Home নাটিকা অহঙ্কারী লাল গোলাপ -হুসনে মোবারক

অহঙ্কারী লাল গোলাপ -হুসনে মোবারক

(বসন্তকাল। বনের মধ্যে ফুটলো লাল টুকটুকে এক গোলাপ। ফোটার পর থেকেই গোলাপটি তার আপন সৌরভে নজর কেড়ে নিলো আশপাশের সবার। ছোট-বড় সব গাছ গোলাপের সৌন্দর্য আর সুগন্ধে মুগ্ধ হয়ে গেল।)
পাইন গাছ : গোলাপের কাঁটা দেখে আমি একদিন টিটকারি করেছিলাম। আজ আমি নিজেই অবাক হচ্ছি- আহ্! কী চমৎকারই না ফুলটি! আমি যদি এমন সুন্দর হতে পারতাম! তবে আমার সৌরভ ছড়িয়ে পড়তো চারদিকে।
অপরিচিত
একটি গাছ : দুঃখ করো না ভাই পাইন গাছ। তোমার তো একটা নাম আছে। পাইন গাছ! কিন্তু আজ পর্যন্ত আমার নামটাই আমি জানলাম না। কিযে করে বেটা বিজ্ঞনীরা! বনের মধ্যে আসলেই সব ছুটে ঐ চেনা গাছের কাছে। আমার নাম নেই বলে কেউ কাছেই আসে না। বেটা! একটা নাম দিয়ে দিলেই হয়! আমাদের কি আর তোমাদের মত আব্বা-আম্মা আছে যে জন্মের সাত দিনের মধ্যে আকিকা করে নাম রাখবে।
গোলাপের সত্যিই সৌভাগ্য! এমন সুন্দর লাল টুকটুকে গায়ের রং! কি সুবাস!  আহ্ ভাই গোলাপ একটু কাছে আস না, প্রাণভরে সুবাস নেই। আহ!
গোলাপ গাছ : হ্যাঁ ঠিকই বলেছ। এই বনের মধ্যে আমিই সবচেয়ে সুন্দর ও আকর্ষণীয় গাছ। আমার আছে আকর্ষণীয় সুবাস! মনোমুগ্ধকর রঙ। আমার সাথে অবশ্য তোমাদের কারোই তুলনা চলে না। আমিই সেরা!
পাইন গাছ : কেন তুমি এমন কথা বলছ? এই বনে তোমার মতো আরও অনেক সুন্দর সুন্দর তরুলতা আছে। তুমি কেবল তাদেরই একজন, এর চেয়ে বেশি কিছু নয়।
গোলাপ গাছ : (গর্ব করে) তুমি যা-ই বল না কেন, আমার তুলনা কেবল আমি। দেখ না আমার দিকে সবাই কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে!
(পাশের একটি ক্যাকটাস বা ফণীমনসা গাছের দিকে ইশারা করে)
দেখতো, এটা কত কুৎসিত একটি গাছ। ওর সমস্ত শরীরজুড়ে শুধু কাঁটা আর কাঁটা!
পাইন গাছ : (বিরক্ত হয়ে) এসব কী ধরনের কথা! তোমার কাছে যা সুন্দর, অন্যের কাছে তাই অসুন্দর মনে হতে পারে। আর তাছাড়া, তোমার গায়েও তো কাঁটা আছে।
গোলাপ গাছ : (কিছুটা অপমান বোধ ও ভীষণ রেগে) হে পাইন, আমি এতদিন ভাবতাম তোমার রুচি বোধহয় অন্যদের চেয়ে ভালো। এখন দেখছি সৌন্দর্য সম্পর্কে তোমার তেমন কোনো ধারণাই নেই! আমার কাঁটা আর ফণীমনসার কাঁটাকে তুমি এক করে ফেললে! লজ্জার কথা!
(কপাল কুঁচকে গোলাপ তার মূলটিকে ফণীমনসার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিতে চাইল। কিন্তু একচুলও নড়াতে পারল না তার মূলকে।)
ফণীমনসা গাছ : দেখ ভাই গোলাপ! আল্লাহ কোনো কিছুকেই উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি।
(এরপর বেশ কিছুদিন চলে গেল। বসন্ত শেষে শুরু হলো গ্রীষ্ম। আবহাওয়া গরম হতে থাকায় মাটি শুকিয়ে ফেটে যেতে লাগল। পানির অভাবে অনেক ছোট ছোট গাছের সঙ্গে অহঙ্কারী গোলাপ ফুলটিও শুকিয়ে যেতে লাগল। এতে গোলাপের সৌন্দর্য দিন দিন কমে যেতে থাকল। একদিন গোলাপটি দেখলো- কয়েকটি চড়–ই পাখি ফণীমনসার শাখা-প্রশাখায় ঠোঁট প্রবেশ করিয়ে কী যেন চুষে নিয়ে তৃৃপ্তির সঙ্গে উড়ে যাচ্ছে। বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো গোলাপ!)
গোলাপ গাছ : প্রতিদিনই দেখছি তোমার কাছে অনেক পাখি যাওয়া-আসা করছে। তোমার মত একটা কুৎসিত গাছের কাছে তারা কেন আসছে আমি ভেবে পাই না। আচ্ছা, বলতো কেন আসে তারা?
(ফণীমনসা গাছ মুচকি হাসে, কিছুই বলে না।)
পাইন গাছ : আরে বোকা, পাখিরা ফণীমনসার শরীরে ঠোঁট ঢুকিয়ে পানি সংগ্রহ করছে। এই গ্রীষ্মের তাপদাহে তাদের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে
গোলাপ গাছ : (বিস্মিত হয়ে) পাখিরা যখন ফণীমনসার শরীরের ঠোঁট ঢুকিয়ে দেয় তখন সে ব্যথা পায় না?
পাইন গাছ : ব্যথা পায় বটে, কিন্তু সে কোনো পাখির কষ্ট দেখতে চায় না।
গোলাপ গাছ : হায়! এই গাছটির মধ্যে পানি আছে! অথচ আমি পানির জন্য কষ্ট পাচ্ছি।
পাইন গাছ : ফণীমনসার শরীর থেকে তুমিও পানি পান করতে পার। তুমি যদি ওর কাছে পানি চাও তাহলে চড়–ইরা ওর শরীর থেকে তোমাকে পানি এনে দিতে পারবে।
গোলাপ গাছ : ক’দিন আগে ফণীমনসাকে যেভাবে অপমান করেছি। আসলে আমার বেশ লজ্জা হচ্ছে ফণীমনসার কাছে পানি চাইতে। কিন্তু পানি ছাড়া আমারওতো বেহাল অবস্থা।
ইয়ে ভাই ফণীমনসা! আমাকে একটু পানি দেবে ভাই? গ্রীষ্মের কাঠফাটা তাপে আমার প্রাণবায়ু যে যায় যায়! দাও না ভাই দয়া করে একটু পানি।
(ফণীমনসা হাসিমুখে গোলাপকে পানি দিতে রাজি হয়। এরপর চড়–ইরা তাদের ঠোঁট ভর্তি করে পানি এনে গোলাপ গাছের গোড়ায় ঢালতে লাগল। গোলাপ আবার সতেজ হয়ে উঠলো। অন্যরকম এক উপলব্ধিতে ভরে গেলো গোলাপ গাছের মন।)
গোলাপ গাছ : আসলে কোনো সৃষ্টিরই অহঙ্কার করা সাজে না। গর্ব ও অহঙ্কার একমাত্র আল্লাহর জন্যই প্রযোজ্য।

সংগৃহীত

SHARE

Leave a Reply