Home সায়েন্স ফিকশন ইনসাইট -আবু হোসাইন

ইনসাইট -আবু হোসাইন

কর্ণফুলী নদী থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই রাস্তার পাশেই গ্রামটি। নাম গাছি নয়াহাট। কর্ণফুলী নদীতে মেশা খালটি গ্রামের পাশ ঘেঁষেই চলে গিয়েছে। গ্রাম থেকে নদী পর্যন্ত রাস্তাটির পুরোটাই পাকা। আর আশপাশের সব ছোটবড় রাস্তাই প্রায় পাকা হয়ে গিয়েছে। পায়ে হেঁটে বাড়িতে ফিরছিল হিশাম। সেই নদী থেকেই হেঁটে এসেছে সে। উদ্দেশ্য গায়ের কাপড় শুকানো। নদীতে পড়ে গিয়েছিল। ভেজা কাপড়ে আম্মুর সামনে পড়লে সমস্যা আছে।
সামনের বাঁকটা পার হলেই খালের একদম তীরেই বাড়িটা। ডাইনিং রুমের আলোটা জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। আরেকটু কাছাকাছি হতেই আম্মুর কর্কশ কণ্ঠের বকুনিও শুনতে পেল হিশাম। এর অর্থ পরিষ্কার, তার ছোটটি মানে, যায়িদ আজও কিছু একটা করেছে। তারই বিচারকার্য চলছে ডাইনিং রুমে, আব্বুর সামনে। অবশ্য আব্বু সবসময়ই নীরব দর্শক, পত্রিকার পাতায় মুখ লুকিয়ে রাখেন। যা করার আম্মুই করেন।
যায়িদের বিচার চলছে, আর এর  ভেতরে ভেজা কাপড়ে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? ইতস্তত করতে লাগল হিশাম। কিন্তু উপায় নেই। অনেক রাত হয়ে গেছে। ভেজা কাপড়ে অনেকক্ষণ থাকতে থাকতে ঠান্ডা লেগে গেছে। কাপড় পাল্টানো দরকার।
ভয়ে ভয়ে নক করল সে। ধরেই নিয়েছিল কি দেখবে সে আম্মুর চোখে। দরজা খোলার সাথে সাথেই বুঝতে পারল আম্মু তাকে চোখ দিয়ে এক্স-রে করছেন। কিছুই যেন চোখ এড়ায় না তার। ভেজা কাপড়টাও চোখে পড়ল সময়মত। আম্মুর চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝল তা হিশাম। কিন্তু জানে কাপড় পালটিয়ে ডাইনিংয়ে আসার আগ পর্যন্ত কিছুই বলবেন না আম্মু।
এতক্ষণ যা ঘটছিল তা মাথায়ই ছিল হিশামের। যা তার জানা ছিল না তা হলো, যায়িদও ভেজা কাপড়ে বাসায় ফিরেছিল। আর তারই বিচার চলছিল। দুই ছেলেকেই ভেজা কাপড়ে বাসায় ফিরতে দেখেছে আম্মু। শাস্তি কি হতে পারে মনে মনে চিন্তা করছিল। কিন্তু সে ধারণাও করেনি তার আরও অনেক কিছু জানা নেই।
: কোথায় গিয়েছিলে? আম্মুর প্রথম প্রশ্ন।
: নদীর ধারে
: নদীতে নেমেছিলে?
: না।
: কাপড়-চোপড় ভেজা কেন?
: পা-পিছলে পড়ে গিয়েছিলাম?
: তারপর ভেজা কাপড়েই ছিলে এতক্ষণ?
: জি। আম্মুর জানার কথা না যে সে হেঁটে এসেছে। তাহলে বুঝতেন যে, সে আরও অনেকক্ষণ ভেজা কাপড়ে ছিল।
: কেন গিয়েছিলে?
: নৌকায় চড়তে। কী বলবে ঠিক করতে গিয়ে সত্য কথাটাই বলে দিল। এখন আরও প্রশ্ন না করলেই হয় এই নিয়ে।
: যায়িদকে দেখলাম তোমার পিছু পিছু যেতে। তারপর কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে? যায়িদ নাকি খুঁজে পায়নি তোমাকে?
চমকে উঠল হিশাম। যায়িদ তার পিছু নেইনি এটা নিশ্চিত হয়েই সে নদীর তীরে গিয়েছিল। কিন্তু আম্মুকে সে কথা বলা কি ঠিক হবে।
: যায়িদ তো আমার সাথে আসেনি!
: তুমি বাসা থেকে বের হলেই আমি ছাদে গিয়ে উঠি। তারপর দেখি যায়িদও বের হয়। সে তোমার পিছু পিছু যাচ্ছে দেখেই আমি আর তাকে থামাইনি। তারপর দুই ভাই মিলেই ভেজা কাপড়ে বাসায় এসেছ। ঘটনা কী?
এতক্ষণে যায়িদের বিষয়টা বুঝতে পারল হিশাম। কিন্তু যায়িদ তাকে ফলো করতে পারার কথা না। এ জন্যই হয়ত তাকে হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু আম্মুকে এখন কিভাবে বোঝাবে সে!
: আম্মু, যায়িদ আমার পেছনে থাকলে আমি বুঝতে পারতাম।
: কিন্তু সে তোমার পেছনেই ছিল। অথচ তুমি জান না?
: কিন্তু যায়িদ আমার পেছনে আসেনি তা নিশ্চিত হয়েই আমি নদীর তীরে গিয়েছিলাম!
: নিশ্চিত হয়ে! কিভাবে?
: আম্মু, ও ফলো করলে আমি ধরতে পারি …
: জিপিএস ট্র্যাকার… হিশামের মুখের কথা কেড়ে বলে উঠল যায়িদ। সবাই তাকালো যায়িদের দিকে।
: ভাইয়ার একটা আছে… এবার সবার নজর হিশামের দিকে। উপায় নেই, এবার আম্মুকে ওটা দেখাতেই হবে। ব্যাগের ভেতর থেকে জিপিএস ট্র্যাকার বের করল হিশাম। আম্মুর চোখে বিস্ময়।
: জিপিএস ট্র্যাকার! কেন! হিশাম চুপ মেরে রইল। তাকিয়ে দেখল আব্বুও পেপার পড়া বাদ দিয়ে এদিকে আছে।
: জিপিএস ট্র্যাকার কেন? এবার আম্মুর কণ্ঠে একটু ঝাঁঝ বেশি। প্রতিক্রিয়ার আশায় আব্বুর দিকে তাকালেন আম্মু। কিন্তু সোলায়মান সাহেবও কম বিস্মিত হননি। দুই ভাইয়ের একসাথে ভেজা কাপড়ে বাড়ি ফেরা, জিপিএস ট্র্যাকার… কি হচ্ছে এসব। তিনিও চুপ মেরে রইলেন।
: সমস্যা কী যায়িদ তোমার সাথে গেলে? হিশাম এবারও চুপ।
পরিস্থিতির কোন উন্নতি না দেখে আম্মু রায় দিয়ে দিলেন, ‘স্যুট রুম’।
মনে মনে খুশিই হলো হিশাম। আম্মু বড় কোন শাস্তি দেননি। ‘স্যুট রুম’, তাদের বাসারই নিচতলার একটা ঘর। দুই ভাইয়ের ভেতরে ঝগড়া বাধলে দুজনকেই আম্মু ওখানে বন্দি করে রাখেন, মিল না হওয়া পর্যন্ত। উল্লেখ্য, তারা দুই ভাই কখনই মারামারি করে না, সুতরাং এটা নিরাপদ। আজ তারা দুই ভাই-ই ভেজা কাপড়ে বাসাই এসেছে, সেই হিসেবে বড় শাস্তি হওয়ার কথা। কিন্তু দুই ভাইয়ের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়ার কারণে ঘটনাটা অপরাধমূলক না হয়ে অন্তর্দ্বন্দ্বমূলক বলেই মনে হয়েছে বেশি। হয়ত আম্মু ধরেই নিয়েছেন দুই ভাইয়ের মধ্যে মিল থাকলে কেউই তারা ভিজত না।

২.
কিছুক্ষণ পর। আম্মু তখন রান্নাঘরে, খাবার আনতে গেছেন। সবাই চুপচাপ বসে ছিল। হিশামের মাথা নিচু আর যায়িদ ক্ষুব্ধ চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আব্বুর চোখ পত্রিকায়, কিন্তু কিছুক্ষণ বাদে তার গলা পরিষ্কারের শব্দ শোনা গেল।
: হিশাম, যায়িদকে কিভাবে ট্র্যাক করেছ? জিপিএস ট্র্যাকার তো কোন একটা যন্ত্রকে ট্র্যাক করে!
এই একটা প্রশ্ন তখন সবার নজর এড়িয়ে গেছে। আব্বুর এই একটা দোষ, সবসময় যা সবার নজর এড়িয়ে যায়, তিনি সেই বিষয়টা নিয়েই প্রশ্ন করেন। এতক্ষণ তাও কিছুটা শান্তিতে ছিল হিশাম। কিন্তু তা আর হলো না।
আব্বুর প্রশ্ন শুনেই লাফিয়ে উঠল যায়িদ।
: তুমি আমার ব্যাগে কিছু একটা রেখেছ। বলেই নিজের ব্যাগ হাতড়াতে লাগল সে।
: ওর প্যান্টের বেল্ট…
ব্যাগ হাতড়ানো বাদ দিয়ে বেল্টে হাত দিল যায়িদ। তারপর ওটাকে খুলেই একটানে ছুড়ে ফেলে দিল পাশের ডাস্টবিনে।

৩.
স্যুট রুম। পরদিন দুপুর। দুই ভাই দুই টেবিলে বসে। ঘরের মাঝখানে বেডটা খালি। রাতে দুই ভাই কোনরকমে ঘুমিয়েছিল ওখানে। ঘুম ভাঙতেই টেবিলে এসে বসেছে দুইজন। হিশাম কম্পিউটার ঘাঁটাঘাঁটি করছিল, কিন্তু যায়িদের কোন কম্পিউটার নেই, সে একবার বইয়ের দিকে তাকায়, আরেকবার ভাইয়ের কম্পিউটারের দিকে উঁকি মারার চেষ্টা করে। অনেকক্ষণ ধরে ভাইয়া কি জানি পড়ছে, কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই আছে, ওখান থেকে নড়ে না। কী পড়ছে ওরকম মনোযোগ দিয়ে! তার টেবিল থেকে উঁকি দিয়ে দেখা সম্ভব না। কোন একটা কারণ দেখিয়ে ঘরের মাঝখানে যাওয়া লাগবে।
অনেক গরম পড়ছে তখন, আর লো ভোল্টেজের কারণে অনেক আস্তে ঘুরছিল ফ্যানটা। ফ্যানের স্পিড কিছুটা বাড়িয়ে দেয়া যেতে পারে, আর সেই সুযোগে ভাইয়ার কম্পিউটারে নজর বোলানোর সুযোগ হলেও হতে পারে।
: ভাইয়া? আস্তে করে ডাকল যায়িদ
: কী?
: ফ্যানের স্পিডটা একটু বাড়িয়ে দেবো? অনুমতি চাইল যায়িদ, যাতে ভাইয়া সন্দেহ না করে।
: হুম।
কিন্তু সে ঘরের মাঝবরাবর যেতে না যেতেই কথা বলে উঠল হিশাম,
: ফ্যানের পাখাগুলো দেখতে পারিস?
: মানে!
: মানে হলো একটা ফ্যানটা যখন বন্ধ থাকে তখন ওর তিনটি পাখায়ই পরিষ্কার দেখা যায় একজায়গায়। কিন্তু যখন স্পিড বাড়তে থাকে তখন পাখাগুলো অনেক বিস্তৃত মনে হয়। পরে স্পিড বাড়তে বাড়তে এমন মনে হয় যেন পুরো বৃত্তাকার পথ জুড়েই পাখাগুলো রয়েছে। এখন কথা হলো, তুই কি একটা পাখার ওপর চোখ স্থির রেখে ওর ঘূর্ণনের সাথে সাথে তোর চোখের মনিকে ঘুরিয়ে পাখাটির ওপরই তোর চোখের দৃষ্টি স্থির রাখতে পারবি? যদি পারিস তাহলে পাখাগুলোর আলাদা অস্তিত্ব বুঝতে পারবি, না হলে মনে হবে পুরো গোল একটা চাকতি ঘুরছে তোর মাথার ওপর।
কথা বলার সময় কম্পিউটার থেকে মুখ ঘুরিয়ে যায়িদের দিকে তাকিয়েছিল হিশাম, ফলে যায়িদও তাকিয়েছিল তার দিকে। না আসলে যিয়াদ তাকিয়েছিল, হিশামের কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে। হিশামের কথা খুব কমই তার কানে ঢুকছিল। হিশামের কথা শেষ হতেই সে বলে উঠল,
: পারব না।
: পারবি। ফ্যানের স্পিড আরেকটু কমিয়ে দে, তাহলেই পরিষ্কার বুঝতে পারবি। কথা শেষ করেই নিজের কম্পিউটারের দিকে ঘুরে তাকালো হিশাম।
মানে ফ্যানের স্পিড বাড়ানো যাবে না। নিজের চেয়ারে ফিরে এল যায়িদ। তবে সে যা দেখতে চেয়েছিল, দেখে এসেছে সে। ‘পেজ মার্জিন অপশন্স’ পড়ছে ভাইয়া। ‘পেজ মার্জিন…’ কোথাকার কি এটা। ‘পেজ’, ‘পেজ’, ‘পেজ’… ওহ মাইক্রোসফট ওয়ার্ড অফিসের হেল্প ফাইল এটা। কিন্তু ভাইয়া মাইক্রোসফট ওয়ার্ড অফিসের হেল্প ফাইল পড়ছে! না হয়ত অন্য কোন কিছু হবে। কিন্তু দেখে তো মাইক্রসফট অফিস বলেই মনে হলো! মনটা তেতো হয়ে গেলো যায়িদের, অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা দেখবে ভেবেছিলো সে।

৪.
হিশাম নিশ্চিন্তে আছে। আগামী দুই তিনদিন বাইরে বের না হলেও তার চলবে। স্যুট রুমের নিয়ম হলো বাইরে যত প্রয়োজনই থাকুক দুই ভাইয়ের মিল না হওয়া পর্যন্ত বের হওয়া চলবে না। স্কুল কলেজ সব বাদ। শুধু খাওয়ার সময় হলে আম্মু এসে দুইজনকে খাইয়ে যান, আর দেখে যান দুইজনের মধ্যে মিল হয়েছে কি না। অনেকটা জেলখানার প্যারোলের মত। আম্মু সন্তুষ্ট হলে মুক্তি, না হলে পরের খাবাবের ওয়াক্তের জন্য বসে থাকা লাগবে। স্যুট রুমেই একটা অ্যাটাচড বাথরুম আছে, সুতরাং টয়লেট করার অজুহাতেও বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
তাই সে একমনে মাইক্রোসফটের হেল্প ফাইলস পড়ছে। সে জানে যায়িদ তাকে ফলো করছে, এমনকি কতবার, কখন তাকিয়েছে তাও জানে। স্যুট রুমে এই ওদের প্রথম দিন না, দুই ভাই-ই একে অন্যের আচরণ সম্পর্কে খুব ভালোই জানে। তাই এক পেজেই সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে আছে, যেন অনেকক্ষণ পড়ার পরও বুঝতেই পারছে না বিষয়টা, আর তাই পেজ উল্টানোও হচ্ছে না। জানে ওকে এক পেজে বসে থাকতে দেখে অস্থির হয়ে উঠবে যায়িদ, আর তাই কোন ছুতো দেখিয়ে ঘরের মাঝখানে আসতে চাইবে সে, ভাইয়া কি পড়ছে দেখার জন্য।
খুব বেশি জরুরি হলে হিশামই নেগোশিয়েশন শুরু করে অগ্রণী হয়ে, আর তা না হলে অপেক্ষা করে যায়িদ নিজে এসে পরাজয় স্বীকার করা পর্যন্ত। হাজার হলেও ক্লাস নাইনের একজন ছাত্রের আর কতক্ষণ ভালো লাগে বদ্ধঘরে বসে থাকতে। কিন্তু এবার হিশাম ঠান্ডা মেরে আছে, আগামী তিন দিন বাইরে ওর কোন কাজ নেই, ইউনিভার্সিটিও বন্ধ, সুতরাং সে কোন গরজই দেখাচ্ছে না যায়িদের রাগ ভাঙানোর জন্য।
নেই মানে…
হঠাৎ করেই মনে পড়ল ব্যাপারটা। আজ থেকে সপ্তাহব্যাপী বিজ্ঞানমেলা শুরু হচ্ছে ওদের ইউনিভার্সিটিতে। ওদের ডিপার্টমেন্টের বড় ভাইয়েরা কিছু একটা শো করবে বলে শুনেছিল, না গেলে অনেক বড় কিছু মিস হয়ে যাবে। কিন্তু এই ঘর থেকে বের হবে কিভাবে সে, যায়িদকে কেবলই খোঁচাটা দিল সে!
রিভলভিং চেয়ারে নিজের জায়গায় বসেই যায়িদের দিকে ঘুরল হিশাম। তারপর আস্তে করে কাশি দিল, যেন গলা পরিষ্কার করল। যায়িদ বুঝল ভাইয়া নেগোশিয়েশন করতে চাচ্ছে। কিন্তু সে মাথা নিচু করেই রইল। ভালো কোন প্রস্তাব না হলে এবার সে সাড়া দেবে না।
: আমি তোকে আমার কম্পিউটার ব্যবহার করতে দেবো।
চকিতে একবার মুখ তুলে তাকাল যায়িদ, হাজার হলেও এই কম্পিউটারে বসার জন্য সে ছোটবেলা থেকেই হন্যে হয়ে রয়েছে। কিন্তু পরে আবার মুখ নামিয়ে নিলো, বুঝল ভাইয়া বিপদে পড়েছে। একটু বাজিয়ে দেখলে খারাপ হয় না।
: আগামী এক সপ্তাহ তোমার সাথে এই ঘরে থাকতে আমার কোনো আপত্তি নেই।
: ঠিক আছে তাহলে আম্মু আসুক, আমি বলব যে, আগামী এক সপ্তাহ এই ঘরে একসাথে থাকার ব্যাপারে আমরা একমত হয়েছি।
‘একমত হয়েছি’ শব্দ দুটো শুনেই চমকে উঠল যায়িদ, সে মনে করল বিরাট একটা নেগোশিয়েশন বুঝি হাতছাড়া হয়ে গেল। তাই সে আর কোন চিন্তা না করেই বলে উঠল,
: কম্পিউটারে কোন রেস্ট্রিকশন থাকবে না তো?
কিন্তু পরক্ষণেই নিজের ভুল বুঝতে পেরে চেঁচিয়ে উঠল যায়িদ। হেসে ফেলল হিশাম।
: না কোন রেস্ট্রিকশন থাকবে না।
মনটা খারাপ হয়ে গেল যায়িদের, ভাইয়ার কাছে আবার হেরে গেল সে।
: কোন প্যারেন্টাল কন্ট্রোল থাকবে না তো?
: না।
: টাইম লিমিট?
: না।
: সফটওয়ার রেস্ট্রিকশন?
: আমি তোকে আমার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাকাউন্ট ইউজ করতে দেবো!
: অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাকাউন্ট! কিন্তু শিডিউল শাট ডাউন, রিস্টার্ট থাকবে না তো?
: না।
: হিডেন কমান্ড!
: না।
: ব্যাকগ্রাউন্ড ডাউনলোড?
: না।
: শিডিউল স্ক্যানিং?
: না।
: রিমোট কন্ট্রোল?
: যায়িদ, আমি শুধু আমার মোবাইলটা নিয়ে ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছি।
: পাসওয়ার্ড? ভাইয়ার মোবাইল সেকেলে আমলের, ওটা দিয়ে রিমোট কন্ট্রোল করা সম্ভব না।
: আমি রিমুভ করে দিয়ে যাবো।
তবুও সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল যায়িদ, ঝামেলা একটা না থেকেই পারে না। ভাইয়া এত সহজে হার মেনে নেয়ার পাত্র না। স্ক্যান করার চেষ্টা করল সে ভাইয়াকে, কিন্তু কিছুই পেল না ভাইয়ার মুখে। হিশাম তখনও তরল চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। আর কোন কথা খুঁজে না পেয়ে মেনে নিল ভাইয়ার প্রস্তাব।
হিশাম বলতে চাইল যে, প্রস্তাবটা কিন্তু শুধু আজকের দিনের জন্য। কিন্তু তা বললে যিয়াদ আবার জিদ ধরে বসবে যে, তাকে এক সপ্তাহ তার কম্পিউটার ব্যবহার করতে দিতে হবে। অথচ না বললে, কালকে আবার কোন একটা যুক্তি দেখিয়ে সে যিয়াদকে বোঝাতে পারবে যে, প্রস্তাবটা শুধু আজকের দিনের জন্যই ছিল। প্রতিপক্ষ নিজের কোন একটা সুবিধার কথা ভুলে গেলে তাকে আবার তা ইচ্ছা করে মনে করিয়ে দেয়ার কোন মানেই হয় না। তাই আর সে কিছু বলল না।

৫.
দুপুরে হিশাম বের হয়ে যেতেই তার কম্পিউটারে গিয়ে বসল যায়িদ। আব্বুর কম্পিউটারে সে যখন ইচ্ছা তখন বসতে পারে, এমনকি আব্বুর ফেসবুক অ্যাকাউন্টও সে চাইলে ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু ভাইয়া তাকে কখনও বসতে দেয় না। এবার সে সুযোগ পেয়েছে, ভাইয়া এত মনোযোগ দিয়ে কম্পিউটারে কী করে সে দেখতে চায়।
কিন্তু কম্পিউটার অন হতে গিয়ে ‘ওয়েলকাম’ পর্যন্ত গিয়ে অনেকক্ষণ বসেই আছে। ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে উঠল যায়িদের, সমস্যাটা কী! কিন্তু না, অন হল কম্পিউটার। মহাখুশি যায়িদ, খুশির চোটে ‘মাই কম্পিউটার’ বাটনটা বিদঘুটে অবস্থায় দেখেও সে কিছু মনে করল না।
কিন্তু ‘মাই কম্পিউটার’ এর  ভেতরে গিয়েই চোখটা ছানাবড়া হয়ে গেল তার। দুনিয়ার তাবত ফোল্ডার, ফাইল সব চাইনিজ ভাষায় লেখা! এমনকি কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেমও! অপারেটিং সিস্টেমের ল্যাঙ্গুয়েজ সে চেঞ্জ করতে পারবে, কিন্তু এতগুলো ফোল্ডার আর ফাইলের চাইনিজ নাম সে কিভাবে চেঞ্জ করবে! ফলে কিছুই বুঝতেও পারল না সে কম্পিউটারের। আর সব ফোল্ডারের আইকনই সাদাকালো, বোঝার কোনো উপায় নেই কোনটাতে কী আছে। বোঝাই যাচ্ছে ভাইয়া অনেক সময় নিয়ে এগুলো চেঞ্জ করেছে।
মনটা খারাপ হয়ে গেল যায়িদের। চেয়ারে কিছুক্ষণ থ মেরে বসে রইল। কিন্তু পরক্ষণেই ভাইয়ার ওপর রাগ হতে লাগল অনেক। কিন্তু কি করবে সে, ভাইয়া তো অযৌক্তিক কিছু করেনি, অবৈধ কিছুও করেননি। সেই তো কখনই ভাইয়ার সাথে বুদ্ধিতে পেরে উঠে না। চাইলে সে এখনই কম্পিউটারের কয়েকটা ফাইল ডিলিট করে দিতে পারে, কিংবা পাসওয়ার্ড বসাতে পারে, কিংবা সিস্টেম রি-স্টোর দিয়ে ভাইয়ার কয়েকদিনের কাজের বারোটা বাজাতে পারে, কিন্তু সেটা হবে অন্যায় উপায়ে প্রতিশোধ নেয়া। প্রমাণ হবে, সে  বৈধ উপায়ে বুদ্ধিতে ভাইয়ার সাথে পেরে না ওঠে, অবৈধ পথে প্রতিশোধ নেয়ার দিকে পা বাড়িয়েছে। কিন্তু বৈধ উপায়েও তো ভাইয়াকে হারানোর কোনো পথ দেখছে না সে। মানে  বৈধভাবে বুদ্ধিতে ভাইয়াকে হারাতে পারবে না সে, আবার অবৈধ প্রতিশোধও নিতে পারবে না।
এসব চিন্তা যায়িদের মনের ক্ষোভটা না কমিয়ে আরও বাড়িয়ে দিল। ভাইয়ার বুদ্ধির সামনে তার এই অসহায় দশাটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না সে। অনেক ভেবে চিন্তে সে সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলল।
ভাইয়াকে একটা উচিত শিক্ষা দিতে হবে, কিভাবে তা এখনও জানে না সে।

৬.
পরদিন বিকাল বেলা। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছে হিশাম। আজও তার গায়ের কাপড় চোপড় ভেজা, আজ একটু বেশিই। কিন্তু আজ আর পা পিছলে নদীতে পড়েনি সে, আজ প্রয়োজনেই নেমেছিল নদীতে। আর তাতে শুধু গায়ের কাপড়ই ভিজে নি, ডান পায়ের গোড়ালিতে বড় একটা ক্ষতেরও সৃষ্টি হয়েছে, পানির তলার গোজের আঘাতে। ব্যান্ডেজ বাঁধার পরও একটু একটু করে রক্ত পড়ছে, আর যন্ত্রণাতো আছেই।
কিন্তু হিশামের দুশ্চিন্তা আম্মুকে নিয়ে। কি বলবে সে আম্মুকে। আজ আর তার কোন সদুত্তর নেই। আর যদি পায়ের রক্ত আম্মুর চোখে পড়ে তাহলে খবরই আছে। যাকে বলে ডিটেইল ইনভেস্টিগেশন। প্রতি মিনিটের হিসেব চেয়ে বসবেন আম্মু। সত্য বলতে তাতে কিছুই বাদ যাবে না তখন। সুতরাং আর যাই হোক পায়ের ক্ষত কিংবা রক্ত কোনটাই আম্মুর চোখে পড়া চলবে না।
যেখানে বাঘের ভর, সেখানেই রাত হয়। দরজা খোলার পর আম্মুর চোখের এক্সরে দৃষ্টির সম্মুখীন হওয়ার সময়ই দেখতে পেল ডাইনিংয়ে আজ অতিরিক্ত আরও একজন বসে আছে। পাশের বাসার খালিদ। যায়িদের সমবয়সী হবে। তারা দু’জনও ভেজা কাপড়ে বাসায় ফিরেছিল। আর এদিকে হিশামও ভেজা কাপড়ে। ফলে আজ আম্মু চুপ করে থাকলেও তার চোখমুখের চাঞ্চল্যটা আজ অনেক বেশি মনে হলো হিশামের কাছে। কিন্তু হিশামের আহত হওয়াটা আম্মুর চোখ এড়িয়ে গেল।
কাপড় পাল্টে ডাইনিংয়ে এসে বসতেই আম্মু জেরা শুরু করলেন। কিন্তু হিশাম কোন প্রশ্নেরই উত্তর দিল না। একদম চুপ। যায়িদও এর আগে আম্মুকে কোন প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। সেও মাথা নিচু করে চুপ করে ছিল। শুধুমাত্র খালিদের কাছ থেকেই জানতে পারা গেল যায়িদের ব্যাপারটা। তাকে নদী থেকে ডাঙায় উঠতে সাহায্য করতে গিয়েছিল খালিদ। কিন্তু পা পিছলে পড়ে যায় নদীতে সে। ফলে সেও ভিজে যায়। এর বাইরে আম্মু আর কিছুই জানতে পারলেন না।
অসহায় অবস্থা দেখা গেল আম্মুর চোখেমুখে। তার দুই ছেলেই একদম চুপ মেরে গেছে। কেউ কোন কথা বলছে না, কোন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না।
এসময় সশব্দে পত্রিকার পাতা উল্টালেন আব্বু। ব্যাপারটা অনেকটা ইচ্ছাকৃত মনে হল হিশামের কাছে। আম্মুর মুখে একটু বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। বুঝল হিশাম, তাদের পরে আব্বুর পালাও আসছে।
‘ঠিক আছে, আগামী এক সপ্তাহ তোমরা দুইজনই স্যুট রুমে থাকবে, বাইরে বেরোনো বন্ধ।’
রাগের মাথায় একটা বড় ভুলটা করে ফেললেন আম্মু, ভাবল হিশাম। তাদের দুইজনকে এক করে এক পক্ষ বানিয়ে শাস্তি দেয়া ঠিক হয়নি। ফলে, এখন থেকে অফিসিয়ালি আম্মুর শাসনের বাইরে চলে গেল যায়িদ। হিশাম আগেই গিয়েছিল। কিন্তু সে বুঝে। যায়িদ এখনও অনেক ছোট। তারও বুদ্ধি হয়েছ, আম্মুর শাসনের প্রতি আস্থা, শ্রদ্ধা ফিরে আসতে যে সময় লাগবে, সেই সময় পর্যন্ত আম্মুকে ভোগাবে সে।
মনে মনে এই আশঙ্কাটাই করে আসছিল হিশাম। কিন্তু আজ যে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতিতে পড়েছিল সে, তাতে নদীতে না নেমে কোন উপায় ছিল না তার। সে চেয়েছিল, আজ আর ভেজা কাপড়ের কোনো ব্যাখ্যা সে আম্মুকে দেবে না, অপরাধীর মত মাথা নিচু করে থাকবে। তার একার যে শাস্তি হয় হবে। কিন্তু তার জানা ছিল না যায়িদ আর খালিদের ব্যাপারটা। ফলে পরিস্থিতিটা ঘোলাটে হয়ে গেল, আর তাতে ইন্ধন জোগালো আব্বুর নীরব আচরণ।

৭.
সে রাত্রে পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার আরও কিছুটা বাকি ছিল। সবাই তখন খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন সময় বাসার কলিংবেল বেজে উঠল। আব্বু-আম্মু মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলেন, হয়ত ধারণা করার চেষ্টা করছেন কে আসতে পারে।
আম্মু গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। বাইরে মিকদাদ চাচা দাঁড়িয়ে। কর্ণফুলী নদীতে ট্রলার চালান তিনি। মাঝে মাঝে পছন্দমত ভাড়া পেলে সাগরেও যান মাছ ধরতে। তার ট্রলারটা আম্মুই কিনে দিয়েছিলেন জাকাতের টাকা দিয়ে।
মিকদাদ চাচাকে দেখেই মুখ শুকিয়ে গেল হিশামের। একগাদা দুশ্চিন্তা ভর করল তার মনে। দরজার বাইরে দাঁড়িয়েই তিনি আম্মুকে অনুচ্চস্বরে কি জানি বলছেন। কথা বলার ফাঁকে আম্মুকে পাশ কাটিয়ে যায়িদের দিকে একবার তাকালেন মিকদাদ চাচা, আর তার দেখাদেখি আম্মুও। আম্মুর চোখটা কুঞ্চিত। আম্মুর দৃষ্টিকে অনুসরণ করে যায়িদের দিকে তাকাল হিশাম। দেখল যায়িদের মুখের অবস্থা তার চেয়েও খারাপ, ভয়ে শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। আর তার সাথে সাথেই বুঝতে পারল, সে না, যায়িদই মিকদাদ চাচার টার্গেট। ফলে তার ভয় কিছুটা কমে এলো।
মিকদাদ চাচার সাথে কথা বলা শেষ করে দরজা বন্ধ করলেন আম্মু। তারপর যায়িদের দিকে তাকালেন। মুখে ভীষণ নিম্নচাপের ছাপ। সরাসরি যায়িদের সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। তারপর কণ্ঠ যথাসম্ভব কন্ট্রোলে রেখে জিজ্ঞাসা করলেন,
: নদীতে কি করছিলে আজ? যায়িদ চুপ
: তোমার মিকদাদ চাচার ট্রলারে উঠেছিল? যায়িদ এবারও চুপ। কিন্তু হিশামের মনে ঝড় বইছে, যায়িদ মিকদাদ চাচার ট্রলারে কি করছিল! তার চুপ থাকা দেখেই বোঝা যাচ্ছে অভিযোগটা সত্য।
মাথা নিচু করেই রইল যায়িদ। আম্মু এত সহজে ছাড়বেন না, জানে হিশাম। এইভাবে জিজ্ঞাসা করাই আম্মুর অস্ত্র ভান্ডারের শেষ অস্ত্র নয়।
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply