Home ভ্রমণ বিছনাকান্দি প্রকৃতির এক বিস্ময় -মাহবুব এ রহমান

বিছনাকান্দি প্রকৃতির এক বিস্ময় -মাহবুব এ রহমান

দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ হিসেবে পরিচিত সিলেটকে বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী বলা হয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যঘেরা অপরূপ এই সিলেট। জাফলং, বিছনাকান্দি, রাতারগুল, লোভাছড়া, পান্তুমাই, লালাখাল প্রভৃতি সত্যিই মহান আল্লাহর অপূর্ব সব সৃষ্টি। এগুলোর মধ্যে নব উদ্ভাবিত দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি বিছনাকান্দি।
বিছনাকান্দি সিলেট শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে সীমান্ত ঘেঁষা পর্যটনকেন্দ্র। পাথর বিছানো বিস্তীর্ণ প্রান্তরের ওপর বয়ে চলা ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি ঝর্ণা বিছনাকান্দির মূল আকর্ষণ। জাফলংয়ের সাথে বিছনাকান্দির অনেকটাই মিল আছে, তবে বিছনাকান্দির পানি জাফলংয়ের চেয়েও স্বচ্ছ। পানিতে বসে ছবি তুললে পানির নিচের পাথরও দেখা যায়। আকাশছোঁয়া পাহাড়ের কোলে এ যেন পৃথিবীর এক অপরূপ বিছানা। হ্যাঁ, বিছনাকান্দি সত্যিই জান্নাতি এক বিছানা। বর্তমানে সিলেটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র।
এই বিছনাকান্দিতে ভ্রমণের উদ্যোগ নিলো ‘কিশোরকণ্ঠ পাঠক ফোরাম’ বিয়ানীবাজার উপজেলা। অনেক অপেক্ষার পর এলো সেই শুভদিন। ভ্রমণের জন্য দু’টি বাস রিজার্ভ করেছিলেন ফোরামের সদস্যবৃন্দ। আমি, হাসান ভাই, জহির ভাই, জাহাঙ্গীর ভাই আমরা ছিলাম উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে। তাই আগে থেকেই আমরা একটি সিএনজি রিজার্ভ করে রেখেছিলাম। ২৭ তারিখ সকাল ৭টায় আমরা সিএনজিতে উঠলাম। সিএনজি উপজেলা সদরে পৌঁছল সকাল সাড়ে ৭টায়। পৌঁছেই আমরা নাশতা সেরে নিলাম। আমাদের বিয়ানীবাজার থেকে সিলেটের দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার, আবার সিলেট থেকে বিছনাকান্দির দূরত্ব আরও ৬০ কিলোমিটার। অর্থাৎ সব মিলিয়ে আমাদের যেতে হবে প্রায় ১১০ কিলোমিটার। ঘড়ির কাঁটা তখন ৮টা ছুঁইছুঁই। আমাদের বাস ছাড়ল বিছনাকান্দির উদ্দেশে। ‘তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ’ বলে গাড়ির সিটে বসে ফেসবুকে একটা পোস্ট দিলাম।
গাড়ি ছুটল আপন গন্তব্যের দিকে। গাড়ির সামনে ঝুলছে ব্যানার। আর ভেতরে মাইক ফিট করে রাখা। মাইকে পরিবেশিত হচ্ছে মজার সব সঙ্গীত। সাথে বিখ্যাত সাংস্কৃতিক সংগঠন কান্ডারি শিল্পীগোষ্ঠীর রম্যগান ও কৌতুক। আমি নিজেও কান্ডারির শিল্পী হওয়ায় সাথী হলাম শিল্পীদের সাথে গান ও কৌতুক পরিবেশনে। সময় কেমন করে যাচ্ছে কেউই বুঝতে পারলাম না।
সবার পরনে নীল টি-শার্ট আর গলায় ঝুলছে আইডি কার্ড। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে ১০টার দিকে পৌঁছলাম বিছনাকান্দির নিকটস্থ হালদারপার বাজারে। সেখানে বাজারের একটি খালি জায়গায় বসে আমাদের সাথে নেয়া বিরিয়ানি খেলাম। হালদারপার বাজার থেকেও স্পটের দূরত্ব প্রায় ২ কিলোমিটার।
আমরা দুপুরের দিকে রওনা হলাম মূল স্পটের উদ্দেশে। আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে, পার হয়ে যায় গরু পার হয় গাড়ি, দুই ধার উঁচু তার ঢালু তার পাড়িÑ ছোটবেলার কবিতার সাথে ছবির অনেক মিল।
হাঁটতে হাঁটতে আমরা পৌঁছে গেলাম বাংলাদেশের শেষপ্রান্তে। পৌঁছালাম বিছনাকান্দি! এতো সুন্দর!! খুশিতে সাত-পাঁচ না ভেবেই নেমে গেলাম। স্রোতের শক্তি কল্পনা করতে পারিনি। ধপাশ করে পাথরে আছাড় খেলাম। শীতল জলের পরশ পেয়ে আছাড়ের ব্যথা, দুই কিলো বন্ধুর পথহাঁটার ক্লান্তি ভুলে গেলাম।
টানা এক ঘন্টা যাবৎ হেঁটে, ক্লান্ত শরীর যখন বিছিয়ে দিলাম ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঝর্ণার ঝকঝকে পরিষ্কার শীতল পানিতে, তখন সেই ক্লান্তি অতিসুখে পরিণত হতে এক সেকেন্ডও লাগেনি। কিভাবে যে এতটা পথ হেঁটেছি, বুঝতেই পারিনি। চাইলে নৌকায়ও যেতে পারতাম কিন্তু অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কি আর নৌকায় ভালো লাগে! ঝকঝকে শীতল পানির প্রবল স্রোত আর ঢেউয়ে, বড় বড় পাথর আঁকড়ে ধরে শৈবাল হওয়া। সামনে সবুজে ঘেরা উঁচু উঁচু পাহাড়। দূরের পাহাড়টা এতই উঁচু, দেখে মনে হয় যেন মেঘ ছুঁয়ে আছে। পাহাড়ের চূড়া থেকে বিরামহীনভাবে গড়িয়ে পড়ছে ঝর্ণার পানি আর তার শব্দে সারা শরীর যেন নেচে ওঠে আজ। এ যেন নায়াগ্রা জলপ্রপাতেরই প্রতিচ্ছবি।
প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যের মহিমা, সত্যিই অবর্ণনীয়। এ যেন অদ্ভুত এক ভালোলাগা। সবকিছু এখানে এসে মিলেছে। জাফলংয়ের স্বচ্ছ পানি, পাথর আর পাহাড়ের মিলন। তার সাথে আছে মাধবকুন্ডের মতো ঝর্ণা। কক্সবাজারের মতো জলের ঢেউ আর শীতল মিষ্টি পানি। এ যেন ভূ-স্বর্গ।
এখানে এসে সব সৌন্দর্যই উপভোগ করছি কিন্তু ছোঁয়া যাচ্ছে না কিছুই, কেননা সবই যে ভারতে। তবে দূর পাহাড়ই আপনাকে হাঁটাবে। মেঘালয়ের টানেই আপনি হাঁটবেন। যদি হেঁটে বিছনাকান্দি যান তাহলে আপনাকে এরকম কয়েকবার নৌকা দিয়ে পার হতে হবে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর একটি অফিস আছে একদম শেষ মাথায়। বিছনাকান্দি নামার আগে অবশ্যই তাদের সাথে পরামর্শ ও অনুমতি নিয়ে যেতে হবে।
বালু ও পাথরের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে আমাদের অনেকেরই বিরক্তি চলে আসছিল। স্পটে পৌঁছার পর দুই বাজারের মধ্যবর্তী স্থানে আয়োজন করা হলো মোরগের লড়াই, হাঁড়ি ভাঙা, চকোলেট দৌড়সহ বিভিন্ন ধরনের খেলার। অতঃপর নামলাম ঝরনার পানিতে। আল্লাহর সৃষ্টি অপরূপ এই সৌন্দর্য মুহূর্তের মধ্যেই আমাদের মনকে সতেজ করে দিলো। কেটে গেল আমাদের সকল ক্লান্তি। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম আল্লাহতায়ালার দরবারে। যার করুণায় এতো সুন্দর একটি স্থানে আসতে পেরেছি। মন ভরে গোসল করলাম ঝরনার পানিতে। আমরা ছিলাম ১৩০ জনের মতো। আমাদের দুষ্টুমিতে মেতে উঠল পুরো পর্যটন স্পটটি। শুরু হলো ছবি তোলা। কেউ সেলফি আবার কেউ কেউ গ্রুপ ছবি। গোসল শেষ করে আমরা আবার পরে নিলাম আমাদের সেই নীল টি-শার্ট। সবাই হেঁটে এলাম একটি সবুজ মাঠে। শুরু হলো কুইজ প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতা শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আমাদের সাথে এসে যোগ দিলেন কিশোরকণ্ঠ পাঠক ফোরাম সিলেট মহানগরের প্রধান উপদেষ্টা আব্দুর রাজ্জাক ভাই। তিনি আমাদের সকলের উদ্দেশে মজাদার কিছু কথা বললেন। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনলাম ভাইয়ার কথা।
তারপর এলো ফেরার পালা। আবারো হাঁটা শুরু। উদ্দেশ্য হালদারপার বাজার। যেখানে আমাদের বাস রাখা আছে। সূর্য তখন ডুবুডুবু অবস্থায়। কিছুক্ষণ হাঁটার পর পেঁছলাম হালদারপার বাজারে। মসজিদ থেকে সুমধুর কণ্ঠে ভেসে এলো মাগরিবের আজান। বাজারের মসজিদে সালাতুল মাগরিব আদায় করে আমরা আবার গাড়িতে উঠলাম। সারা দিনের দৌড়ঝাঁপের কারণে সবার মধ্যেই একটা ক্লান্তিভাব চলে এসেছে। অনেকটা নীরবেই কেটে গেল কিছু সময়। আমরা এসে পৌঁছলাম সিলেট শহরে। বাস থেকে নেমে হালকা নাশতা করলাম। চা পানের পর সবার মনে যেন কিছুটা চেতনা ফিরে এলো। আবারো শুরু হলো শিল্পীদের পরিবেশনা। গোলাপগঞ্জ বাজারে পৌঁছে আবারো নাশতা। অতঃপর শুরু হলো অনুভূতি প্রকাশ। ভ্রমণটা কার কাছে কতটুকু উপভোগ্য ছিল তার বর্ণনা দিলেন সবাই। সবাই সবার অনুভূতি প্রকাশ করল। এভাবে চলে এলাম বিয়ানীবাজার উপজেলা সদরে। এরপর ধীরে ধীরে সবাই ছুটলাম গন্তব্যের দিকে। কিন্তু মন যেন পড়ে রইল বিছনাকান্দির পরম শীতল স্বচ্ছ পানিতে।

SHARE

Leave a Reply