেই মানুষটাই সবচেয়ে বেশি অসুখী। তার কাছে তার প্রতিবেশীও নিরাপদ নয়। সুতরাং মন-মানসিকতা ভালো রাখা বা ভালো চিন্তা করা অতীব জরুরি। রাসূল (সা) বলেছেন, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ নয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। অতএব কথা বলাটাও রুচিসম্মত হতে হবে। অশ্লীল বা গালি-গালাজযুক্ত কথাবার্তা পরিহার করাই সুস্থ মানসিকতার পরিচয়। আচার- আচরণ, কথাবার্তা এমন হতে হবে যাতে মানুষের হৃদয়-মন ভরে যায়; যাতে তারা প্রশান্তি পায়। ‘বড়দের শ্রদ্ধা এবং ছোটদের ¯স্নেহ’- এ রীতি অনুসরণ করলে আর কোনো সমস্যা থাকে না। পোশাক-আশাক, আচার-আচরণে যাতে কেউ বিচলিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ ব্যাপারে ধর্মীয় যে বিধিবিধান রয়েছে তা অনুসরণীয়। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে রুচি থাকা দরকার। অগ্রজদের প্রতি ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, বাবা-মায়ের কথা না শোনা, শিক্ষকদের শ্রদ্ধা না করা এসবই বে-আদবির লক্ষণ। রুচিশীল মানুষ হতে গেলে এগুলো সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে। এই রুচি প্রতিটি ক্ষেত্রেই থাকতে হবে যেমন : খাওয়া-দাওয়ার পূর্বে হাত-মুখ ধোয়া, আদবের সঙ্গে খাবার গ্রহণ করা, সময়মত পড়াশোনা, খেলাধুলা ইত্যাদি।
ফ্যাশন-সচেতন হতে হবে সবাইকে। কিন্তু ফ্যাশন মানে উগ্রতা নয়, উচ্ছৃঙ্খলতা নয়, বে-আদবি নয়, অশ্লীলতা নয়, অহঙ্কার নয়, ঔদ্ধত্যতা নয়।
আপাতদৃষ্টিতে যা অসামাজিক ও অনৈতিক তা ফ্যাশন হিসেবে নেয়া যাবে না। এতে রুচিবোধ থাকাটা খুবই জরুরি। সুস্থ সমাজগঠনে রুচিবোধের বিকল্প কিছু নেই।

SHARE

Leave a Reply