Home প্রবন্ধ বিশুদ্ধভাষী রাসূল সা. -মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্

বিশুদ্ধভাষী রাসূল সা. -মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্

আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সা. যখন লোকদের আল্লাহ্র পথে আহ্বান জানাতেন, কোন মাহফিলে বক্তব্য রাখতেন, জনতা তাঁর কথা পাগলপারা হয়ে শুনতো। বক্তৃতা চলাকালীন সময়ে পুরো পরিবেশ ‘পিনড্রপ সাইলেন্ট’ পিনপতন নীরবতা বিরাজ করতো। শুধু বক্তৃতা নয় ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়ও তাঁর প্রতিটি নির্দেশ পালনের উদ্দেশ্যে সাহাবারা নিজেদের জানমাল বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। যার যা কিছু আছে তা নিয়ে নবীজির নির্দেশ পালনে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। একবার ব্যর্থ হলে শতবার চেষ্টা করতেন লক্ষ্যের সোনালি সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে। কিন্তু কখনো নিরাশ হয়ে চেষ্টা-প্রচেষ্টা থেকে বিরত থাকতেন না।
কালেমার আওয়াজকে সবার দ্বারে পৌঁছে দেয়ার জন্য নবী করীম সা. সাহাবাদের নিয়ে প্রায়ই এক কবিলা (গোত্র) থেকে অন্য কবিলা, এক স্থান হতে অন্য স্থানে, এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরে বেড়াতেন। যেখানেই গিয়েছেন তাঁর সুন্দর দীপ্তিমান নূরানী চেহারা, পৌরুষদৃপ্ত অবয়ব, সবচেয়ে বিশুদ্ধ যুক্তিপূর্ণ ভাষণ লোকদের চৌম্বক শক্তির মতো আকৃষ্ট করতো। তাঁর মুখে আল্লাহ্র অস্তিত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব, ক্ষমা এবং শাস্তির কথা মানুষের হৃদয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হতো। ফলে মানুষ সহজে আল্লাহ্র দ্বীনে শামিল হতো। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান এনে নিজেদের ধন্য করতো।
প্রশ্ন জাগতে পারে এটি কী করে সম্ভব হলো? রাসূলে করীমের তো কোন ভাষা শিক্ষক ছিলেন না? অথবা তিনি তো ভাষাতত্ত্বের ওপর কোনো উচ্চতর ডিগ্রি নেননি? তাহলে কোন শক্তি তাঁকে এত সুন্দর সাহিত্যে উৎকর্ষ শৈল্পিক ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন?
হ্যাঁ; তাঁর কোনো দুনিয়াবি শিক্ষক ছিলেন না। এ সম্পর্কে নবীজি প্রায়ই গৌরবের সাথে বলতেন, “আমি তোমাদের সবার চেয়ে বিশুদ্ধভাষী, আমি কোরাইশ ও বনি সা’দ বংশের দুগ্ধপোষ্য (লালিত-পালিত) শিশু।”
বিশুদ্ধ ভাষা শিক্ষার জন্য সবচেয়ে উত্তম সময় হলো শিশুকাল। একটি শিশুকে ছোটবেলায় শুদ্ধরূপে ভাষা শিক্ষা দেয়া হলে সে তার ব্যক্তিত্বকে সহজ ভাষায় ফুটিয়ে তুলতে পারে। তাই ভাষা হলো শিক্ষার বাহন, অভিমত প্রকাশের অলঙ্কার, উদ্দেশ্য অর্জনের হাতিয়ার। এ জন্য কথিত আছে, “ভাষায় বংশের পরিচয় মিলে।”
প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সা.-এর ধাত্রী মা বিবি হালিমা। তিনি ছিলেন বনি সা’দ গোত্রের মেয়ে। এ বংশের লোকেরা খুবই সুন্দর, স্বচ্ছ, প্রাঞ্জল, বিশুদ্ধ আরবি ভাষায় কথা বলতেন। ভাষার জন্য তাঁরা ছিলেন আরবে সুবিখ্যাত। এ বিষয়ে তাদের সাথে অন্য কারো জুড়ি মেলা ভার।
মক্কা নগরী মহানবীর জন্মস্থান। তৎকালীন আরবের ধর্ম, শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। নানা দেশের, নানা বর্ণের, নানা ভাষার লোকদের আনাগোনা ছিল মক্কায়। ফলে আরবি ভাষা মক্কায় তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে। আঞ্চলিক ভাষার বিশাল প্রভাব দেখা যেত লোকদের কথোপকথনে। তা ছিল শ্রুতিকটু।
মহান আল্লাহ্র ইশারায় নবীজির লালন পালন তথা ভাষা শিক্ষার ভার পড়ে বনি সা’দ বংশে। মা হলিমা পালক পুত্র মুহাম্মদ সা.কে হৃদয় উজাড় করে ভালবাসতেন। পরম আদরের সাথে দোলনায় দুলিয়ে দুলিয়ে সুললিত কণ্ঠে গাইতেন :
“বেঁচে থাকুক মুহাম্মদ-সে দীর্ঘজীবী হোক
চির তরুণ, চির কিশোর, চির মধুর রো’ক।
হয় যেন সে সরদার আর পায় যেন সে মান
শত্রু তাঁর ধ্বংস হোক-ঘুচুক অকল্যাণ।
মুহাম্মদের পানে খোদা দয়ার চোখে চাও
চিরস্থায়ী যা কিছু তা’ই তাঁরে দাও।”
দীর্ঘ ছয় বছর যাবৎ দুধ ভাই আবদুল্লাহ্ এবং দুধবোন শায়মার সাথে খেলাধুলায়, ছোটোখাট কাজে, মেষ চরাতে গিয়ে নবীজি সমবয়সী শিশু-কিশোরদের কাছ থেকে আত্মস্থ করেন আরবের সবচেয়ে সুন্দর ভাষা আর বাকরীতি। তাই তো আমরা পরবর্তী জীবনের বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা হিসেবে তাঁর আচার-আচরণে, বক্তৃতামালায়, পত্রাবলিতে সে সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাই। তিনিই বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত যিনি বিদায় হজের ভাষণে অভূতপূর্ব দীপ্রতার সাথে ‘জগতের মুক্তিসনদ’ প্রদান করেছিলেন। যা মান্য করলে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে নেমে আসবে শান্তি।
তাঁর খাঁটি উম্মত হিসেবে আমাদেরও উচিত নিজ মাতৃভাষার বিশুদ্ধ রূপকে আত্মস্থ করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও অফিসে; সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলা। নিজ মাতৃভাষাকে ভালোবাসা। মনে রাখবে, যে শুদ্ধ বলেছে সেই শিক্ষাজীবন ও কর্মক্ষেত্রে সফলতা লাভ করেছে।

SHARE

Leave a Reply