Home প্রচ্ছদ রচনা গ্রাম বাংলায় শীত -মঈনুল হক চৌধুরী

গ্রাম বাংলায় শীত -মঈনুল হক চৌধুরী

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যেই প্রত্যেক দেশের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও রূপ ফুটে ওঠে। বিশাল পৃথিবীর বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি দেশে দেশে ভিন্নতা সৃষ্টি করে। যা মানুষকে আকৃষ্ট করেছে চিরকাল। তাই পাহাড়, পর্বত বন-বনানী, নদী-সাগর, মরুভূমি, সবুজ দেশ, কোন কিছুই মানুষের কাছে মাধুর্যহীন নয়। সব দেশের মানুষ তার প্রকৃতিকে আপন করে নেয় নিবিড়ভাবে ভালোবাসে। তেমনি আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ প্রকৃতি ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমাদের কাছে ধরা দেয়। আমরা তার রূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই। ষড়ঋতুর দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। ষড়ঋতুর আনাগোনায় আমাদের গ্রাম আমাদের গ্রামবাংলার জনজীবন হয়ে ওঠে রঙিন। ফলে আমরা আলোড়িত হই এর প্রভাবে। ষড়ঋতু গ্রামবাংলার বুকে নেমে আসে রূপ রস, বর্ণ-গন্ধ ও ছন্দে। এই বৈচিত্র্যের প্রেক্ষিতে আমাদের মনের ওপর ষড়ঋতুর প্রভাব বিচিত্রধর্মী। ষড়ঋতু নানা রঙের জাল বিস্তার করে আমাদের সবার মনে। বলতে গেলে রঙের বৈচিত্র্য সব ঋতুর গুরুত্ব ও প্রভাব কম নয়। তাই গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত ঋতুর চাকায় চেপে ঘুরে ফিরে আসে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলার বুকে। এখন প্রকৃতিতে ঋতু পরিবর্তনের পালা শুরু হয়েছে। বইছে এলোমেলো উত্তুরে বাতাস। হালকা শীতের আমেজ এখন প্রকৃতিতে। হেমন্তের শেষে উত্তুরের হিমেল হাওয়া ধীরে ধীরে গুটি গুটি পায়ে এগোতে থাকে। আর বাড়ির দরোজা জানালায় কড়া নেড়ে বলে- শোন গো বাংলাদেশের মানুষেরা, আমরা কিন্তু হিমালয়ের ওপাশ থেকে তোমাদের জন্য চিঠি নিয়ে এসেছি। গরম পোশাক নিয়ে তৈরি হও। এভাবেই আসে পৌষ-মাঘ। অর্থাৎ শীতকাল। শীতের হাওয়ায় লাগলো কাঁপন’ কেবল কবিতার কথা নয়। গ্রামবাংলায় এখন শীতের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। নদী-নিসর্গ, শ্যামল-শোভায় প্রকৃতিতে শীতের আমেজ লেগেছে। বন-বাগানে, বিলে-জলাশয়ে, পাখ-পাখালির পাখায় পাখায় শীতের আগমনী আনন্দ।
আসলে শীত বাংলাদেশের প্রকৃতিতে এক প্রধান ও রোমাঞ্চকর ঋতু। শীতের আমেজটা অন্যান্য ঋতুর চাইতে সম্পূর্ণ আলাদা। বিশেষ করে শীতের সকালটা। চারদিকে কুয়াশা চাদর। উত্তুরে হাওয়া। সবুজ ঘাসের ওপর জমে থাকা মুক্তোর মতো ঝকমকে শিশির বিন্দু। সে সাথে টাপুর টুপুর শব্দে কুয়াশার পানি পাতার ওপর পড়ার শব্দ। তা ছাড়া কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে ডিমের লাল কুসুমের মতো সূর্যটা যখন ঠিক মাথার ওপর ওঠে, তখন কী যে আনন্দ লাগে, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা লেপের তলা থেকে শীতে কাঁপতে কাঁপতে উঠোনে সোনালি রোদে পিঠ পেতে বসে। তখন নরম গরম রোদের মিঠেকড়া স্পর্শে শীত পালিয়ে যেতে থাকে। এ সময় রোদের তেজ বেড়ে যায়। কুয়াশা যায় কেটে। সবুজ ঘাসের ডগায় জমা রাশি রাশি শিশির বিন্দু পালিয়ে যায়। এ সময় মাঠে মাঠে কৃষকেরা কাজ করে। দূরে ছোট নদীতে পাল তুলে নৌকা চলে যায়। নদীর দু’পাশে ফসলের বিপুল সমারোহ।
শীতকালের একটি বিশেষ আকর্ষণ খেজুরের রস। সারারাত ধরে হাঁড়িতে টুপ টুপ করে পড়তে থাকে রস।
খুব ভোরে নামানো হয় সেই রসভর্তি রসের হাঁড়ি। এই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় গুড়। কি মনমাতানো গন্ধ সেই গুড়ের। এই গুড় দিয়ে তৈরি হয় নানারকম পিঠে পুলি। এসব পিঠার ধরন আলাদা, আকর্ষণও ভিন্ন। এই পিঠার সাথে একাত্ম হয়ে যায় বাংলাদেশের গ্রামীণ ঐতিহ্য। ভাপা, সাজ, খেজুরি, দুধকমল, ছিট, কাটা, লবঙ লতিকা, আরো কত বিচিত্র নাম যে আছে, বলে শেষ করা যাবে না। সত্যিকারে বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যকে, ঐতিহ্যের প্রধান চিত্রকে যদি উপলব্ধি করতে হয়, তবে এসব কিছু দেখতে হবে খুব কাছ থেকে। যেতে হবে গ্রামে। সেখানে দেখা যাবে নবান্নের এই দেশে এই সময়ে মানুষ কত আনন্দমুখর। কতো পরিতৃপ্ত। আমাদের লোকজ সংস্কৃতি মিশে আছে এই শীতের মনোরম নবান্ন উৎসবকে ঘিরে। যেখানে ধানের সাথে মানুষের সম্পর্ক অচ্ছেদ্য। গ্রামের সবাই স্বাগত জানায় এই নবান্নকে। কত ধরনের আনন্দের মহড়া। মুর্শিদী, কীর্তন, আরো কতো কী! রাতে গানের আসর বসে। সেই গানের সুর নেই। কণ্ঠ ভাঙা। তবু দরদ দিয়ে গেয়ে যায় তারা। সেই গানের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসে তাদের হৃদয়ের লুকানো সুখ দুঃখের কতো না কথা।
আমাদের বাংলাদেশ নানা রকম মেলার জন্য বিখ্যাত। ষড়ঋতুর বিভিন্ন সময়ে এখানে বেশ উৎসবের সাথেই এ মেলাগুলো অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। মেলার রকমারি আয়োজনে গ্রামবাংলার বড় থেকে ছোটদের মনকে আলোড়িত করে। তার মধ্যে গ্রামবাংলার শীতকালীন মেলা অন্যতম। সাধারণভাবে এদেশের মেলায় থাকে কুটিরজাত পণ্যদ্রব্য। সেই সাথে খাবার জিনিসও প্রয়োজন হয় প্রতিদিনকার জীবনে। ফলে মেলা থেকেই সেসবের প্রয়োজন মেটায় অজপাড়াগাঁয়ের মানুষজন। কামার, কুমোর, তাঁতী, ছুতোর, চাষি সবারই মেলায় পরিণত হয় এসব মেলা। বেশির ভাগ শীতকালীন মেলাই বসে নদীর ধারে মাঠে কিংবা ফসলকাটা মাঠে। বিস্তীর্ণ মাঠের মধ্যখানে বটগাছের নিচেও মেলার আয়োজন করে থাকে স্থানীয় লোকজন। এসব মেলাকে ঘিরে ঘরে ঘরে নীরবে প্রস্তুতি চলে প্রায় সারাবছর ধরে। গ্রাম্যকুলবধূ কৃষাণিরা ঘরের মুঠো চাল জমা করে কিংবা গৃহস্থালির নানা উৎপন্ন দ্রব্য বিক্রি করে মেলাকে উপলক্ষ করে টাকা পয়সা জমিয়ে রাখে। তারপর মেলা শুরু হলে মেলা থেকে পছন্দসই জিনিস কিনে নিজেকে ও নিজের ঘর সংসার সাজায়। কুটিরজাত জিনিসের মধ্যে এসব মেলায় থাকে বাঁশ, কাঠ, আর বেতের নানান সামগ্রী। ঘর সাজাবার উপকরণ যেমন পাটের শিকে, শোলা আর তৈরি খেলনাও থাকে এসব মেলায়। মাটির হাঁড়ি, পাতিল, খেলনাপুতুল তো আছেই। কৃষিকাজের প্রয়োজনীয় জিনিস কাস্তে, নিড়েন, দা, কুড়াল ইত্যাদি নিয়ে পসরা সাজান কামার। তাঁতী নিয়ে আসেন হাতে বোনা শাড়ি, লুঙি ইত্যাদি। হাল আমলের প্রায় শীতকালীন মেলাতেই মেয়েদের প্রসাধনসামগ্রী, চুড়ি-পুঁতির মালা, আয়না, চিরুনি ইত্যাদি সব কিছুই পাওয়া যায়। হরেক রকমের মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য, যেমন- গুড়ের জিলাপি, বাতাসা, মুদকি, মশলাযুক্ত পান এসব মেলায় আকর্ষণ সৃষ্টি করে। এই বহু বিচিত্র পণ্যের পাশে এসব মেলায় চমক লাগায় স্থানীয় কিছু জিনিস। যেমন নকশি কাঁথা। তা ছাড়া চট্টগ্রাম, সিলেটের বিভিন্ন মেলায় আদিবাসীদের হাতে তৈরি নানা রকম পণ্যও পাওয়া যায়। আবার কোন কোন শীতকালীন মেলায় পুতুল নাচ, যাত্রা অভিনয় ও নাগোরদোলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। উল্লেখ্য, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই শীতকালীন মেলাগুলো অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই শীতে আসে শীতের পাখিরা। দূরদূরান্ত থেকে তারা আসে অতিথির বেশে। এসব পাখি সাইবেরিয়া কিংবা যেকোন শীতের রাজ্য থেকে এসে থেকে যায় পুরো শীতের মৌসুম। আমাদের গ্রামবাংলার সৌন্দর্যকে এরা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। এই পাখিরা কোলাহলে মুখরিত করে রাখে সারা দেশ। ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসে তারা। দেশীয় পাখিরা গ্রহণ করে তাদের বন্ধুর মতো। কেউ ডুব দিয়ে শামুক খোঁজে, কেউ বা আবার ভেসে বেড়ায় দীঘির জলে। কেউ হয়তো শীতের মিষ্টি রোদে ডানা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সে এক নয়নজুড়ানো দৃশ্য। নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত আমাদের দেশে প্রায় দেড় শ’ প্রজাতির শীতের পাখি চলে আসে।
এদের মধ্যে বেশির ভাগ পাখির আবাসস্থল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। এ সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকগুলো অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়। এরপর শীতের পাখিরা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। শীত শেষ হলে আবার উড়াল দেবে নিজ বাসভূম অভিমুখে। তাইতো এদের বলা হয় শীতের পাখি।
এ সময় আমাদের গ্রামবাংলায় প্রচুর ফলের সমারোহ ঘটে। ফলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- কুল, পেঁপে ও কমলালেবু। পাকা পেঁপে বেশ সুস্বাদু ও সুমিষ্ট ফল। এতে প্রচুর ভিটামিন আছে। উল্লেখ্য, শীত এলে নানা রঙের মৌসুমি ফুল আমাদের বাগানকে আলোকিত করে রাখে। এসব ফুলের রূপজৌলুস খুবই নজরকাড়া। এদের কত যে রঙ আর কত আকুতি তার হিসেব দেয়া কঠিন। আমাদের দেশে শীত মৌসুমেই এ ধরনের কিছু কিছু ফুলের চাষ হয়। তবে দিন দিন আমাদের মৌসুমি ফুলের তালিকা বেশ সমৃদ্ধ হচ্ছে। প্রতিবছর কিছু না কিছু নতুন ফুল আসছে এখানে। মৌসুমি ফুলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফুলগুলো হলো-গাঁদা, গোলাপ, ডালিয়া, সূর্যমুখী, জিনিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, প্রভৃতি ফুল। শীতের নাচন এখন পাতায় পাতায়। শীতের আগমনে ফুরফুরে হয়ে ওঠে আমাদের মনমেজাজ। ফলে প্রকৃতি বদলের সাথে সাথে আমাদের মনেরও পরিবর্তন ঘটে। এই শীতের অপূর্ব শোভার মাঝেই বাংলাদেশের প্রকৃতির প্রকৃত রূপ অনুধাবন করা যায়। অন্যান্য ঋতুর বেলায় যে উদ্দামতা, শীতের বেলায় তা অনুপস্থিত। শীতকালে দিন ছোট থাকে। কেমন করে যে সকাল থেকে দুপুর আর দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে যায়, তা যেন খোঁজই পাওয়া যায় না। শীতের কিছু বাস্তব সুবিধা রয়েছে। কাদা আর ধূলিহীন এই শীত ঋতু। জীবন হয়ে ওঠে শান্ত নিস্তরঙ্গ। প্রকৃতি যেন গাম্ভীর্যের মাধ্যমে জীবনকে করে তোলে উপভোগ্য। শাকসবজির বিপুল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সমারোহ এখন। সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্য এখন কৃষকের ঘরে ঘরে। বর্ষা বাদল থাকে না বলে এ দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শীত ঋতুতেই বেশি হয়ে থাকে। সে সাথে গ্রামে মুক্ত মাঠে চলার পথে মটরশুঁটি যেন দু’পা জড়িয়ে ধরে আদর জানায়। সবুজ ঘাসের ওপর মুক্তোর মতো ঝকমকে শিশির হাতছানি দেয়। দেখে মনে হয় শীতের সৌন্দর্য গ্রামবাংলার গর্ব।

SHARE

Leave a Reply