Home ধারাবাহিক: দুর্গম পথের যাত্রি দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ

দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ

গত সংখ্যার পর

আশপাশের মুজাহিদরা এসে জড়ো হলো হারেস বিন আকরামার কাছে। তিনি আবারও তার কথার পুনরুক্তি করলেন। বললেন, রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী এখন সেনাপতি নির্বাচনের দায়িত্ব তোমাদের। বলো, আমি এই পতাকা কার হাতে তুলে দেবো?
উপস্থিত মুজাহিদরা দেখলো একটু দূরে দাঁড়িয়ে সঙ্গীদের নিয়ে তখনো লড়াই করে যাচ্ছেন নওমুসলিম খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা)। কেউ একজন বলল, ওইতো খালিদ! এ দায়িত্ব তাঁকেই দেয়া যায়। সবাই বলল, হ্যাঁ, খালিদের চেয়ে যোগ্যতর আর কেউ নেই এখানে। খালিদকে ডাকা হলো। তিনি এলে হারেস বিন আকরামা বললেন, ‘খালিদ, এইমাত্র সেনাপতি আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা শাহাদাত বরণ করেছেন। রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী এখন আমাদের নিজেদেরই নেতা নির্বাচন করতে হবে। উপস্থিত সবার দাবি এ দায়িত্ব তুমি গ্রহণ করো।’
‘না না, একি বলছেন আপনি!’ বিস্মিত খালিদ (রা) বললেন, ‘এ কাজের যোগ্য আমি নই। আপনারা যোগ্যতর অন্য কাউকে এ দায়িত্ব অর্পণ করুন।’
চারদিক থেকে প্রবল আপত্তি উঠলো। কারণ মুজাহদিরা ভালো করেই জানতো খালিদ (রা)-এর বংশ ইতিহাস। যুগ যুগ ধরে তার বংশই আরবে সেনাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছে। মুসলমান ও কাফেরের সাথে বিগত যুদ্ধেও তিনিই ছিলেন কাফেরদের অন্যতম সেনাপতি। তিনি দল বদল করেছেন। এতদিন ছিলেন মিথ্যার রক্ষক, এখন সত্যের সৈনিক। সেনাপতির দায়িত্ব তাকেই মানায়।
যুদ্ধের গতি কিছুটা থেমে গিয়েছিল। মুজাহিদরা এসে ভিড় করছিল নেতা নির্বাচনের জটলায়। প্রতিপক্ষ বুঝতে পারছিল না এটা আবার কোন চাল। তাই তারা এগিয়ে এসে হামলা করেনি। চারদিকে খালিদ খালিদ রব গুঞ্জরিত হচ্ছিল। সবাই আমাদের সেনাপতি খালিদ বলে ধ্বনি দিচ্ছিল। ভাবনায় পড়ে গেলেন খালিদ (রা)। মুসলমানরা সেনাপতিহীন অবস্থায় আছে বুঝতে পারলে দুশমনরা জোরালো হামলা করে বসতে পারে। তাতে বড় রকমের বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে। অগত্যা সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে খালিদ (রা) নিজ হাতে পতাকা তুলে নিলেন।
গাসসানরা যুদ্ধ করছিল বটে, কিন্তু মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে আগ্রহী ছিল না। মুসলমানদের মরণপণ ভঙ্গি দেখে তারা কিছুটা পিছিয়ে গিয়েছিল। এক জটিল পরিস্থিতিতে যুদ্ধের দায়িত্ব নিলেন খালিদ (রা)। তিন হাজার মুজাহিদের অনেকেই তখন শহীদ হয়ে গেছে। যারা বেঁচে আছে তারাও অধিকাংশই আহত। মদিনা থেকে এত দূরে যে, সাহায্য পাওয়ারও কোন আশা নেই। এ অবস্থায় যে কজন বেঁচে আছে তাদেরকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে পরাজয়ের গ্লানি বহন করা অথবা যুদ্ধ অমীমাংসিত রেখে সরে পড়া কোনটা মঙ্গলজনক? মুসলমানরা যদি এখন পিছু হটে তবে গাসসানরা তাদের ধাওয়া করে নিঃশেষ করে দেবে। মুসলমানদের নিরাপদ করার একটাই পথ, গাসসানদের মনোবল ভেঙে দেয়া এবং তাদের ছত্রভঙ্গ করে ফেলা। খালিদ (রা) তাই করলেন। একদল জানবাজ সঙ্গীকে বাছাই করলেন তিনি। তাদেরকে বুঝিয়ে বললেন তাঁর পরিকল্পনার কথা। এরপর পতাকা হাতে তীব্রগতিতে গিয়ে আঘাত হানলেন গাসসানদের ওপর। মুজাহিদরা সেনাপতিকে তুমুল আক্রমণ করতে দেখে তারাও উজ্জীবিত হলো। তারাও তীর বর্ষণ করতে করতে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলল। গাসসানদের চোখের সামনে মৃত্যুর ভয়াল বিভীষিকা নেমে এলো। তারা ডানে, বায়ে, সামনে তীরের বদলে দেখতে পেল উন্মুক্ত তরবারির ঝলক। এই অভাবিত আক্রমণে হতবিহবল গাসসান সৈন্যরা সেনাপতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পালাতে শুরু করলো। যখন খালিদ (রা) বুঝতে পারলেন, গাসসানদের মনে তিনি ভীতি সৃষ্টি করতে পেরেছেন তখনই তিনি তার মূল পরিকল্পনায় ফিরে এলেন। তিনি যুদ্ধের তীব্রতা কমিয়ে মুজাহিদদের সংহত ও একত্রিত করলেন। সামনের মুজাহিদদেরকে সারিবদ্ধভাবে এমন করে দাঁড় করালেন যেন তারা গাসসানদের পলায়ন দৃশ্য দেখার জন্যই সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। মুসলমানদের এভাবে সারিবদ্ধ দেখে গাসসানদের ভীতি আরো বেড়ে গেল এবং যারা একটু সাহসী এবং যুদ্ধ করার কথা চিন্তা করছিল তারাও পালাতে শুরু করলো। খালিদ (রা) সামনের সারি অটুট রেখে পেছন থেকে মুসলমানদের পিছু হটার নির্দেশ দিলেন। ময়দান যখন বেশ ফাঁকা হয়ে গেল তখন তিনিও সামনের সারির মুজাহিদদের নিয়ে পেছনে সরে এলেন। এর ফলে মুসলমানদের পিছু ধাওয়া করার চিন্তাও এলো না গাসসানদের মনে। বরং মুসলমানরা আবার কখন তাদের ওপর অতর্কিতে হামলা করে বসে এই আশঙ্কায় ছিল তারা পেরেশান। এভাবেই অবশিষ্ট মুজাহিদদের একত্রিত করে যুদ্ধের ময়দান থেকে সরে এলেন খালিদ (রা) এবং বাহিনীকে মদিনার দিকে যাত্রা করার নির্দেশ দিলেন। এভাবেই অমীমাংসিত অবস্থায় শেষ হয়ে গেল লড়াই।
খালিদ (রা) যখন আহত ও রণক্লান্ত মুজাহিদদের নিয়ে মদিনায় এলেন তার আগেই মদিনায় এ খবর পৌঁছে গিয়েছিল যে, মুসলিম বাহিনী ফিরে আসছে। তারা এ খবরও পেল, যে উদ্দেশ্যে তারা অভিযানে গিয়েছিল সে উদ্দেশ্য পূরণ না করেই ফিরে আসছে মুজাহিদরা। ফলে মুসলমানদের মন আনন্দের পরিবর্তে বিষাদে ভরে গিয়েছিল। তারা মুজাহিদদের অভ্যর্থনা না জানিয়ে বরং তাদের ধিক্কার জানাতে লাগলো। তারা তাদের তিরস্কার করে বলতে লাগলো, তোমরা ময়দান থেকে পালিয়ে এসেছো?
খালিদ (রা) রাসূলে করিমের সামনে হাজির হয়ে যুদ্ধের আদ্যোপান্ত বর্ণনা করলেন। তিনি যখন রাসূল (সা)কে জানাচ্ছিলেন মুজাহিদদের অসম সাহসিকতা ও বীরত্বের কথা, পর পর তিনজন সেনাপতির শাহাদতের কথা, তখন বাইরে লোকজন জমায়েত হচ্ছিল এবং তারা ফিরে আসা বাহিনীকে ক্রমাগত ধিক্কার জানাচ্ছিল।
সব শুনে রাসূল (সা) খালিদ (রা)কে নিয়ে বাইরে এলেন। ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম, ওয়াকেদি ও মাগাজি সেই সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, তিনি বাইরে এসে সমবেত জনতাকে হাত ইশারায় থামতে বললেন। মুখে বললেন, তোমরা চুপ করো। রাসূলের ইঙ্গিতে সবাই চুপ করলে তিনি বললেন, এ ব্যক্তি যুদ্ধের ময়দান থেকে পালানোর লোক নন। সে দ্বীনের জন্য বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেই ফিরে এসেছে এবং আগামীতেও তোমরা তাকে যুদ্ধের ময়দানে দেখতে পাবে। তার সাহসিকতা ও বীরত্ব একদিন ইতিহাস হবে। সে তো কোনো সাধারণ যোদ্ধা নয়, সে হচ্ছে আল্লাহর তলোয়ার, সাইফুল্লাহ। সেদিন থেকেই খালিদ (রা)-এর নাম হয়ে গেল সাইফুল্লাহ, মানে আল্লাহর তলোয়ার।

আবু সুফিয়ান। কোরাইশ সরদার। প্রিয় নবী মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করায় তিনি স্বস্তির নিঃশ^াস ফেলেছিলেন। প্রকাশ্যেই তিনি বলতেন, আরে মুহাম্মদের কথা বলছো? ও তো পালিয়েছে। আমাদের মাথার ওপর থেকে আপদ গেছে। তিনি মুসলমানদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন আর বলতেন, কয়টা দিন যেতে দাও, দেখবে মুহাম্মদের পাগলামি আপনাতেই থেমে গেছে। কিন্তু তিনি জানতেন না, তার এ স্বস্তি বেশিদিন টিকবে না। যখন খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) ইসলামে শামিল হলেন তখন তার মনে ভীতির উদ্রেক হলো। তিনি উপলব্ধি করলেন, তার ডান বাহু ভেঙে গেছে। যুগ যুগ ধরে যে বংশ আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছিল সেই বংশের শ্রেষ্ঠ হীরকখন্ডটি এখন মুহাম্মদের হাতে। আকরামা আর সাফওয়ানই এখন তার একমাত্র ভরসা। তিনি যুদ্ধের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। আগের সে জৌলুস ও দাপট যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। মক্কার সরদার হওয়ার পরও তিনি হয়ে পড়েছিলেন ¤্রয়িমাণ। লোকজন তাকে সরদার হিসেবে মান্য করতো ঠিকই, তবে আগের সে সমীহ ও শ্রদ্ধাবোধে বেশ ঘাটতি অনুভব করতেন তিনি। শুধু খালিদ নয়, উসমান বিন তালহা, উমর বিন আসের মতো প্রসিদ্ধ যোদ্ধাও মুসলমানের দলে নাম লিখিয়েছে। একদা এরাই ছিল তার বাহিনীর মূল্যবান সম্পদ। এসবই ছিল তার দুশ্চিন্তার কারণ। তিনি দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছিলেন, কোরাইশদের সামরিক শক্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
একদিন তার স্ত্রী হিন্দা তাকে বলল, তুমি তো দেখছি একেবারেই কাপুরুষ হয়ে গেছো আবু সুফিয়ান। তুমি যেভাবে মদিনাবাসীদের সময় ও সুযোগ দিচ্ছো তাতে ক্রমেই তারা আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তাদের দল ভারী হবে, সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং একদিন দেখবে, তারা মক্কায় এসে মক্কার ইট দিয়ে ইট ভাঙবে।
‘আমার সঙ্গে আর থাকলোই বা কে হিন্দা।’ নিরাশ কণ্ঠে আবু সুফিয়ান বলল, ‘খালিদ, উসমান, উমরের মতো যোদ্ধারা সব চলে গেছে মুসলমানের দলে। এখন আমার হয়ে কে লড়বে?’
আবু সুফিয়ানের কথা শুনে তেলেবেগুনে জ¦লে উঠলো হিন্দা। তোমার মত লোককে আমার স্বামী বলে পরিচয় দিতেও লজ্জা হচ্ছে। যে আপনজনদের খুনের বদলা নেয়ার সাহস ও হিম্মত হারিয়ে ফেলে তাকে কাপুরুষ ছাড়া আর কী বলে ডাকবো? ধিক তোমার পৌরুষত্বে, ধিক তোমার সেনাপতিত্বে। তুমি না মক্কার সরদার! এ কথা বলতে তোমার লজ্জা হলো না?’
‘না হিন্দা, আমি কাপুরুষও নই, ভিতুও নই। বংশের জন্য জীবন দেয়া নেয়াতেও আমার আপত্তি নেই। প্রয়োজনে কাউকে হত্যা করতে যেমন বাধবে না আমার তেমনি লড়াইয়ের ময়দানে নিহত হলেও আফসোস থাকবে না। মদিনা আক্রমণে আমার আগ্রহ নেই, বিষয়টা এমনও নয়। কিন্তু আমার কেবলই মনে হচ্ছে আমি চালে ভুল করে ফেলেছি। মনে আছে তোমার, হোদায়বিয়াতে মুসলমানদেরকে অপমানজনক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেছিলাম? মুসলমানরা মক্কায় প্রবেশ করতে না পেরে মাথা নিচু করে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল। বিজয়ের গর্বে আমরা ছিলাম গর্বিত। মক্কাবাসী এ জন্য আমাকে বিপুলভাবে সংবর্ধিত করেছিল। আজ মনে হয়, সেদিন জিত আমাদের নয়, মুসলমানদের হয়েছিল। হোদায়বিয়ার চুক্তিতে আমরা অঙ্গীকার করেছিলাম, আগামী দশ বছর আমরা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করবো না। তোমার মত আমিও দেখতে পাচ্ছি, মুসলমানের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে তারা। দশ বছর পর তাদের শক্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আন্দাজ করা কঠিন। তাদের অগ্রযাত্রা থামাতে হলে এখনই বাধা দেয়া উচিত। হামলা করে গুঁড়িয়ে দেয়া উচিত তাদের শক্তির দুর্গ। কিন্তু এটা করলে সারা দুনিয়া, এমনকি আরবের অন্যান্য গোত্রও আমাকে চুক্তিভঙ্গকারী বলে সাব্যস্ত করবে। ইতিহাসেও আমি চিহ্নিত হবো একজন চুক্তিভঙ্গকারী হিসেবে। তুমি কি চাও আমি এই বদনামের বোঝা মাথায় লই?’
‘সেনাপতিকে বুদ্ধিজীবী হলে চলে না। তাকে হতে হয় সাহসী আর কুশলী। প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বিজয় ছিনিয়ে আনাই সেনাপতির কাজ। আর ইতিহাসের কথা বলছো? ইতিহাস সব সময় বিজয়ীর পক্ষেই লেখা হয়।’
‘হিন্দা, আমি কেবল একজন সেনাপতিই নই, আমি মক্কার সরদার। সরদার হিসেবে মক্কার মানমর্যাদা, সম্ভ্রম রক্ষার কথাও চিন্তা করতে হয় আমার। ছলেবলে কৌশলে যুদ্ধে বিজয়ী হলেই বংশের আভিজাত্য ও গৌরব বৃদ্ধি পায় না। তখন সারা আরব আমাদের প্রতারক বলে অভিহিত করবে। বলবে, কোরাইশরা তো নিজের জবানের মূল্যও দিতে জানে না।’
‘আমি বুঝতে পারছি, তুমি মদিনা আক্রমণ করবে না। মক্কাবাসী মদিনা আক্রমণ করবে না। যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার হাজারটা বাহানা এখন তুমি তৈরি করতে পারবে। কিন্তু তোমার যদি ইচ্ছে থাকতো যুদ্ধ করার, আপনজনদের রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ করার, তবে কোন যুক্তিই তোমাকে আচ্ছন্ন করতে পারতো না। রক্তের বদলা নেয়া ছাড়া আর কোনো চিন্তা থাকতো না তোমার মাথায়। কাপুরুষের বাহানার অভাব হয় না।’
আবু সুফিয়ান আরো কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছিল, হিন্দা বলল, ‘থাক, থাক, আর সাফাই গাইতে হবে না। তুমি যুদ্ধ না করলে আমাকে অন্য পথ ধরতে হবে। মুসলমানদের বিনাশ ছাড়া আর কোনো চিন্তা নেই আমার মাথায়। প্রয়োজনে অন্য কোনো সম্প্রদায়কে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেবো আমি। যারা মুসলমানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চায় তাদের গোপনে সাহায্য করবো। মোটকথা, এর শেষ আমি দেখে ছাড়বো।’
‘কোরাইশ ছাড়া কে আছে যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে?’ বলল আবু সুফিয়ান, ‘মুতার যুদ্ধের খবর শোননি? রোমান স¤্রাট হারকিউলিসের নেতৃত্বে একলক্ষ খ্রিস্টান সেনা ও গাসসানদের একলক্ষ সেনার বিরুদ্ধে মাত্র তিন হাজার মুসলমান রুখে দাঁড়িয়েছিল। তাও কি তাদের পরাজিত করা সম্ভব হয়েছে? না, বরং সেখানে মুসলমানরা গাসসানদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে নিরাপদে মদিনা ফিরে গেছে। মুসলমানরা এতটাই মারমুখী যে, সৈন্য বল, অস্ত্র বল কিছুরই তারা তোয়াক্কা করে না।’
গোখরো সাপের মতো হিসহিস করে উঠলো হিন্দা, ‘আবু সুফিয়ান, তুমি ভুলে যেয়ো না আমি সেই নারী, যে ওহোদের ময়দানে হামজার বুক ফেঁড়ে কলিজা বের করে সেই কলিজা আমি চিবিয়ে খেয়েছিলাম। আমার বুকে যে আগুন জ¦লছে সেই আগুনকে তুমি কী দিয়ে নেভাবে?’
আবু সুফিয়ান বিদ্রƒপের হাসি হাসল। বলল, ‘হিন্দা, তুমি কেবল হামজার কলিজা খাওনি, তুমি সমগ্র মুসলিম জাতির কলিজা চিবিয়েছো। তোমাকে হাতের নাগালে পেলে প্রতিশোধ এবার মুসলমানরাই নেবে।’
‘তবু তুমি যুদ্ধ করবে না? মুসলমানদের বিরুদ্ধে তোমার কোনো ক্ষোভ নেই?’
‘ক্ষোভ নেই বলবো না। তবে সরদার হিসাবে আমি অবিবেচকের মত কোন সিদ্ধান্তও নেবো না। কিছুতেই আমি হোদায়বিয়ার চুক্তিভঙ্গের দায় কাঁধে নেবো না। এমনকি আমার সম্প্রদায়ের কাউকে আমি হঠকারী কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার অনুমতিও দেবো না।’
‘চুক্তি তো আমিও লঙ্ঘন করছি না।’ হিন্দা বলল, ‘তবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আমি অবশ্যই প্রতিশোধ নেবো, আর সে প্রতিশোধ হবে অতি ভয়াবহ। শুধু আমি না, কোরাইশ সম্প্রদায়ের মধ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার মত আরো অনেকেই আছে। তুমি দেখো আমরা কী করি।’
‘কী করতে চাও তুমি হিন্দা?’
‘অপেক্ষা করো, আমি কী করতে চাই তা তুমি অচিরেই দেখতে পাবে।’ নির্বিকার কণ্ঠে বলল হিন্দা।
এ ঘটনার কয়েক দিন পরের কথা। মক্কার অদূরে বাস করতো বনু বাকার ও বনু খাযায়া সম্প্রদায়। এদের মধ্যে ছিল বহু পুরাতন দ্বন্দ্ব ও সঙ্ঘাত। হোদায়বিয়ার সন্ধির সময় বনু বাকার কোরাইশদের পক্ষ নিলে বনু খাযায়া সম্প্রদায় মুসলমানদের পক্ষ নিলো। সন্ধিতে আগামী দশ বছর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করায় সবচে লাভবান হলো এ দু’টি সম্প্রদায়। চুক্তি অনুযায়ী বনু বাকার আক্রান্ত হলে তারা কোরাইশদের কাছে সাহায্য চাইতে পারবে আর খাযায়া আক্রান্ত হলে তারা সাহায্য চাইতে পারবে মুসলমানদের কাছে, কারণ তারাও চুক্তির অংশীদার ছিল। ফলে হোদায়বিয়ার সন্ধির কারণে তাদের দীর্ঘদিনের লড়াইও বন্ধ হয়ে গেল। এতে দুটি সম্প্রদায়ই স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সুযোগ পেল।
কিন্তু এ অবস্থা হঠাৎ একদিন বদলে গেল। কোন রকম উসকানি ছাড়াই হঠাৎ এক রাতে বনু বাকারের একদল লোক বনু খাযায়ার এক গ্রামে অতর্কিত আক্রমণ করে বসলো। কিন্তু কেন এই আক্রমণ, কেন বনু বাকার চুক্তি ভঙ্গ করলো অনেক অনুসন্ধান করেও তার কোনো কারণ জানা গেল না। বনু বাকারের লোকদের কথা, আমরা চুক্তি ভঙ্গ করিনি। আমরাতো শান্তিতেই ছিলাম, তাহলে আক্রমণ করতে যাবো কেন? বনু খাযায়ার কথা, শান্তিতে তো আমরাও ছিলাম, তোমরা আক্রমণ না করলে কে আমাদের ওপর আক্রমণ করবে? পরে জানা গেল, এটা ছিল হিন্দার চাল। সে টাকার বিনিময়ে বনু বাকারের একদল লোককে কিনে নিয়ে তাদের দ্বারা এই ঘটনা ঘটিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, এই দুই গোত্রের মধ্যে আবার লড়াই শুরু করিয়ে দিতে পারলে স্বাভাবিকভাবেই চুক্তি অনুযায়ী খাযায়া সম্প্রদায় মুসলমানদের সাহায্য চাইবে। মুসলমানরা তাদের সাহায্যে এগিয়ে এলে বনু বাকার সম্প্রদায়ের পক্ষে কোরাইশরা নামতে বাধ্য হবে। ফলে হোদায়বিয়ার সন্ধি অকার্যকর হয়ে পড়বে এবং আবু সুফিয়ান মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বাধ্য হবে।    (চলবে)

SHARE

Leave a Reply