Home প্রচ্ছদ রচনা পাকা ফলের মধুর রসে -মৃত্যুঞ্জয় রায়

পাকা ফলের মধুর রসে -মৃত্যুঞ্জয় রায়

‘ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ
পাকা জামের মধুর রসে রঙিন করি মুখ।’
পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের এ কাব্য কথাগুলো মনে পড়তেই মনটা ছুটে যায় সেই ছোট্ট বেলায়। বৈশাখী ঝড়ের দিন তো এসেই গেল। গাছে গাছে গুটি আম। ঝড়ো বাতাসে আমগুলো দুলছে। ইস, ওগুলোর দু’চারটা খসে পড়লেই হয়! ঝড়ে পড়া কাঁচা আমের কচকচে শাঁস, সাথে নুন মরিচের মাখামাখি- বোশেখের খরতাপদগ্ধ দুপুরে আহা সে যে কি পরিতৃপ্তি! মামার বাড়ি, যেখানে ছিল না কোনো শাসনের বালাই, ছিল না লেখাপড়ার শাসানি, জ্যৈষ্ঠ মাসে গাঁয়ের বনে-বাদাড়ে ঘুরে ঘুরে কাঁচা-পাকা আম কুড়োনো, কাঁটাময় গাছ থেকে কাঁটার খোঁচা খেয়ে লাল লাল বৈঁচির ফল তুলে মালা গাঁথা, সে মালা আবার শিশু বান্ধবীদের সাথে অদল বদল করা, আহা কী মধুরই না ছিল সেসব স্মৃতি, শিশুহৃদয়ে জেগে ওঠা এক টুকরো গরম ভালোবাসা। মাত্র তো কয়েক দিনের বন্ধুত্ব, তারপর গরমের ছুটি শেষ হলেই ফিরে যেতে হবে শহরের আস্তানায়- হয়তো ওদের সাথে আবার দেখা হবে আগামী বছরের গরমের ছুটিতে কিংবা হয়তো আর কখনো দেখাই হবে না। কিন্তু ওই এক মাসের বন্ধুত্বেই শৈশবের সে গ্রীষ্মের দিনগুলো কী আনন্দেই না কেটে যেত। সকালে রান্নাবাটি, লাটিম খেলা বিকেলে দাঁড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুটÑ এসব করে দিন পার করে দেয়া। সেসব বন্ধুদের সাথে কখনো কখনো চুরি করে আনা ডাঁসা পেয়ারা, ডেউয়া এমনকি কাঁঠাল খেয়ে আনন্দে মেতে ওঠা, সেসবই ছিল সেই দুরন্ত শৈশবের মণিমুক্তা।
বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠÑ এই দুই মাস গরমকাল। ঋতুচক্রে গরমকাল হলেও, ফলের বিবেচনায় এই দুই মাসকে বলা হয় মধুঋতু, জ্যৈষ্ঠ মাস হলো মধুমাস। মধুমাসে কত ফলই না ফলত তখন গাঁয়ের এ- বাগানে ও-বাগানে, এ-বাড়িতে ও-বাড়িতে। শহরের মানুষ আমরা। ইশকুলের একটা লম্বা ছুটি পেতাম যাকে বলা হতো গ্রীষ্মের ছুটি। এই মাসে এতো গরম পড়তো যে স্কুলে যাওয়া-আসা,  লেখাপড়া ছিল বেশ কষ্টের ব্যাপার। একালের মতো তখন স্কুলে স্কুলে বিদ্যুৎ ছিল না, ফ্যানের তো প্রশ্নই উঠতো না। তবে সেই কিশোর বয়সে গরম গরম ছুটিটা কিন্তু বেশ উপভোগ করতাম। খেলতে খেলতে খালি মনে হতো ‘গরম গরম রুটি, আজ আমাদের ছুটি।’ কবে হবে সেই গরমের ছুটিটা? মায়ের সাথে কবে যাবো গ্রামে মামার বাড়ি?
গরমকালে গরম তো পড়তেই হবে। তা না পড়লে কাঁঠালকে তো কিলিয়ে পাকানো যাবে না। গ্রীষ্মের সেই দাবদাহ কয়দিনের জন্য বেড়াতে গেছি বলে অনেকেই তাদের বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে এ ফল ও ফল খেতে দিত। ছোট বেলায় আম যে কেটে খেতে হয় সে কথাটাই জানতাম না। পাকা আমের মুখ ফুটো করে দু’হাত দিয়ে টিপে টিপে নরম করে তার রস চুষে খেতাম। কখনো কখনো সেইসাথে দু-একটা পোকার রসও যে আমের রসের সাথে পেটে চালান হয়নি এ কথা বলব না। জঙ্গলের গাছ থেকে গাদা গাদা আতা পেড়ে চালের মটকির ভেতরে বা চটের বস্তায় লুকিয়ে রেখে দিতাম। মাঝে মাঝে টিপে দেখতাম নরম হলো কি না। পাকা পাকা সেসব আতার স্বাদই ছিল আলাদা। এক কথায় পুরো গ্রীষ্মকালটাই ছিল যেন এক ফলের মহোৎসব। জামাই বাবুর শ্বশুরবাড়িতে আসার এক মহা আয়োজন। জ্যৈষ্ঠ মাসে সেই মধু উৎসবে জামাইবাবু (দুলাভাই) আসতেন দোকানশুদ্ধ ফল নিয়ে। কোন বাড়ির জামাই কতো বড়ো কাঁঠাল এনেছে, কয় ঝুড়ি আম এনেছে, কত পদের ফল এনেছে এসব নিয়ে পাড়াময় চলতো আলোচনা। এখনকার মতো কেউ তখন ঠোঙায় করে ফল কিনে কারো বাড়িতে যেতো না। বাড়িতে ফলের আগমন ঘটতো ঝাঁকা বা ঝুড়িতে। জামাই ষষ্ঠী নামের জামাই আদরের সেই মহা আয়োজনে বাড়ির লোকেরা তো বটেই, সারা পাড়ার ঘরগুলোতে জামাইয়ের আনা সেসব ফল বিলিয়ে জামাই আসার আগমনী সংবাদ পাঠানো হতো। শাশুড়িরাও নানা পদের খাদ্য-খাবার রান্না করে জামাই আদরে সর্বোচ্চ খেতাব পাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়তেন। সেসব খাবারের ছিটেফোঁটা আমরাও পেতাম বৈ কি! জ্যৈষ্ঠ মাসের সেই নিদারুণ ফলাহার জীবন থেকে কখন যে উবে গেছে, টের পাইনি। এখন ডাক্তাররা ফলাহারে একটার বেশি মিষ্টি আম খাওয়া একদম বারণ করে দিয়েছেন, পারলে একটা আম কেটে তার দুই স্লাইস দিয়েই মধুমাস রফা করতে বলেন। গ্রামে গেলেও সেই দুরন্ত কৈশোরের মতো এখন আর সেসব ফল পাবো কি না সন্দেহ। কেননা, গাঁয়ের সেসব জঙ্গলও নেই, থাকলেও সেসব জঙ্গলে এখন বাসা বেঁধেছে ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি, মেহগনি গাছেরাÑ সেই ঢাকি জাম, খুদিজাম, হামজাম, চালতা, চুকুর, বেল, বৈঁচির গাছ উধাও।
আমাদের এখনো আফসোস হয় সে দিনগুলোর জন্য, ছোটবেলায় ঘরের মধ্যে যখন কেউ পাকা সবরি কলার খোসাটা ছিলতো, সারা ঘর তার সুঘ্রাণে ভরে যেত। কেউ চেষ্টা করলেও লুকিয়ে লুকিয়ে কলা খেতে পারত না। আর এখন সবরি কলাগুলো আগের চেয়ে বেশ হৃষ্টপুষ্ট ও মোটাসোটা হয়েছে। কিন্তু সেই সুঘ্রাণ আর স্বাদ উবে গেছে কর্পূরের মতো। শুধু সবরিকে আর দোষ দিই কেন? গ্রামের গাছে গাছে কত শত রকমের আম যে ফলত তখন! গাছপাকা ল্যাংড়া আম দুধ দিয়ে চটকে খেলে তার সুঘ্রাণ হাতের তালুতে লেগে থাকত সারা দিন। এ দেশের গাছে গাছে কত শত রকমের আম যে হতো তার কোন হিসাব পাওয়া মুশকিল। সেসব আমের এক একটা আমের স্বাদ ছিল এক এক রকম, নামও ছিল বাহারি। ঘ্রাণ আর রঙের পার্থক্য ছিল চোখে পড়ার মত। ‘সিঁদুর রঙা’ ‘বউভুলানী’ অথবা ‘জামাইপছন্দ’ আমের বাহারি রূপ যে না দেখেছে তাকে আর কি দিয়ে বুঝাব তার রূপমাধুর্য! ফল গবেষকেরা এরকম অন্তত ষোল শ’ জাতের আমের সন্ধান পেয়েছেন ভারতীয় উপমহাদেশে। এর অন্তত হাজারখানেক জাতের অস্তিত্ব আছে আমাদের দেশেই। এও কি আমাদের কম অহঙ্কার? এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন বাগানে ও বাড়িতে পেয়েছি অন্তত এক শ’ রকমের আমের দেখা। সেসব আমের নামগুলোও বড় মধুর- ল্যাংড়া, ফজলি, গোপালভোগ, ক্ষীরসাপাত তো আছেই সেই সাথে আছে ক্ষীরভোগ, মোহনভোগ, রাজভোগ, রাণীভোগ, রাণীপছন্দ, সিন্দুরা, সুবর্ণরেখা, কুয়াপাহাড়ি, নাকফজলি, ফজনী, চনি ফজলি, সুরমাই ফজলি, চিনি মিসরি, জগৎমোহিনী, রাখালভোগ, রাঙ্গাগুড়ি, গোবিন্দভোগ, তোতাপুরী, মিশ্রিকান্ত, জালিবান্ধা, বোম্বাই, ভুতো বোম্বাই, পাহাড়িয়া, গোলাপখাস, কাকাতুয়া, দাদভোগ, চম্পা, সূর্যপুরী, কাঁচামিঠা, কলামোচা, শীতলপাটি, লক্ষণভোগ, গোলাপবাস, কিষাণভোগ. বান্দিগুড়ি, কুয়াপাহারী, রাংগোয়াই, আশ্বিনা, ভাদুরিগুটি, বনখাসা বউ ফুসলানী, ক্ষীরমন, দুধসর, রঙভিলা, পারিজা, আনোয়ারা, দিলশাদ, আম্রপালি, মল্লিকা, বেগমবাহার, পূজারীভোগ, পলকপুরী, রাজলক্ষ্মী, দুধকুমারী ইত্যাদি।
ছিটমহল আঙ্গরপোতার এক জঙ্গলে গিয়ে দেখা পেলাম গুটি জামের। অন্তত দশ রকম জামের দেখা পেয়েছি দেশের বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু বুটি জামের দেখা কোথাও পাইনি। মনে প্রশ্ন এলো, তাহলে এটি কি সেই হারানো দিনের ফল? আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, লিচু, কলা, আনারস, পেঁপে, নারিকেল ও কুল-এ ন’টি আমাদের দেশের প্রধান ও প্রচলিত ফল; এগুলোকে আমরা সবাই চিনি। অনেকেই হয়ত চিনি আরও কিছু অপ্রধান ও স্বল্প আকারে চাষকৃত ফল সফেদা, কামরাঙ্গা, লটকন, আমড়া, বাতাবি লেবু, কদবেল, বেল, জলপাই, তাল, খেজুর, তেঁতুল, জাম, জামরুল, আমলকী, বাঙ্গি, তরমুজ পেয়ারা ইত্যাদি ফলকে। কিন্তু অনেকেই চিনিনা লুকলুকি, ডেউয়া, ডেফল, করমচা, জংলী বাদাম, কাঠ বাদাম, কাজু বাদাম, গোলাপ জাম, তুঁত, তিনকরা, সাতকরা, আদা জামির, জামির, মনফল, অরবরই, আশফল, তারকা ফল, গাব, বিলাতি গাব, আতা শরিফা, কাউফল, তৈকর, লালিম, চালতা, ডুমুর, বৈঁচি, টক আতা, পানি ফল, সিঙ্গাড়া ফল, জিলাপি ফল, পদ্ম ফল, মাখনা, রুটি ফল, বকুল, ফলসা, ট্যাংফল, চুকুর, পাদ ফল, চিকান, পানকি চুনকি, টুকটুকি বা টাকিটাকি, বিলিম্বি, ডালিম, ক্ষুদিজাম ইত্যাদি ফলকে। এ ফলগুলোর অধিকাংশই এখন বিপন্ন। বসত বাড়িতে দু’একটি গাছ রয়েছে, বনে জঙ্গলেও কিছু আছে। অথচ পুষ্টি মানে এমনকি স্বাদ বৈচিত্র্যে এসব ফলের কোনো তুলনা হয় না। কেননা, এক এক ফলের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ এবং ভেষজ মূল্য এক এক রকম। অথচ এক রকম অবহেলা করেই আমরা আমাদের এসব ফলকে হারাতে বসেছি। তবে আমাদের সৌভাগ্য যে, এখনো অল্প স্বল্প হলেও এর অনেক ফলই দেশের মাটিতে টিকে আছে।
অনেক ফলই এখন বন উজাড়ের ফলে বিলীন বা বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে হয়ত এমন একদিন আসবে যে এ দেশে বাঙ্গি, তরমুজ, কলা, পেয়ারা, কুল, আম, আনারস ছাড়া আর কোনো ফলের দেখা হয়তো সহজে মিলবে না। যেমন এখন ইচ্ছে করলেও শৈশবের সেই বোশেখের দিনগুলোতে পাকা বেত ফলের নস্যি রঙের রসালো শাঁসের ফলগুলোকে লবণ মরিচের গুঁড়ো দিয়ে ঝেঁকে খেতে পারি না, যেমন খুঁজে পাই না ঢাউস আকারের রসালো শাঁসের ভুতিজাম আর পুঁতি দানার মত বুটিজামকে, তেমনি হয়তো কদিন পরেই পাবো না লুকলুকি, মাখনা, কাউয়াডুলি, পানিজাম, পানকি চুনকি, আইকা গোটা, হামজাম ও ডেউয়াকে। এক আমলকীর মধ্যে লুকিয়ে আছে পাঁচ কমলার ভিটামিন সি, অথচ সেই আমলকীকে হেলা করে কোলে তুলে নিচ্ছি কমলা সুন্দরীকে। আফসোস, বড়ই আফসোস হয়- দেশের মাটিতে দেশের মানুষের কাছেই দেশি ফলেরা উপেক্ষিত। কেউ হাসপাতালে রোগী দেখতে গেলে তাই জাম্বুরা নেন না, সঙ্গে নেন কমলা আপেল। দেশেই যাদের পুষ্টির এত রতœভান্ডার সে দেশের মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগবে এটা মেনে নিতে কষ্ট হয়। তবে আশার কথা, সম্ভাবনার কথা দেশে  এখন আম, পেয়ারা আর কুল চাষে এক নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। ২০১৪-১৫ সালে এ দেশে প্রায় ১ কোটি টন ফল উৎপাদিত হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সূত্র মতে ২০১৩ সালের বৈশ্বিক পরিসংখ্যানে বিশ্বে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হার এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। বিশ্বে বাংলাদেশ আম উৎপাদনে সপ্তম ও পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে উঠে এসেছে। বিশ্বে ফল উৎপাদনে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, ইতালি, স্পেন, মেক্সিকো, ইরান, ফিলিপিন, ফ্রান্স শীর্ষ ফল উৎপাদনকারী দশটি দেশ। বিশ্বে মোট ফল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ২৮তম। এটাও তো কম সুখের কথা নয়।

SHARE

Leave a Reply