Home তোমাদের গল্প অভিমান -তোফায়েল সিপু

অভিমান -তোফায়েল সিপু

এই অপমান কোনভাবেই সহ্য করা যাবে না। আম্মুটাও কি রকম হয়ে গেল। আব্বু যখন আমাকে বলছিলো ল্যাপটপ কিনে দেবে তখন সেওতো পাশে ছিলো। আর আজকে বলছে, এতো তাড়াহুড়া করার কী দরকার। আমি আবার তাড়াহুড়া করলাম কই। আমাকে বলেছে এ প্লাস পেলে ল্যাপটপ কিনে দেবে। আমিতো এ প্লাস পেয়েছি। আর, ল্যাপটপের কথাতো আমি বলিনি, আব্বু নিজেই বলেছেন। এখন আবার বলছেন, ব্যবসার অবস্থা ভালো না। তখন তো আর আমাকে বলেন নাই ব্যবসার অবস্থা ভালো হলে তোমাকে ল্যাপটপ কিনে দেবো। তাহলে তো আমি এতো স্বপ্ন দেখতাম না। রহিম ভাইকে বলে রেখেছি গেমস ডাউনলোড করে দেওয়ার জন্য। ফাইয়াজও আমাকে বলেছে, ল্যাপটপ কিনলে দুটো গেমসের সিডি গিফট্ করবে। রিক্সায় বসে ভাবছিল জামান।
‘এই যে ভাইজান, কার সাথে কথা কন, কোনখানে নামবেন?’ রিক্সা ড্রাইভারের কথা শুনে সম্বিত ফিরে পেল জামান। সেতো নিজেই জানে না কোথায় যাবে। ভাই, আপনার যেখানে খুশি নিয়ে যান, তবে উত্তরায় যাবেন না, ঐখানে আব্বুর দোকান।
ড্রাইভার কিছু বলতে চাচ্ছিল এমন সময় তার ফোন বেজে উঠল। ফোনের ওপাশের কথাগুলো বুঝা না গেলেও ড্রাইভার বলল, ট্যাহার মিল করতে পারলে আনবো, তয় আইজকা আর ওষুধ আননের পারবো না।
ফোন রেখে রিক্সার ড্রাইভার বলল, ভাইজান, বড় বিপদে আছি। যা আয়রোজগার হয় বাপজানের ওষুধ কিনেই শেষ। এখন আবার বলছে বাপের লাইগা একখান কম্বল নেওনের লাইগা। ঠান্ডায় নাকি বেমার আরও বাড়তাছে। দুইশো ট্যাহার নিছেতো আর কম্বল পাওন যাইবো না। ভাইজান এইখানে নামবেন?
হ্যাঁ, এইখানেই দিয়ে দেন। জামান রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া দিতে যাবে এমন সময় তার মনে পড়ল, বাসা থেকে রাগ করে বের হওয়ার সময় মানিব্যাগ নিয়ে আসেনি। সে কাঁচুমাচু হয়ে ড্রাইভারকে সে কথা বলল, এবং তার হাতের ঘড়িটি খুলে দিল। ঘড়িটি হাতে না নিয়ে ড্রাইভার বলল, এইডা কী করেন ভাইজান। আপনের বিপদের সময় কী আমি আপনের ঘড়ি নিব, আইজকা নাই তো কী অইছে, যেইদিন থাকবে দিয়া দেবেন। আর আমারে না পাইলে কোন গরিবরে দিয়া দিয়েন। এই কথা বলেই রিক্সা নিয়ে সে চলে গেল।
রিক্সা থেকে নেমেই জামান বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। বাড়ি থেকে রাগ করে আসাটা কী তার ভুল হয়েছে? না! যেখানে আমার কোন মূল্যায়ন নেই সে বাড়িতে আর কখনও ফিরে যাবো না। সে রাস্তার পাশে একটি পিলারে হেলান দিয়ে বসে এসব চিন্তা করছিল। হঠাৎ পাশের মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান শুনে চিন্তার জগৎ থেকে ফিরে এলো জামান। লোকজনকে মসজিদের দিকে যেতে দেখে সেও মসজিদে গেল। নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে সে হাঁটা শুর করল। কোথায় যাবে সে তা জানে না। তবে বাড়িতে সে কোনভাবেই যাবে না।
কিছুক্ষণ হাঁটার পর তার প্রচন্ড ক্ষিধে পেল। তখন মনে মনে নিজের ওপর খুব রাগ হলো। কেন সে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মানিব্যাগ নিয়ে আসেনি। নাহলে তো তার এতক্ষণ না খেয়ে থাকতে হতো না। বেচারা রিক্সা ড্রাইভারকেও ভাড়াটা দিতে পারল না।
পাশে একটা চায়ের টঙের দোকান দেখে পানি খাওয়ার জন্য গেল জামান। গিয়ে দেখে তার মতো একটা ছেলে চা বিক্রি করছে। নিজ হাতেই একগ্লাস পানি খেয়ে দোকানের টুলে বসে পড়ল সে। অনেকক্ষণ বসে থাকার পর দোকানদার ছেলেটি বলল, ভাইজান কিছু লাগবে? সেই সকালে নাস্তা খেয়ে এসেছিল জামান। এতক্ষণ কোনরকমে পেটের ক্ষুধা সহ্য করলেও এবার আর পারল না। সে দোকানদার ছেলেটিকে তার সারাদিনের ঘটনা খুলে বলল।
আরে ভাই, টাকা নাই তো কী হইছে? পেটে ক্ষুধা লাগছে খান। সে দু’টা বন ও এককাপ চা তুলে দিল জামানের হাতে। চা খেয়ে জামান ছেলেটিকে পড়াশোনার কথা জিজ্ঞেস করলো। ছেলেটি তখন বিষন্ন মনে বলতে লাগলো, হ ভাই ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছিলাম। ভাইজান জানেন, আমি কিন্তু ক্লাসে দুই নাম্বার ছিলাম। এক নাম্বার হইতাম কিন্তু যে এক নাম্বার হইছে তার বাবা স্কুল কমিটির সদস্য। তাই স্যাররা তাকে মার্ক বেশি দিতেন। স্কুল থেকে আমিই কিন্তু একমাত্র বৃত্তি পেয়েছিলাম।
তাইলে তুমি পড়াশোনা বন্ধ করে দিলে কেন?
পড়াশোনা কী আর ইচ্ছে করে বন্ধ করে দিছি ভাইজান। হঠাৎ করেই কারখানা থেকে খবর এলো, বাপজান মারা গেছেন। বিশ্বাস করেন ভাইজান আমার বাপ খুব ভালো মানুষ ছিল। তারা তাদের স্বার্থের জন্য আমার বাপরে মেরে ফেলেছে। বাপজান মারা যাওয়ার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়ল। এখন আর আমার মা কথা বলতে পারে না। সেই থেকেই আমার পড়াশোনা বন্ধ। স্কুলের এক স্যারের সহযোগিতায় এই টঙটা দিছি। এখন কোন রকমে আমাদের মা-ছেলের দিন চলে যাচ্ছে। ডাক্তার বলছে অপারেশন করা না হলে মা নাকি আর সুস্থ হবে না। তবে অনেক টাকা লাগবে। এই দুই বছরে আমি কিছু টাকা জমিয়েছি। আরও কিছু টাকা জমা হলে ডাক্তারের কাছে যাবো। বেশ চিন্তায় আছি ভাই। ইদানীং বেশি টাকা পয়সা জমা করতে পারি না। জিনিসপত্রের দামও বাড়ছে।
ছেলেটার কথা মুগ্ধ হয়ে শুনলো জামান। মনে মনে ভাবলো, আমি আব্বা আম্মার ওপর রাগ করে এসেছি আর ওই ছোট্ট ছেলেটি তার মায়ের জন্য কত কিছুই না করছে। না! আব্বার ওপর এভাবে রাগ করে আসাটা আমার উচিত হয়নি। বাবার কষ্টমাখা চেহারাটা মনে পড়ে গেল জামানের। সে বাড়িতে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলো।

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply