Home খেলার চমক ক্রিকেট আধিপত্যবাদ : রুখবে টাইগাররা -হাসান শরীফ

ক্রিকেট আধিপত্যবাদ : রুখবে টাইগাররা -হাসান শরীফ

একসময় ক্রিকেট খেলত ইংরেজ অভিজাতেরা। তাদের আভিজাত্য এতই বেশি ছিল যে, অন্যরা ক্রিকেট খেলুক তা তারা চাইত না। লর্ডদের এই বিনোদনকে তারা ‘ভদ্রলোকের খেলা’ হিসেবে অভিহিত করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে উপনিবেশভুক্ত কয়েকটি দেশে মাত্র এই খেলাটি প্রচলিত হয়। অলিম্পিকের মতো আসরে ক্রিকেট নেই। ফুটবল যেখানে সবাই খেলতে পারে, ক্রিকেটে নানা প্রতিবন্ধকতা। চাইলেও তারা ক্রিকেট খেলতে পারবে না। যেসব কারণে ক্রিকেট নামের খেলাটি খুব বেশি দেশে প্রচলিত নেই, এটা অন্যতম। একসময় ইংরেজ সাম্রাজ্যের পতন হলো। ইংরেজদের সামরিক শক্তি চলে গেল যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। তবে ক্রিকেট গেল অস্ট্রেলিয়ায়। তারাও বর্ণবাদী আচরণ শুরু করল। বেশ ভালোভাবেই। তাদের দেশের বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান ক্রিকেটারের আত্মপ্রকাশ তাদের কাজটি সহজ করে দিয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার সেই দিন আর নেই।
এখন দিন ভারতের। তাদের ভিত্তি কী? অর্থনৈতিক শক্তি। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ভারত যে ধনী দেশ তা নয়। তবে ধনী দেশগুলো ক্রিকেট খেলে না বা ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো ক্রিকেটের পেছনে তেমন ব্যয় না করায় সুযোগটি লুফে নিয়েছে ভারত। ক্রিকেটের পেছনে তারা বিপুল অর্থ ব্যয় করতে থাকল। সেই সূত্রে তারাই এখন মোড়ল। তবে আগের দুই মোড়ল ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াকে সাথে রেখেছে। ওই দুটিকে নিয়ে ভারত তাদের বর্ণবাদী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যান্য দেশে ক্রিকেট খুব একটা না থাকায় এবং আইপিএলসহ অর্থকরী ক্রিকেট ভারতে হওয়ায় দেশটি এখন দুর্বলদের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে। তাদের শিকার হয়ে নানাভাবে বঞ্চিত হচ্ছে অন্য দেশগুলো, অকালে ঝরে পড়ছে অসংখ্য প্রতিভা। তাদের কথামতো আইসিসি সিদ্ধান্ত দিচ্ছে। অবস্থা এমন হয়েছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) অনেকে এখন বলছে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল।
নিজেদের প্রাধান্য অব্যাহত রাখার জন্য তারা নানা ধরনের নিয়ম-কানুন তৈরি করেছে। ঘোষিত সুবিধা তো আছেই, সেইসাথে আছে নানা অপ্রকাশ্য বিধিনিষেধ। এমনকি ভারতীয়দের সমালোচনা কিংবা প্রতিপক্ষের প্রশংসাও তাদের সহ্য হয় না। এই তো কয়েক দিন আগে হঠাৎ করে ধারাভাষ্যকার হর্ষ ভোগলেকে আইপিএল থেকে সরিয়ে দেয়া হলো। তার অপরাধ : তিনি বাংলাদেশের প্রশংসা করেছিলেন। তার আগেও আরো কয়েকজনের চাকরি খতম হয়েছে একই অপরাধে।
তা ছাড়া বিভিন্ন দেশের উদীয়মান ক্রিকেটারকেও নানাভাবে হেস্তনেস্ত করা হয়। বাংলাদেশের তাসকিন আহমেদ এরই একটি দৃষ্টান্ত। টি-২০ বিশ্বকাপে হঠাৎ করে তাকে নিষিদ্ধ করা হলো।
তবে জগমোহন ডালমিয়া যখন আইসিসির সভাপতি ছিলেন, তখন কিন্তু অন্য রকম পরিস্থিতি ছিল। তিনি চাইছিলেন জোটবদ্ধ এশিয়াকে নিয়ে অ-এশিয়ানদের প্রতিরোধ করতে। তিনি তার এই কাজে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাকে পেয়েছিলেন। ওই প্রয়োজন পূরণ হয়ে যাওয়ার পর জোটবদ্ধ থাকার প্রয়োজন আর অনুভব করেনি ভারত। এর মধ্য অবশ্য আরো দুটি ঘটনা ঘটে গেছে। ডালমিয়ার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া এবং ভারতে কয়েকজন দুর্দান্ত খেলোয়াড়ের আবির্ভাব। এসব খেলোয়াড় ভারতকে ভালো দলে পরিণত করেছে। একইসাথে মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে এন শ্রীনিবাসনের মতো একনায়কদের। এই বর্ণবাদী চরিত্রগুলো ন্যূনতম প্রতিরোধের সব সম্ভাবনা শুরুতেই শেষ করে দিতে বদ্ধপরিকর। আইসিসি এখন এদের দখলেই। শ্রীনিবাসন সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তার তুলনায় বেশ নমনীয়, ডালমিয়ার কাছাকাছি। কিন্তু অন্যরা তো রয়ে গেছে। তার ফল হলো তাসকিনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ।
বাংলাদেশের ধারাভাষ্যকার শামীম আশরাফ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন। ওই তিন দেশের কোনো ক্রিকেটার এখন পর্যন্ত অবৈধ ঘোষিত হননি। গত আইসিসি বিশ্বকাপের আগে সুনীল নারায়ন, সাইদ আজমল, মোহাম্মদ হাফিজের মতো বেশ কয়েকজন বোলারকে হঠাৎ করে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এটা কি বিশ্বকাপে মাতব্বরদের পথ পরিষ্কার করার আগাম কার্যক্রম ছিল? তখনই অনেকে এই প্রশ্নটি করেছিলেন।
ভারত এখন যে কাজটি করছে, এই কিছু দিন আগে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড তা-ই করত। মুত্তিয়া মুরালিধারানের ব্যাপারটাকে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়। এখন উভয় দেশই মুরালিধারানের ব্যাপারে উচ্ছ্বসিত, প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু এই লঙ্কান বোলার যখন দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন, তখন শেন ওয়ার্নের চেয়েও সফল ছিলেন, তখন তার বোলিং ভঙ্গি নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন তুলে তাকে নাজেহাল করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। তবে শ্রীলঙ্কা হাল ছাড়েনি। তারা দৃঢ়ভাবে মুরালির পাশে ছিল। মুরালির সৌভাগ্য তিনি বোর্ডের পাশাপাশি অর্জুনা রানাতুঙ্গার মতো একজন অধিনায়ক পেয়েছিলেন। হাফিজ, আজমলরা পাননি। তাসকিনরা কি পাবেন?
বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পেছনে ডালমিয়ার অবদান ছিল। তবে সাধারণভাবে ভারতের বড় অংশই চাচ্ছিল না, বাংলাদেশ তাদের সমান মর্যাদার হোক। বর্তমানে তাদের ওই মানসিকতা আরো জোরদার হয়েছে। এর একটি প্রমাণ হলো, এত বছর পরও বাংলাদেশকে টেস্ট খেলার জন্য ভারতে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এবার আমন্ত্রণ জানানো হলেও নানা গুজব ভেসে আসছে। সফরটি আসলেই হতে পারবে কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়।
বাংলাদেশ কি হাল ছেড়ে দেবে? না। হাল যে ছেড়ে দেবে না, সেটা বাংলাদেশ এর মধ্যেই প্রমাণ করে দিয়েছে। টি-২০ বিশ্বকাপে লড়াই করার যে মানসিকতা দেখিয়েছে, সেটাই তাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রতীক রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সেই বাঘ কারো কাছে আত্মসমর্পণ করে না। বাংলাদেশও করবে না। নিজেরা তো এগিয়ে যাবে, সেইসাথে বঞ্চিত অন্য দেশগুলোকে নিয়ে আধিপত্যবাদ মোকাবেলায় নেতৃত্ব দেয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।

SHARE

Leave a Reply