Home বিজ্ঞান জগৎ টারান্টুলা নেবুলার গল্প -আহমদ বিন রফিক

টারান্টুলা নেবুলার গল্প -আহমদ বিন রফিক

তোমরা নিশ্চয়ই টারান্টুলা মাকড়সার কথা শুনেছো। মৌমাছির কামড় খেতে যারা ভয় পায় তারা এই প্রাণীটি থেকে ১০০ হাত দূরে থাকে। তবে আমরা আজকে মাকড়সার গল্প শুনবো না, শুনবো একটি নেবুলার গল্প। নেবুলা কাকে বলে? নেবুলা শব্দের বাংলা অর্থ নীহারিকা। ইংরেজি নেবুলা শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ থেকে। এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে ‘মেঘ’। এই নেবুলারা হচ্ছে নতুন নক্ষত্র তৈরির কারখানা।
নেবুলাতে থাকে প্রচুর পরিমাণ ধূলিকণা, হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামসহ বিভিন্ন আয়নিত গ্যাস। অধিকাংশ নেবুলাই আকারে বেশ বড় হয়। এদের ব্যাস হয় কয়েক শ’ আলোকবর্ষ পর্যন্ত। এক আলোকবর্ষ কাকে বলে, জানো? আলো এক বছরের যে পথ অতিক্রম করে তাকে এক আলোকবর্ষ বলে। আলো এক সেকেন্ডেই যায় ১ লাখ ৮৬ হাজার মাইল। তাহলে এক বছরে কত দূর যাবে ভাবো একবার। তাহলে এক একটি নেবুলা কত বিশাল, চিন্তা করো দেখ। তবে মহাবিশ্বে এদের চেয়েও অনেক অনেক বড় বস্তু আছে। সেই গল্প না হয় আমরা অন্য সময় করবো।
তবে আকারে বড় হলেও নেবুলাদের ঘনত্ব খুব কম। অর্থাৎ, অনেক বেশি জায়গায় খুব সামান্য পরিমাণ বস্তু থাকে। যেমন পৃথিবীর সমান জায়গায় নেবুলার কিছু অংশ এনে রেখে দিলে এর ভর মাত্র কয়েক কিলোগ্রাম হবে। অবাক লাগছে, তাই না? নেবুলারা কয়েক রকম হতে পারে। নক্ষত্র মধ্যবর্তী গ্যাস মহাকর্ষের কারণে একত্রিত হয়ে গড়ে উঠতে পারে নেবুলা। আবার একটি নক্ষত্রের জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে এর বাইরের অংশ মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও নেবুলা তৈরি হতে পারে, যা থেকে পুনরায় নতুন নক্ষত্র সৃষ্টি হতে পারে।
টারান্টুলা নেবুলা পৃথিবী থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। একটি বিষয় ভেবে দেখেছো? আমরা কোন কিছু দেখি যখন এটি থেকে আলো এসে আমাদের চোখে পড়ে। তাহলে এই নেবুলাটি থেকে আলো আমাদের চোখে এসে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে? নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছো। হ্যাঁ, ১ লাখ ৬০ হাজার বছর। তার মানে একে যদি আমরা এখন টেলিস্কোপ দিয়ে দেখি, আসলে আমরা দেখবো নেবুলাটি ১ লাখ ৬০ হাজার বছর আগে কেমন ছিল সেটি। হতে পারে এখন সেখানে নক্ষত্র তৈরি হয়ে গেছে। অতীতের ঘটনা এখন দেখা- মজার ব্যাপার, তাই না?

প্রথমে টারান্টুলা নেবুলাকে নক্ষত্র মনে করা হতো। পরে ১৭৫১ সালে ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলা লা কালাই প্রথম বুঝতে পারলেন, এটি আসলে নেবুলা। একে অবশ্য খালি চোখে দেখা যায় না। তবু প্রায় একই রকম দূরত্বে থাকা বস্তুদের তুলনায় এটি বেশ উজ্জ্বল দেখায়। এর কারণ হচ্ছে নেবুলাটির দীপ্তি তথা প্রকৃত উজ্জ্বলতা খুব বেশি। প্রকৃতপক্ষে এর দীপ্তি এতটাই বেশি যে এটি যদি ওরিয়ন নেবুলার মত এত কাছে থাকতো তবে রাতের বেলায় এর কারণে আমাদের ছায়া তৈরি হতো! ওরিওন নেবুলা হচ্ছে মাত্র ১৩৫০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি নেবুলা। রাতের আকাশে আদম সুরতের মাঝে এর অবস্থান।
শুধু দীপ্তিতেই নয়, নক্ষত্র জন্ম দানের ব্যাপারেও নেবুলাটি অনেক এগিয়ে। তোমরা জানো, আমাদের সূর্যসহ আরো এ রকম প্রায় ২০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন তারকা নিয়ে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি গঠিত। মিল্কিওয়েসহ মোট ৫৪টি গ্যালাক্সিকে একত্রে বলা হয় লোকাল গ্রুপ। আর টারান্টুলা নেবুলায় এত বেশি তারকা তৈরি হয় যা লোকাল গ্রুপের আর কোথাও হয় না। আকারেও এটি কোন অংশে কম নয়। এর এক পাশ থেকে অপর পাশের দূরত্ব ৬১ আলোকবর্ষ। তাহলে এর এক প্রান্তে কী হচ্ছে তা অপর পাশে বসে জানতেও ৬১ বছর বসে থাকতে হবে।
পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধের আকাশে দৃশ্যমান একটি উজ্জ্বল গ্যালাক্সির নাম লার্জ ম্যাজেলানিক ক্লাউড। এই গ্যালাক্সিটিতেই টারান্টুলার বাস। নেবুলাটি নক্ষত্রের প্রধান প্রান্তে অবস্থিত যেখানে আন্তঃনাক্ষত্রিক পদার্থের সঙ্কোচন খুব জোরালো।
এনজিসি ২০৭০ নামক কতগুলো নক্ষত্রের সমাবেশের মাঝে নেবুলাটির কেন্দ্র অবস্থিত। এ অঞ্চলেই আবার জ১৩৬ নামক এক গুচ্ছ তারকা রয়েছে। মূলত এদের কারণেই নেবুলাটিকে উজ্জ্বল দেখায়। আরো জেনে রাখতে পারো, এখন পর্যন্ত জানা মতে ভারী তারকাদের মধ্যে এক নম্বরে থাকা তারকার নাম জ১৩৬ধ১। তোমার বুদ্ধি তোমাকে এতক্ষণে বলে দিয়েছে, এই নক্ষত্রটিও এই নেবুলা থেকে সৃষ্ট।
তারকার এই গুচ্ছটির একারই ভর সূর্যের ৪ লাখ ৫০ হাজার গুণ। তাহলে কী সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, বলতো! আমরা জানি, সূর্য একটি সাধারণ ভরের তারকা। এর চেয়ে বড় ও ছোট ভরের নক্ষত্র আছে। ফলে সূর্যের ভর সব নক্ষত্রের গড় ভরের প্রায় সমান। তাহলে বলা চলে, কম করে হলেও ৪ লাখ নক্ষত্র এই নেবুলার মাত্র একটি অংশ থেকেই তৈরি হওয়া সম্ভব। হয়তো এত দিনেও হয়ে গেছে। দূরে থাকায় আমরা জানি না। কেন জানি নাÑ তোমরা ইতোমধ্যে জেনেছো।
জ১৩৬ধ১ ছাড়াও নেবুলাটিতে আরো অনেক স্টার ক্লাস্টার বা নক্ষত্রগুচ্ছের বাস রয়েছে। এদের মধ্যে একটি হচ্ছে হজ ৩০১। এই গুচ্ছের অধিকাংশ ভারী নক্ষত্র এদের সব জ্বালানি শেষ করে সুপারনোভা হয়ে বিস্ফোরিত হয়েছে। তুমি হয়ত জানো, একটি নক্ষত্রের জ্বালানি হচ্ছে হাইড্রোজেন গ্যাস যা নিউক্লিয়বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত হিলিয়ামে পরিণত হয়। সূর্যে এই ঘটনা ঘটার কারণেই আমরা আলো ও তাপ পাচ্ছি।
সুপারনোভা বিস্ফোরণের সময় অনেক বেশি উজ্জ্বলতার সৃষ্টি হয়। এই উজ্জ্বলতা অনেক সময় একটি গ্যালাক্সির সমগ্র উজ্জ্বলতাকেও ছাড়িয়ে যায়। পৃথিবী থেকে টেলিস্কোপের মাধ্যমে দেখা সবচেয়ে কাছের সুপারনোভা বিস্ফোরণও ঘটেছে এই টারান্টুলা নেবুলারই এক প্রান্তে। ১৯৮৭ সালের এই সুপারনোভা বিস্ফোরণ সহজেই খালি চোখে দেখা গিয়েছিল। সুপারনোভা গবেষণায় অগ্রগতির পেছনে এটির ভূমিকা ছিল খুব বেশি।
বুঝতেই পারছো নেবুলাটিতে তারকাদের ধ্বংসাবশেষ খুব বেশি পরিমাণে আছে। সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে বাইরে ছুঁড়ে দেয়া পদার্থগুলোকেই আমরা ধ্বংসাবশেষ বলছি। আগেই জেনেছো, এই ধ্বংসাবশেষ নেবুলার অন্যতম উৎস। নেবুলাটিতে থাকা তারকাদের আরেকটি গুচ্ছের নাম এনজিসি ২০৬০। এই গুচ্ছেরও চারপাশে একটি সুপারনোভার ধ্বংসাবশেষ রয়েছে।
আজ এ পর্যন্তই। অন্য কোন দিন অন্য কোন নেবুলার গল্প শুনবো, কেমন? ইনশাআল্লাহ।

SHARE

Leave a Reply