Home প্রচ্ছদ রচনা বাংলা নববর্ষ নতুন দিনের জয়গান -মঈনুল হক চৌধুরী

বাংলা নববর্ষ নতুন দিনের জয়গান -মঈনুল হক চৌধুরী

আমাদের সংস্কৃতি ও কৃষ্টি হাজার বছরের। তাই বৈশাখ বাঙালির প্রেরণার প্রেরণা। ইতিহাস এবং ঐতিহ্যে গাথা এক অমর কাব্য। ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ বাংলাদেশ। ঋতুকে আহবান করে বাঙালি পালন করে ঋতু উৎসব। উল্লেখ্য, সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি দিল্লির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন ৯৬৩ হিজরি মোতাবেক ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে। ঊনত্রিশ বছর রাজত্ব করার পর তিনি পঞ্জিকা ও বর্ষপঞ্জি সংস্কারের উদ্যোগ নেন। হিজরি সন ও সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছরকে যুক্ত করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। বলা হয়ে থাকে ফসল কাটার মৌসুমে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য এই সন চালু করা হয়েছিলো। হিজরি সন হলো চান্দ্রসন। চাঁদ দেখে গণনার ওপর এই সনের ভিত্তি। বাংলা সৌরসন। সৌরসনে দিনক্ষণ গণনা সহজ এবং এর একটি নির্দিষ্ট ভিত্তি আছে। সম্রাট আকবরের উপদেষ্টা আমীর ফাতেউল্লাহ সিরাজী বাংলা মাসের নামগুলো নক্ষত্রের নাম থেকে নিয়ে সৌর মাসের দিন মিলিয়ে বাংলা সন প্রবর্তন করেন। এ ব্যাপারে ১৫৮৫ সনের ১০ মার্চ সম্রাটের নির্দেশনামা জারি হয়। তবে এর কার্যকারিতা দেখানো হয় ১৫৫৬ সনের ১১ মার্চ থেকে। কারণ দিনটি ছিলো সম্রাট আকবরের সিংহাসনে বসার তারিখ। সেই থেকেই শুরু। হাজার বছরের না হলেও বাংলা নববর্ষ এখন আমাদের শত বছরের ঐতিহ্য। এখন তাই বাঙালিদের সংস্কৃতির একটি বৃহৎ আয়োজন নববর্ষ উৎসব এবং বৈশাখী মেলা। বাঙালির ইতিহাস ও তাদের জীবনযাত্রায় বাংলা সনের প্রভাব ব্যাপক ও গভীর। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে উৎপাদনমুখী নানা কর্মকান্ড এই বাংলা সনকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। কৃষকের ফসল বোনা, ফসলের সময়ভিত্তিক যত্ন বা পরিচর্যা ও ফসল কাটাসহ যাবতীয় কৃষিকাজ বাংলা সন, তারিখ, পঞ্জিকা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ বহুকাল থেকে পহেলা বৈশাখ পালন করে আসছে। মুসলিমরা একভাবে এবং সনাতন ধর্মের লোকেরা অন্যভাবে দিবসটি পালন করতো। তবে মূল অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে ধর্মের প্রভাব থাকতো। যেমন মুসলিমরা মিলাদ, কুরআন খতম, দোয়া, শিরনি বিতরণ এবং মেলায় অংশগ্রহণ করতো। সনাতন ধর্মের মানুষ পহেলা বৈশাখের আগে চৈত্রসংক্রান্তির পূজা, অর্চনা এবং পহেলা বৈশাখের পূজা ও আনন্দ উৎসবসহ মেলায় যোগ দিতো। সনাতন ধর্মের ব্যবসায়ীরা নতুন খাতা খুলতো। একে তারা বলতো হালখাতা। হালখাতা মানে বর্তমান খাতা। পুরনো খাতার লেনদেন তারা পহেলা বৈশাখে শেষ করতে চাইতো। এ জন্য তারা উৎসবের আয়োজন করতো। পাওনাদার ও দেনাদার নির্বিশেষে এলাকার সকলকে নিমন্ত্রণ করতো। যারা অংশগ্রহণ করতো তাদেরকে পেটভর্তি মিষ্টি খাওয়ানো হতো। উদ্দেশ্য একটাই। পাওনা টাকা উসুল করা। আগে এ আমন্ত্রণ জানানো হতো মুখে। মুদ্রণযন্ত্র আসার পর জানানো হয় ছাপানো পত্রে। একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, নিমন্ত্রণপত্রের কোথাও লেখা থাকে না যে, আসার সময় পাওনা টাকা নিয়ে আসবেন। লেখা থাকে এ হালখাতা উৎসবে আপনি/আপনারা সবান্ধব/ সপরিবারে আমন্ত্রিত। পহেলা বৈশাখের বিশেষ দিনে বিগত বছরটির সব হিসাব নিকাশ চুকিয়ে নির্ঝঞ্জাট সুন্দর একটি বছর শুরু করতে চায় সবাই। উল্লেখ্য, পূর্বে পহেলা বৈশাখে কোন মেলা ছিল না। মেলা ছিল চৈত্রসংক্রান্তির। চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহে এই মেলা বসতো। গ্রামীণ জীবনের হরেক রকম জিনিস মেলায় কেনাবেচা হতো। মাটি, কাঠ, সুতা, পাট, পাটখড়ি, টিন, সোলা ও কাপড় দিয়ে নানাধরনের গৃহস্থালি জিনিস গ্রামের পুরুষ ও মহিলারা বানাতেন। সেসব জিনিস চৈত্রসংক্রান্তির মেলায় বিক্রি করতেন। চিনি, গুড়, ও মধু দিয়ে নানা ধরনের মিষ্টি তৈরি করা হতো। তৈরি করা হতো চাল ও চালের গুঁড়ি দিয়ে নানা ধরনের খাদ্য। যেমনÑ খই, মুড়ি, মুড়কি, মুড়ির মোয়া, চিঁড়া, চিঁড়ার মোয়া ইত্যাদি। বাতাসা, খাজা, গজা, নাড়–, তিলের খাজা এবং আরো কত কী! তিলের মিষ্টিও ছিল বহু রকম। পিঠা পুলির আয়োজনও কম ছিল না। পাপড় জাতীয় খাদ্যেরও রমরমা উপস্থিতি ছিল। সেসব মেলায় নানারকম খেলাধুলা, বায়স্কোপ, সার্কাস ও মিনি চিড়িয়াখানার আয়োজনও থাকতো। জারি, সারি, মুর্শিদি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, কবি, পালা এবং যাত্রা গানও থাকতো এসব মেলায়। মুসলিমরা পালা বা যাত্রাগানে খুব বেশি অংশগ্রহণ করতো না। তারা পুঁথিপাঠের আসরে অংশগ্রহণ করতো। পুঁথির মধ্যেই তারা জীবনের ছবি দেখতো, দেখতো আনন্দের ছবি। কবিগানের আসরে তারা মাঝে মাঝে অংশগ্রহণ করতো। বেশ জমে উঠতো চৈত্রসংক্রান্তির এসব মেলা। পরবর্তীতে এই মেলা বৈশাখী মেলায় রূপান্তরিত হয়। মুসলিম অধ্যুষিত মেলাকে কেউ এখন আর চৈত্রসংক্রান্তি মেলা বলে না। বলে বৈশাখী মেলা। যে অঞ্চলে সনাতন ধর্মের অধিবাসীরা বেশি সে অঞ্চলের মেলাকে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা বলে। উল্লেখ্য, তখনকার দিনে ধানই ছিল প্রধান খাদ্য বা শস্য। সারা বছরের খাবারের জন্য ধান রেখে দিয়ে অতিরিক্ত ধান কৃষকরা বিক্রি করতেন। এই বিক্রয়লব্ধ টাকা দিয়ে হালের গরু লাঙল কিনতো। কিছু জমি জিরাত কট-বন্ধক নিত। নিজের আঙিনায় রবিশস্য ফলাত। পুকুর ও খানাখন্দের পাড়ে গাছ লাগাতো। পরিবার পরিজনের চিকিৎসা করাতো। মেয়ের বিয়ে দিত। নাইওরি আনতো। বেয়াই বেহান খাওয়াতো। শ্বশুরবাড়ি যেত, জামা-কাপড় কিনতো। হাতে টাকা থাকতো বলে জীবনের যত প্রয়োজন তা মেটানোর চেষ্টা করতো। মূলত খাজনা প্রদান করার কারণে পহেলা বৈশাখের উৎপত্তি। মুঘল সম্রাট আকবর হিজরি সনের সাথে খাপ খাইয়ে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। উল্লেখ্য, চৈত্র মাসের মাঝামাঝি থেকে শেষ অংশে বাংলার কৃষকরা জমি থেকে ধান তুলে আনে, সে ধান বিক্রি করে যাতে খাজনা প্রদান করতে পারে, সে কারণেই বাংলা সনের শুরু করা হয় বৈশাখ মাস থেকে। অতি প্রাচীন না হলেও নববর্ষ এখন আমাদের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে। এখন পহেলা বৈশাখ মানেই নববর্ষ। এ বিশেষ দিন উপলক্ষে গ্রামবাংলায় মেলা বসে। সেসব মেলায় গরম জিলাপি, গজা, নকুলদানা, বাদাম, খই, বাতাসাসহ নানা রকমের খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় তৈজসপত্র আর নানা রকমের খেলনা ওঠে। ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে ঘোরে নাগরদোলা, চলে পুতুলনাচ। আয়োজন হয় বলিখেলার, আমানি খাওয়া, গম্ভীরা, লাঠিখেলা কিংবা বায়োস্কোপ, জাদুমন্ত্র, বাঁদরনাচ, সাপখেলাসহ আরো কত আয়োজন। যারা নগরে বাস করেন নববর্ষ শব্দটি শোনা মাত্রই তাদের অনেকের মনের ভেতর শৈশব উঁকিঝুঁকি দিয়ে যায়। চঞ্চল হয়ে ওঠে মন। বড় ইচ্ছে করে ছায়া সুনিবিড় আম্রতলের কাদামাটির পুতুল কিংবা গোল্লাছুট খেলায় মেতে উঠতে। নববর্ষ এলেই মনে পড়ে যায় ফেলে আসা অসংখ্য এলোমেলো স্মৃতি। সেই স্মৃতির অনেকটা উজ্জ্বল, খানিকটা আবছা। নববর্ষ এলে ইচ্ছে হয় ভোরে ঘুম থেকে সবাই জাগার আগে চুপি চুপি বনে গিয়ে আম কুড়াতে। নববর্ষ এলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বজ্রের চোখ ঝলসানো আলো আর বাতাসের শাঁই শাঁই শব্দ। এ এক অন্যরকম অনুভূতি। এভাবে গ্রামবাংলার লোকজ জীবনের সাথে পহেলা বৈশাখ ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে।
পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উপলক্ষে বসে বৈশাখী মেলা। মেলায় বিভিন্ন কৃষিপণ্য, কুটিরশিল্পে তৈরি পণ্য, হস্তশিল্প, মৃৎশিল্প পাওয়া যায়। শিশুদের জন্য থাকে নানারকমের খেলনা। বৈশাখী মেলা উপলক্ষে থাকে নানান বিনোদনের আয়োজন। মেলার বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকে যাত্রা, সার্কাস ইত্যাদি। উল্লেখ্য, বৈশাখ উপলক্ষে, একসময় ঢাকায় ঘুড়ি প্রতিযোগিতা হতো। মুন্সীগঞ্জে হতো গরুর দৌড় প্রতিযোগিতা। এরকম দেশজুড়ে হতো ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, ঘোড়দৌড়, পায়রা ওড়ানো, নৌকাবাইচ ইত্যাদি খেলা। এসব এখন হারিয়ে গেছে। তবে চট্টগ্রামে এখনো অনুষ্ঠিত হয় বলিখেলা। দেশের কোথাও কোথাও হাডুডু খেলা হয়। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে বাস করে অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠী। তারা চৈত্রসংক্রান্তির শেষে ও বৈশাখের প্রথমে উৎসব পালন করে। পার্বত্য আদিবাসীদের সবচেয়ে বড় উৎসব বৈসাবি। ত্রিপুরার আদিবাসীরা এ উৎসবকে বৈসুক বলে। মারমারা বলে সাংগ্রাই আর চাকমারা বলে বিজু। এ তিনটি নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে হয়েছে বৈসাবি। চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন ও বৈশাখের প্রথম দিন মোট এই তিনটি দিন বৈসাবি পালিত হয়। বৈসাবি উৎসবে তারা পুরনো বছরকে বিদায় জানায়। আর নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। বৈসাবি উৎসবের প্রথম দিনটির নাম ফলবিজু। এ দিনটি শিশু-কিশোররা ফুল তুলে ঘর সাজায়। এদিন নানারকম সবজি দিয়ে নিরামিশ রান্না করা হয়। নানা রকম মিষ্টান্ন ও পিঠা তৈরি করা হয়। এদিন মূল অনুষ্ঠান হয়। এ উপলক্ষে সবাই সবার বাড়িতে বেড়াতে যায়। বাড়িতে সকলকে আপ্যায়ন করা হয়। আদিবাসীরা আদিকাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এ উৎসব পালন করছে। উল্লেখ্য, নববর্ষে আমরা অনেকভাবেই শুভেচ্ছা বিনিময় করি। ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইদানীং সব জায়গাতেই নববর্ষের কার্ড, হোক তা ছাপানো কিংবা নিজে বানানো, এই কার্ড বিনিময় হয় খুব। হৃদয়ের সমস্ত আকুতি মিশিয়ে লেখা হয় এইসব কার্ডের ভাষা। কাছের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা ঝরে ঝরে পড়ে এই সব কার্ডে। কবিতা, কবিতার লাইন, ছড়া, বন্ধুত্বের অকৃত্রিম ছোঁয়া জড়ানো আঞ্চলিক কথামালা- এ সবই থাকে শুভেচ্ছা কার্ডে। অনেকে কাগজ ছাড়াও অন্য মাধ্যমে, স্যুভেনির বা শুভেচ্ছা উপহার তৈরি করে থাকেন। ধনী কিংবা দরিদ্র অথচ সৃজনশীল অনেক শিশু-কিশোর, বাবা-মা বড় ভাইবোনদের জন্য পাঠানো অন্য কাউকে কেটেছেঁটে নতুন করে রঙতুলির আঁচড় দিয়ে মজার সব কার্ড তৈরি করে প্রিয়জনকে বিলি করে। মোট কথা নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময়ের অন্যতম মাধ্যম কার্ড। ভুলো না আমায়, মায়ের স্মৃতি, বড় ভাইয়াকে তুলি- এসব সুন্দর সুন্দর লেখা তোলা হাত পাখা, বালিশের কভার এখনো বিনিময় হয় গ্রামবাংলায়। নববর্ষের শুরু থেকেই গরমের যে যন্ত্রণা শুরু তার আগেই মায়েরা, বোনেরা, স্ত্রীরা তাদের প্রিয়জনের জন্য স্মৃতি জাগানিয়া নববর্ষের উপহার ঠিক করে রাখেন যাতে বাতাসের প্রতিটি পরশ তাদের কথা মনে করে দেয়। বাংলা নববর্ষ বাঙালির জীবনে নবচেতনার আলোকে অবগাহনের দিন। আবহমান কাল ধরে এই দিনটি বাঙালির জীবনে নতুন সম্ভাবনার উৎসবের দীপালি জ্বেলে নতুন আশার আলো নিয়ে আসে। পহেলা বৈশাখের আগমনে বাঙালির জীবন থেকে মুছে যায় পুরাতন বছরের জীর্ণ আবরণ। চির নতুনকে বরণ করার জন্য বাঙালির অন্তর ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তাই পহেলা বৈশাখ বাঙালির জীবনে নব উন্মেষের দিন। অতীতকে মুছে ফেলার দিন। গত একটি বছরের সব দুঃখ কষ্ট বেদনাকে হাসি গান আর আনন্দ দিয়ে ঢেকে ফেলার দিন। তাই বাঙালি জাতির হাজার বছরের ঐতিহ্যময় এই দিনটি আমাদের সংস্কৃতি ও ভালোবাসার মূর্ত প্রতীক। পহেলা বৈশাখ ও নববর্ষের আগমনে আমরা সবাই উজ্জীবিত হই, জেগে উঠি নতুন প্রেরণায়। শুভ বাংলা নববর্ষ ১৪২৩।

SHARE

Leave a Reply