Home গল্প বাঘের সঙ্গে লড়াই -শামীম খান যুবরাজ

বাঘের সঙ্গে লড়াই -শামীম খান যুবরাজ

এ  বছর আমাদের ইশকুলের শিক্ষা সফর ছিলো ফেনী জেলার ছাগলনাইয়ায়। প্রতি বছরের মতো স্যারদের সঙ্গে আলাদা আলাদা গ্রুপে ভাগ হয়ে গেলো ছাত্র-ছাত্রীরা। আমি, সাদ্দাম, মোশাররফ, জেসমিন, জাহেদা, ফাতেমা, এ্যানি ও নোভা ইতিহাস স্যারের গ্রুপে। ইতিহাস স্যার মমতাজ উদ্দিন আহমেদ আমাদের গ্রুপে থাকায় এ্যানি আর আমি বেশ খুশি। আমরা দু’জনেই ইতিহাস ভালোবাসি। ঐতিহাসিক স্থানগুলো দেখা আর নতুন নতুন শেখা আমাদের এক ধরনের শখ বলা যায়। অবশ্য বাকিরাও খুশি। বাংলা শিক্ষক জাহাঙ্গীর স্যারের মতো ইতিহাস শিক্ষক মমতাজ স্যারও আমাদের সবার প্রিয়।
আমাদের গাড়ি বল্লভপুর হয়ে চম্পকনগর বাজার অতিক্রম করে ছোট্ট একটি পাহাড়ের নিচে থামলো। সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ের ওপরে উঠে সবুজের সমারোহ আর গাছগাছালি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। অনেক ফলের গাছ এখানে। কাঁঠাল, আম, জাম, কামরাঙা, জলপাই, পেয়ারা, আমলকীসহ অনেক প্রজাতির ফলের গাছ পুরো পাহাড়জুড়ে। ও হ্যাঁ, কয়েকটি পামঅয়েল গাছও আছে এখানে। খুব কাছেই ভারতের সীমান্ত। কাঁটাতারের বেষ্টনী দেখা যাচ্ছে এখান থেকে। আম-কাঁঠালের বাগান পেরিয়ে ঘন ঝোপ-জঙ্গল। জঙ্গলের মাঝ দিয়ে পায়ে চলার সরু রাস্তা। ইতিহাস স্যার আমাদের সরু রাস্তা ধরে সীমান্তের দিকে এগিয়ে গেলেন। কতদূর গিয়েই তিনি ‘বাঘ’ ‘বাঘ’ বলে চিৎকার জুড়ে দিলেন। আমরা ভয়ে দৌড় লাগালাম পেছনের দিকে। পেছন থেকে স্যারের হাসি শুনতে পেলাম। স্যার আমাদের সঙ্গে এরকম মশকরা করবেন এমন ধারণা ছিলো না। আমরা দাঁড়িয়ে গেলে স্যার আমাদের কাছে এলেন। খোলা একটা জায়গায় আমাদের গোল করে বসালেন। বললেন, এখানে একসময় আরো ঘন জঙ্গল ছিলো। মানুষখেকো বাঘ ছিলো। একবার বাঘের সঙ্গে মানুষের লড়াই হয়েছিলো এরকম জঙ্গলেই।
আমরা চোখ বড়ো বড়ো করে স্যারের দিকে তাকালাম। স্যার পুরো ঘটনা বলতে শুরু করলেন।
ছেলেটির বয়স তোমাদের মতোই। এই ধরো এগারো কি বারো বছর। এই বয়সেই অসীম সাহস ছেলেটির বুকে।
বন্ধুদের সঙ্গে পথ চলছিলো সে। সরুপথ। দু’পাশে ঝোপ-ঝাড় আর ঘন জঙ্গল। সে সবার আগে। বাকি আট-দশজন বন্ধু তার পেছনে পেছনে হইচই করে পথ চলছে। বেড়ানোর আনন্দ সবার চোখে-মুখে।
ঝোপ পেরিয়ে খানিকটা এগিয়ে এসেছে ওরা। এমন সময় গর্জন দিয়ে লাফিয়ে পড়লো বাঘ। এক্কেবারে সবার সামনে। মুহূর্তেই আনন্দ মাটি। হইচই চেঁচামেচিতে বদলে গেলো। সবাই ছুটে পালালো যে যার মতো। শুধু পালালো না একজন। দলনেতা সে। হ্যাঁ, অসীম সাহসী সেই ছেলেটিই এখন বাঘের মুখোমুখি।
সঙ্গীর বিপদে সবাই চোখ বুজে নিলো।
শুরু হলো বাঘে-মানুষে লড়াই। লড়াই শেষে কে জিতলো জানো?
এ্যানি আন্দাজে বলে দিলো, ছেলেটি।
ঠিক ধরেছো। সেই সাহসী ছেলেটিরই জয় হয়েছে।
কিভাবে কাবু করলো সেই শক্তিশালী বনের রাজাকে! সে গল্পই বলছি।
বাঘের ভয়ে সবাই যখন ছুটে পালালো, তখন সাহসী সেই ছেলেটির পালানোর কোনো পথ ছিলো না। কারণ সে ছিলো সবার সামনে।
সবার ছুটোছুটি দেখে বাঘ যখন সিদ্ধান্ত নিতে কয়েক মুহূর্ত দেরি করলো। তখনই ছেলেটি তার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো। ঝাঁপিয়ে পড়লো বাঘের ওপর। চড়ে গেলো বাঘের পিঠে। বাম হাতে পেঁচিয়ে ধরলো বাঘের গলা। বাঘের দম বন্ধ হয়ে এলো ছেলেটির পেশিবহুল হাতের চাপে। এরপর চললো কিল-ঘুষি। তাও এক্কেবারে মাথা বরাবর।
এবার যায় কোথায়! ঘুষি চলছে। সঙ্গে হাতের শক্ত প্যাঁচ।
এভাবে চললো কিছুক্ষণ। একসময় দম আটকে, মাথায় আঘাতের কারণে নিথর হয়ে গেলো প্রকান্ড বাঘের শরীর।
আবার শুরু হলো হই-হল্লা। সেই সাহসী ছেলেটিকে কাঁধে তুলে বিজয় মিছিল নিয়ে বন্ধুরা ছুটলো বাড়ির দিকে।
বাঘের সঙ্গে লড়াই করে বিজয়ী হওয়া অসীম সাহসী সেই ছেলেটি একদিন অনেক বড় বীর হয়েছিলো। পেয়েছিলো ‘বাংলার বীর’ ও ‘ভাটি অঞ্চলের বাঘ’ খ্যাতি।
তাঁর নাম শমশের গাজী। বাংলার বীর শমশের গাজী।
স্যারের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম আমরা। উত্তেজনায় আমাদের চোখ জ্বলজ্বল করছিলো। স্যার আরো বললেন, শমশের গাজীর জন্ম ১৭০৫ সালে ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার নিজকুঞ্জরা গ্রামে। তিনি ত্রিপুরা রাজ্য ও পরবর্তীতে চাকলা রোশনাবাদ, ভুলুয়া ও নিজামপুর পরগনার শাসক ছিলেন। তাঁর শাসনকালে সর্বত্র শান্তি-শৃঙ্খলা ছিলো। অসহায় দরিদ্র ও মৌলবি-ব্রাহ্মণদের অর্থ সাহায্য ও নিষ্কর জমি প্রদান, খাজনা মওকুফ, হাট-বাজার, রাস্তাঘাট, মসজিদ-মন্দির স্থাপন, দিঘি-পুকুর খনন, পণ্যদ্রব্যের ওজন ও মূল্য নির্ধারণ, দুঃসময়ের জন্য খাদ্য মজুদ, চাষাবাদের জন্য খাল-নদী কেটে গতিপথ পরিবর্তন, শিক্ষার প্রসারে বিদ্যালয় স্থাপন ও শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার মাধ্যমে বহু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
স্যার আমাদের দিক থেকে চোখ ফেরালেন সামনের ছোট্ট পাহাড়টার দিকে। তারপর হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিয়ে বললেন, এখানেই শমশের গাজীর প্রধান দুর্গ ছিলো। এটা হচ্ছে সোনাপুর-চম্পকনগর মৌজা। আর একটু এগিয়ে চলো তোমাদের শমশের গাজীর সুড়ঙ্গ দেখাবো।
আমরা স্যারের পিছু নিলাম। বাংলার বীর শমশের গাজীর ব্যবহৃত সুড়ঙ্গ দেখলাম। সুড়ঙ্গের পাশে বসে গ্রুপ ছবি তুলে আমরা ইশকুলের ফেসবুক পেজ-এ আপলোড করলাম। তারপর ঘুরে ঘুরে শমশের গাজীর দিঘি ও প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ দেখলাম। প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো স্মৃতিনিদর্শন দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়া সূর্যটাকে তখন তাজা কমলার মতোই মনে হচ্ছিলো।
বাংলার বীর শমশের গাজীর দুর্গ ছেড়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলছে। কাঁচখোলা গাড়িতে ঢুকে পড়া বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের সাথে যেন ভেসে আসছে বাঘের গর্জন আর সাহসী শমশেরের হুঙ্কার।

SHARE

Leave a Reply