Home তোমাদের গল্প ছিন্নমূল -ফজলে রাব্বী দ্বীন

ছিন্নমূল -ফজলে রাব্বী দ্বীন

রাবেয়া ধলেশ্বরী এক্সপ্রেস ট্রেনটার জন্য অপেক্ষা করছে। গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কথা সেই কয়েক মাস আগে। কিন্তু সময়ের অভাবে যেতে পারেনি। তার একমাত্র কাকাত বোন তানিয়ার বিয়ে। আজ যেভাবেই হউক বিয়ে বাড়িতে উপস্থিত হতেই হবে। গ্রাম থেকে কাকু ফোন দিয়েছিলেন কিছুক্ষণ আগে। রাগত স্বরে অনেক কথাই বলেছেন। কিন্তু সবকিছ্ইু ভালোর জন্যই। রাবেয়া কাকুর কথায় একটুকুও মন খারাপ করে না। কারণ কাকু ঠিকই বলেছেন বাসের টিকিট না কেটে ভুল করেছে সে। মিছিমিছি ট্রেনের টিকিট কাটতে গিয়ে এখন দুপুর বারটা পেরিয়ে গেল। তবুও ট্রেনের খবর মিলছে না। কি যে করবে এখন! টিকিট মাস্টারের কাছে গিয়ে শুনল ট্রেন আসতে এখনও এক ঘণ্টা দেরি। মাথাটা যেন ঝিম ধরে গেল রাবেয়ার। ভুল করে টাইম না জেনেই স্টেশনে ছুটে এসে যে ভুল করেছে তা কোনো মূল্য দিয়েই পরিশোধ করা সম্ভব নয়।
নিশ্চুপ একা একা বসে থাকতে আর ভালো লাগছে না দেখে রেললাইনের পথ ধরে একটু একটু করে সামনের দিকে হাঁটতে লাগল। সুন্দর রোদেলা প্রকৃতিটাকে মোটেও খারাপ লাগছে না। হঠাৎ পেছন থেকে ট্রেনের হুইসেলের শব্দ ভেসে এলো কানে। তাকিয়েই দেখে ধলেশ্বরী এক্সপ্রেস। খুশিতে বুকটা ভরে উঠল। ট্রেনটা তখনও স্টেশনে এসে পৌঁছায়নি। কিন্তু ট্রেনের সামনে হাত উঁচিয়ে ওটা কে দাঁড়িয়ে আছে। ভালো করে লক্ষ করল রাবেয়া। মনে হচ্ছে একটা ছোট্ট ছেলে! ছেলেটা কি আত্মহত্যা করার জন্য ওইভাবে দাঁড়িয়ে আছে? না, যে করেই হোক ছেলেটাকে বাঁচাতে হবে। রাবেয়া আর কোন কিছুই ভাবতে পারল না। এক দৌড়ে সোজা ছুটে গেল ছেলেটাকে বাঁচাতে। এদিকে ট্রেনটাও প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে। চরম একটা রিস্ককে সামনে রেখে রাবেয়া ট্রেনের সামনে থেকে ছেলেটাকে দু’হাত দিয়ে চেপে ধরে ছিটকে পড়ল রেললাইনের বাইরে। কিছুক্ষণ নীরবতা সঙ্গী হলো।
প্রায় কয়েক মিনিট পর রাবেয়া চোখ খুলে দেখে সব ঠিক আছে। কিন্তু ছেলেটা কোথায়? ছয়-সাত বছরের ছেলেটাকে এদিক সেদিক খুঁজতেই রাবেয়া দেখে কতক পাথরের ওপর বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে ছেলেটা। হালকা একটু রাগত স্বর তুলে ছেলেটার কাছে গিয়ে তৎক্ষণাৎ বলল, ‘কি ব্যাপার তুমি এভাবে ট্রেনে কাটা পড়ে মরতে গিয়েছিল কেন?’
ছেলেটা কোনো উত্তর দিচ্ছে না। কেবল কাঁদছে আর কাঁদছে। রাবেয়া এবার নিজের কণ্ঠে একটু মায়ার সুর সংযুক্ত করে বলল, ‘তোমার নাম কী?’
ছেঁড়া শার্টের হাতাটুকু দিয়ে ছেলেটা মুখের জমা ঘামটুকু আস্তে করে মুছে ফেলে তারপর বলল, ‘সুমন’।
‘কী মিষ্টি নাম! কিন্তু তুমি মরতে গিয়েছিলে কেন? আমায় সবকিছু খুলে বললে আমি তোমায় সাহায্য করব।’
‘তাহলে আমার মাকে এনে দিন।’
‘তোমার মা কোথায় থাকে?’
‘আকাশে’-কোমল দু’টি হাতের একটি আঙুল উপরের দিকে তাক করে দেখিয়ে দিল সুমন।
রাবেয়া চুপ মেরে গেল। বুঝতে আর বাকি রইল না যে ছেলেটার মা পৃথিবীতে বেঁচে নেই। রাবেয়া জানে মা ছাড়া পৃথিবীটা কেমন লাগে। সেও যে খুব ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছে। একটু দীর্ঘনিঃশাস ফেলে আরেকটা প্রশ্নের সুর টানল।
‘তোমার বাবা কোথায়?’
‘ঝিনাইগাতি। বদমাশটা বেঁচে থেকেও নেই। মা মারা যাওয়ার পর আরেকটা বিয়ে করেছে। ওরা আমায় সবসময় মারে। খেতে দেয় না, শান্তিতে ঘুমোতেও দেয় না। তাই এই রেলস্টেশনে চলে এসেছি। কিন্তু এখানে এসেও শান্তি নেই। সারাদিন হাত পেতে মানুষের কাছে খাবার চাই। কিন্তু কেউই আমায় খাবার দেয় না। একটা টাকা চাইলে ফিরিয়ে দেয়। পেটে ক্ষুধা নিয়ে রাত্রে ঘুমাতে গেলেও ওই লোকগুলো সেখানে থাকতে দেয় না। টোকাই বলে লাঠির আঘাতে তাড়িয়ে দেয়। তাই ঠিক করেছি মরে যাবো। মায়ের কাছে চলে যাবো আমি।’
সুমনের ছোট্ট মুখে একেকটা করুণ কথা তীরের ফলার মতো বিঁধতে লাগল রাবেয়ার মনে। নিজের চোখের জল আটকাতে না পেরে বুকের মধ্যে সুমনকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘জানিস, আমিও ঠিক তোর মতই মরতে গিয়েছিলাম একদিন। কিন্তু পারিনি। আমার বাবা-মা দু’জনই অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর থেকে কেউ আমাকে ঠায় দেয়নি। অনেক কষ্টে বড় হয়েছি। তুই কি আমার সাথে যাবি?’
‘কোথায়?’
‘আমার বাড়িতে। আমার বাড়িতে কেউ নেই। একা একা থাকি আমি। আমার সাথে গেলে তোকে সুন্দর একটা স্কুলে ভর্তি করে দেবো। তারপর মানুষের মতো মানুষ হবি।’
‘সত্যি। কিন্তু এসব তুমি আমার জন্য কেন করবে?’
‘বলতে পারিস, একটা ছেলেকে আলোর পথ দেখিয়ে দিচ্ছি। ঐ যে রেললাইনের ধার দিয়ে তাকিয়ে দেখ্ তোর মত অসংখ্য ছেলে না খেয়ে মরতে যাচ্ছে। শেকড়বিহীন হয়েছে বলে মানুষ তাদেরকে পথের কুকুরের মতো মনে করে। আমার মত ওই সমস্ত ছিন্নমূল মানুষের পাশে তোকে যে দাঁড়াতে হবে…।’

SHARE

Leave a Reply