Home গল্প আয়নাল -মহিউদ্দিন আকবর

আয়নাল -মহিউদ্দিন আকবর

মুয়াজ্জিনের সুরেলা কণ্ঠে মুখরিত ভোর। চারদিকে কোরাসের তানে ধ্বনি থেকে প্রতিধ্বনি তুলছে সেই মোহন কণ্ঠস্বর। এমন মায়াময় আহ্বানে আর শুয়ে থাকতে পারে না বাপহারা এক ছোট্ট ছেলে। আরামের বিছানা ছেড়ে উঠে বসে। বয়স কতো আর হবে এগারো অথবা বারো। ওর নাম আয়নাল। পুরো নাম আয়নাল মাস্টার। প্রমত্তা পদ্মায় গিলে ফেলা মাস্টার বাড়ির আবেদ আলী মাস্টারের ছেলে আয়নাল মাস্টার।
বাড়িঘর পদ্মায় খেয়েছে বলে বাড়ির নাম তো আর মুছে ফেলা যায় না, তাই ওর আব্বা-আম্মা আয়নালের নামের সাথে মাস্টার বাড়ির স্মৃতি ধরে রাখতেই জুড়ে দিয়েছেন মাস্টার পদবিটা। কিন্তু বাড়িঘর হারিয়ে বস্তিতে আশ্রয় নেয়ার পর সেই মাস্টার শব্দটাই হারিয়ে গেছে। এখন শুধু আয়নাল। কেউ কেউ ডাকে আয়নাইল্লা বলে। তাতে আয়নালের দুঃখ নেই। এ নিয়ে কারো সাথে গায়ে পড়ে ঝগড়াও বাধাতে যায় না।
বিছানা ছাড়ার পর চোখ ডলতে ডলতে আড়মোড়া ভাঙে আয়নাল। ছোট্ট একটা হাই তুলে ডান হাতটা চাপা দেয় মুখে। ধীরপায়ে বস্তিঘরের ছালার চটে বানানো আধছেঁড়া পর্দা সরিয়ে হালকা কুয়াশায় ঘেরা বাইরের জগৎটাকে দেখে নেয়। অমনি ওর বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে! আধো আলো-আঁধারিতে বস্তির মুখে দাঁড়িয়ে কথা বলছে দবির আর মানিক। ওরা আয়নালের আগেই উঠে পড়েছে। তাহলে ওরই উঠতে দেরি!
আয়নাল আর ভাবতে পারে না। সুরুৎ করে ঢুকে পড়ে বস্তিঘরে। খুব আদরের সাথে ডেকে তোলে মাকে- মাগো আজান পইড়া গেছে। উঠো। নামাজ পইড়া আমারে দুগা পান্তা দ্যাও। আমি মসজিদে যাই। আইয়া দেরি করবার পারুম না। বাইরে উক্কি দিয়া দেখলাম, দবির আর মানিক বাইর অইয়া পড়ছে। আমার আগেই অরা ইটা ভাঙতে পাগলা ঘাট যাইবোগা। তয় যাউক। আমি সাতটার আগে হাজিরা দিবার পাড়লেই চলবো।
আয়নাল আর অপেক্ষা করে না। বস্তিপাড়া লাগোয়া স্টেশনের দিকে ছোটে। তারপর স্টেশন মসজিদ থেকে বেশ ফুরফুরে মেজাজে বস্তিতে ফিরে বাসন টেনে বসে যায় মায়ের পাশে। একটা কাঁচামরিচ, এক টুকরো পেঁয়াজ আর লবণ-ডলে মায়ের হাতে বাড়া সামান্য পান্তা গিলে- শুকুর আলহামদুলিল্লাহ্ বলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে। অমনি ওর মহাজনের মুখটা মনের পর্দায় ভেসে ওঠে।
মহাজন খুব কড়া মানুষ। কথায় কথায় বলে, “নো হাংকি মাংকি। নো ফাঁকিবাজি। টাকা দিয়ে কাজ করাবো, তদ্ নগদে যাকে সামনে পাবো তাকেই কাজে লাগাবো। আমার চাই ওয়েল প্রোডাকশন। বেশি বেশি উৎপাদন। এটা মামাবাড়ি নয়, কাজের জায়গা। সময় নষ্ট করে লস টানতে পারবো না। যে সময় মতন আসবে সে কাজ পাবে। সাতটা থেকে এক মিনিট দেরিতে এলেই বাদ।”
আয়নাল আর ভাবতে পারে না। আকাশের দিকে তাকিয়ে সময় বোঝার চেষ্টা করে। শীতের সকাল। মনে হয়, সূর্যমামা এখনো ঘুমের ঘোরে। আকাশ কেবল ফর্সা হতে শুরু করেছে। তার মানে খুব বড়জোর সকাল ছয়টা। হাতে সময় মাত্র এক ঘণ্টা। কাঁটায় কাঁটায় সকাল সাতটায় হাজিরা দিতেই হবে। দেরি করলে আর উপায় নেই। সারাটাদিন বেকার কাটাতে হবে। আর বেকার কাটালে মায়ের ওষুধ, এক কেজি চাল, কমপক্ষে দু’টি ডিম অথবা দুশ’ গ্রাম ডাল, সামান্য সয়াবিনতেল, আধা কেজি কাঁচা পেঁপে, পাঁচ টাকার পেঁয়াজ আর দু’টাকার কাঁচামরিচ কেনা হবে না।
সে কি কম খরচের ব্যাপার! এই খরচের টাকাটা রোজগার করতে না পারলে মাকে নিয়ে আয়নালের একটা দিন স্রেফ অনাহারেই কাটাতে হবে। তা ছাড়া মায়ের জন্য কাঁচাপেঁপে আর ওষুধ না হলে তো চলবেই না। সরকারি হাসপাতালের বড় ডাক্তার বলেছেন, তোমার মা ডিওডেনাল আলসারের রোগী। টানা এক বছর মসলা ছাড়া তরকারি আর কাঁচাপেঁপে কেটে কাঁচা অথবা সেদ্ধ করে খাওয়াবে। তিন মাস চলবে সকাল ও রাতে একটা করে স্পানিল ও রেনিডিন ট্যাবলেট। সাথে দিতে হবে একটা করে মেক্সিমা ক্যাপসুল।
আয়নাল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বলে, সরকারি হাসপাতালের বড় স্যার তা-ও দয়া কইরা বিনাট্যাকায় চিকিৎসার ব্যবস্থা করছেন। অহন ওষুধ তো আমাগোই কিনোন লাগবো। আব্বায় জিন্দা থাকলে আমার এতো চিন্তা করণ লাগতো না। হায়াতের মালিক আল্লাহ তারে তুইলা নিলো। আমারও মাদরাসায় যাওয়া বন্ধ অইলো।… আল্লারে তুমি আমার লগে থাইকো।… আয়নালের বুক ফেড়ে আরো একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। ও তাড়াতাড়ি মাকে সালাম করে বলে, সময় মতন ওষুধ খাইও। রাইতের আর কাইল সকালের ওষুধ লইয়া আমুনে। পেঁপেসেদ্ধ খাইতে ভুইলো না। আমি আল্লার নামে চললাম।
কথাটা বলে আর দেরি করে না আয়নাল। দ্রুত পা চালায় বস্তির মোড়ের দিকে। আয়নালের মা ছেলের শাসনের তোড়ে আলসারের ব্যথা পেটে নিয়েও মুচকি না হেসে পারেন না। তিনি ছেঁড়া চটের পর্দা সরিয়ে ‘মড়েল হাঁসের’ মতো গলা টান টান করে বাইরে চোখ রাখেন। পেছন থেকে ছেলের দ্রুত পা চলনা দেখে বুকে একটা প্রশান্তির শ্বাস টেনে বিড়বিড় করে বলেন, ফি আমানিল্লাহ। আল্লাহ গো পোলাডারে তোমার হাতে সইপা দিলাম। অরে তুমি দেইখো।…
না, পাগলাঘাটে পৌঁছতে আয়নালের দেরি হয়নি। একেবারে ছয়টা পঞ্চাশ মিনিটেই হাজিরা লাইনে ঠাঁই পেয়ে যায়। তবে ওর থেকে প্রায় পনের-ষোলো জনের আগে লাইনে জায়গা নিয়েছে দবির আর মানিক। এখনও মহাজন কাউকে কাজে নিযুক্তি দেননি। মহাজন তার লোকজনকে নিয়ে কিসব পরামর্শে ব্যস্ত।
রোদ থেকে মহাজনের মাথা বাঁচানোর জন্য নিজে রোদের তেজে হাবুডুবু খেয়েও ছাতা ধরে আছে এক কর্মী। নাম সম্বল মিয়া। বেটা গায়ে-গতরে বেশ তাগড়া জোয়ান। এই ছাতা ধরার কাজটুকু করেই ঘাটের খোয়াভাঙা মজুরদের চাইতে বেশ ভালো মজুরি পায়। তবে এই মজুরিকে পুরোপুরি হালাল করতে মাঝেমধ্যে বাজখাই কণ্ঠে দিনমজুরদের কাজের তাড়া লাগাতে হাঁক ছাড়ে। কাজে ফাঁকি না দেয়ার হুঙ্কার মেরে আয়নাল, দবির, মানিকদের মতো শিশুশ্রমিকদের আন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দেয়।
তাতে সবাই নাখোশ হলেও আয়নাল বেশ খুশি। ওর কাজের আলসেমি নিমেষেই কেটে যায়। দুর্দুমার হাত চালিয়ে সারাদিনে অন্যদের চেয়ে দু’তিন সিএফটি ইটের খোয়া বেশি ভেঙে ফেলে। তাতে বিশ-ত্রিশ টাকা বেশি আয় হয়। এমনিতে দিনে গড়ে পরতায় ওরা মাথাপিছু পনের সিএফটি ইটের খোয়া ভেঙে মহাজনের মন জয় করে। আর কাজ শেষে পড়ন্ত বিকেলে যখন হাতের মুঠোয় দেড় শ’ করে টাকা বুঝে পায়- তখন দিনের ক্লান্তির কথা বেমালুম ভুলে যায়। মহাজনকে আদবের সাথে সালাম জানিয়ে বাজারের দিকে ছোটে।
তারপর যার যার প্রয়োজনীয় সদাইপাতি করে দলবেঁধে বস্তির পথ ধরে। তবে কাজে যাবার বেলা ওদের মাঝে আগে আগে ঘাটে পৌঁছার যে প্রতিযোগিতা থাকে, বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে সে প্রতিযোগিতাটা থাকে না। তখন ওরা খোশমেজাজে গল্প করতে করতে পথ চলে। এটাই ওদের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়মের পথে পা চালাতে গিয়ে ওদের মাঝে অনেক সুখ-দুঃখের আলাপ-সালাপও হয়। আর তখনই একের প্রতি অপরের ভালোবাসার সত্যিকারের চিত্রটা ফুটে ওঠে। সামান্য আলসেমি অথবা ইটের খোয়া কম ভাঙার কারণে যারা মহাজনের লোকের বকুনি শোনে অথবা মাঝে মধ্যে চড়-থাপ্পড় খায়- তাদের প্রতি সবাই সমবেদনার সাথে কথা বলে। একে অপরকে সান্ত¡না দেয়।
তবে নিজের সচেতনতা আর কাজের আমানতদারির কারণে আয়নালকে কখনো মার খেতে হয়নি। এ জন্য ওর প্রতি কারো ক্ষোভও নেই। বরং সবাই বাড়ির পথে ফিরতে ফিরতে ওর কাছেই সান্ত¡না খোঁজে। সে সুযোগে আয়নালও বেশ দরদ দিয়ে সহকর্মীদের বুঝায়, মহাজনের লোকেরা আমাগো ভালার লাইগাই ইট্টু আধটু মাইর-ধইর করে। কাম বেশি করলে আমরা ট্যাকাও বেশি পামু। তয় শইলে না কুলাইলে হ্যাগোর কাছে কইয়া-বইলা জিরাইলেই ভালা হয়। বুঝলি না, হ্যাগো ওতো মহাজনের কাছে কামের হিসাব দেওন লাগে। হ্যারাও মহাজনের মতন খালি ‘পডাকশন’ বাড়াইবার চায়।
হ্যাঁ, এই ‘পডাকশন’ জিনিসটা যে কী! তা বকলম আর সামান্য অক্ষরজ্ঞানওয়ালা এসব ইটের খোয়াভাঙা শিশু মজুররাও বেশ বুঝে গেছে। মহাজনের ‘পডাকশন’ মানে প্রোডাকশন বাড়াতে পারলে ওদেরও যে লাভ, তা এখন ওরাও বোঝে। তাই আয়নালের উপদেশ শুনে ঘাড় কাত করে মেনে নেয় সবাই। চড়-থাপ্পড় খেয়ে বাড়ি ফেরা শিশু মজুরটি মনে মনে শপথ নেয়, কাল থেকে আর কাজে ফাঁকি দেবে না। শরীরে না কুলোলে কাজের সর্দারকে বলে-কয়ে জিরিয়ে নেবে। তাতে দু-দশ টাকা কম রোজগার হলেও মার তো খেতে হবে না।…
প্রতিদিনের মতো আজও বেশ কাজ হয়েছে। কেউই কাজে ফাঁকি দেয়নি। ফলে ইটের খোয়া প্রোডাকশন মানে উৎপাদন হয়েছে অন্য দিনের চেয়ে দেড় শ’ সিএফটি বেশি। পড়ন্ত বিকেলে লালিমা মেশানো তামাটে রোদে লাইনে দাঁড়িয়ে যার যার পাওনা বুঝে নিচ্ছে মজুরেরা। ওদিকে কী এক কাজে আটকা পড়ে মহাজন সাহেব আর এদিকটায় আসতে পারেননি।
প্রতিদিনের মোটামুটি আন্দাজ মতো টাকা নিয়ে কাজের সর্দার পড়ে গেলেন মহা ফাঁপড়ে। মজুরির টাকা দিতে দিতে তার হাত টান পড়ে গেল। শত হলেও দেড় শ’ সিএফটি মানে দেড় শ’ বর্গফুট ইটের খোয়া বেশি ভাঙা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই অন্য দিনের চেয়ে আজ দেড় হাজার টাকা বেশি মজুরি গুনতে হবে। কিন্তু মহাজন সামনে না থাকায় সর্দার নিজের পকেটে হাত চালিয়ে পেলেন মোটে আট শ’ টাকা। তাও মজুরদের হাতে দিয়ে অবসর। আরও সাত শ’ টাকা চাই।
এদিকে ইটের খোয়া মাপজোখ করতে করতে আয়নাল, দবির আর মানিক পড়ে গেছে শেষ কাতারে। ওরা সর্দারের সামনে আসতেই তিনি বললেন, আয়নাল মিয়া, আজকা তো মহাজনসাবে নাইকা। আইজকা তুমি, মাইনকা আর দবিরা বাইত যাওগা। কাইল এক লগে হগল পাওনা বুইঝা নিও।
সর্দারের কথায় ওদের মাথায় বাজ পড়ার দশা। মানিক অনেকটা অস্থির হয়ে বললো, এইডা একখান কতা অইলো সর্দারচাচা! আমগো ঘরে খাওন নাই। খালি হাতে বাইত গিয়া কী করুম?
দবির আরেকটু আগবাড়িয়ে বললো, আপনেরা দিহি আমগো তনে ফকির! মোটে কয়খান ট্যাকার কাম বেশি অইছে, অমনেই আপনেগো মালপানি শট! আগে কইলে আধাবেলা কাম কইরা রেল ইস্টিশনে ছিঁড়া কাগজ টোকাইবার যাইতামগা।…
দবিরের কথায় সর্দার মুখ বাঁকিয়ে ভেংচি কেটে বললেন, ইস্ কত্ত বড় কামাইছুতরে! আধাবেলা ছিঁড়া কাগজ টোকাইয়া ভাত খাইবো। তয় আর ইটার ঘাটে কামে আহোছ ক্যান? খালি বুইড়া মাইনষের মতন বচন মারো, না?
সর্দারের ধমকে দবির হাল ছাড়তে নারাজ। ও যুক্তি খাটিয়ে বলে, আপনে কি খবর রাহেন চাচা? আইজকাইল মাইনষেরা রেলগাড়িতে আর ভদ্দর লোকের মতন থাহে না। এইডা অইডা খাইয়া ছিঁড়াফাঁড়া প্যাকেট আর কাজগপাতি তো রেলগাড়ির ভেতরে ফালাইয়াবোই- আবার দুই ট্যাকা দামের হস্তা খবরের কাগজ পাইয়া হেইগুলি কিনবো আর পড়া শেষ কইরা রেলের ভেতরে ফালাইয়া ঠাট দ্যাহাইয়া নাইমা যাইবোগা। তা বাদে আইন-কানুনের ধার না ধাইরা রেলের ভেতরে বইয়া সিগারেট ফুঁকবো আর গন্ডায় গন্ডায় সিগারেটের খাইল্লা প্যাকেট ফালাইয়া রেলের বগি ময়লা করবো। আবার পানির খাইল্লা বোতলও ফালাইয়া যায়। ছালা একখান লইয়া রেলগাড়িত্ উঠলে পারলেই বস্তা ভর্তি।…
দবিরের কথায় এবার সর্দার রীতিমত তার দু’চোখ কপালে তুলে বললেন, ওরে বাপরে বাপ! আমগো টুইন্না কামলা দিহি আইন-কানুনের খবরও জানে অ্যাঁ!!
সর্দারের অবাক হবার কায়দা দেখে দবির এবার বুক ফুলিয়ে বলে, লেহাপড়া জানি না দেইখা কি অইবো চাচা, আপনেগো আলাপ-সালাপ হুনি না বুঝছেন? আমগো বস্তির চায়ের দোকানের টেলিভিশনেও ফুচকি মাইরা এইহগল জাইনা ফালাই। হেল্লেইগা আমরা আপনেগো নিয়ম-কানুন মাইনা চলি। তয় শিক্ষিত মাইনষেরে দেহি খালি নিয়ম ভাঙতে। তয় জাউকগা হেই কতা। অহন আমগো মজুরির ট্যাকা দিয়া বিদায় করেন। সদাইপাতি লইয়া বাইত যাইগা।…
দবিরের কথার জবাব কী দেবেন ভেবে পান না সর্দার। তিনি একটু নরম হয়ে বলেন, কইলাম তো কাইলকা একবারে দুইদিনের ট্যাকা দিয়া দিমুনে।
এবার আয়নাল মুখ খোলে। ও বেশ বিনয়ের সাথে বলে, সর্দারচাচা! শোনেন নাই? আমাগো নবীজি কইছেন- শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই আমগো পাওনা দিয়া দিতে। এইডা কিন্তু আমার কতা না। হাদিস শরিফে আছে। জানেন তো আব্বায় জিন্দা থাকতে মিজান জামাত পর্যন্ত মাদরাসায় পড়ছিলাম।
– ‘রাইট। একদম খাঁটি হাদিস। তা সর্দারজি, আপনার কত টাকা শর্টেজ আছে? ওদের গায়ে ঘাম শুকাবার আগেই সব পাওনা মিটিয়ে দিন। এই নিন এখানে হাজার দুয়েক টাকা আছে’। কথাটা বলেই খোয়া ভাঙার আড়তের পাশে দাঁড়ানো একটা ট্রাকের পাশ থেকে বেরিয়ে এলেন খোদ মহাজন সাহেব। তাকে দেখে তো সবাই তাজ্জব! তিনি হাসতে হাসতে আয়নালের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, শোন ব্যাটা আয়নাল- তুই চাইলে আবার মাদরাসায় পড়তে পারিস। আমি একটা মাদরাসার সভাপতি। মাদরাসাটা খুব বেশি দূরে না। তোদের বস্তির কাছাকাছি। আমি মুহতামিম সাহেবকে বলে দেবো। তোর কোন খরচ লাগবে না। তবে কষ্ট করতে হবে। পারবি তো? সারাদিন কাজ শেষে পাওনা নিয়ে, সদাইপাতি সেরে মায়ের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে, সোজা চলে আসবি মাদরাসায়। তাতে ছোট মানুষ হিসেবে তোর একটু খাটনি বেড়ে যাবে। কিন্তু আলেম হতে পারলে এই কষ্টের দিন আর থাকবে না। তোর আসল নাম তো আয়নাল মাস্টার, একদিন তুই সত্যি সত্যি তোর আব্বার মতো মাদরাসার মাস্টার হয়ে যাবি।
মহাজন সাহেবের কথায় আয়নালের মনে নতুন করে বাপ হারানোর হাহাকারটা মোচড় দিয়ে ওঠে। প্রচন্ড একটা ঝড় ওঠে মনের ভেতর। ওর কী থেকে যে কী হয়ে যায়, ও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে মহাজন সাহেবকে জড়িয়ে ধরে।

SHARE

Leave a Reply