Home বিশেষ রচনা পলাশী ট্র্যাজেডি -ড. এম এ সবুর

পলাশী ট্র্যাজেডি -ড. এম এ সবুর

পলাশী নাম শুনলেই বেদনাবিধুর কাহিনী মনে পড়ে যায়। পলাশী একটি স্থানের নাম, যার অবস্থান পশ্চিম বঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায়। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশী প্রান্তরে বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হারিয়ে দেয়া হয়। আর ইংরেজরা এ দেশের শাসনক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়। এতে বাংলার স্বাধীনতাসূর্য অস্তমিত হয়। তারপর ইংরেজরা ধীরে ধীরে সারা ভারত উপমহাদেশ দখল করে  নেয়। তারা দীর্ঘ প্রায় দুই শত বছর শাসন-শোষণের পর ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যায়। এতে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হয় এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সূর্যও উঁকি দেয়। আর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জিত হয়।
সিরাজ-উদ-দৌলা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব ছিলেন। তিনি মাত্র ২৩ বছর বয়সে শাসনক্ষমতা গ্রহণ করেন। ১৭৩৩ সালে তিনি বিহারে জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম মির্জা মোহাম্মদ। তবে ইতিহাসে তিনি সিরাজ-উদ-দৌলা নামে পরিচিত। তার পিতার নাম জয়েনউদ্দিন এবং মাতার নাম আমেনা বেগম। তার নানা আলীবর্দী খাঁ বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব ছিলেন। তখনকার দিনে উত্তরাধিকারসূত্রে কিংবা যুদ্ধবিজয়ের মাধ্যমে শাসকগণ ক্ষমতা লাভ করতেন। তাই আলীবর্দী খাঁর কোন পুত্রসন্তান না থাকায় সিরাজ-উদ-দৌলাকে বাংলার পরবর্তী নবাব বা শাসক মনোনীত করেন।
তার নানার ইন্তেকালের পর ১৭৫৬ সালের ১৫ এপ্রিল তিনি মসনদে আরোহণ করেন। এতে তার খালা ঘসেটি বেগম এবং খালাতো ভাই শওকত জং চরম অসন্তুষ্ট হন। তারা নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করেন। এদিকে ইংরেজ বণিকরাও সিরাজ-উদ-দৌলা নবাব হওয়াতে মনঃক্ষুণ্ন হন। কারণ নবাব ইংরেজ বণিকদের বা ‘ইস্ট ইন্ডিয়া’ কোম্পানির অন্যায় কাজকর্ম মোটেই সহ্য করতেন না। এ জন্য তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিনা শুল্কে ব্যবসা বন্ধ করেন। জানা যায়, ১৭১৫ সালে দিল্লির স¤্রাট ফররুখ শিয়ার গুরুতর অসুস্থ হলে ইংরেজ ডাক্তার হ্যামিলটন তাকে সুস্থ করেন। এতে স¤্রাট সন্তুষ্ট হয়ে ইংরেজ বণিকদের জন্য বিনা শুল্কে ব্যবসাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ফরমান জারি করেন। কিন্তু পূর্ববতী নবাবগণের মতো সিরাজ-উদ-দৌলাও স¤্রাটের এ ফরমান কার্যকর করতে অস্বীকার করেন। অধিকন্তু তিনি কলকাতায় ইংরেজদের ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ নির্মাণ করতে বাধা দেন। এতে ইংরেজরা নবাবের প্রতি আরও বেশি ক্ষুব্ধ হয়। এমনকি নবাবের আদেশ উপেক্ষা করেই তারা দুর্গ নির্মাণের কাজ অব্যাহত রাখে। আর নবাবের বিপক্ষের লোকদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে তাদের সাথে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। ইংরেজদের এসব অন্যায় কর্মকান্ড বন্ধ করতে নবাব কলকাতায় এক দল সৈন্য  প্রেরণ করেন। নবাবের সৈন্যরা ১৭৫৬ সালের ২০ জুন কলকাতা আক্রমণ করেন। এ সময় তারা ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের আস্তানা ‘কাসিমবাজার কুঠি’ দখল করেন। এতে পরাজিত ইংরেজ বাহিনী কলকাতা ছেড়ে চব্বিশ পরগনা জেলার ফলতা নামক স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং কেউ কেউ আত্মসমর্পণ করে। এ সময় নবাব তার সেনাপতি মানিক চাঁদকে কলকাতার গভর্নর নিযুক্ত করেন। অন্যদিকে ইংরেজরা তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণের হরেক রকমের ষড়যন্ত্র করতে থাকে। এরই অংশ হিসেবে ইস্ট ইন্ডিয়ার কর্মকর্তা ডাক্তার হলওয়েল নবাবের বিরুদ্ধে ‘অন্ধকূপ হত্যা’র কল্পকাহিনী রচনা করেন। হলওয়েলের বর্ণনা মতে, কলকাতা দখলের পর ১৮ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ১৪ ফুট প্রস্ত একটি কক্ষে পরাজিত ইংরেজদের ১৪৬ জনকে রাখা হয়। এতে ১২৩ জনের মৃত্যু হয়, যা ‘অন্ধকূপ হত্যা’ বা ইষধপশ ঐড়ষব ঞৎধমবফু নামে প্রচার করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা ও ঐতিহাসিক ভিত্তিতে ‘অন্ধকূপ হত্যা‘র ঘটনা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। কারণ এতো ছোট কক্ষে ১৪৬ জন মানুষ ধারণ করা কখনই সম্ভব নয়। অধিকন্তু নবাবের সৈন্যদের কাছে পরাজিত হয়ে ইংরেজরা আগেই পলায়ন করে, যারা কলকাতা নগরীতে ছিলেন তাদের সংখ্যা কোনোভাবেই ১৪৬ জন নয়।
এদিকে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার কাসিমবাজার কুঠি ও কলকাতা দখলের ঘটনায় ইংরেজরা রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা কলকাতা নগরী পুনর্দখলের জন্য অ্যাডমিরাল ওয়াটসন ও রবার্ট ক্লাইভকে অনেক অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে কলকাতায় পাঠায়। রবার্ট ক্লাইভ ছিলেন অত্যন্ত ধূর্ত ও সাহসী লোক। তিনি কলকাতায় এসে নবাবের নিযুক্ত শাসক মানিক চাঁদের সাথে গোপনে আঁতাত করেন। এতে মানিক চাঁদ কলকাতা থেকে পলায়ন করে হুগলিতে চলে যান। আর ইংরেজরা সহজেই কলকাতা দখল করতে সক্ষম হন। তখন নবাব ইংরেজদের সাথে ‘আলিনগর চুক্তি’ করতে বাধ্য হন। ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি স¤্রাট ফররুখ শিয়ার প্রদত্ত সকল অবৈধ সুযোগ-সুবিধা লাভের অধিকার পায়। তবু তারা নবাবের প্রতি সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তাদের ধারাণা নবাব তাদের সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করে দিতে পারেন এবং এ দেশ থেকে তারা বিতাড়িত হতে পারে। এ আশঙ্কায় এবং এ দেশের শাসনভার দখলের আকাক্সক্ষায় ইংরেজরা নবাবের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তারা নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করতে নবাবের প্রধান সেনাপতি মীরজাফর, রাজা রাজভল্লব, সেনাপতি রায় দুর্লভ, রাজভল্লভপুত্র কৃষ্ণদাস, ঘসেটি বেগম, উমি চাঁদ, জগৎ শেঠসহ অনেকের সাথে গোপন আঁতাত করেন। এ ছাড়া স্বার্থবাদী অনেক দেশীয় (হিন্দু) জমিদার ও অর্থলোভী মুৎসুদ্দি ব্যবসায়ী নবাবের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সমর্থন করেন। এসব কারণে ইংরেজরা নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করার অজুহাত খুঁজতে থাকে।
ইংরেজদের সাথে ষড়যন্ত্র বৈঠকে মীর জাফরকে বাংলার নবাব ঘোষণা করা হয় এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, রাজা রাজবল্লভ, রায়দুর্লভসহ সকল ষড়যন্ত্রকারীর জন্য বিভিন্ন পদ-পদবি ও সুযোগ-সুবিধার চুক্তি করা হয়। নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের চুক্তি পাকাপাকি হলে ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ সৈন্য নিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে অগ্রসর হন। ইংরেজ বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা তার সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন। মীরজাফরের নেতৃত্বে নবাবের বাহিনী ৫০ হাজার সৈন্য ও ৫৮টি কামান নিয়ে ইংরেজ বাহিনীর মাত্র ৩,০০০ সৈন্য ও ১৩টি কামানের মোকাবিলা করেন। এমতাবস্থায় ২৩ জুন তারিখে ভাগিরথী নদীর তীরবর্র্তী পলাশী প্রান্তরে উভয় বাহিনীর যুদ্ধ শুরু হয়। ইংরেজদের সাথে চুক্তি অনুযায়ী বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর তার অধীনস্থ সৈন্যদেরকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখেন। তবে মীর মদন ও মোহনলালের নেতৃত্বে দেশপ্রেমিক সৈন্যরা ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তারা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে ইংরেজ বাহিনীকে হটিয়ে দেন। তখন ইংরেজ সৈন্যরা পালিয়ে লক্ষবাগে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এদিকে প্রবল বৃৃষ্টিতে নবাব বাহিনীর সৈন্যদের গোলাবরুদ ভিজে যায়। এতে নবাব বাহিনীর কামানগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। আর নবাবের প্রধান সেনাপতি মীরজাফর যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা দেন। এ সময় ইংরেজ বাহিনী প্রস্তুতি নিয়ে আবারও নবাবের বাহিনীর ওপর আক্রমণ করে। তাদের প্রতিহত করতে মীর মদন বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেন। কিন্তু যুদ্ধের এক পর্যায়ে ইংরেজ বাহিনীর গোলার আঘাতে তিনি নিহত হন। এ সময় মোহনলালের নেতৃত্বে নবাবের দেশপ্রেমিক সৈন্যরা যুদ্ধ চালিয়ে যান। কিন্তু মোহনলাল বন্দি হলে নবাবের বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে ইংরেজ বাহিনীর মনোবল বেড়ে যায়। এ সময় নবাব ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার নির্দেশ দেন। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে যুদ্ধ বন্ধের পরামর্শ দেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে নবাব দেশপ্রেমিক সৈনিকদের যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দেন।
পরে নতুন করে ইংরেজদের মোকাবিলার প্রস্তুতির জন্য তিনি স্ত্রী লুৎফুন্নেসাকে সাথে নিয়ে মুর্শিদাবাদ থেকে পাটনার উদ্দেশে যাত্রা করেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! পথিমধ্যে ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে  নবাব ও তার স্ত্রী আটক হন। পরে ২ জুলাই তারিখে ষড়যন্ত্রকারীদের নির্দেশে মোহাম্মদী বেগ বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ- দৌলাকে নির্মমভাবে হত্যা করে! এতে সারা বাংলায় বেদনার করুণ সুর বেজে ওঠে। আকাশ-বাতাশে মাতম ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে। আর বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর ইংরেজদের পুতুল নবাব হিসেবে ক্ষমতায় বসেন। তার মদদে রাজপ্রাসাদে লুটপাট শুরু হয়। ইংরেজ বেনিয়ারা মুর্শিদাবাদের নবাবপ্রাসাদ থেকে সোনা, রূপা, মুদ্রা ও মূল্যবান ধন-সম্পদ কয়েক শত নৌকাভর্তি করে কলকাতায় নিয়ে যায়। এভাবেই বাংলার স্বাধীনতাসূর্য অস্তমিত হয়!

SHARE

Leave a Reply