Home গল্প শিয়ালের গর্তে আগুন-মরিচ -মোস্তাফিজুর রহমান

শিয়ালের গর্তে আগুন-মরিচ -মোস্তাফিজুর রহমান

সন্ধ্যা নামলেই হুক্কাহুয়া ডাক শুরু। শিশু ও ছোট ছেলেরা ডাক শুনে ভয় পায়। ঘরের বাইরে যেতে চায় না সহজে। মায়ের কোলে লুকিয়ে থাকে। শিশুরা দুষ্টুমি করলে মায়েরা নতুন বুদ্ধি পেয়েছে তাদের দুষ্টুমি কমানোর তা হলো শিয়ালে ধরাবে বলে হুমকি দেয়া। অনেক কান্নাকাটি করার সময়ও যদি বলা হয় তাহলে সাথে সাথে সেই তার কান্না বন্ধ করে দেয়। চারদিকে যতই রাতের অন্ধকার বাড়ছে ততটাই যেন সারা মাঠ শিয়ালদের হাতে চলে যাচ্ছে। কেউ ভয়ে বের হতে পারে না রাতের বেলা একাই। দিনে রাতে এমনকি লোকজন থাকলেও তাদের সামনে নিয়ে পালিয়ে যায় হাঁস-মুরগি। তাদের অত্যাচারে কেউ হাঁস মুরগি পালন করতে পারছে না। চারদিকে এক ভয়ানক অবস্থা।
মায়েরা খুব সাবধানে রাখে তাদের শিশুদের, যেন তারা রাতের বেলা বাড়ির বাইরে না যায়। এমন অবস্থায় সবার একটাই চাওয়া আর তা হলো এই শিয়ালগুলোকে মেরে ফেলা। কিন্তু এই কাজটা করবে কে? মোটেও সহজ কোন কাজ নয় এটা। এই জন্য প্রচন্ড সাহসী একদল যুবকের প্রয়োজন। যারা নিজেরা মানুষের সেবার জন্য, একটু প্রশান্তির জন্য ভয়কে শক্তিতে পরিণত করে শিয়ালদের আবাসস্থলকে গুঁড়িয়ে দেবে।

এমন বড় বড় শিয়াল যে কুকুর পর্যন্ত ভয় পায়। কুকুর সাধারণত গ্রাম থেকে শিয়ালকে তেড়ে মাঠের মধ্যে রেখে আসে। কিন্তু শিয়ালগুলো বড় হওয়ায় কুকুর একাই যেতে পারে না তেড়ে। আবার কুকুরের একদল হলে তখন তাদের তেড়ে গ্রাম থেকে মাঠের মধ্যে রেখে আসতে পারে।
হ্যাঁ এমনই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার বান্দ্রা গ্রামে। সবাই অস্থির এই শিয়ালদের অত্যাচারে। গ্রামবাসীর চাওয়া শিয়ালগুলোর একটা অবস্থা সৃষ্টি হোক যার ফলে তাদের নিষ্ঠুর থাবা হতে মুক্তি পাবে গ্রামের মানুষ।

গ্রামের কিছু যুবক, নিজেরা এর অত্যাচার কমাতে এবং গ্রামের মানুষের কষ্ট লাঘব করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে একটা কিছু করার। সেই যুবকদের মধ্যে মিঠু, রুবেল, আব্দুর রাজ্জাক, পলাশ, মনাসহ আরো অনেকেই ছিল। কিন্তু এই কাজত খুব কঠিন কাজ। বিপদেরও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কিভাবে এটা করা যায়, নানা জল্পনা নানা কল্পনা করতেই হবে কাজটা নিয়ে। যেভাবেই হোক এটা সফল করতে হবে। এমন অবস্থায় সবাই একসাথে হয়ে একটা আলোচনার ব্যবস্থা করল। কে কী কাজ করবে, কার কী দায়িত্ব থাকবে তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করার জন্য। সভায় একে একে বুদ্ধি পরামর্শ দিতে থাকল। কেউ বলে এভাবে, কেউ বলে ওভাবে, আবার কেউ অন্যের দেয়া পরামর্শগুলো ভালোভাবে মাথা খাটিয়ে দেখছে। সর্বসম্মতি ক্রমে একটা সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো এবং তা বাস্তবায়নের জন্য সবার প্রচেষ্টা শুরু হলো। আর এই সিদ্ধান্তের মধ্যে হলো এই মাঠের কোন স্থানে শিয়ালের অবস্থান, কোন গর্তে তারা থাকে, কোন সময় তারা বেশি থাকে এই তথ্যগুলো একান্ত জানা প্রয়োজন। সেই অনুসারে প্রথমে তথ্য সংগ্রহে বেরিয়ে পড়ল অনেকেই আর কিছু সংখ্যক যুবক তারা কাজ সম্পন্ন করার জন্য উপাদান সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
তাদের দেয়া তথ্য ও প্রস্তুতি প্রায় শেষ এখন কাজকে বাস্তবায়ন করার পালা। দিনের বেলায় উপযুক্ত স্থান কাজটাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য। ভয়ও কাজ করছে, যেহেতু শিয়াল একটা বিষাক্ত প্রাণী। কোনভাবে যদি কাউকে কামড় দেয় অথবা আঁচড়িয়ে দেয় তাহলে কী কী ব্যবস্থা নিতে হবে এরও একটা আলোচনা হয়েছিল আগেই। সেই অনুসারেই ব্যবস্থা করা হয়েছে সব কিছুর। লোকবল যথেষ্ট হাজির। যে গর্তে শিয়াল থাকে সেই গর্তের অপর প্রান্ত খুঁজতে ব্যস্ত অনেকে। এমন অবস্থায় তারা খুঁজে পেল অপর প্রান্ত। সেই হিসাব করে কিছু লোক ওক প্রান্তে কিছু লোক অন্য প্রান্তে। সবার হাতেই কিছু না কিছু যন্ত্রপাতি, কারো হাতে লাঠি আবার কারো হাতে আগুন জ্বালানোর উপকরণ আবার কারো হাতে বস্তা। এবার এক মুখে আগুন জ্বালানো হলো সাথে শুকনো মরিচ এবং মরিচের গুঁড়া। মরিচের গুঁড়া দেয়ার একটা চমৎকার কারণও আছে। তারা চাইছিল মরিচের ঝাঁঝালো ধোঁয়ায় দ্রুত বেরিয়ে পড়বে। অপর প্রান্তে প্রচন্ড সাহসী কিছু যুবক গর্তের মুখে বস্তা লাগিয়ে আছে। অপর প্রান্তে ধোঁয়া এলেই শিয়ালগুলো বেরিয়ে আসবে। তখন তাদের বস্তার মধ্যে আটকিয়ে রাখা যাবে। যতক্ষণ না ধোঁয়া অপর প্রান্তে না আসছে ততক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে ধোঁয়া দেয়ার কাজ। অপর প্রান্তের যুবকরা খুব তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, কখন বের হয়, কয়টা বের হয় একসাথে? এমন কল্পনা আর অজানা আশঙ্কা।
এরই মধ্যে হঠাৎ করে তিনটা শিয়ালের বাচ্চা প্রথমে বেরিয়ে এলো। যারা মুখের কাছে লাঠি নিয়ে সজাগ ছিল তারা খুব সাবধানে যেন কোনভাবে পালিয়ে যেতে না পারে। পরে আরো দুইটা বাচ্চা সাথে সাথে একটা বয়স্ক শিয়াল এলো। খুব সাবধানে শিয়ালকে ধরে বস্তায় ভরে রাখল।
গ্রামের সকল মানুষ দেখতে এলো সেই শিয়ালগুলোকে, তখন পর্যন্ত কেউ মারেনি তাদের। সেই সাহসী যুবকদের আর একটা মহৎ উদ্দেশ্য ছিল। শিয়ালগুলোকে না মেরে যদি চিড়িয়াখানায় দেয়া যায়। তাহলে দিয়ে দিব। আর মাঝে মাঝে সেখানে গিয়ে দেখলে তারা অনেক তৃপ্তি পাবে। তারা যোগাযোগও করেছিল। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। অবশেষে সব শিয়ালকে মেরে ফেলেছিল তারা। তার পর দীর্ঘ সময় সেই এলাকায় শিয়ালের উৎপাত অনেক কম ছিল। গ্রামের সব মানুষ সেই যুবকদের জন্য দোয়া করেছিল। এখনো করে। তারা এখনো গ্রামবাসীর যে কোন সমস্যা সমাধানের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেই যাচ্ছে। তারা মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে বেশ তৃপ্তি নিয়ে কাটাচ্ছে তাদের জীবন।

SHARE

Leave a Reply