Home প্রচ্ছদ রচনা স্বাধীনতার সুখ -মাহবুবুল হক

স্বাধীনতার সুখ -মাহবুবুল হক

‘স্বাধীনতা’ শব্দটি তোমাদেরকে খুব সহজেই বোঝানো যায়। এই তো সেদিন ক্লাসমেট মুমিন মহসিনকে বলছিলো, “রতনটা একেবারে স্বাধীন। ওর তেমন কোনো মুরব্বি নেই। ওর আম্মা থাকেন গ্রামে, আব্বা থাকেন বিদেশে আর ও থাকে এক মামাতো ভাইয়ের বাসায়। মামাতো ভাইতো নিজের চাকরি-বাকরি ও পরিবার-পরিজন নিয়ে ব্যস্ত। সুতরাং রতনের ওপর খবরদারি করার কেউ নেই। সে তার ইচ্ছা মতো দিনযাপন করে। অর্থাৎ সে স্বাধীন। আর আমার দিকের সবাই ঢাকায় আমরা একান্নবর্তী পরিবার বাবা, মা, চাচা ও চাচাতো ভাই সবার শাসনতলে আমরা বসবাস করি। আমাদেরকে সবার কথা শুনতে হয়। সবার ফুট ফরমাশ করতে হয়। একটু ভুল হলেই সবার কাছ থেকে হইচই শুনতে হয়, ধমক খেতে হয়। সুতরাং দেখতেই পাচ্ছ আমি কতটা পরাধীন !”
যদিও এসব কথার মাধ্যমে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ নির্ণয় করা যায় না। তারপরও একটা ধারণা তো অন্তত করা যায়। কিন্তু সুখ শব্দটি তোমরা কিভাবে বুঝবে বা বোঝানো যাবে। মানুষ মায়ের পেট থেকে নিয়ে শৈশবকাল পর্যন্ত একান্তভাবে সুখী জীবন-যাপন করে। কিন্তু এই সুখী জীবন সম্পর্কে কোনো শিশুই সঠিক ব্যাখ্যা করতে পারবে না। অথচ মানবজাতির উপলব্ধি হলো শিশুকালটা মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ সময় এবং সবচেয়ে সুখময় ও শান্তিময় সময়। মায়ের পেট এবং মায়ের কোল মানুষের জন্য সবচেয়ে শান্তিময় ও আনন্দময় স্থান। এখানে সে ইচ্ছামতো হাসে। ইচ্ছামতো কাঁদে এবং ইচ্ছামতো হাত-পা ছোড়া-ছোড়ি করে। ক্ষুধা লাগলেই সে কাঁদে এবং কাঁদলে পরক্ষণেই সে পুষ্টিকর খাবার পায়। মহান আল্লাহ তায়ালা মায়ের বুকে শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ পানীয় সংরক্ষণ করে রেখেছেন। এই পূত ও পবিত্র অমিয় ধারার জন্য বাজারে যেতে হয় না। তাৎক্ষণিক টাকা পয়সার প্রয়োজনও হয় না। চাওয়া মাত্রই পাওয়া যায়। এমন বিশুদ্ধ ও নিরাপদ খাদ্য মানুষ আর কোথায় পাবে? কিন্তু মুশকিল হলোÑ এই সুখের উপলব্ধি বা অভিজ্ঞতা মানুষ সঠিকভাবে বর্ণনা করতে পারে না। কারণ তখন সে অবুঝ শিশু। বুঝমান বা বুঝমান মানুষ তখনও সে হয়নি।
তাহলে কি আমরা বলতে পারি স্বাধীনতার সুখ মানুষ মাত্র ভোগ করে তার বয়স যখন ৪-৫ বছর? হয়তো তাই। কারণ এরপর তার ওপর অনেক দায়-দায়িত্ব এসে পড়ে। প্রথম আসে হাতেখড়ির বিষয়টি। তাকে স্কুলে বা মাদরাসায় যেতে হয়। পড়ালেখা করতে হয়। তাকে সময়মতো খেতে, পরতে ও খেলাধুলা করতে হয়। তাকে পরিবার বা গোষ্ঠীর সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করতে হয়। অনেকেই মনে করেন, এই সময়টা থেকেই তার স্বাধীনতা ক্ষুণœ হতে শুরু করে। তার ইচ্ছা বা অনিচ্ছার বাইরেও তাকে চলতে হয়। যে রঙের কাপড় সে পরতে চায় না, স্কুল ইউনিফর্ম বা ড্রেসের রঙ হলে তা-ই তাকে পরতে হয়। টিফিনে যে নাস্তা সে পছন্দ করে না, তাকে সে নাস্তাই খেতে হয়। এমনকি যে স্কুল তার পছন্দ নয়, সে ধরনের স্কুলেই তাকে পড়াশুনা করতে হয়।
মনে কর লাভলুর এক চাচাতো ভাই সরকারি জেলা স্কুলে পড়াশুনা করছে। এই স্কুলের ইমারতগুলো অনেক বড়। স্কুলের ভেতরে-বাইরে খেলার জন্য অনেক বড় মাঠ রয়েছে। শিশুরা সেখানে মনের আনন্দে খেলাধুলা করতে পারে। এই স্কুলেই হয়তো দীঘি বা পুকুর আছে। যেখানে ছাত্ররা সাঁতার কাটতে পারে। যেখানে স্কুলের বাগান রয়েছে। রয়েছে গাছ-গাছালি। স্কুলের বাগানে রঙবেরঙের শত শত প্রজাপতি অবিরাম ঘুরে বেড়ায়। সেখানে পাখিরা দলবেঁধে মিটিং করে। এ ধরনের একটি স্কুলের বর্ণনা যখন গাঁয়ে পড়–য়া স্কুলের ছাত্র লাভলু শুনে তখন সে অভিভূত হয়। অবাক হয়। আশ্চর্য হয়! তখন স্বভাবতই সে কামনা করে ঐ ধরনের একটি আনন্দময় স্কুলে পড়াশুনা করতে। সে ভাবে, চিন্তা করে, স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সাধ থাকলেই ঝটপট এই ধরনের স্কুলে হয়তো সে পড়ার সুযোগ পায় না। এখানে এসেই তার স্বাধীনতা হোঁচট খায়। একটা সীমাবদ্ধতা এসে তাকে ঘিরে ফেলে। এভাবেই মানুষ যত বড় হয়, তার বয়স যত বাড়তে থাকে, ততই সে নানাভাবে হোঁচট খায়। সে নিজেকে আর স্বাধীন মানুষ বলে ভাবতে পারে না। নিজেকে সে একটু একটু করে পরাধীন ভাবতে শিখে। এসবের সঠিক জবাবও শিশু-কিশোর দূরে থাক, বয়স্ক মানুষও এসবের কারণ খুঁজে পায় না। অপূর্ণতা, অভাব, দারিদ্র্য, কষ্ট, দুঃখ, যন্ত্রণা, দুর্ঘটনা মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। মানুষ পাখির মতো উড়তে পারে না।
এই যে পাখির কথা বললাম, খুব ভালো হলো এখন স্বাধীনতার সুখ কিছুটা হলেও তোমরা বুঝতে পারবে। পাখিদের তো তোমরা চারপাশে দেখই। ভোরের পাখি, দিনের পাখি এবং শেষ বিকালের পাখি। রাতে পাখিরা কী করে? কোথায় থাকে? কোথায় ঘুমায়? তা তোমাদের চোখে পড়ে না। তবে কিছু কিছু পাখি আছে যেমন চড়–ই, কবুতরÑ এসব পাখি মানুষের বাসাবাড়িতে নিজেরা বাসা বানিয়ে বসবাস করে। পাখি স্বাধীনতার প্রতীক। সে দিনরাত স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায়। রাতে সে ঘরে ফিরে। তার ঘর গাছ-গাছালি, ঝোপঝাড় এবং মানুষের বসবাসস্থলেই। তার নির্দিষ্ট কোনো পরিমন্ডল বা সীমারেখা নেই। যে দিকে মন চায় সে ঘুরে বেড়ায়, খাদ্য সংগ্রহ করে, নিজেদের এবং বাচ্চাদের জন্য তারা কিছুটা খাদ্য মজুদও করে। তাদের স্বাধীনতায় কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারে না। যদি করে তবে তারা খুব বিরক্ত হয় এবং তারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। সে জন্যই দেখা যায় খাঁচার পাখি বিষণœ থাকে, নিশ্চুপ থাকে এবং খাঁচা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ছটফট করতে থাকে। তোমরা যারা খাঁচায় পাখি রেখে ওদের লালন-পালন কর তারা বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পারো যে কোনো পাখিই খাঁচায় বন্দি থাকতে চায় না, উন্মুক্ত থাকতে চায়, স্বাধীন থাকতে চায়।
পাখির সাথে মানুষেরও এখানেই মিল। মানুষও বন্দিজীবন চায় না। সে পাখির মতোই স্বাধীন থাকতে চায়। কিন্তু পাখি আর মানুষতো একধরনের জীব নয়। পাখিদের রাষ্ট্র গঠন করতে হয় না। সমাজ গঠন করতে হয় না। কিন্তু মানুষের তা করতে হয়। মানুষের ওপর অনেক দায়-দায়িত্ব রয়েছে। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। তাকে এ দুনিয়া সাজাতে হয়। সুন্দর করতে হয়। রূপময় এবং আনন্দময় করতে হয়। পৃথিবীকে মানুষের জন্য বসবাসযোগ্য করতে হয়। পরাধীন মানুষ বা খাঁচাবদ্ধ মানুষও প্রকৃতির জন্য তেমন কিছুই করতে পারে না। যেমন পারে না খাঁচাবদ্ধ পাখি তার ও তার পরিবারের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করতে। তবুও মানুষ ও পাখিকে খাঁচায় আবদ্ধ করা হয়।
একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা তোমরা বুঝতে পারবে। ‘জেলখানা’ শব্দটি তোমরা নিশ্চয় শুনেছো। কিছু মানুষকে ধরে এনে এখানে আটক করে রাখা হয়। কক্ষের মধ্যে বা চার দেয়ালের মধ্যেই ওদের বসবাস করতে হয়। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাদেরকে এই জেলখানাতেই বসবাস করতে হয়। তারা বাইরে বের হতে পারে না। চাকরি বা ব্যবসা করতে পারে না এবং পরিবার-পরিজনের সাথেও সহসা দেখা সাক্ষাৎ করতে পারে না। এরা স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ইচ্ছামতো খেতে, পরতে বা বিশ্রাম নিতে পারে না। এই জেলখানা আর পাখির খাঁচার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। পাখিকে কেউ অপরাধের কারণে খাঁচায় পুরে না। তেমনি অপরাধী না হয়েও বহু মানুষকে জেলখানায় বসবাস করতে হয়।
মানুষ যেমন নিজের স্বার্থে পাখিকে বন্দি করে, একই মানুষ নিজের দলের স্বার্থে বা নিজের দেশের স্বার্থে অন্য মানুষকেও যুগে যুগে বন্দি করেছে। সম্পদ আহরণের জন্য গোটা দেশকে বন্দি করেছে। দেশ বন্দি হওয়ায় সমাজ বন্দি হয়েছে এবং বন্দি হয়েছে মানুষও। যুগে যুগে কালে কালে শক্তিধর মানুষ ও শক্তিধর দেশগুলো দুর্বল দেশ ও জাতিকে বন্দি করেছে। এমনি বন্দি অবস্থায় আমরা ছিলাম ১৭৫৭ সাল থেকে। ইংরেজ জাতি ব্যবসা করতে এসে আমাদের দেশকে শুধু নয়, আমাদের আশপাশ অনেক দেশকেই দখল করে নিয়েছিলো। আমাদের আইন-কানুন সমাজের রীতি-নীতি, ভাষা-সাহিত্য সব কিছু বাদ দিয়ে ওরা ওদের দেশের আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি আমাদের দেশে চালু করেছিল। প্রায় ২০০ বছর আমরা ছিলাম খাঁচাবদ্ধ পাখির মতো। খাঁচাবদ্ধ পাখি যেমন স্বাধীনতার সুখ লাভ করার জন্য ছটফট করতে থাকে। আমাদের পূর্বপুরুষরাও সেভাবেই ছটফট করেছেন। ইংরেজরা স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়েছিলো মুসলিমদের কাছ থেকে। মুসলিমরা তখন ছিল বাদশাহর জাতি। ইংরেজরা বাদশাহর জাতিকে পুরোপুরিভাবে দাসের জাতি বা গোলামের জাতিতে পরিণত করেছিল। ইংরেজরা আমাদের পূর্বপুরুষদের যদি পরাধীন না করতো, যদি আমরা বরাবর স্বাধীন থাকতাম, তাহলে এখন আমরা অবশ্যই বিশ্বের বুকে অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় জাতিতে পরিগণিত হতাম। আমরা হতাম মর্যাদাসম্পন্ন আদর্শবাদী জাতি। পরাধীন করে সে অবস্থা থেকে আমাদেরকে বহু নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে।
বহু সাধনা ও সংগ্রামের পর ১৯৪৭ সালে আমরা একবার স্বাধীনতা লাভ করেছিলাম। কিন্তু সেই স্বাধীনতা আমরা সঠিকভাবে পাইনি। স্বাধীনতা পেয়েও আমরা আমাদের অধিকারগুলো অর্জন করতে পারিনি। আমাদের যারা মূল শাসক ছিল তারা আমাদের ঠকিয়েছে। আমাদের ওপর নতুন করে পরাধীনতার শিকল পরিয়েছে। আমাদের সাথে প্রবঞ্চনা করেছে। আমাদের ন্যায়-নিষ্ঠ অধিকার হরণ করেছে। স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েও আমরা পুনরায় তা হারিয়েছি।
তোমরা জানো, না পাওয়ার দুঃখ এবং বেদনা এক ধরনের। আবার পেয়ে হারানোর বেদনা আরেক ধরনের। শীতের মাঝে তোমাদের একটা শীতবস্ত্র খুব প্রয়োজন ছিল তুমি তা পেলে না, এতে অবশ্যই তোমার দুঃখ হবে, কিন্তু শীতবস্ত্র পেয়ে তা যদি তুমি আবার হারিয়ে ফেলো তাহলে তা হবে অনেক দুঃখ এবং অনেক কষ্টের। ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা যে সত্যিকার স্বাধীনতা ছিল না তা বুঝতে বা উপলব্ধি করতে আমাদের সময় লেগেছিল। যখন আমরা বুঝলাম, তখন আমরা নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য, স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার জন্য আমরা লড়াই শুরু করে দিয়েছিলাম। ২৫ বছরের লড়াই-সংগ্রাম এবং রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা হারানো সেই স্বাধীনতা পুনরায় ফিরে পেয়েছি। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ আমরা সেই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যুদ্ধ শুরু করি। এখন আমরা স্বাধীন। এখন সেই স্বাধীনতার মাস আমরা উদ্যাপন করছি। সত্যিকার স্বাধীনতার সুখ পেতে আমাদের আর একটু সময় লেগেছিল। সেই দিনটা ছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। মাঝখানের ৯ মাস ছিল গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের কাল, তারপরও দেখতে দেখতে ৪৪টি বছর পার হয়ে গেছে। আমরা স্বাধীনভাবে আছি। স্বাধীনতার মধ্যে আছি এবং অবশ্যই কোনো না কোনোভাবে স্বাধীনতার সুখ অনুভব করছি।

SHARE

Leave a Reply