Home তোমাদের গল্প মা -দীদার মাহদী

মা -দীদার মাহদী

মা। একটি অক্ষর। একটি আকার। এই ছোট্ট শব্দটির মাঝে কত কিছু লুকিয়ে আছে। মরু প্রান্তরে প্রাণ ফিরে পাওয়ার মতো শব্দ। সকল ভালোবাসার রেখা যেনো ওই মা শব্দে গিয়ে মিলিত হয়েছে। কী চমৎকার! কী মধুমাখা এক শব্দ। তুলনাহীন অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক ভালোবাসার উৎসের জায়গা মা। মা মা-ই। তার সাথে তুলনা করার কিছু নেই পৃথিবীতে। মায়ের ভালোবাসার ওজন অনেক গভীর। তা পরখ করে দেখার ক্ষমতা কারো নেই। রাব্বুল ইজ্জত এতো ভালোবাসা দিয়েই মাকে বানিয়েছেন। সকল ভালোবাসার কাছে মায়ের ভালোবাসা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় নিমিষেই। কোনো ভালোবাসাই এখানে টিকে না। টিকতে পারে না। কেবল মা-ই নিঃস্বার্থভাবে সন্তানকে ভালোবাসেন। নিজের হাজারো কষ্ট-দুঃখের মাঝে সন্তানের ভালো চান। কল্যাণ কামনা করেন। যন্ত্রণায় থেকেও সন্তানকে জান্নাতি হাসি উপহার দেন। নিজের জীবনকে সন্তানের জন্য উৎসর্গ করে দেন। মাথা পেতে নেন সব বিপদ আপদ। একমাত্র মায়ের দ্বারাই এতো কিছু সম্ভব?
সাইফ এভাবেই তার মাকে নিয়ে ভাবছিলো। সাইফরা তিন ভাই। কোনো বোন নাই। সাইফই বড়। আম্মু মেট্রিক পাস। আব্বু ইন্টার পাস। আম্মুর মেট্রিকের বছর বিয়ে হয়। পরীক্ষার আগেই জন্ম হয় সাইফের। পরীক্ষা দেয়া না দেয়ার দোলাচলে যখন আম্মু ভুগছিলেন, তখন আব্বুর কড়া সিদ্ধান্তে পরীক্ষা দিতে হবে। সবকিছুর ব্যবস্থা আব্বুই করে দেন। আম্মু ছোট্ট সাইফকে নিয়ে অবর্ণনীয় কষ্ট করে এসএসসি পরীক্ষা দেন। সম্মানের সাথেই পাস করেন। জীবনটা ভালোই যাচ্ছিলো সাইফ ও তার আম্মুর। জীবনের রঙ তখনই বদলালো। যখন আম্মু সাইফদের বাড়িতে গেলেন। সেখানে গিয়ে শুনতে পান সাইফের আব্বু আগে আরেকটি বিয়ে করেছেন। সামাজিকভাবে নয় গোপনে। সে মহিলার বাড়ি কাছেই। মহিলাকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন। সাইফের আম্মুর মনটা খারাপ হয়ে গেলো। তিনি মনে ভীষণ আঘাত পেলেন। সাধারণত মহিলারা এই ধরনের পুরুষদের সংসার করতে মোটেও প্রস্তুত নন। সাইফের আম্মু বিষয়টাকে স্বাভাবিকভাবে নিলেন না। তিনি সাইফের আব্বুকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করলেন। আব্বু অস্বীকার করলেন। না, কিছুতেই না। অসত্য কথা। যে বা যারা বলছে, মিথ্যা বলছে। মোটেই এমনটা নয়। মহিলা আমার কাছে কিছু টাকা পাবে। এর বেশি কিছু নয়। সাইফের আম্মুর কাছে তার বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না। অনেকেই ডিভোর্স দেয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। ভালো সম্বন্ধও এসেছিলো! এই প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলো, সাইফকে আপন সন্তানের মতো লালন পালন করবে। সাইফের আম্মু ভীষণ শক খেলেন। একমাত্র সাইফের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি অন্যকোন সিদ্ধান্ত নেননি।
ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছিল, সাইফের আব্বুর দ্বিতীয় বিবাহের কথা। যদিও ওই স্ত্রীকে তিনি বাড়িতে উঠাতে পারবেন না। সেও উঠবে বলে মনে হয় না। বয়স্কা মহিলা। আগেও দুটো বিয়ে হয়েছে। সে ঘরে সন্তান আছে। সাইফের আম্মু ভেবে পান না। এই কি ছিলো ভাগ্যে! সবকিছু মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিলেন। এরপর সাইফের আরো দুটি ভাই এলো। তার বাবার সুমতি ফিরলো বলে মনে হলো না। হঠাৎ কী হলো! সাইফের আব্বু নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন। তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না। জীবনের ছন্দপতন ঘটলো। জীবন ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠলো সাইফের আম্মুর। জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার প্রত্যয়ে হাল ছাড়লেন না তিনি। অবর্ণনীয় কষ্ট ক্লেশ করে সন্তানদের লেখাপড়া করিয়ে যাচ্ছিলেন?
সাইফ জেডিসি পরীক্ষা দেবে সেবার। বাড়ি থেকে বহুদূর কেন্দ্র। ওখানে থেকে পরীক্ষা দিতে হবে। সবার কাছ থেকে বিদায় নিলেও আম্মু পিছু ছাড়ছেন না। অনেক দূর পর্যন্ত এলেন। অভয় দিলেন। দোয়া করলেন। সবিশেষ বিদায়ে তিনি কেঁদে ফেললেন। সাইফের চোখও ছলছল। এই মহিলাটি বাবার অভাব পূরণ করছেন। কত না কষ্ট সহ্য করেছেন। খেয়ে না খেয়ে। পুরনো কাপড়ে ঈদ করে। আমাদের যথেষ্ট দিয়েছেন। একজন মা হিসেবে যা করার তার চেয়েও বেশি করেছেন। করছেন। সাইফ কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললো, মা! তোমার চোখের পানি সহ্য হয় না। তুমি কেঁদো না। আমরা তোমার এই দিন বদলিয়ে দেবো, ইনশাআল্লাহ। তোমার সুখের দিন সামনে অপেক্ষা করছে। তুমি শুধুই দোয়া করো?
জীবনের পরতে পরতে ঘটে যাওয়া স্মৃতিগুলো মনে পরছে সাইফের। ও ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমিয়ে পড়েছিল পুরো পৃথিবী। এ বাড়ি ও বাড়ি কেউ জেগে নেই। নীরব, নিস্তব্ধ পুরো এলাকা। সাইফের ঘুম ভেঙে গেলো। কান্নার শব্দে। কান খাড়া করলো সাইফ। এতে গভীর রাতে কে কাঁদে! হ্যাঁ, কান্নার আওয়াজ আম্মুর ঘর থেকে আসছে। সাইফ উঠে বসলো। তার সবকিছু মনে হতে লাগলো। আজ দীর্ঘদিন ধরে সাইফের ছোটো ভাই রিফাত অসুস্থ। কিছুতেই রোগ সারছে না। আম্মু এই গভীর রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর কাছে কাঁদছেন। স্পষ্টই শোনা যাচ্ছে। সাইফের দুই চোখ দিয়ে দরদর করে গড়িয়ে পড়লো কয়েক ফোঁটা অশ্রু। স্বগতোক্তি করতে লাগলো, মা মা-ই। তুমি খোদার এক অপার বিস্ময় সৃষ্টি! এতো ভালোবাসা, দরদ, মোহাব্বত দিয়ে প্রভু তোমায় সৃষ্টি করেছেন যা ভাষায় প্রকাশ অসম্ভব। মা, তোমার পায়ে আমার জান্নাত।

SHARE

Leave a Reply