Home প্রবন্ধ গান-কবিতায় দেশপ্রেম -সাকী মাহবুব

গান-কবিতায় দেশপ্রেম -সাকী মাহবুব

যে  ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিবেশের মধ্যে মানুষ জন্মগ্রহণ করে এবং বড় হয় ওঠে, সেই পরিবেশের প্রতি, সেখানকার মানুষের প্রতি তার একটি স্বাভাবিক আকর্ষণ গড়ে ওঠে। দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি এ আজন্ম আকর্ষণই দেশপ্রেম। দেশপ্রেম মানুষের একটি স্বভাবজাত গুণ। দেশকে ভালোবেসে এ দেশের লক্ষ লক্ষ লোক নিজের জীবন বিলিয়ে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। ১৭৫৭ সালের বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের ভেতর দিয়ে বাংলার শেষ স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। উদ্ভব ঘটে পশ্চিমা ইউরোপীয় ইংরেজ শাসনের। ইংরেজরা এ দেশে শাসনের নামে শোষণ শুরু করে। তাদের অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে গোটা দেশবাসী। তাদের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য দেশপ্রেমিকগণ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কবি সাহিত্যিকগণ তাঁদের সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে দেশবাসীকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জোগান। তারপর ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে এ দেশের স্বাধীনতার চেতনা ও  স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। বহু কাল আগে থেকেই এ দেশের কবিদের ভেতর দেশপ্রেমের উন্মেষ ঘটেছিল। বাংলাদেশ যেহেতু কবির দেশ, কবিতার দেশ, গানের দেশ, সুরের দেশ, সেই কারণে এ দেশের কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও গীতিকারের কলমে দেশপ্রেমের গান ও কবিতা উঠে এসেছে বারবার। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে আমরা গান কবিতার দেশপ্রেম নিয়ে কিছুটা আলোচনা করার প্রয়াস পাবো ইনশাআল্লাহ।
মধ্যযুগের অন্যতম কবি আব্দুল হাকিমের কবিতায় মাতৃভূমির প্রতি গভীর মমত্ববোধের পরিচয় মেলে। বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করে যারা বাংলাভাষাকে ঘৃণা করেন তারা কেন এ দেশ ত্যাগ করছেন না- এ প্রশ্ন তিনি করেছেন তাঁর এ কবিতায়-
“যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী
সে সব কাছার জন্ম নির্ণয় ন জানি।
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়া।
নিজ দেশ ত্যাগী কেন বিদেশ ন যার।”
যুগ সন্ধিক্ষণের কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতায় দেশপ্রেমের প্রভাব লক্ষ করা যায়। তিনি বলেছেন-
মিছা মণি-মুক্তা হেম
স্বদেশের প্রিয়-প্রেম
তার চেয়ে রত্ন নাই আর।
বাংলা কাব্যসাহিত্যে আধুনিক যুগের ¯স্রষ্টা মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতায় স্বদেশপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়। কপোতাক্ষ নদ কবিতায় তিনি বলেন-
“বহুদেশ দেখিয়াছি বহুনদ-দলে,
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?
দুগ্ধ ¯স্রোতরূপী তুমি জন্মভূমি স্তনে।”
কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতায় দেশপ্রেমের ঝড় লক্ষ করা যায়। কবির ভাষায়-
“স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়?
কে বাঁচিতে চায়?
দাসত্ব শৃঙ্খল বল, কে পরিবে পায় হে
কে পরিবে পায়?
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ও কবিতায় দেশপ্রেমের চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন-
“আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।”
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের অসংখ্য গান ও কবিতায় দেশপ্রেমের অগ্নিঝরা বাণী রয়েছে। তিনি লিখেছেন-
“সোনা সোনা সোনা
লোকে বলে সোনা
সোনা নয় তত খাঁটি
বল যত খাঁটি, তার চেয়ে খাঁটি
বাংলাদেশের মাটিরে
আমার জন্মভূমির মাটি।”
দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে কবি গোবিন্দ্র চন্দ্র দাস লিখেছেন-
“হেরিলাম কত দেশ কত সৌধ মালা
কিন্তু তৃপ্ত না হইল এ দগ্ধ নয়ন,
তোমার ধূলিতে গড়া এ দেহ আমার
তোমার ধূলিতে কালে মিশিবে আবার।”
কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বলেছেন-
“মধুর চেয়েও আছে মধুর
সে আমার দেশের মাটি।”
কবি দ্বীজেন্দ্র লাল রায় ‘ধন ধান্য পুষ্পভরা’ কবিতায় সুন্দর করে লিখেছেন-
“এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাক তুমি,
সকল দেশের রানী সে যে, আমার জন্মভূমি”
কবি কায়কোবাদের কবিতায় দেশপ্রেম অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে। যেমন-
“বাংলা আমার আমি বাংলার
বাংলা আমার জন্মভূমি
গঙ্গা ও যমুনা পদ্মা ও মেঘনা
বহিছে যাহার চরণ চুমি।”
প্রকৃতি ও দেশপ্রেমের অমর কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় দেশপ্রেমের রং ফুটে ওঠে এভাবে-
“বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি
তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে চাই না আর।”
প্রখ্যাত বরণীয় গীতিকার অধ্যাপক আবু জাফর তার গানে দেশপ্রেমের কথা বলেছেন-
“আমার দেশের মাটির গন্ধ
ভরে আছে সারা মন
শ্যামল কোমল পরশ ছাড়া যে
নেই কিছু প্রয়োজন।”
গাজী মাজহারুল আনোয়ারের গানে দেশপ্রেমের তীব্রতা লক্ষ্য করা যায়। যেমন-
“একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়
কোথায় কোকিল ডাকে কুহু
দোয়েল ডাকে মুহু মুহু
নদী যেথায় ছুটে চলে আপন ঠিকানায়।”
জনপ্রিয় কবি ও গীতিকার মতিউর রহমান মল্লিকের গানে দেশপ্রেম ফুটে উঠেছে এভাবে-
“মাঠ ভরা ঐ সবুজ দেখে
নীল আকাশের স্বপ্ন এঁকে
যার কথা মনে পড়ে…
সে যে আমার পাল্নেওয়ালা।

ঐ যে পাখি মেল্লো পাখা
কোন্ অজানার পথে একা
ও যেন স্বপ্ন দেখা
ও যেন কাব্য লেখা
যার প্রেমে সুরে সুরে…
সে যে আমার পাল্নেওয়ালা।

ঐ যে দূরে মেঘের খেলা
জোনাক জোনাক তারার মেলা
ও যেন শিল্পপরী
কি মধুর মরি! মরি!
যার ছোঁয়া লেগে ওরে…
সে যে আমার পাল্নেওয়ালা।
ঐ যে অলী ফুলের কানে
বললো কথা গানে গানে
আহারে জুড়িয়ে গেল
বেদনা ভুলিয়ে গেল
যার স্বরলিপি পড়ে…
সে যে আমার পাল্নেওয়ালা।”
কবি মোশাররফ হোসেন খান তাঁর ‘দেশের জন্য’ কবিতায় দেশপ্রেমের এক চমৎকার নিটোল ছবি এঁকেছেন এভাবে-
“আকাশ ভরা তারার মেলা বাওড়ি বাউল সুর
বাতাস ফুঁড়ে যাচ্ছে ছুটে সামনে বহু দূর।
মাথার পরে আছড়ে পড়ে আপন করা হাসি
যে হাসিটা অনেক দামী- জোসনা রাশি রাশি।
ভুবন জোড়া খুশির মায়া জড়িয়ে আছে মা-কে
সাত সমুদ্দুর ওপার থেকে মা- যে আমার ডাকে।
স্বদেশ আমার সূর্য হাজার রাজ্যিসেরা সুখ
সবুজ-সোনা আলপনাতে ভাসে তারই মুখ।
স্বদেশ আমার ব্যাকুল হৃদয় আকুল করা গান
দেশের জন্য ভালোবাসা বান ডেকেছে বান ॥”

পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাসাহিত্যের কবিতার শাখাটি দেশপ্রেমের কবিতায় সমৃদ্ধ। কবি-সাহিত্যিকগণ দেশপ্রেম গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেন বলে যুগে যুগে যত কবি-সাহিত্যিকগণ জন্মগ্রহণ করেছেন, তাঁদের অধিকাংশই লিখেছেন ভালোবাসার স্বদেশকে নিয়ে। আমাদের বাংলা কবিতা ও সাহিত্যেও দেশপ্রেমের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। অনাগত কালে এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাসাহিত্য আরো সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।

SHARE

Leave a Reply