Home স্বাস্থ্য কথা গরমের রোগ-ব্যাধি -ডা: জাহিদুল বারী

গরমের রোগ-ব্যাধি -ডা: জাহিদুল বারী

ঋতু পরিবর্তন মহান আল্লাহ তায়ালার এক বিশেষ নিয়ামত। ঋতু পরিবর্তনের ফলে আমরা প্রকৃতিতে নানা ধরনের ভিন্নতা দেখতে পাই যা আমাদের চারপাশের পরিবেশের ওপর এমনকি আমাদের শরীরের ওপরও প্রভাব ফেলে। ঋতু পরিবর্তন আমাদের শরীর ও মনে ভিন্ন রকমের আমেজ সৃষ্টি করে। তাই স্বাভাবিকভাবেই ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন আমাদেরকে প্রভাবিত করে। তবে নানাবিধ ব্যস্ততার কারণে শারীরিক ও মানসিক এই সকল পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রে আমাদের অলক্ষ্যেই  পেরিয়ে যায়। ঋতু পরিবর্তনের কারণে মানুষের শরীরে ভালো ও মন্দ উভয় ধরনের প্রভাবই পরিলক্ষিত হয়। সঙ্গত কারণেই এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সম্যক ও বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণা থাকলে আমরা সহজেই ঋতু পরিবর্তনজনিত নানা ধরনের সমস্যাকে মোকাবেলা করে আমাদের শরীরকে আল্লাহর রহমতে সুস্থ ও সতেজ রাখতে পারব।
শীতের বিদায় ঘটিয়ে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে ঋতুরাজ বসন্তের আগমনী বার্তা জানিয়ে দিয়েছেন। বসন্তকালে প্রকৃতিতে বিশেষ পরিবর্তন ঘটে। এ সময় গাছে গাছে সব পাতা ঝরে যায়। তাই প্রকৃতি হয়ে ওঠে রুক্ষ। রাস্তায় রাস্তায় ধুলা উড়তে থাকে। রোদের প্রখরতা বাড়তে থাকে। গরমের তীব্রতাও বাড়তে থাকে। বন্ধুরা, বসন্তকালে প্রকৃতির পরিবর্তনের কারণে আমাদের স্বাস্থ্যগত যেসকল সমস্যা দেখা যায় আমাদের এ পর্বের আলোচনা সেগুলোকে নিয়েই।
বসন্তকালে বিভিন্ন ভাইরাসজনিত রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। বিশেষ করে চিকেন পক্স, রুবেলা, মাম্পস, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসজনিত জ্বর ইত্যাদি। তবে এই সকল রোগের প্রায় সবগুলোরই প্রাথমিক উপসর্গে (ঝুসঢ়ঃড়সং) মিল থাকায় আমাদের অনেকেই শুরু থেকে এগুলোকে গুরুত্ব দেয় না এমনকি চিকিৎসাও নেয় না। এর ফলে প্রায়শই অসুখগুলো জটিল আকার ধারণ করে।

চিকেনপক্স

এই অসুখটি আমাদের দেশে বসন্ত রোগ হিসেবে পরিচিত। এটি একটি ছোঁয়াচে রোগ। ভ্যারিসেলা জোস্টার (ঠধৎরপবষষধ তড়ংঃবৎ) নামক ভাইরাস এই রোগের জন্য দায়ী। চিকেনপক্স সাধারণত ১০ বছরের নিচের বাচ্চাদের বেশি হয়। তবে বড়দেরও এ অসুখ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অসুখের তীব্রতাও অনেক বাড়ে। চিকেনপক্স সাধারণত বছরের ১ম ৬ মাসের মধ্যে হয় কিন্তু আমাদের দেশের বসন্ত ও গ্রীষ্মকালের শুরুতে এ রোগের প্রকোপ বেশি দেখা দেয়। জনবহুল এলাকাগুলোতে এ রোগ বেশি ছড়ায় বলে স্কুল পড়–য়া শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা এ রোগে আক্রান্ত হয় বেশি। চিকেনপক্স মানুষের শ্বাসতন্ত্র দিয়ে ছড়ায়। সর্দি, কাশি, হাঁচি ইত্যাদির মাধ্যমে এ রোগ মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়। গর্ভবতী মায়ের এ রোগ হলে তার পেটের বাচ্চাও আক্রান্ত হতে পারে।
উপসর্গসমূহ : চিকেনপক্সের উপসর্গসমূহ ক্লিনিক্যালি বিভিন্ন রকম হতে পারে। অল্প জ্বর, হাঁচি, ঘামজনিত ঠান্ডা লাগা, শরীরে অল্প গোটা ওঠা থেকে শুরু করে অনেক ক্ষেত্রে তীব্র জ্বর ও সমগ্র শরীরে গোটা ওঠা প্রভৃতি বিভিন্ন উপসর্গ হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে শরীরে গোটা ওঠার আগে অল্প জ্বর, পিঠে ব্যথা, কাঁপুনি, শরীর ম্যাজম্যাজ করা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। ছোটদের ক্ষেত্রে এই উপসর্গ ২৪ ঘণ্টা বা তার কিছু বেশি সময় থাকে তবে প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই উপসর্গ গোটা ওঠার ২-৩ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বর আসার ১ম দিন থেকেই বুক, পেট, পিঠ, মুখ, হাত ও পায়ে ছোট ছোট গোটা দেখা যায় এবং খুব দ্রুত এগুলো সমগ্র শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত এ রোগ ১৪-১৬ দিন পর্যন্ত থাকে। তবে প্রাথমিক উপসর্গগুলো দেখা দিলেই দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
করণীয় : চিকেনপক্সের উপসর্গগুলো বিশেষ করে শরীরে গোটা ওঠার সাথে সাথেই আক্রান্ত ব্যক্তিকে পরিবারের অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখা উচিত, যাতে করে এই অসুখ অন্যদের মধ্যে না ছড়ায়। তার সর্দি, কাশি, থুথু ইত্যাদি নিষ্কাশনের জন্য আলাদা বাথরুম, আলাদা বেসিন প্রভৃতির ব্যবস্থা করা উচিত। রোগীকে বেশি করে পানি পান করা উচিত। রোগীকে বেশি করে শাকসবজি ও ফলমূল বিশেষ করে করলা, শজনে, কচুশাক, গাজর, ঢেঁড়স, মাল্টা, কমলালেবু, লেবু, সফেদা, স্ট্রবেরি ইত্যাদি খাওয়া উচিত। এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে এন্টি অক্সিডেন্ট ও প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান থাকে বলে রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
চিকেনপক্স প্রতিরোধ : বিশ্বব্যাপী চিকেনপক্সের প্রতিরোধের জন্য ভ্যাক্সিন বা টিকা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে। আমাদের দেশেও চিকেনপক্সের  টিকার ব্যবস্থা আছে।
ক্ষতিকর জটিলতাসমূহ : শুরু থেকেই সঠিক চিকিৎসা পেলে চিকেনপক্স সাধারণত সম্পূর্ণরূপে ভালো হয়ে যায়। কিন্তু চিকিৎসায় বিলম্ব ঘটলে অনেক ধরনের জটিলতা দেখা দেয় যেগুলো অনেকাংশে শরীরের ব্যাপক ক্ষতি করে। এ রোগের ফলে রক্তক্ষরণ, নিউমোনিয়া, এনকেফালাইটিস, লিভার প্রদাহ ইত্যাদি হয়। গর্ভবতী মায়ের এ রোগ হলে পেটের বাচ্চার অঙ্গ বিকৃতি, ছোট মাথা, জন্মের সময় ওজন কম হওয়া এমনকি বাচ্চার গর্ভকালীন মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

রুবেলা

রুবেলা হচ্ছে শিশুদের ভাইরাসজনিত তীব্র ইনফেকশন যা রুবেলা নামক ভাইরাস দিয়ে ঘটে থাকে। সাধারণত শীতের শেষে এবং বসন্তকালের শুরুতে শিশুরা এ রোগে আক্রান্ত হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এ রোগ গর্ভবতী মায়ের মাধ্যমে তার পেটের বাচ্চাকে আক্রান্ত করে। তাই এ রোগে আক্রান্ত শিশুদের অনেক জন্মগত ত্রুটি থাকে। এ রোগ সমগ্র পৃথিবীতে শিশুমৃত্যু ও শিশুদের জন্মগত ত্রুটির অন্যতম কারণ। অনেক ক্ষেত্রে এই ভাইরাস সর্দি, হাঁচি, কাশি প্রভৃতির মাধ্যমে ছড়ায়। সাধারণত ৩-১০ বছর বয়সের শিশুদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।
উপসর্গসমূহ :  রুবেলা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সর্দি, গলা ব্যথা, অল্প জ্বর ইত্যাদি উপসর্গ পাওয়া যায়। পরে শরীরে ছোট্ট ছোট্ট গোটা ওঠে। প্রথমে মুখে এরকম গোটা ওঠে পরে শরীরে ছড়িয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে চোখের কনজাংকটিভাতে প্রদাহ হয়।
করণীয় :  এ রোগের প্রাথমিক উপসর্গগুলো দেখা দিলেই রোগীকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা শুরু করতে হবে।
জটিলতাসমূহ : সঠিক চিকিৎসা না হলে এ রোগের কারণে পরবর্তীতে জয়েন্ট ফুলে যাওয়া ও জয়েন্ট ব্যথা, আর্থ্রাইটিস,  থ্রোম্বসাইটোপেনিয়া, প্রজনন তন্ত্রের জটিলতা প্রভৃতি জটিল সমস্যা দেখা দিতে পারে।
প্রতিরোধ : আমাদের দেশে সরকারিভাবে শিশুদের জন্মের পরে রুবেলা ভাইরাসের ভ্যাকসিন দেয়া হয়। তাই প্রত্যেক শিশুকেই সময়মতো টিকা দেয়া উচিত।

শেষ কথা :  আমাদের দেশে এই অসুখগুলো নিয়ে অনেক কুসংস্কার প্রচলিত আছে। এগুলো কুসংস্কারমূলক কথাকে গুরুত্ব না দিয়ে সরাসরি চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে খুব সহজেই আমরা অসুখগুলো থেকে সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হতে পারব ইনশাআল্লাহ্।

SHARE

Leave a Reply