Home ধারাবাহিক: দুর্গম পথের যাত্রি দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ

দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ

গত সংখ্যার পর

‘তুমি যতটা হালকাভাবে বিষয়টি দেখছো সম্ভবত বিষয়টি তত সহজ নয়।’ হারকিউলিস এক যুবতীর হাত থেকে মদের পেয়ালা নিতে নিতে বলল, ‘যাকগে ওসব কথা। এখন বলো তুমি কী ভাবছো?’
‘আমি কি ভাবছি সেটা আপনি জানেন। আমার অভিপ্রায় আমি আপনাকে আগেই বলেছি। আপনি বিশাল সা¤্রাজ্যের স¤্রাট। সৈন্য সংখ্যাও অনেক। আপনি যে পরিমাণ সৈন্য নিয়ে এসেছেন, সে পরিমাণ সৈন্য আমিও জোগাড় করেছি। আমি আগেও বলেছি, আমাদের লড়াই আমাদের কোনো ফায়দা দেবে না, এর ফায়দা নেবে মদিনার মুহাম্মদ। তার দূতকে হত্যা করে আমি তাকে জানিয়ে দিয়েছি, তার শক্তিকে আমি গণনার মধ্যে ধরি না। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সে যদি অভিযান চালায় তবে সে কেন্দ্র থেকে দূরে সরে এসে আরো দুর্বল হয়ে পড়বে। মদিনায় না গিয়েই আমরা মদিনার শক্তিকে কাবু করতে পারবো। আর সে যদি ভয়ে পথে না নামে তবে মদিনা আমাদের করতলগত হবে। আমি আপনাকে এও বলেছি, বিজিত অঞ্চলের প্রতি আমার কোনো লোভ নেই, আপনি আমার অঞ্চলের দিকে নজর দেবেন না, এটুকু হলেই আমি আপনাকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। কিন্তু যদি আপনি আমার অঞ্চলের দিকে চোখ দেন, তবে মনে রাখবেন, আমরা বংশগতভাবেই যোদ্ধা। আপনার আমার সৈন্যও প্রায় সমসংখ্যক। আপনি যুদ্ধ করবেন আপনার কেন্দ্র থেকে দূরে এসে আর আমি আমার চিরপরিচিত মাটিতে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করবো। যেখানে প্রতিটি শিশুও আপনাকে শত্রু ভাববে, পাহাড়ের প্রতিটি চড়াই উতরাই আপনার প্রতিপক্ষ হয়ে যাবে।’
‘তুমি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছো?’ বলল স¤্রাট হারকিউলিস।
‘এটাকে যদি আপনি ভয় মনে করেন তবে জানবেন, ভয় আমি শুধু আপনাকে দেখাচ্ছি না, নিজেকেও দেখাচ্ছি। আমাদের জন্য মদিনায় শত্রু শক্তি সঞ্চয় করছে। যত তাকে অবকাশ দেবো সে আরো শক্তিশালী হবে। আসুন, বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে আমরা আমাদের উভয়ের দুশমনকে নিপাত করি।’
‘হ্যাঁ, আমি তোমার কথা বুঝতে পেরেছি। কিন্তু মনে রেখো, যুদ্ধ শেষে বিজিত অঞ্চলের ভাগ আবার চেয়ে বসো না।’ বলল স¤্রাট হারকিউলিস।
‘না, আমাদের যেটুকু আছে তা নেহাত কম নয়। আমার সম্প্রদায় এটুকু করে খেতে পারলেই স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটাতে পারবে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে এখনো আপনি আমার কথা পুরোপুরি বুঝতে পারেননি।’
‘কেন, কেন তোমার এমনটি মনে হলো?’
‘আপনার সৈন্যরা যেভাবে গ্রামবাসীদের ওপর অত্যাচার করছে তা মোটেই বন্ধুসুলভ নয়। যদি আমাকে বন্ধু গণ্য করেন তবে অবিলম্বে আপনার সৈন্যদেরকে বলে দিন, তারা যেন গ্রামবাসীদের ওপর অত্যাচার না করে।’
স¤্রাট হারকিউলিস মুচকি হেসে বলল, ‘ও, এই কথা! ঠিক আছে আমি তাদের বলে দেবো। আর অত্যাচার করবেই বা কখন? আমরা কি এখানে বসে থাকবো? তুমি তৈরি থাকলে চলো আমরা মদিনার দিকে রওনা হই।’
‘হ্যাঁ আমি প্রস্তুত। আমাকে তাহলে বিদায় দিন, দু’দিনের মধ্যেই আমি আমার বাহিনী নিয়ে আপনার সাথে মিলিত হবো।’

মদিনার তিন হাজার মুজাহিদ মদিনা থেকে অনেক দূর চলে এসেছে। তাদের আগমনসংবাদ যেমন জানে না হারকিউলিস বা গাসসানের সরদার, তেমনি তাদের তৎপরতার খবরও জানা নেই মুজাহিদদের। মুতা থেকে সামান্য দূরে মুয়ান নামক স্থানে এসে তাঁবু গাড়ল মুজাহিদরা। উদ্দেশ্য, সামনের পরিস্থিতি কী তা জেনে নিয়ে অগ্রসর হওয়া। কারণ, মুতার পরিস্থিতি তাদের কিছুই জানা নেই। সামনে শত্রু আছে কি না, থাকলে কী পরিমাণ এসব না জেনে অভিযান পরিচালনা করা যায় না। তাই মুজাহিদ কমান্ডার ব্যবসায়ীর বেশে তিনজনকে সামনে পাঠিয়ে দিলো। তাদের বলল, ‘শত্রুর গতিবিধি ঠিকমত জেনে তবেই ফিরবে তোমরা। তোমাদের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেবো।’
গোপনে ব্যবসায়ীর বেশে তিন গোয়েন্দা অনেক দূর এগিয়ে গেল। পথে এক ছোট্ট কাফেলার সাথে দেখা হলো তাদের। গাসসানের এক ধনাঢ্য পরিবার। সাথে বেশ ক’জন যুবতী মেয়ে। সঙ্গে বেশ কয়েকটি উটের পিঠে অনেক মালসামান। মুজাহিদরা বলল, ‘আমরা ব্যবসায়ী। সিরিয়া যাচ্ছি মালপত্র কিনতে।’
অবাক হয়ে কাফেলার একজন বলল, ‘বলো কি! ফিরে যাও, ফিরে যাও। জানো না এদিকে কি হচ্ছে? ওদের হাতে পড়লে টাকাকড়িতো যাবেই, প্রাণটাও যেতে পারে!’
বিস্মিত মুজাহিদরা বলল, ‘কারা? কাদের কথা বলছো তুমি?’
‘ওহ, তোমরা দেখছি কিছুই জানো না। খ্রিষ্টান স¤্রাট হারকিউলিস আস্তানা গেড়েছে জর্ডানের সীমান্তে। বস্তির পর বস্তি উজাড় হচ্ছে তাদের হাতে।’
‘কী বলছেন আপনি?’
‘আমি ঠিকই বলেছি। আর সে জন্যইতো আমরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছি। আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন আমাদের সাথে অনেকগুলো মেয়ে। আমাদের চোখের সামনে তাদের অপমান সইবো কেমন করে? সে জন্যই তো পালিয়ে যাচ্ছি আমরা।’
‘ওরা সংখ্যায় কি অনেক বেশি?’
‘হ্যাঁ, অনেক। তবে প্রকৃত সংখ্যাটা আমাদের জানা নেই। তাদের সাথে আমাদের দেখা হয়নি তো! তবে লোকমুখে শুনেছি তারা সংখ্যায় অনেক।’
‘তাই বলুন, তবে তো আমাদের ফিরে যাওয়াই উচিত। বাড়িঘর ছেড়ে এতদূর এসে কোনো বিপদে পড়লে কে আমাদের দেখবে?’
কাফেলার এক প্রবীণ বলল, ‘তাই করুন। দেখছেন না আমরা পঙ্গপালের হাত থেকে পালিয়ে যাচ্ছি। আপনারাও পালান।’
মুজাহিদ তিনজন কাফেলা থেকে সরে অন্য পথ ধরলো। তাদের জন্য এ ছিল এক ভয়ঙ্কর খবর। কিন্তু সৈন্যদের সংখ্যা ও গতিবিধির সংবাদ না নিয়ে তো ফিরে যাওয়া যায় না। তাই তারা চলতে চলতে এক গাসসান পল্লীতে প্রবেশ করলো। গ্রামবাসীকে তারা বলল, ‘আমরা ব্যবসা করতে সিরিয়া যাচ্ছিলাম। পথে ডাকাতদল আমাদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে। আমাদের একটু আশ্রয় দাও, পারলে সামান্য খাবারও দাও।’
মরুভূমিতে এ রকম দুর্ভাগ্য যে কারো ঘটতে পারে, তাই সবাই এ ধরনের বিপদগ্রস্তদের সহায়তায় এগিয়ে আসে। এদের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটলো না। গাঁয়ের লোক প্রচুর খাবার দাবার এনে তাদের সামনে রাখলো। তারা গ্রামবাসীকে শোনালো ডাকাতের কবলে পড়ার বানানো গল্প। গল্পচ্ছলে তারা সংগ্রহ করলো ভয়ঙ্কর সব তথ্য। তারা জানতে পারলো, জর্ডানের শাসক ও হারকিউলিসের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। গাসসান সরদার তাদের সৈন্য হারকিউলিসের সৈন্যের সাথে একাত্ম করে মদিনার দিকে রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের মধ্যে দেখা দিল পেরেশানি। কখন এ খবর তারা সঙ্গীদের পৌঁছাবে? গাসসান সরদার ও হারকিউলিসের নেতৃত্বে দুই লক্ষ সৈন্য পথ ধরেছে মদিনার। অপর দিকে মদিনার তিন হাজার মুজাহিদ ছুটছে দূত হত্যার বদলা নিতে। কী হবে এখন?

হারকিউলিস ও গাসসানদের সম্মিলিত বাহিনী মদিনার দিকে রওনা হয়ে গিয়েছিল। মুতার অদূরে মায়ান নামক স্থানে অবস্থান করছিল দূত হত্যার বদলা নিতে আসা তিন হাজার মুজাহিদ। খবর সংগ্রহের জন্য যে দলটিকে পাঠানো হয়েছিল তারা এখনো ফেরেনি। খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে গাঁয়ের বস্তিতে অনেক রাত পর্যন্ত তারা গ্রামবাসীদের সাথে গল্প করলো। ভেতরে ভেতরে কখন সঙ্গীদের সাথে মিলিত হবে সে জন্য তারা ছিল অস্থির। কিন্তু বাইরে তার কিছুই প্রকাশ করলো না। ভোর হলো। সূর্যের তাপ বাড়ার আগেই পথ এগিয়ে নেয়ার কথা বলে সূর্য ওঠার আগেই তিন গোয়েন্দা পথে নামল। গ্রামের মানুষের দৃষ্টির আড়ালে এসেই ঘোড়া ছুটালো তীব্রগতিতে। পরদিন তারা যখন মুজাহিদ বাহিনীর সাথে মিলিত হলো তখন তাদের অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। ক্লান্তিতে মরার মত ঘোড়ার ওপর নেতিয়ে পড়েছিল ওরা। মুজাহিদরা তাদেরকে সেনাপতি জায়েদ বিন হারিসার তাঁবুতে পৌঁছে দিল।
সেনাপতি তিনজনই ঘটনা জানতে পারলেন। একদিকে দুই লক্ষ, কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে এক লক্ষ সৈন্য, অন্য দিকে মাত্র তিন হাজার মুজাহিদ। এ অবস্থায় কী করা যায় এ নিয়ে ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন সেনাপতিগণ। স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী এই বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার পরিবর্তে মদিনায় ফিরে যাওয়াই উচিত ছিল, কিন্তু রাসূলের পর পর তিনজন সেনাপতি নির্বাচনের ইঙ্গিতটা স্পষ্টতই বলছে, এ বাহিনী মরণপণ লড়াই করবে। তাহলে ফিরে যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে কোত্থেকে? সুতরাং সেনাপতি জায়েদ সবাইকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বললেন। তিনি বললেন, যদি আমরা ফিরে যাই তবে হারকিউলিস ও গাসসানদেরকে মদিনা আক্রমণের দাওয়াত দেয়া হয়। তার মানে দাঁড়ায়, তোমরা বিনা বাধায় মদিনা চলে এসো। এটা আমরা কিছুতেই করতে পারি না।’
তার কথার প্রতিধ্বনি করে সেনাপতি আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা বললেন, ‘একদম ঠিক কথা। আমরা বিনা বাধায় দুশমনকে মদিনার পথে এগিয়ে যেতে দিতে পারি না। শত্রু যেই হোক আর যত শক্তিশালীই হোক তাদেরকে আমরা এখানেই বাধা দেবো।’ সুতরাং তারা মুয়ান নামক স্থানেই তাদের অগ্রযাত্রা সীমাবদ্ধ করলেন।
এক মুজাহিদ জানতে চাইল, ‘আমরা কি এই অল্পসংখ্যক সেনা নিয়ে ওদের মোকাবেলা করতে পারবো?’
‘আমরা কোন ময়দানেই অল্পসংখ্যক ছিলাম না।’ জায়েদ বিন আবি তালিব বললেন, ‘আল্লাহ যতটুকু প্রয়োজন মনে করেছেন ফেরশেতা দিয়ে ততটুকু ঘাটতি পূরণ করে দিয়েছেন।’
অন্য একজন বলল, ‘এ অবস্থায় আমাদের পক্ষ থেকে কেউ যদি মদিনায় গিয়ে রাসূলের অনুমতি ও পরামর্শ নিয়ে আসে সেটাই কি ভালো হয় না?’
সেনাপতির স্পষ্ট জবাব, ‘আমরা এই সময়টুকুও নষ্ট করতে পারবো না। শত্রুরা আমাদের সে সময় দেবে না। আল্লাহর কসম, আমরা শত্রুদের জানতেই দেবো না আমরা কত সংখ্যক আছি। তাদের এ কথা মনে করার কোনো সুযোগ আমরা দেবো না যে, তাদের বিপুল সংখ্যক সৈন্য দেখে আমরা ভয় পেয়েছি।’
জায়েদ বললেন, ‘আর আমরা মদিনায় এ কথাও বলতে যাবো না যে, আমরা পিছিয়ে এসেছি।’ তিনি বললেন, ‘বরং আমরা জীবন কোরবানি করে জীবিতদের জন্য দৃষ্টান্ত রেখে যাবো।’
আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা তখন দাঁড়িয়ে গেলেন এবং উপস্থিত মুজাহিদদের সামনে জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখলেন। তিনি বললেন, ‘গাসসানদের এক লাখ সৈন্য দায়ে ঠেকে যুদ্ধে এসেছে। মূলত আমাদের বিরুদ্ধে লড়তে এসেছে খ্রিষ্টানরা। তারা যেমন ধর্মের জন্য যুদ্ধ করতে এসেছে তেমনি আমরাও ধর্মের জন্য লড়াই করতে এসেছি। আমরা আমাদের ধর্মকে ভালোবাসি, দ্বীনকে ভালোবাসি, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি। আমরা যুদ্ধে এসেছি এই ভালোবাসার টানে। আমরা কি করছি আল্লাহ দেখছেন। তিনি যদি আমাদের ভাগ্যে শাহাদাত লিখে থাকেন সেটাকে আমরা আমাদের পরম সৌভাগ্য মনে করবো। আর তিনি যদি আমাদের বিজয় মঞ্জুর করে থাকেন তবে দুনিয়ার কোন শক্তি নেই আমাদের পরাজিত করে। চরম ক্ষমতাধর নমরুদকে আল্লাহ মশা দিয়ে শেষ করেছেন। মিশরের ফেরাউনকে শেষ করেছেন পানিতে ডুবিয়ে। অতএব যার ভাগ্যে যা আছে তা ঘটবেই। ভবিষ্যতে কী ঘটবে সেটা ভাবার মতো সময় নেই আমাদের। আমাদের সামনে দুশমন, তাদের সাথে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত হওয়া ছাড়া আমাদের আর কোন ভাবনা নেই।’ তিনি মুজাহিদদের লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেয়ার কথা বললেন। মুজাহিদগণ এ বক্তৃতায় এতটাই উজ্জীবিত হলো যে, আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তারা আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিতে লাগলো। সেনাপতি জায়েদ মুজাহিদদের এ জজবা দেখে তাদের অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, সেদিন মুজাহিদগণ জেনেবুঝেই নিজেদেরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল। এমন ভয়াবহ পরীক্ষায় নিজেদের নিক্ষেপ করলো যার দৃষ্টান্ত দুনিয়ায় বিরল।
গাসসান সরদার এবং হারকিউলিস খবর পেল যে, দূত হত্যার বদলা নিতে মদিনা থেকে একদল সৈন্য এগিয়ে আসছে। এ খবর পেয়ে মনে মনে হাসলো তারা। তারা কোন ধারণাই করতে পারলো না, এরা কতটা মরিয়া। বরং অল্প কয়জন সৈন্যকে পিষে মারার জন্য তারাও তাদের গতি দ্রুত করলো।
উভয় বাহিনীই দ্রুত অগ্রসর হচ্ছিল। মুজাহিদগণ বালকা নামক স্থানে গিয়ে পৌঁছলো। মুজাহিদ বাহিনী আরও অগ্রসর হতে চাচ্ছিল, কিন্তু তাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াল গাসসানদের একদল সৈন্য। এরা সংখ্যায় মুসলিম বাহিনীর তিনগুণেরও অধিক ছিল। গাসসান বাহিনী তাদের পথরোধ করে দাঁড়ালে সেনাপতি জায়েদ মুজাহিদদের থামিয়ে দিলেন। তিনি ময়দান ঘুরে দেখলেন, যুদ্ধের জন্য জায়গাটি উপযুক্ত নয়। তিনি সুবিধাজনক জায়গায় দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করার মানসে মুজাহিদদের পেছনে সরে যেতে বললেন।
মুজাহিদরা পিছু হটছে দেখে গাসসানরা ভাবলো, মুসলমানরা ভয় পেয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। তাই তারা মুজাহিদদের পিছু নিলো। সেনাপতি জায়েদ (রা) কিছুদূর গিয়ে একটি সুবিধাজনক স্থানে দাঁড়িয়ে গেলেন। সৈন্যদের তিনি তিনটি ভাগে ভাগ করলেন। তিনি মাঝখানে অবস্থান নিয়ে একদলকে ডানে ও অন্য দলকে বাঁয়ে অবস্থান নিতে বললেন। ডান দিকের নেতৃত্বে দিলেন কোতায়বা বিন কাতাদাকে আর বামদিকের দলের নেতৃত্বে দিলেন আবায়া বিন মালেককে। মাঝের দলের নেতৃত্ব তিনি নিজেই নিলেন।
‘আল্লাহর দ্বীনের প্রেমিকগণ!’ সেনাপতি জায়েদ উচ্চস্বরে মুজাহিদদের উদ্দেশ করে বললেন, ‘আজ আমাদের প্রমাণ করতে হবে আমরা সত্যি সত্যি সত্য দ¦ীনের অনুসারী। প্রমাণ করতে হবে আমরা আরবের শ্রেষ্ঠতম সন্তান আল্লাহর দ্বীনের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর যথার্থ উম্মত। এসো আমরা বাতিলের পায়ের তলের মাটি সরিয়ে দিই। সামনে বাতিল সৈন্য যত বেশি পাবে ততই তোমার বাহাদুরি দেখানোরও সুযোগ বেশি পাবে। এ যুদ্ধ দু’টি দলের লড়াই নয়, এ যুদ্ধ সত্য ও মিথ্যার লড়াই। এ যুদ্ধ হক ও বাতিলের লড়াই। এ যুদ্ধে তারাই বিজয়ী হবে যাদের সাহস, উদ্দীপনা ও বুদ্ধি বেশি। যাদের সহায় একমাত্র আল্লাহ। আমি তোমাদের সেনাপতি ও দ্বীনের পতাকাবাহী। আমি বলছি, তাদের সৈন্য এত বেশি যে, আমরা তাদের মাঝে হারিয়ে যেতে পারি। কিন্তু মুজাহিগণ, তোমরা তোমাদের বুদ্ধি হারিয়ে ফেলো না। হিম্মত হারিয়ে ফেলো না। আমরা এক সাথে মদিনা থেকে বেরিয়ে এসেছি, এক সাথে পথ চলেছি। যদি মরতে হয় আমরা এক সাথেই মরবো।’ জায়েদ (রা) পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরলেন।
গাসসানরা মুসলমানদের দাঁড়িয়ে যেতে দেখে নিজেরাও দাঁড়িয়ে পড়লো। তারা ভাবতেই পারেনি এই অল্প ক’জন মুজাহিদ তাদের চ্যালেঞ্জ করে বসতে পারে। গাসসানদের সেনাপতি নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে মুজাহিদদের লক্ষ্য করলেন। এরপর তিনি তার সৈন্যদের হুকুম দিলেন, ‘তীর চালাও।’
সেনাপতির নির্দেশে ডান ও বামের সৈন্যরা আগেই দূরে সরে পড়েছিল। তীর সরাসরি মাঝখানের বাহিনীর দিকে ছুটে এলো। গাসসানদের আক্রমণ করতে দেখে ডান ও বামের সৈন্যরা এগিয়ে এলো। মাঝের বাহিনীকেও এগোবার হুকুম দিলেন জায়েদ (রা)। তিনি নিজেই ছিলেন বাহিনীর অগ্রভাগে। এ যুদ্ধের নিয়মই ছিল এরকম। সেনাপতিকেই সামনে থাকতে হতো। নইলে বাহিনীর প্রেরণা ও উদ্যমে ভাটা পড়তো। শত্রুদের আক্রমণের লক্ষ্যও থাকতো সেনাপতি। কারণ সেনাপতি নিহত হলে যুদ্ধের শক্তি ও সাহস হারিয়ে ফেলতো বাহিনী।
সেনাপতি জায়েদ (রা) আরও অগ্রসর হয়ে তীর চালাতে হুকুম দিলেন। মুজাহিদগণ দুশমনের তীর উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে গেল। তীর এসে বিদ্ধ হলো সেনাপতি জায়েদ (রা)-এর শরীরে। শরীর থেকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল। কিন্তু তিনি পতাকা হাতে সম্মুখে অগ্রসর হতেই থাকলেন। তার সাথে মুজাহিদ বাহিনীও এগিয়ে চলল এবং ক্রমাগত তীর নিক্ষেপ করতে লাগলো। জায়েদ (রা) এগিয়ে যাচ্ছিলেন আর সৈন্যদেরও এগিয়ে যাওয়ার জন্য ক্রমাগত উৎসাহ দিচ্ছিলেন।
গাসসানরা ভাবতেই পারেনি এই অল্প কজন মুজাহিদ এভাবে মরণপণ লড়াই শুরু করে দেবে। জায়েদ (রা)-এর দেখাদেখি ডান ও বামের বাহিনীও তীর ছুড়তে ছুড়তে দ্রুত এগিয়ে চলল। গাসসানরা ভেবেছিল, ডান ও বামের বাহিনী মূল বাহিনী থেকে দলছুট হয়ে পড়েছে। অচিরেই তারা টের পেল, এরা কোন দলছুট বাহিনী নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে যুদ্ধের কৌশল হিসেবেই মুসলমানরা এ পথ বেছে নিয়েছে।
তীব্র লড়াই চলছে। শরীর থেকে রক্ত ঝরছে সেনাপতি জায়েদ (রা)-এর। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তাঁর। হতভম্ব দুশমন বাহিনীর সৈন্যরা লুটিয়ে পড়ছে পাকা ফলের মত। কিন্তু সংখ্যায় তারা তিন গুণ। ফলে মনোবল হারালো না তারা। তীর চালাতে লাগলো বৃষ্টির মত। একসময় সেনাপতি জায়েদ (রা)-এর শক্তি নিঃশেষ হয়ে এলো। তিনি লুটিয়ে পড়লেন তপ্ত বালুকারাশির ওপর। তাঁর পবিত্র রক্তে ভিজে গেল শুকনো বালুকারাশি। মুজাহিদদের চোখের সামনে শেষ নিঃশাস ত্যাগ করলেন সেনাপতি জায়েদ বিন হারিসা (রা)। সাথে সাথে পতাকা হাতে নিলেন দ্বিতীয় সেনাপতি জাফর বিন আবি তালিব (রা)। বললেন, মুজাহিদ ভাইয়েরা, আল্লাহ নিজে বলেছেন, দ্বীনের পথে যারা শহীদ হয় তাঁরা মরে না। বরং তারা জীবিত। তাঁরা জীবনকে ধন্য করে আল্লাহর মেহমান হয়ে যায়। জায়েদ বিন হারিসার মতো আর কারা আল্লাহর মেহমান হওয়ার স্বপ্ন দেখছো? তারা আমার পেছনে এসো। আমরা দুশমনের সামনে বুক পেতে দেবো, পিঠ নয়। তার এ আহবান যেন ছিল দিয়াশলাইয়ের জ¦লন্ত অগ্নিশলাকা। ক্লান্ত সৈনিকরা নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়লো গাসসানদের ওপর। কিন্তু তিনিও ছিলেন রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত। লড়াইয়ের তীব্রতা দেখে দুশমন শিবিরে হতাশা নেমে এলো। এ সময় ঘটে দ্বিতীয় বিপর্যয়। জাফর বিন আবি তালিবও শাহাদাতের পেয়ালা পান করে চলে যান আল্লাহর দরবারে। পতাকা তুলে নেন তৃতীয় সেনাপতি আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা। এত দ্রুততার সাথে তিনি পতাকা উঠিয়ে নেন যে, পতাকা যে হাতবদল হয়েছে সেটা দুশমন খেয়ালই করতে পারেনি। ময়দানজুড়ে পড়েছিল দু’পক্ষের অসংখ্য লাশ। আহতরা কাতরাচ্ছিল অক্ষম আক্রোশে। লড়াই চলছিল তীব্র থেকে তীব্রতর বেগে। এ যেন অনন্ত পথযাত্রা। তাদের সামনে যুদ্ধ ছাড়া আর কোনো পৃথিবী ছিল না। শাহাদাতের পেয়ালা পান করা ছাড়া আর কোন আনন্দের বিষয় ছিল না। দুশমনের পায়ের তলের মাটি সরানো ছাড়া আর কোন কাজ ছিল না তাদের। সেটাই করছিল তারা। লড়াই করছিল অসম সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল এক জায়গায়। তীরের শনশন আওয়াজের মধুর ধ্বনি যেন তাদের সম্মোহিত করে রেখেছিল। কিন্তু দশহাজার বাহিনীর বিরুদ্ধে কতক্ষণ লড়বে তিন হাজার মুজাহিদ? তাদের বাহুর অমিত তেজ কতক্ষণ অক্ষুন্ন থাকবে? আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহার ক্ষতবিক্ষত দেহ ও রক্তের ¯্রােত বেশিক্ষণ তাঁকে যুদ্ধের অনুমতি দিল না। একসময় তিনিও শহীদ হয়ে গেলেন। সেনাপতি আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা)-এর পাশেই ছিলেন হারেস বিন আকরাম (রা)। নেতার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছিলেন তিনি। সেনাপতির হাত থেকে পতাকা পড়তে দেখেই তিনি খপ করে ধরে ফেললেন তা। বিষাদে ভরে গেল তাঁর অন্তর। রাসূলের মনোনীত তিনজন সেনাপতিই যে শহীদ হয়ে গেলেন! এবার কে নেবে এই পতাকার ভার? তিনি সঙ্গের মুজাহিদদের বললেন, প্রিয় মুজাহিদ ভাইয়েরা, রাসূলের মনোনীত তিনজন সেনাপতিই শহীদ হয়ে গেছেন। রাসূল বলেছিলেন, যদি যুদ্ধে পর পর তিনজন সেনাপতিই শহীদ হয়ে যান, তবে তোমরা নিজেরাই নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে সেনাপতি বানিয়ে নেবে। এখন সেই কঠিন মুহূর্ত। তোমরা তোমাদের নেতা নির্বাচন করে নাও। তোমরাই বলো এখন এই পতাকা আমি কার হাতে দেবো?    (চলবে)

SHARE

Leave a Reply