Home তোমাদের গল্প সারপ্রাইজ শরিফ আহমাদ

সারপ্রাইজ শরিফ আহমাদ

আনিতাকে চেনো না? ঐ যে পিচ্চি মেয়েটা! পুতুলের মত মিষ্টি চেহারা। পাকনা পাকনা কথা বলে। হাসলে গালে টোল পড়ে। তার বয়স কত আর হবে! এই ধরো ৭-৮। ক্লাস ফোরে পড়ে। আজিমপুর গার্লস স্কুলে। রোল নম্বর ১০।
আনিতাদের বাসা ইসলামবাগে। নিজস্ব বাসাতে তারা থাকে। তার বাবা আতিয়ার চৌধুরী। নামকরা একজন ব্যবসায়ী। চকবাজারে রয়েছে তার দুটো দোকান। ব্যবসার কাজে তিনি ব্যস্ত থাকেন। বাইরে বাইরে ছুটে বেড়ান। এ জন্য তিনি মেয়েকে বেশি সময় দেন না। দিতে পারেন না। সময় না দিতে পারলেও খোঁজ নেন। অনেক কিছু কিনে দেন। দূর থেকে তার গতিবিধি লক্ষ রাখেন। স্ত্রী আক্তার জাহানের সাথে কথা বললে প্রথমে মেয়ের কথা জিজ্ঞাসা করেন। তার পর সারেন প্রয়োজনীয় কথা।
আনিতা একা স্কুলে যায় না। তার মা স্কুলে আনা-নেয়া করেন। মাঝে মাঝে অবশ্য আনিতার মামাও স্কুলে দিয়ে আসেন। তার মামা আ: মোমিন। তিনি গ্রামে থাকেন। লেখাপড়া করেন। ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে। ভাগিনীর টানে প্রায়ই তিনি ঢাকায় আসেন। ভাগিনীর সাথে গল্পে মেতে ওঠেন। গল্পে গল্পে শেখান অনেক কিছু। দেখান বিশাল নীল আকাশ। শোনান সমুদ্রের শোঁ শোঁ গর্জন। গাছের জন্য, ফুলের জন্য, প্রজাপতির জন্য তৈরি করেন আলাদা জগৎ। শেখান ভালোবাসা। পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে সজাগ করেন তাকে। গড়ে তোলেন প্রকৃতিপ্রেমিক।
মামার প্রেরণায় আনিতা টবে গাছ লাগায়। ফুলের গাছ। নানা ধরনের ফুলগাছ। গাছে পানি দেয়। যতœ নেয়। প্রতিদিন ছাদে গিয়ে দেখে। গাছে ফুল ফোটে। লাল, নীল, সবুজ আরো বহু রঙের ফুল। ফুলগুলোর সামনে বসে ও। রীতিমত মুখোমুখি। চোখাচুখি। মৃদু হাওয়া আসে। হাওয়ার দোল দোলোনি উপভোগ করে। ভোমরার সাথে গুণ গুণিয়ে গান গায়। তাদের ভাষা বোঝার চেষ্টা করে।
আজ বিকেলে কথা বলার চেষ্টা করছিলো। এই ক’মিনিট আগে ছাদে এসেছে। সুন্দর বাতাস বইছে। চার পাশে তাকাতেই একটা প্রজাপতি দেখলো। কী সুন্দর রঙিন ডানা! মাত্র এসে বসলো অর্ধ ফোটা একটা ফুলের ওপর। কৌতূহলী হলো ও। বিড়ালপায়ে গেলো কাছে। ঝামেলা বাধালো পাশের ফ্ল্যাটের আনিসা। ওপর থেকে পানি ফেললো। প্রাণ বাঁচাতে উড়ে পালালো প্রজাপতি। আনিতার খুব রাগ হলো। কটমট করে তাকালো তার দিকে। প্রতিবেশী হিসেবে তাকে কটু কথা বললো না। আনিসা এক স্কুলের একই ক্লাসে পড়ে। বয়স তার মতো প্রায়। বড্ড বেশি কথা বলে। পন্ডিতি দেখায়। আনিতার বিরোধিতা করে। তার সাফল্যে বেজার হয়। আনিতা ওসবের মধ্যে নেই। ঝামেলা করা তার পছন্দ নয়। কোন রকম মিল দিয়ে চলার চেষ্টা করে।
কিন্তু এ ব্যাপারটায় তার  ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলো। রাগী গলায় বলল, এই ! এই ! কী করলে তুমি এটা। ফাজিল কোথাকার! অন্য দিকে পানি ফেলতে পার না!
সরি! ভুল হয়েছে আমার। আর এমন হবে না। হরহর করে বললো আনিসা। এক হাতে এক কানও ধরলো।
তার ব্যবহারে আনিতা অবাক। ও তো ক্ষমা চাওয়ার মেয়ে নয়। আজ কী মনে করে মাফ চাচ্ছে। ভাবছিলো সে। হঠাৎ কে যেন এলো। পায়ের আওয়াজ শুনে বুঝলো। পেছনে তাকালো আনিতা। সিঁড়ির গোড়ায় মামাকে দেখে চমকে উঠলো। মামাতো কখনো এভাবে আসে না। এক সপ্তাহ আগে জানিয়ে দেয়। কিন্তু এখন কাকে দেখছে ও! দৃষ্টি ভ্রম নয় তো?
কেমন আছো আম্মু? তোমাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য বলা হয়নি। রাগ করো না আবার। নরম সুরে বললেন মামা আ: মোমিন। তার পর কাছে নিয়ে আদর করলেন। মামার আদর পেয়ে আনিসার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা ভুলতে বসেছিলো ও। পরক্ষণে স্মরণ হলো। ও মামার সাথে কথা বলা দেখে। তার ইচ্ছে হচ্ছিলো মামাকে টেনে নিচে নিয়ে যাবার।
অনেক কষ্টে রাগ দমালো। আকাশের দিকে তাকিয়ে। মাটিতে দৃষ্টি দিয়ে। মামা শিখিয়েছেন রাগ দমানোর এ মন্ত্র। আনিসা মামার কাছে গল্প শোনানোর বায়না ধরা দেখে আনিতার বুঝে এলো তার মাফ চাওয়ার ব্যাপারটা। মামা এলে ও গল্প শোনে। তাদের বাসায় আসে। সিঁড়ির মুখে প্রথম মামাকে সে দেখেছিলো। তাই মাফ চেয়ে ভালো সাজার চেষ্টা করে। যাতে আনিতার রাগ পড়ে যায়। গল্প শুনতে কোনো ঝামেলা না করে।
মায়ের ডাকাডাকিতে নিচে গেলো ওরা। মামা আনিসাকে আসতে বললো। ও আপত্তি করলো না দেখে তিনি খুশি হলেন। বুঝলেন সে আসলে রাগ কন্ট্রোল করা শিখছে। তাদের কথা কাটাকাটির শেষাংশ তিনি শুনেছিলেন। ওটা কাউকে বুঝতে দিলেন না। নাস্তা খেতে খেতে তিনি মোবাইল বের করলেন। দেখালেন গ্রামে তোলা অনেক মাছের ছবি। গাছের দৃশ্য। শোনালেন ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর আওয়াজ। ব্যাঙের ডাক শুনে আনিতা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সেবার মামা এসে ব্যাঙ সম্পর্কে জ্ঞান দেন। তারা কোথায়, কিভাবে ডিম পাড়ে বোঝান সবই। আহসান হাবীবের ব্যাঙ কাহিনীও শোনান। সব শুনে মজা পেয়েছিলো সে। কৌতূহলী হয়ে আবদার করেছিলো ব্যাঙের ডাক শোনানোর। মামা সেটা মনে রেখেছেন। ব্যাঙের গলা রেকর্ড করে এনেছেন। মামা তাকে এতো আদর করেন। ভালোবাসেন। ভাবতেই তার চোখ থেকে কয় ফোঁটা আনন্দাশ্রু গড়ালো। ব্যাপারটা মামার নজর এড়ালো না। পরম মমতায় তিনি তাকে বুকে তুলে নিলেন।

SHARE

Leave a Reply