Home স্বাস্থ্য কথা মওসুমি ফলের উপকারিতা -ড. জাহিদ হোসেন

মওসুমি ফলের উপকারিতা -ড. জাহিদ হোসেন

পরম করুণাময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের হাজারো নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তিনি নানান জাতের সুস্বাদু ও উপাদেয় ফল-মূল আমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতির ভিন্নতার কারণে নানান রঙের নানান স্বাদের ফলমূল পাওয়া যায়। ঋতু বৈচিত্র্যে, ভূমির উৎকর্ষতা, কতো নদীর ¯্রােতধারার পাশাপাশি মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে ধন্য করেছেন হাজারো রকমের ফলফলাদি দিয়ে। আবহমান কাল ধরে এ দেশের উর্বর ভূমি ভেদ করে বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন ফলফলাদি দিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তার রহমতের চাদরে ক্রমাগত আচ্ছাদিত করে রেখেছেন। বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি ঋতুতেই ভিন্ন ভিন্ন ফলমূল পাওয়া যায়। তবে গ্রীষ্মকাল হচ্ছে এ দেশের জন্য মধুমাস কেননা এ সময় নানান জাতের নানান বর্ণের, নানান স্বাদের ফলমূলের মধুময় মিষ্টি গন্ধে এ দেশের আকাশ বাতাস মৌ মৌ করে। গ্রীষ্মকালে আম, কাঁঠাল, লিচু, জাম, তরমুজ বাগানে এমনকি প্রায় প্রতিটি বাড়িই ছেয়ে যায়। এই সব ফল প্রতিটিই অত্যন্ত দানাদার, সুস্বাদু এবং উপাদেয়। এসব প্রত্যেকটি ফলই পুষ্টিগুণে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আমাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি বিভিন্ন রোগের প্রতিকারসহ সর্বোপরি মানুষের শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহের সকল উপাদানই আমরা এসকল ফলফলাদি থেকে পেয়ে থাকি। তবে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, কিডনিজনিত রোগ, বার্ধক্য প্রভৃতি কারণে এই সকল ফলফলাদি অনেকেই খেতে পারেন না। তাতে উপকারের  চেয়ে বরং ক্ষতি হওয়ারই আশঙ্কা থাকে। আবার অসাবধানতাবশত কিছু ফল বেশি খেলে সে ক্ষেত্রেও উল্টো খারাপ কিছু ঘটে যেতে পারে। বন্ধুরা আমাদের আজকের আলোচনা মধুমাসের রসময় ফলগুলো নিয়ে।
আম : ফলের রাজা আম। আম আমাদের দেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় ফল। শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সকলেই আম খেতে পছন্দ করে। আমের রস অত্যন্ত উপাদেয় ও পুষ্টিসমৃদ্ধ। কাঁচা আম খেতে টক স্বাদ। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি পাওয়া যায়। কাঁচা আমে ফসফরাস, জিংক ও আয়রন পাওয়া যায়। আমাদের দেশে কাঁচা আম সাথে লবণ মিশিয়ে খাওয়া হয়। আয়োডিনযুক্ত লবণ মিশিয়ে খেলে তা শরীরের আয়োডিনের অভাব পূরণে সহায়তা করবে। অনেক সময় কাঁচা আমে কাসুন্দি দিয়ে মাখিয়ে খাওয়া হয়, যা আমাদের হার্টকে ভালো রাখতে অবদান রাখে। আমের আচার খেতে সুস্বাদু এবং এতে ফসফেট, সাইট্রেট ও এসিটেট থাকে, যা শরীরের ক্ষয়পূরণে ও রুচি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। পাকা আমে প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট, গ্লুকোজ, ক্ষার এসিড, আয়োডিন, নিয়সিন, ফলিক এসিড, আয়রন, বিভিন্ন ইলেকট্রলাইট প্রভৃতি পাওয়া যায়। এগুলো আমাদের শরীরে শক্তির সঞ্চার করে শরীরে ইলেকট্রলাইট নিয়ন্ত্রণ করে। রুচি বাড়ায়, শরীরে সুগারের মাত্রা বাড়ায়, শরীরে আয়রনের মাত্রা বাড়ায়, হাড়ের গঠন ও বৃদ্ধিতে সহায়তা করে ও শরীরে অনেক রোগের প্রতিরোধ করে। পাকা আমের সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ আছে, যা রাতকানা রোগ, চোখের কর্নিয়ার আলসার ইত্যাদির জন্য উপকারী।
আমাদের দেশে প্রতি বছর বহু শিশু রাতকানা রোগে আক্রান্ত হয়ে জন্মায় যা প্রতিরোধের জন্য একমাত্র উপায় শরীরে ভিটামিন এ এর অভাব পূরণ করা। বেশি বেশি করে আম আমাদের প্রায় ৪০% ভিটামিন এ এর চাহিদা পূরণ করে। এ ছাড়া এ আমাদের ত্বককে সুস্থ ও সতেজ রাখে এবং প্রসূতিদের প্রজননসক্ষমতা বাড়ায়। আম আমাদের আঁশ জাতীয় খাদ্যের অন্যতম উৎস। আম ক্যান্সারে, ত্বকের ক্যান্সার ইত্যাদি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া আম আমাদের, এনিমিয়া, ট্রপিকল প্রভৃতি প্রতিকারেও ভূমিকা রাখে। তবে যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও কিডনি রোগ আছে তাদের পাকা আম বেশি খেলে তা অবশ্যই ক্ষতিকর। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে আম ক্ষেতে হবে।
লিচু : গ্রীষ্মকালের বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে লিচু। লিচু অত্যন্ত স্বল্প সময়ের ফল। লিচু অতীব সুস্বাদু, রসালো ও উপাদেয় ফল। সকল বয়সের মানুষের কাছেই লিচুর প্রতি বাড়তি আকর্ষণ রয়েছে। লিচু একটি স্বাস্থ্যপ্রদ ফল। এ ফলে প্রচুর পরিমাণে ফ্রুটোজ, গ্লুকোজ, পটাসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, জিংকসহ আরো অনেক উপকারী পদার্থ থাকে। ফ্রুক্টোজ বেশি থাকার কারণে এ ফল পুরুষের ফিমেনের কোয়ালিটেটিভ ইমপ্রুভমেন্ট করে। জিংক আবার শিশুদের হাড়ের ও মাসল বৃদ্ধি ঘটায়। শিশুদের মানসিক উন্নয়নের জিংকের অবদান অনেক। লিচু সন্তানের শারীরিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। লিচুতে থাকা গ্লুকোজ শরীরের ক্লান্তি দূর করে। তবে লিচু খাওয়ার সময় খুব সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কেউ যদি অনেক লিচু একসাথে খেয়ে ফেলে তবে তাকে বিপদে পড়তে হতে পারে। কেননা লিচুতে তুলনামূলক অধিক পরিমাণে জৈব এসিড ও জৈব লবণ  থাকে যা মাঝে মাঝে আমাদের অনেক সমস্যারও কারণ হতে পারে।
আমাদের দেশে গ্রামে-গঞ্জে এরকম পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য ডাক্তার নেই বললেই চলে। সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত লিচু খাওয়াই এই ক্ষতির কারণ হবে। আবার অনেকে বিশেষ করে ছোট বাচ্চারা সকালবেলা খালি পেটে লিচু খেয়ে ফেলে যা বিপজ্জনক কাজ। সে ক্ষেত্রেও উপরিউক্ত সমস্যাগুলো হতে পারে।
কাঁঠাল : কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল। বাংলাদেশের সর্বত্র কাঁঠাল পাওয়া যায়। এ দেশের মানুষের প্রিয় ফলের তালিকায় কাঁঠাল অন্যতম একটি  ফল। কাঁঠাল কাঁচা অবস্থায় রান্না করে খাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে কাঁচা কাঁঠালের গুণাগুণ পাওয়া যায়। কাঁচা কাঁঠালে এসিড, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন বি৩, ভিটামিন, বি১, কিউকোলিক অ্যাসিডসহ আরো অনেক পদার্থ থাকে। আমাদের শরীরে পুষ্টি সরবরাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা  রাখে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে আমরা অনেকে কাঁচা কাঁঠালের উপকারিতার  গুরুত্ব এমনকি কাঁচা কাঁঠাল খাওয়ার প্রক্রিয়াও অনেকের জানা নেই।
পাকা কাঁঠাল ভিটামিন এ এর প্রধান উৎস। এতে আছে গ্লুকোজ, পলিম্যান, ফসফেট, আ্যামাইনো এসিডসহ আরো  অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যেগুলো আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধে এবং শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধিতে ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তরমুজ : শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং তরমুজ হচ্ছে বিশ^ব্যাপী সমাদৃত একটি ফল। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পাওয়া তথ্য মতে মানবদেহের জন্য প্রয়োজন এমন বেশির ভাগ মাইক্রো নিউটিয়েন্ট পাওয়া যায়। তীব্র গরমে আমাদের শরীরে পানি ও ঘাটতি মেটাতে তরমুজের জুড়ি নেই।
তরমুজে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফলিত এসিড, গ্লুকোজ, জিংক, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাঙ্গানিজ, ভিটামিন বি ১, ভিটামিন সি ৩, ভিটামিন বি ৬ প্রভৃতিসহ আরো অনেক প্রয়োজনীয় উপাদান পাওয়া যায় যা আমাদের শরীরে মস্তিষ্কের উন্নয়ন, হাড় বৃদ্ধি, হাড়ক্ষয়, রক্তশূন্যতা দূরীকরণ, ভ্রƒণের বৃদ্ধি ও উন্নয়ন, মাংশপেশির সঞ্চালন, বিপাকপ্রক্রিয়া, হরমোনসহ সকল ধরনের রোগ মুক্তিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বন্ধুরা, আজ জানতে পারলাম শুধু ওষুধের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে আমরা যদি আমাদের হাতের কাছের এই দেশি ফলগুলো পরিমিত পরিমাণে খাই তাহলে আমরা নিজেদেরকে পরিচ্ছন্ন, সুস্থ, সবল, সতেজ ও রোগমুক্ত রাখতে পারব।

SHARE

Leave a Reply