Home প্রবন্ধ শিশু-কিশোর পরিচর্যার গুরুত্ব -মির্জা মুহাম্মদ নূরুন্নবী নূর

শিশু-কিশোর পরিচর্যার গুরুত্ব -মির্জা মুহাম্মদ নূরুন্নবী নূর

মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জাতি। দুনিয়ার সকল সৃষ্টিই মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে অগণিত নিয়ামত দান করে ধন্য করেছেন। করেছেন সম্মানিত। অগণিত নিয়ামতসমূহের মধ্যে অন্যতম বিশেষ নিয়ামত হচ্ছে আদর্শ সন্তান, যা আল্লাহ তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহের ফল। আমরা আলোচ্য নিবন্ধে সন্তানের পরিচর্যায় ইসলামের দিকনির্দেশনা বা গুরুত্ব নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
সন্তান আল্লাহ তায়ালার দেয়া বিশেষ নিয়ামত। তাই এ সন্তান যদি হয় আদর্শ এবং সৎচরিত্রের অধিকারী তবে তা হবে পিতা-মাতার জন্য দুনিয়া এবং আখিরাতে কল্যাণের মাধ্যম। আর যদি সন্তান হয় অসৎচরিত্রের অধিকারী তাহলে এটি হবে অকল্যাণের বিষধর হাতিয়ার। সৎসন্তানের সুফল মৃত্যুর পরও ভোগ করা যায়। যেমন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন তার যাবতীয় আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিন প্রকার আমলের ফলাফল সে ভোগ করে। তার মধ্যে একটি হলো, এমন সচ্চরিত্রবান সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে। তাই আমাদের উচিত সন্তানকে সৎ এবং চরিত্রবান হিসেবে গড়ে তোলা।
বিশ্বমানবতার মহান শিক্ষক, আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) শিশুদেরকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। গভীর মায়ার আদরে শিশুদেরকে কাছে টেনে নিতেন একান্ত আপনার করে। আল্লাহর ভালোবাসা যেমন সর্বজনীন ঠিক তেমনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর অকৃত্রিম ভালোবাসাও ছিলো সর্বজনীন। হাদিসে এসেছে, একবার রাসূলুল্লাহ (সা) এর কানে হুসাইন (রা) এর কান্নার শব্দ এলো। এতে তিনি ভীষণভাবে ব্যথিত হলেন এবং হযরত ফাতিমাকে (রা) ডেকে বললেন, তুমি কি জান না, তার কান্না আমাকে কষ্ট দেয়? হযরত আনাস (রা) হতে বর্ণিত এক হাদিস থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ (সা) শিশু-কিশোরদের নিকট দিয়ে যাতায়াতের সময় তাদেরকে সালাম করতেন। অপর এক হাদিস থেকে আরো জানা যায় যে, তিনি শিশুদের কান্না শুনতে পেলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করে দিতেন এবং বলতেন, আমি চাই না যে, তার মায়ের কষ্ট হোক। তিনি আরো বলেন, যারা বড়দের সম্মান করে না এবং ছোটদের আদর করে না তারা আমার উম্মতের দলভুক্ত নয়। শিশুদের সাথে অসৎ ব্যবহার করা নিষেধ। তাদের মনে কষ্ট দেয়া যাবে না। তারা প্রস্ফুটিত ফুল।

শিশুদের চরিত্রগঠনে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
আজকের শিশুরাই আগামী দিনের কর্ণধার। আদর্শিক পরিবার, দেশ ও জাতি গঠন করতে হলে শিশুদের চরিত্রগঠনে মনোযোগী হতে হবে। শিশুদেরকে আদর্শ ও চরিত্রবান করে গড়ে তুলতে না পারলে আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে যথাযথ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে না। তাই কুরআন ও হাদিসেও শিশুদের চরিত্রগঠনের ব্যাপারে জোর তাকিদ দেয়া হয়েছে।
শিশুদেরকে উত্তম চরিত্রের প্রতি আগ্রহী করে গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা করতে বলা হয়েছে। অসৎ চরিত্রের প্রতি তাদেরকে ঘৃণার মনোভাব জাগাতে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে পিতা-মাতাকে। তাই শিশুদের মাঝে আল্লাহ, রাসূল, কুরআন, হাদিস, পরকালে বিশ্বাস, জান্নাত-জাহান্নামের প্রতি আস্থা তৈরি তথা ইসলামী আদর্শের প্রতি যতœশীল মনোভাব গড়ে তুলতে সচেষ্ট হতে হবে। অন্য দিকে অহঙ্কার মিথ্যা, ধোঁকাবাজি, গিবত, হিংসা বিদ্বেষসহ খারাপ আদর্শের প্রতি বিরূপ মনোভাব গড়তে চেষ্টা করতে হবে। সন্তানের চরিত্রগঠনের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, কারো সন্তান জন্মগ্রহণ করলে সে যেন তার জন্য সুন্দর নাম রাখে এবং উত্তমরূপে তাকে আদব কায়দা, শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়।
সন্তানের চরিত্রগঠনের গুরুত্ব বুঝতে হলে হযরত লুকমান (আ)-এর সন্তানের প্রতি অভিভাবকের নসিহত বা উপদেশসমূহ জানতে হবে। তার নির্দেশিত উপদেশবাণী প্রতিটি পিতা-মাতার জন্য জানা থাকা জরুরি। সন্তানের চরিত্রগঠনের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, পিতা-মাতা সন্তানকে ভালো আদব কায়দা ও স্বভাব চরিত্র শিক্ষাদান অপেক্ষা উত্তম কোন দান দিতে পারে না। আলোচ্য সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থেকে সন্তান পরিপালনের দিকনির্দেশনা বিষয়ে জানতে পারলাম। তাই সন্তানকে আদর্শ ও চরিত্রবান করে গড়ে তুলতে ইসলামী আদর্শের সংস্পর্শে আশা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করি।
শিশুর নিরাপত্তায় ইসলাম
শিশুদের নিরাপত্তাবিধান এবং তাদের সার্বিক বিকাশসাধনে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত পরিষ্কার। শান্তি বা যুদ্ধ যে কোন অবস্থায় ইসলাম শিশুদের নিরাপত্তা প্রদানে গুরুত্বারোপ করেছে। কাজেই পিতা-মাতা কোন অবস্থাতেই সন্তানকে হত্যা করতে পারে না। সন্তানের কোনো প্রকার ক্ষতি হয় এরকম কোন কাজ পিতা-মাতাসহ কারো জন্যই ইসলামসম্মত নয়। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে দারিদ্র্যের ভয়ে হত্যা করো না। তাদেরকে আমিই রিজিক দেই এবং তোমাদেরকেও। তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ। (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৩১)
প্রতিটি মানুষ তার পরিবার রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল। তাকে এ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের শান্তি, স্বস্তি এবং নিরাপত্তার জন্য পরিবার একটি দুর্গ। এ পরিবেশ ঠিক রাখতে হলে সন্তানকে আদর্শবান করে তোলার বিকল্প কিছুই নেই। তাই সন্তান পরিপালনে আমাদের আরো যত্নশীল হওয়া জরুরি।

সন্তানের চরিত্রগঠনে মায়ের ভূমিকা
সন্তানের চরিত্রগঠনে সবচেয়ে বেশি এবং গুরুত্বপূর্ণ অভিভাবকের গুরু দায়িত্ব যিনি পালন করেন তিনি হচ্ছেন মা। মায়ের আদর সোহাগ এবং পরম ভালোবাসায় বেড়ে ওঠে নবজাতক শিশুটি। শিশুর সুখ, দুঃখ, হাসি-কান্না সব ক্ষেত্রেই মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি। আমরা আরবি কবিতায় পড়েছিলাম ‘হিযনুল উম্মাহাত আল মাদরাসাতু লিল বানিনা ওয়াল বানাত’। অর্থাৎ মায়ের কোলই হচ্ছে শিশুদের শিক্ষাকেন্দ্র। তাই যে মায়ের আদর্শে গড়ে উঠবে সন্তান সে মাকে কেমন আদর্শ ও চরিত্রবান হওয়া দরকার! মেয়েরা যদি আদর্শ এবং চরিত্রবান হিসেবে গড়ে ওঠে তাহলে তারা জাতিগঠনে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখতে পারবেন। তাইতো নেপোলিয়ন বলেছিলেন, তোমরা আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও আমি তোমাদেরকে শিক্ষিত জাতি উপহার দেবো। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, দেশ এবং জাতিগঠনে আদর্শ সন্তান গড়ে তোলার বিকল্প নেই। আমরা যেন সে ভূমিকা পালনে যত্নশীল হই।

আমাদের আরো সচেতন হতে হবে। আমাদের নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে আদর্শ ও চরিত্রবান করে। নইলে ঘোর অমানিশায় হারিয়ে ফেলবো আমাদের ইতিহাস, আমাদের ঐতিহ্য। তাই আসুন আরো সতর্ক হই, সাবধান হই আমরা সকলেই। দেশ, জাতি এবং মানবতার কল্যাণে ভূমিকা রাখি একান্ত আপনার করে। গড়ে তুলি সুন্দর একটি প্রজন্ম। স্বপ্নিল সোনার দেশ গড়তে আমাদের পথচলা হোক আরো শানিত। আরো বেগবান।

SHARE

Leave a Reply