Home খেলার চমক ক্যারিবিয়ান ক্যালিপসো -হাসান শরীফ

ক্যারিবিয়ান ক্যালিপসো -হাসান শরীফ

ক্যারিবিয়ান ঝড়ে সব রেকর্ড তছনছ হয়ে গেছে। এক সময়ের অপ্রতিরোধ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজ সাম্প্রতিক সময়ে হয়ে পড়েছিল ‘ক্রিকেটের রুগ্ণ দল’। কেউ তাদের পাত্তা দেয় না। এমনকি নিজ দেশেও নানা বঞ্চনার শিকার। এত অনাদর, অবহেলার জবাব একটাই হতে পারে। সেটা মাঠে দুর্দান্ত কিছু করে দেখানো। মাঠেই তান্ডব সৃষ্টি। তারা ঠিক তা-ই করল। আর আর তা-ই হ্যাটট্রিক শিরোপা তাদের ঘরে। ইতিহাসে কোনোকালে এমন ঘটনা ঘটেনি। সম্ভবত ঘটবেও না।
শুরুটা হয়েছিল বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দিয়ে। তাতে তারা চ্যাম্পিয়ন। তারপর ভারতে অনুষ্ঠিত টি-২০ বিশ্বকাপ। সেখানে নারী ও পুরুষ উভয় বিভাগে চ্যাম্পিয়ন। এটা তো আরো অবিশ্বাস্য ব্যাপার। একই দিনে দুই বিভাগে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের শিরোপা জয়! সম্ভবত কোনো খেলাতেই এমন ঘটনা ঘটেনি।
তা ছাড়া টি-২০ বিশ্বকাপ এই প্রথম দ্বিতীয়বারের মতো জয়ী হলো কোনো দল। এই দিক থেকেও ড্যারেন স্যামিরা নতুন রেকর্ড গড়লেন।
২০১৬ সালটা সত্যিই অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। কেবল তাদের কাছে নয়, পুরো ক্রিকেটবিশ্বের কাছেই। বিশেষ করে ড্যারেন স্যামিরা যেভাবে টি-২০ বিশ্বকাপ খেলল, তাতে সবাই অবাক হয়ে গেছে।
তাদের পথ চলাটা ছিল সত্যিই অদ্ভুত। সুপার টেনে প্রথম সারির সব দলকে হারানোর পর দুর্বল আফগানিস্তানের কাছে হেরে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে তাদের। মজার ব্যাপার হলো, আফগানদের কাছে হারার পর তারা কিন্তু মন খারাপ করে বসে থাকেনি। তারা আফগানদের আন্তরিকভাবে অভিনন্দিত করেছে, তাদের সাথে হাসিমুখে ছবি তুলেছে, নেচেছে। এমন ঘটনাও নজিরবিহীন।
আবার সেমিফাইনালে স্বাগতিক ভারতকে হারানোটাও ছিল বিরাট প্রাপ্তি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনালেও একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। হার না-মানার মানসিকতাই তাদের এগিয়ে দিয়েছে। একজনের দল নয়, তারা খেলেছে পুরো দল নিয়ে। ক্রিস গেইলের ওপর নির্ভর করে থাকেনি। বরং যুদ্ধের ময়দানে কেউ না কেউ এসে দলকে এগিয়ে নিতে সামনে এসেছে। লড়াই করে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে। যারা এগিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তাদের কেউ রুখে দিতে পারে না। ওয়েস্ট ইন্ডিজ তা আবার প্রমাণ করেছে।

শেষ ওভারের নাটক : ফাইনালে জয়ের জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রয়োজন ছিল ১৯ রানের। বোলার বেন স্টোকস। ব্যাটসম্যান কার্লোস ব্রেথওয়েট। এই পর্যায়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ হেরে গেলে কেউ এতটুকু আশ্চর্য হতো না। সবাই ইংরেজ অধিনায়ক মর্গ্যানের হাতে মনে মনে কাপ দেখছে। ঠিক এই সময় চারটে বিশাল ছক্কা মারলেন ব্রেথওয়েট। কোনোটার দৈর্ঘ্য আশি মিটার। কোনোটার পঁচাত্তর। কোনোটা পঁচাশি। মনে হচ্ছিল জাভেদ মিয়াঁদাদের শেষ বলে শারজার ছক্কা এর পর থেকে ক্রিকেটের স্কুলছাত্রদেরই কেবল পড়ানো হবে। চতুর্থ বলে আরেকটি চার হাঁকিয়ে শিরোপা নিশ্চিত করে ফেলল ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

ছক্কায় শুরু ছক্কায় শেষ : এবারের বিশ্বকাপে আরেকটি ঘটনা ঘটেছে অবিশ্বাস্যভাবে। তা হলো হলো, এই বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে ছক্কা দিয়ে, শেষও হয়েছে ছক্কা দিয়ে। মার্টিন গাপটিল ও কার্লোস ব্রাফেট যেন একই সূত্রে গাঁথা।
টি-২০ বিশ্বকাপের মূল পর্ব তথা সুপার টেনের লড়াই শুরু হয়েছিল গত ১৫ মার্চ। নাগপুরে যে ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল স্বাগতিক ভারত ও নিউজিল্যান্ড। আগে ব্যাট করতে নেমেছিল নিউজিল্যান্ড। অশ্বিনের করা ইনিংসের প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন কিউই ওপেনার মার্টিন গাপটিল। যদিও দ্বিতীয় বলেই আউট হয়েছিলেন গাপটিল। কিন্তু নিউজিল্যান্ড ম্যাচ জিতেছিল দাপট দেখিয়ে। ৩ এপ্রিল রোববার কলকাতার ইডেন গার্ডেনে ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ড। রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে ৪ উইকেটের জয়ে চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কার্লোস ব্রাফেট শেষটা করেছেন স্টোকসের বলে ছক্কা হাঁকিয়ে। ৬ বলে দরকার ছিল ১৯ রান, টানা চার বলে ছক্কা হাঁকিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করেন ব্রাফেট। সত্যিই, দারুণ। ছক্কায় বিশ্বকাপ শুরু, ছক্কায় বিশ্বকাপ শেষ।

প্রথম অধিনায়কের দু’টি শিরোপা
টি-২০ বিশ্বকাপে ড্যারেন স্যামিই একমাত্র অধিনায়ক, যার হাতে রয়েছে দু’টি শিরোপা। ২০১২ সালে তার নেতৃত্বেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতেছিল। তারপর এবার ২০১৬ সালে আবার তার দল চ্যাম্পিয়ন হলো তারই নেতৃত্বে। দারুণ রেকর্ড। এ ধরনের রেকর্ড আছে তার দেশেরই আরেক কিংবদন্তি ক্লাইভ লয়েডের। তবে সেটা আইসিসি একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। ওই সংস্করণে তারাই প্রথম দুইবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।

পরের বিশ্বকাপ অস্ট্রেলিয়ায়
টি-২০ বিশ্বকাপ দুই বছর পরপর হয়ে এলেও পরের আসরে পরিবর্তন এসেছে। পরের তথা সপ্তম আসরটা হবে চার বছর পর, ২০২০ সালে। আর সেটি হবে অস্ট্রেলিয়ায়। অস্ট্রেলিয়া মূল বিশ্বকাপের দু’টি আসর নিউজিল্যান্ডের সাথে যৌথভাবে আয়োজন করলেও টি-২০ আসরের স্বাগতিক হয়নি কখনই। ফলে ওই আসরে কয়টা দল খেলবে, বাছাইপর্বের ফরম্যাট কী এগুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আইসিসি হয়তো সহসাই করে ফেলবে সেটি। এটিও ঠিক, এ আসরে যারা খেলেছেন আগামী চার বছরে থাকবেন না তাদের অনেকেই। বয়সের ভারে ক্রিকেট ছাড়বেন কেউ কেউ। ফর্ম না থাকার জন্যও বাদ পড়বেন অনেকে। সেখানে হয়তো উড়বে নতুনের কেতন। বিশ্ব খুঁজবে নতুন পারফরমার।
সর্বোচ্চ রান তামিম ইকবালের

টুয়েন্টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ষষ্ঠ আসরে সবচেয়ে বেশি রান করেছেন বাংলাদেশের ড্যাশিং ওপেনার তামিম ইকবাল। ৬ ম্যাচে ২৯৫ রান করেছেন এই বাঁ-হাতি ওপেনার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান ভারতের বিরাট  কোহলির। ৫ ম্যাচে ২৭৩ রান করেছেন তিনি। তৃতীয় স্থানে আছেন ইংল্যান্ডের জো রুট। ৬ ম্যাচে ২৪৯ রান আছে রুটের।
বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে তিন ও সুপার টেনে তিন ম্যাচ খেলেন তামিম। প্রথম রাউন্ডে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ৮৩ রানে অপরাজিত ইনিংস খেলেন তিনি। পরের ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৪৭ রান করেন তামিম। প্রথম দুই ম্যাচের ফর্ম ধরে রেখে তৃতীয় ম্যাচে ওমানের বিপক্ষে সেঞ্চুরি হাঁকান বাংলাদেশের এই ওপেনার। ১০৩ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলেন তামিম।
অবশ্য সুপার টেনে ব্যাট হাতে উজ্জ্বলতা ছড়াতে পারেননি তামিম। পাকিস্তানের বিপক্ষে ২৪, ভারতের বিপক্ষে ৩৫ ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩ রান করেন তিনি। ফলে টুর্নামেন্টে ৬ ম্যাচে ২৯৫ রান সংগ্রহ জমা পড়ে তামিমের। তাই বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রানের সংগ্রহের তালিকায় শীর্ষেই থাকলেন তামিম। প্রথম দশজনের তালিকায় বাংলাদেশের আরও এক ব্যাটসম্যান রয়েছেন। সাব্বির রহমান। ৭ ম্যাচে ১৪৭ রান তুলে তালিকার নবম স্থানে রয়েছেন সাব্বির।

SHARE

Leave a Reply