Home ধারাবাহিক: দুর্গম পথের যাত্রি দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ

দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ

গত সংখ্যার পর

৮.
ইসলাম গ্রহণের পর খালিদ বিন ওয়ালিদ জন্মভূমি মক্কায় ফিরে না গিয়ে মদিনাতেই অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিলেন। রাসূলের সান্নিধ্যে সময় কাটাতে লাগলেন তিনি। শিখতে লাগলেন ইসলামের সেই অনুপম শিক্ষা ও আদর্শ যার স্পর্শ পেলে মানুষ ক্রমেই সোনার মানুষে পরিণত হয়। মন থেকে পালিয়ে যায় হিংসা ও লোভ। পালিয়ে যায় জিঘাংসার তান্ডব। পালিয়ে যায় অপরাধের মনোবৃত্তি। পালিয়ে যায় জাগতিক ভয়। সেখানে বাসা বাঁধে আল্লাহ-নির্ভরতা। বাসা বাঁধে প্রেম আর দয়া। অলীক শক্তির কাছে মাথা নত করার পরিবর্তে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে শেখে মানুষ। ঘুচে যায় সাদা-কালোর প্রভেদ। ঘুচে যায় মনিব-ভৃত্যের বিভেদ। ঘুচে যায় সমাজের তৈরি করা উঁচু-নিচু ভেদাভেদ। মানুষ ভাই বলে জড়িয়ে ধরে মানুষকে। সে হয়ে ওঠে পৃথিবীর একান্ত আপন।
মানুষ জানতে পারে, মানুষ না কারো গোলাম, না কারো মনিব। মানুষ কেবল এক আল্লাহর বান্দা, এক আল্লাহর গোলাম। তার প্রধান শত্রু শয়তান। অহঙ্কারের কারণে সে আল্লাহর অবাধ্য হয়ে অভিশাপ কুড়িয়েছে মহান রবের। তাই মানুষ হওয়ার প্রথম শর্ত অহঙ্কারমুক্ত হওয়া, আমিত্বের অহমিকা থেকে বেরিয়ে এসে এক আল্লাহর দাসত্ব গ্রহণ করা। এক আল্লাহর কাছে অবনত হওয়া। আল্লাহর এই বান্দাদের কী করতে হবে, কিভাবে চলতে হবে সে কথা মানুষকে বলার জন্য আল্লাহ পাঠিয়েছেন রাসূল (সা)। ফলে আল্লাহর হুকুম শিখতে হবে রাসূলের কাছ থেকে। যারা আল্লাহর গোলামি ঠিকমত করবে মৃত্যুর পর পুরস্কার হিসেবে তারা পাবে অনন্ত সুখের জান্নাত। আর যারা আল্লাহর নাফরমানি করবে, তাঁর হুকুম না মেনে নিজের ইচ্ছেমত চলবে, তারা পাবে জাহান্নাম। সীমাহীন কষ্ট আর দুর্ভোগই হবে তাদের পরকালের সঙ্গী। সমগ্র সৃষ্টিজগতের মধ্যে মানুষ হচ্ছে আশরাফুল মাখলুকাত, মানে সৃষ্টির সেরা। পৃথিবীকে সুন্দর করার, সুন্দর রাখার দায়িত্ব মানুষকেই পালন করতে হবে। এ জন্যই আল্লাহ মানুষকে বানিয়েছেন তার খলিফা। খলিফা মানে প্রতিনিধি। মানুষ শুধু আশরাফুল মাখলুকাত মানে সৃষ্টির সেরাই নয়, আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়ার কারণে অনন্য মর্যাদারও দাবিদার। এই মর্যাদার সম্মান রক্ষার দায়িত্বও মানুষের। তাকে পৃথিবী থেকে সব অশুভ দূর করে শুভ ও মঙ্গলের প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে জীবন বাজি রেখে লড়তে হবে অশুভের বিরুদ্ধে। আর এভাবেই জীবনভর প্রতি মুহূর্তে মানুষকে প্রমাণ করতে হবে, সে প্রকৃতই আল্লাহ ও রাসূলের অনুসারী। খালিদ বিন ওয়ালিদ রাসূলের সান্নিধ্যে থেকে এভাবেই ইসলামের আলোয় নিজেকে আলোকিত করে তুলছিলেন।
এদিকে আরবের দুই প্রখ্যাত সেনাপতির ইসলাম গ্রহণের ঘটনায় আরবজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হলো। যারা এত দিন ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়ার পরও দ্বিধাদ্বন্দ্বের কারণে ইসলাম গ্রহণ করতে পারছিল না, এ ঘটনায় তাদের দ্বিধার দেয়াল ধসে পড়লো। তারাও রাসূলের দরবারে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে নিজেদের জীবনকে ধন্য করতে লাগলো। এভাবে দ্রুত ইসলাম আরবভূমিতে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো।
আরবের সমাজজীবনে এই আলোড়নের ফলে দ্রুত সব ঘটনা ঘটতে লাগলো। সর্বত্রই আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলো ইসলাম। প্রতিটি জনবসতিতেই পটপরিবর্তন হতে লাগলো। এর ফলে মক্কা-মদিনা শুধু নয়, দূরদূরান্তের গ্রামাঞ্চলেও ইসলাম সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো।
ইসলামের আকর্ষণ ও প্রভাব যত বাড়তে লাগলো, তার বিরোধিতা এবং প্রতিরোধের মাত্রাও ততোই বেড়ে চলল। সরাসরি বিরোধিতার সাথে যুক্ত হলো ষড়যন্ত্র। নানা রকম ফেতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করলো। কায়েমি স্বার্থবাদীদের প্রতিরোধ যত বাড়তে লাগলো, যত বাড়লো নিপীড়ন, নির্যাতন, গণমানুষের সহানুভূতি এবং আকর্ষণও ততোই বেড়ে চলল ইসলামের প্রতি।
মক্কা থেকে বেশ দূরে জর্ডান নামক এক সমৃদ্ধ অঞ্চল। সেখানেও গিয়ে লাগলো এই ইসলামের ঢেউ। মানুষ দলে দলে ইসলাম কবুল করতে লাগল। প্রমাদ গুনলেন জর্ডানের বাদশাহ। ইসলামের বিরোধিতায় কোমর বেঁধে নামলেন তিনি। আশপাশ অঞ্চলের ভূস্বামী এবং ক্ষমতাবানদের জড়ো করে বললেন, এই সয়লাব রুখতে না পারলে অচিরেই তাদের ক্ষমতার জৌলুস ধুলায় লুটিয়ে পড়বে। মিসমার হয়ে যাবে তাদের দম্ভ ও দাপট। মানুষে মানুষে সমতা ও ভ্রাতৃত্বের যদি জয় হয় তবে বাদশাহ আর ফকিরে কোন পার্থক্য থাকবে না। বাদশাহর আসন থেকে তাদের নেমে আসতে হবে পথের ফকিরের কাতারে। জীবন থাকতে এমনটি মেনে নেয়া যায় না। তাই নও মুসলিমদের সামনে তিনি আবির্ভূত হলেন ভয়ঙ্কর বিভীষিকা হয়ে। নানা কায়দায় তাদের ওপর অত্যাচার চালাতে লাগলেন।
বর্তমান সিরিয়া ও জর্ডানের মধ্যবর্তী অঞ্চলে সে সময় বাস করতো গাসসান নামে দুর্ধর্ষ এক সম্প্রদায়। তারা যেমন ছিল যুদ্ধবাজ, তেমনি সংখ্যায় ছিল বিপুল। বিশাল অঞ্চলে ছড়ানো ছিটানো ছিল এ সম্প্রদায়ের আবাসস্থল। জর্ডানের বাদশাহ প্রথমে তাদের দিকেই মনোযোগ দিলেন। তাদের বোঝালেন, ক্রমবর্ধমান মুসলিমশক্তিকে প্রতিহত করতে না পারলে তাদের শক্তি ও ক্ষমতা খর্ব হয়ে যাবে। তাদের ওপর প্রভুত্ব করবে মুসলিম নামে গজিয়ে ওঠা এ নতুন দলটি। এভাবে জর্ডানের বাদশাহ তাদেরও দলে ভিড়িয়ে নিলেন।
এ সময় রোমের শাসক ছিলেন দুর্দান্ত প্রতাপশালী খ্রিষ্টান সম্রাট হারকিউলিস। হারকিউলিসের সাম্রজ্যবাদী মানসিকতার কারণে আশপাশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শাসকরা ছিল ভীত-শঙ্কিত। কখন তাদের ওপর হারকিউলিস চড়াও হয় এ আতঙ্কে অস্থির থাকতো তারা। জর্ডানের রণপ্রস্তুতির খবর পেয়ে হারকিউলিস জর্ডান আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন। এদিকে জর্ডানের বাদশাহও খবর পেলেন, স¤্রাট হারকিউলিস জর্ডান আক্রমণের পাঁয়তারা করছে। জর্ডানের বাদশাহ ভাবলেন, একদিকে খ্রিষ্টান সম্রাট হারকিউলিস, অন্যদিকে মুসলমান- এ দুই শক্তির সাথে একত্রে লড়াই করা সম্ভব নয়। তাই তিনি খ্রিষ্টানদেরকে বন্ধু বানিয়ে নেয়ার জন্য সচেষ্ট হলেন।
সময় খুব দ্রুত পাল্টে যাচ্ছিল। দেখতে দেখতে এক লক্ষ খ্রিষ্টান সেনা এসে সমবেত হলো জর্ডান সীমান্তে। তারা লড়াই শুরু করার আগেই সীমান্তের গ্রামগুলোর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন করে তুলল। গ্রাম থেকে ছাগল-ভেড়া ধরে এনে খেতে লাগল। লুটপাট করতে লাগল দেদার। ফলে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়লো।
খবর পেয়ে তাদের কাছে ছুটে গেলেন জর্ডানের বাদশাহ। হারকিউলিসকে বললেন, আপনি এক লক্ষ সেনা নিয়ে জর্ডান আক্রমণ করতে এসেছেন। আমার সেনাবাহিনীর সংখ্যাও এক লক্ষের ওপরে। আমরা লড়াই করে আমাদের সেনাবাহিনীর লক্ষ লক্ষ সৈনিককে নিঃশেষ করতে পারবো। যুদ্ধ শেষে জয়-পরাজয় কার হবে সেটা নিশ্চিত করে আমরা কেউ বলতে পারবো না। আমরা যে-ই বিজয়ী হই না কেন, আমাদের শক্তি যে তখন দুর্বল হয়ে যাবে এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই। আমাদের সামনে তখন থাকবে আমাদের উভয়েরই দুশমন মুসলিমশক্তি। আমাদের দুর্বল পেয়ে তারা তখন ঝাঁপিয়ে পড়বে আমাদের রণক্লান্ত সৈনিকদের ওপর। তার ফল আমাদের কারো জন্যই ভালো হবে না। অথচ আমরা ইচ্ছে করলেই নিজেরা বন্ধুত্ব ও সমঝোতায় আসতে পারি। আমরা সম্মিলিতভাবে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো আমাদের কব্জায় নিয়ে আসতে পারি। আপনি শুধু আমার রাজ্যের দিকে নজর দেবেন না, এটুকু নিশ্চয়তা পেলেই আমি আপনাকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। বিজিত অঞ্চলগুলো আপনি আপনার কব্জায় নিয়ে নিতে পারবেন, তাতে আমার কোনো আপত্তি থাকবে না।
হারকিউলিস একজন বিচক্ষণ স¤্রাট। মুসলমানদের নিয়ে তিনিও চিন্তিত ছিলেন। তিনি সম্মত হলেন বাদশাহর প্রস্তাবে। বললেন, আপনার প্রস্তাব মন্দ নয়। ঠিক আছে, আমি ফিরে যাচ্ছি। কিছুদিন পর আমি পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে আবার ফিরে আসবো, ততদিনে আপনিও গুছিয়ে নিন।
সে সময় মুসলমানদের বিজয়ের এটাও একটা অন্যতম কারণ ছিল, প্রতিপক্ষ যেখানেই যে প্রস্তুতি নিতো, নবীজি যথাসময়ে সে খবর পেয়ে যেতেন। নবীজির কাছে এ খবরও পৌঁছে গেল। তিনি যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে চাইলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন, গাসসান সরদারের নিকট দূত পাঠাবেন। যদি গাসসানরা নবীজির আহবানে সাড়া দেয় তবে খ্রিষ্টান স¤্রাট হারকিউলিসের কবল থেকে বেঁচে যাবে তারা। ইসলামের অগ্রযাত্রাও এগিয়ে যাবে সিরিয়া এবং জর্ডানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। গাসসান সরদারকে তিনি লিখলেন, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। আল্লাহ এক, তাঁর কোন শরিক নেই। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। অন্যান্য যেসব বিশ্বাস ও মতবাদ আছে সবই ভ্রান্ত, সবই মানুষের তৈরি। পত্রে তিনি গাসসান সরদারকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দেন এবং এতেই যে তার কল্যাণ তা উল্লেখ করেন।
দূত মদিনা থেকে বেরিয়ে গেলে খালিদ বিন ওয়ালিদ এক সমাবেশে বললেন, খোদার কসম, রাসূলের আহবান গ্রহণ করার মধ্যেই গাসসানদের মঙ্গল ও কল্যাণ নিহিত। অন্য একজন তাকে সমর্থন করে বলল, যদি ওরা ইসলাম কবুল না করে তবে তারা রোম স¤্রাট হারকিউলিসের গোলামে পরিণত হবে।
খালিদ বিন ওয়ালিদ তিন মাস ধরে রাসূলের সান্নিধ্যে আছেন। এই সান্নিধ্য তার জীবনধারাকে আমূল পাল্টে দিলো। একজন বীর ও বিচক্ষণ সেনাপতি হিসেবে সমগ্র আরব ভূখন্ডে তার যথেষ্ট সুনাম ও খ্যাতি ছিল। তিনি নিজেও জানতেন, আরবে তার মতো সেনানায়ক খুব কমই আছে। এ নিয়ে তিনি বেশ গর্ববোধও করতেন। কিন্তু রাসূলের সান্নিধ্যে আসার পর তার এই মনোভাব পুরোপুরি পাল্টে গেল। তিনি অনুভব করলেন, মানুষের এই যোগ্যতা, দক্ষতা, ক্ষমতা সবটাই আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। এটা নিয়ে কোনো ব্যক্তির গর্ব করা সাজে না। আল্লাহ এই যোগ্যতা তাকে না দিয়ে অন্য কাউকেও দান করতে পারতেন। সাধারণ মানুষের চাইতে আল্লাহ যদি কাউকে কোনো না কোন বিষয়ে অধিক দক্ষতা ও যোগ্যতা দান করে থাকেন তবে সেই বান্দার উচিত সাধারণ মানুষের চাইতে অধিক শোকরকারী হিসেবে নিজেকে আল্লাহর দরবারে পেশ করা। তিনি নিজেকে একজন সাধারণ মানুষের চাইতে বেশি কিছু ভাবতেন না। একজন বিখ্যাত সেনাপতি হিসেবে তিনি এমন দাবি কখনোই করেননি যে, তাকে কোন বাহিনীর কমান্ডার বা সেনাপতি করা হোক। বরং একজন সৈনিক হিসেবে কোনো বাহিনীতে শামিল হতে পারাকেই তিনি সৌভাগ্যবান মনে করতেন এবং সন্তুষ্ট ছিলেন।
রাসূলে করীমের দূত নবীজির বাণী ও পয়গাম নিয়ে বসরার দিকে যাচ্ছিল। কারণ গাসসানদের রাজধানী ছিল বসরা। দূতের সঙ্গে একটি উটবোঝাই পাথেয় ও তিনজন রক্ষী ছিল। সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দূত গিয়ে পৌঁছলো মুতা প্রান্তরে।
জর্ডানেরই একটি অখ্যাত পল্লী মুতা। আর দশটি গ্রামের মতই চলছিল এখানকার মানুষের নিস্তরঙ্গ জীবন। এমন কোনো বিশেষত্ব ছিল না, যে কারণে এই গ্রামের নাম ঠাঁই পেতে পারে ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু আল্লাহর ফয়সালা ছিল ভিন্ন। এমন এক লোমহর্ষক ও রক্তক্ষয়ী ঘটনা সংঘটিত হলো এখানে যার কারণে এ গ্রাম হয়ে গেল ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে দূত মুতার জনবসতির অদূরে এক নির্জন স্থানে যাত্রাবিরতি করলো এবং সেখানেই রাত্রি যাপনের সিদ্ধান্ত নিলো। তাঁবু খাটিয়ে রাতের খানা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো দূত। রক্ষীরা পালা করে তাঁবুর পাহারা দিতে লাগলো।
কাছেই গাসসানদের যে গ্রামটি ছিল তার সরদার খবর পেল, চারজন অপরিচিত লোক গ্রামের পাশে তাঁবু খাটিয়েছে। সরদারের নাম শারজিল বিন উমরু। সে কয়েকজন রক্ষীকে নিয়ে সেখানে গেল এবং দূতকে ডেকে তুলে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কোত্থেকে এসেছো এবং কোথায় যাচ্ছো?
‘আমি মদিনার দূত, বসরা যাচ্ছি।’ জবাব দিলো দূত।
‘বসরায় কী কাজে যাচ্ছো তুমি?’
‘আমি আল্লাহর রাসূলের পয়গাম তোমাদের সরদারের নিকট পৌঁছে দিতে যাচ্ছি।’
‘তুমি কি কোরাইশ যুবক মুহাম্মদের কথা বলছো?’ শারজিল ব্যঙ্গ ভরে বলল, ‘তা তিনি কী পয়গাম দিতে চান সরদারের কাছে?’
‘পয়গামটা হলো, তোমরা সত্য দ্বীন কবুল করো এবং জীবনবিধান হিসেবে ইসলামকে মেনে নাও।’
‘আমাদের নিজেদের ধর্মের কী হবে?’ জানতে চাইল শারজিল।
‘তোমাদের ধর্ম বাতিল মতবাদ। তোমাদের এবং আমাদের সকলের ¯্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যে জীবনবিধান দিয়েছেন সেটাই সত্য। মুহাম্মদ তাঁর রাসূল। তিনি যে জীবনপদ্ধতি আমাদের শিখিয়েছেন তাই সবার জন্য মঙ্গলময় এবং কল্যাণকর।’
‘তুমি কি মনে করো আমাদের সরদার এবং আমরা আমাদের ধর্মের অপমান সহ্য করবো? তুমি আমাদের ধর্মকে অপমান করবে আর আমরা তা শুনে চুপচাপ বসে থাকবো?’
দূত বলল, ‘সত্য প্রকাশ করা আমার দায়িত্ব। আমি তোমাদের মঙ্গলের জন্যই দ্বীনের দাওয়াত দিচ্ছি।’
কুটিল হাসি ফুটে উঠলো শারজিলের ঠোঁটে। বলল, ‘আমাদের মঙ্গল আমরা ভালোই বুঝি। তুমি তোমার মঙ্গল নিয়ে চিন্তা করো। বাঁচতে চাও তো মদিনায় ফিরে যাও। তুমি দূত, তাই তোমাকে এ সুযোগ দিচ্ছি। নইলে এতক্ষণে তোমার রক্তে এ মাটি লাল হয়ে যেতো।’
‘আল্লাহর নবী আমাকে একটি দায়িত্ব দিয়ে বসরা যেতে বলেছেন। আল্লাহর নবীর দেয়া দায়িত্ব থেকে আমি মুখ ফিরিয়ে নিতে পারি না। আমি যার কাছে যেতে চাই তার কাছে আমাকে যেতে দাও, অযথা আমার পথে বাধার সৃষ্টি করো না।’
‘বোকামি করো না, ফিরে যাও। বেশি বাড়াবাড়ি করলে জীবন নিয়ে ফিরে যেতেও পারবে না।’
‘তুমি আমাকে হত্যা করার হুমকি দিচ্ছো? একজন দূতকে হত্যা করবে তুমি? অথচ সারা দুনিয়া দূত হত্যাকে অন্যায় মনে করে।’
‘সারা দুনিয়া কী মনে করে সেটা আমি তোমার কাছ থেকে শিখতে যাবো না। এখনো বলছি, ফিরে যাও, নইলে মরবে।’
‘আমি তার পরোয়া করি না।’ দূত বলল, ‘কোন মুমিন মৃত্যুকে ভয় পায় না। মৃত্যুর ভয়ে মুমিন আপন কর্তব্য থেকে হাত গুটিয়ে বসে থাকে না। আমাকে আমার কর্তব্য পালন করতে দাও।’
‘তাহলে তুমি ফিরে যাবে না?’ শারজিল শেষবারের মতো জানতে চাইল।
দূত দ্বিধাহীনকণ্ঠে বলল, ‘না, আমি শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে চেষ্টা করবো নবীর বাণী তোমাদের সরদারের কাছে পৌঁছে দিতে। আমি আনন্দের সঙ্গেই দ্বীনের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত।’
শারজিল তার সঙ্গীদের ইশারা করল। বলল, ‘আর আমি আনন্দের সঙ্গেই তোমার জীবন নিতে প্রস্তুত।’
দূতের সঙ্গীরা তাঁবুর বাইরে পাহারা দিচ্ছে। ভেতরে কী হচ্ছে তার কিছুই জানে না তারা। শারজিলের ইশারায় তার সঙ্গীরা দূতকে কোনো প্রতিরোধের সুযোগ না দিয়েই হত্যা করলো। তারপর তাঁবুর বাইরে এসে বলল, ‘তোমাদের সরদার তোমাদের ভেতরে যেতে বলেছে।’
দূতের রক্ষীরা তাঁবুর ভেতরে প্রবেশ করলো। দেখলো ফিনকি দিয়ে তখনো তাজা রক্ত ছুটছে। ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত হয়ে গেল তারা। দূত মারা গেছে নিশ্চিত হয়ে তাঁবুর বাইরে এলো। শারজিল বলল, ‘তোমরা তো এর দেহরক্ষী হিসেবেই বসরা যাচ্ছিলে? দেখতেই পাচ্ছো, তিনি এখন আর বসরা যেতে পারছেন না। তাকে ছাড়া কি তোমরা যেতে চাও?’
‘না।’ এক রক্ষী বললো, ‘পয়গাম তো তিনি দেবেন। তাকে ছাড়া মদিনা যাওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই আমাদের।’
‘তাহলে ফিরে যাও। মুহাম্মদকে বলবে, গাসসান সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের ধর্মের অপমান সহ্য করে না।’
‘কিন্তু তিনি তো একজন দূত ছিলেন, তাকে আপনারা হত্যা করলেন?’
‘না, আমরা তাকে হত্যা করিনি, সে নিজেকে নিজে হত্যা করেছে। আমরা তাকে ফিরে যাওয়ার মওকা দিয়েছিলাম, কিন্তু সে মদিনা ফিরে যেতে অস্বীকার করে নিজেই নিজের মৃত্যু ডেকে এনেছে। আর একটি কথা, আমরা তাকে বসরা যাওয়ার সুযোগ দিলেও একই ঘটনা ঘটতো। সেখানেও সে নিহতই হতো।’
‘আল্লাহর কসম!’ এক রক্ষী বলল, ‘আমরা কখনো দূত ও মেহমানের সঙ্গে এমন ব্যবহার করি না।’
‘আমিও আল্লাহর কসম করেই বলছি, তোমরা যদি ফিরে যেতে না চাও তবে জোর করবো না। তার মতোই উপযুক্ত মেহমানদারি করার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত।’
রক্ষী তিনজন শারজিলের অনুমতি নিয়ে সেখানেই দূতের লাশটি দাফন করলো। দাফন শেষে নিজেদের ঘোড়া ছুটিয়ে দিলো মদিনার পথে।
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply