Home আইটি কর্নার ভয়াবহ ভিডিও গেম আসক্তি -সোলায়মান খান

ভয়াবহ ভিডিও গেম আসক্তি -সোলায়মান খান

প্রিয় বন্ধুরা, কেমন আছো? বছরের এই মাঝামাঝি সময়ে নিশ্চয়ই পড়ালেখা নিয়ে অনেক ব্যস্ত আছো। আমি যদি তোমাদের জিজ্ঞাসা করি, এই পড়ালেখার ব্যস্ততার মাঝে একটু সময় পেলে তুমি কি করো? অনেকেই হয়ত উত্তর দেবে ভিডিও গেম খেলো। আবার এমন অনেক বন্ধুই হয়ত আছে, যে একবার গেম খেলা শুরু করলে ঘুম, খাওয়া-দাওয়া, পড়ালেখা, স্কুলে যাওয়া এমনকি টয়লেটে যাওয়ার কথাও ভুলে যায়। এইতো কয়েকদিন আগে ভারতে অতিরিক্ত ভিডিও গেম খেলে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়া দুই সহোদরকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। ভিডিও গেমে আসক্ত ওই দুই ভাই গেমিং কনসোল নিয়ে এতটাই আসক্ত হয়ে পড়েছিল যে নাওয়া-খাওয়া, ঘুম বাদ দিয়ে দিয়েছিল। এমনকি তারা টয়লেটে যাওয়ার কথা ভুলে গিয়ে প্যান্ট পর্যন্ত ভিজিয়ে ফেলা শুরু করেছিল। তাদের উপস্থিতিতে বাড়িতে দুবার চুরি পর্যন্ত হয়েছে।
বিনোদনের জন্য অল্প সময় গেম খেলা ভালো হলেও দীর্ঘ সময় ধরে গেম খেলা আসক্তিতে পরিণত হতে পারে। এর ফলে আসক্ত ব্যক্তি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।
আজ তোমাদের বলব কেন ও কিভাবে গেমের প্রতি আসক্তি জন্ম নেয়, এর ফলে কী কী ক্ষতি হয়, এর থেকে কিভাবে বাঁচা যায়।
কেন ও কিভাবে গেমের প্রতি
আসক্তি জন্ম নেয়?
ভিডিও গেম সাধারণত দুই ধরনের হয়। এক ধরনের গেম এমন যেগুলোতে একটি নির্দিষ্ট টার্গেট থাকে। যেমন- কোন রাজকন্যাকে উদ্ধার করা, মোটরসাইকেল রেসে প্রথম হওয়া, সর্বোচ্চ পয়েন্ট অর্জন করা, কম সময়ের মধ্যে একটি কাজ শেষ করা। কয়েকবার টার্গেটে পৌঁছতে পারলে ঐ গেমের প্রতি আসক্তি কমে আসে। আরেক ধরনের গেম আছে যেগুলো একসাথে অনেক জন মিলে অনলাইনে খেলতে হয়। এই ধরনের গেমগুলোর মধ্যে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় গেম হল ‘ক্ল্যাশ অফ ক্ল্যানস’। এই গেমগুলো বেশি আসক্তিকর, কেননা এই গেমগুলোর কোন শেষ থাকে না। গেম খেলোয়াড় একটি অনলাইন চরিত্রে পরিণত হয় এবং অন্যান্য খেলোয়াড়দের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে। এ থেকে সে আর বের হতে পারে না।
এই ভিডিও গেমগুলো যারা বানায় তাদের উদ্দেশ্য থাকে মুনাফা লাভ করা। তুমি যতবার গেমগুলো খেলবে তাদের তত লাভ হবে। এ জন্য তারা গেমগুলোতে বিভিন্ন আকর্ষণীয় ফিচার রাখে যাতে করে তুমি বারবার গেমটি খেলতে উৎসাহিত হও।

গেম আসক্তি থেকে কী কী ক্ষতি হতে পারে?
একজন যখন এই ধরনের গেমে আসক্ত হয়ে পড়ে তখন সারাক্ষণ ঐ গেম নিয়ে ভাবতে থাকে, কিভাবে সর্বোচ্চ পয়েন্ট অর্জন করবে, কিভাবে তার প্রতিযোগীকে হারাবে। গেমের প্রতিটি ঘটনা তার মাথায় ঘুরতে থাকে। সে যখন গেম খেলা বন্ধ করে অফলাইনে চলে আসে তখনও ভাবতে থাকে তার কোন প্রতিযোগী মনে হয় তাকে ছাড়িয়ে চলে গেল। সে যখন গেমটি খেলতে বসে তখন তার মাঝে এক ধরনের অস্বাভাবিক উত্তেজনা কাজ করে। এর ফলে পড়ালেখাসহ দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটে। এ ছাড়াও সে অনেক শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়।
#    কার্পাল টানেল সিন্ড্রোম : কার্পাল টানেল সিন্ড্রোম এক প্রকারের কব্জির প্রদাহজনিত রোগ। কারপাল টানেল অর্থাৎ কব্জির হাড়গুলির (ও সংশ্লিষ্ট কব্জি ভাঁজ করার পেশিগুলির সংযোগকারী টেন্ডনসমূহের) মধ্যবর্তী সড়ঙ্গে মিডিয়ান স্নায়ুর নিষ্পেষণ/পীড়নজনিত কারণে এই প্রদাহ হয়ে থাকে। গেম খেলার সময় অতিরিক্ত সময় ধরে মাউস ও কি-বোর্ড ব্যবহারের ফলে এ রোগের উৎপত্তি হতে পারে। রোগের প্রথম দিকে কব্জির ব্যায়াম দ্বারা এ রোগের উপশম হয়। মারাত্মক আকার ধারণ করলে অর্থাৎ রাতে ঘুমাতে না পারার মত ব্যথা বা কাজ করাই যায় না এমন অবস্থা হলে কার্পাল টানেলে স্পি­ন্ট স্থাপন করা লাগতে পারে। এমনকি মিডিয়ান স্নায়ুকে চাপমুক্ত করার জন্য অস্ত্রোপচার করা লাগতে পারে।
#    মাইগ্রেনের ব্যথা: দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে গেম খেলার জন্য চোখ ও মস্তিষ্কের ওপর চাপ পড়ে এবং মাইগ্রেনে প্রচন্ড ব্যথা শুরু হয়। এই ব্যথা তীব্র হতে পারে। এমনকি এ থেকে বমি পর্যন্ত হতে পারে।
#    নিদ্রাহীনতা : গেমের ঘটনাগুলো খেলোয়াড়ের মস্তিষ্ককে তাড়িত করে। ফলে অনিদ্রা, হড়পঃঁৎহধষ সুড়পষড়হঁং (ঘুমের সময় হাত, পায়ের ঝাঁকুনি) এবং ঢ়ধৎধংড়সহরধ (রাতের বিভীষিকা, ঘুমের মধ্যে হাঁটা বা কথা বলা, দুঃস্বপ্ন দেখা) সহ বেশ কিছু ঘুম সংক্রান্ত রোগের তৈরি হতে পারে।
#    পৃষ্ঠ বেদনা : দীর্ঘ সময় ধরে বসে থেকে গেম খেলার কারণে পৃষ্ঠ বেদনা হতে পারে।
#    দুর্বল স্বাস্থ্য : গেম আসক্ত ব্যক্তি নিজের শরীরের প্রতি যত নেয় না, ঠিকমত গোসল করা, দাঁত মাজা, ঠিক সময়ে খাবার খাওয়া ইত্যাদি না করার ফলে শারীরিক দুর্বলতা, অবসাদগ্রস্ততাসহ বিভিন্ন রোগের জন্ম দিতে পারে।
এ ছাড়াও অতিরিক্ত গেম খেলা চোখ ও কানের সমস্যা তৈরি, ঘাড়ে ব্যথা, কুনুইতে ব্যথা, মূত্রের বেগ ধারণের অক্ষমতার জন্ম দেয়। এই সমস্যাগুলো স্বল্প বা দীর্ঘ মেয়াদি হতে পারে। মাত্রাতিরিক্ত গেম আসক্তি মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। কোরিয়ায় একজন লোক টানা ৫০ ঘন্টা কম্পিউটার গেম খেলার পর তার নিজের গেম-ই ওভার হয়ে গেছে (সে মারা গেছে)।
অতিরিক্ত গেম খেলা শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সমস্যাও তৈরি করে। গেম আসক্ত ব্যক্তি গেম খেলার জন্য নিজেকে আত্মীয় ও সহপাঠীদের থেকে আলাদা করে রাখে। তাদের কোন বন্ধু হয় না, তারা সমাজের মানুষের সাথে মিশতে পারে না, কর্মক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়। সহিংস ভিডিও গেমগুলো খেলোয়াড়দের মাঝে আক্রমণাত্মক আচরণ বৃদ্ধি করে। ডুম নামের ফার্স্ট পারসন শুটার ধরনের একটি ভিডিও গেমে আসক্ত ইভান নামের এক ব্যক্তি ১৯৯৭ সালে তার এক শিক্ষকসহ আরও দু’জনকে শটগান দিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

কিভাবে গেম আসক্তি থেকে বাঁচা যায়?
যে কোন আসক্তি থেকে বাঁচার উপায় হলো তার ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে চিন্তা করা এবং ঐ কাজ থেকে ফিরে আসার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হওয়া। তোমার জীবনের সমস্যাগুলোর একটি তালিকা তৈরি করো। সেই সমস্যাগুলোর কোনগুলো গেম খেলার কারণে হয়েছে তা খুঁজে বের কর। এরপর তোমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর তালিকা তৈরি কর। সেই তালিকায় গেমের জায়গা কতটুকু সেটা বুঝতে চেষ্টা করো।
তারপর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ লেখাপড়া, হোমওয়ার্ক, পরিবারের সাথে সময় কাটানো, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে যাওয়া, সুন্দর সুন্দর বই পড়া, extra-curricular activity, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে নিজের সময় ভাগ করে নাও এবং ঐ সকল কাজে ব্যস্ত থাকো। কম্পিউটারে গেম না খেলে মাঠে খেলাধুলা করো। এতে শারীরিক ব্যায়ামের ফলে অনেক রোগও দূর হয়ে যাবে।

SHARE

Leave a Reply