Home ফিচার ক্রিস্টোফার কলম্বাস দুর্জেয়কে জয় করার এক ইতিহাস -হুসনে মোবারক

ক্রিস্টোফার কলম্বাস দুর্জেয়কে জয় করার এক ইতিহাস -হুসনে মোবারক

ইউরোপে তখন সবেমাত্র  রেনেসাঁর হাওয়া লেগেছে। নানাভাবে বিকাশের জন্য ইউরোপ তখন উন্মুখ। ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারের জন্যও ইউরোপের দেশে দেশে শুরু হয়েছে নানা উদ্যোগ। সেখানে সবাই জানে ব্যবসায় সফলতা পেতে হলে ভারতের বাজারে প্রবেশ করা চাই, কিন্তু ইউরোপ থেকে স্থলপথে সুদূর ভারতে যাওয়া নানা ঝক্কির ব্যাপার। আর জলপথের সন্ধান জানে শুধুমাত্র আরবীয় নাবিকেরা। তাদের সাথে ইউরোপের তখন রেষারেষির সম্পর্ক, আরব নাবিকেরা কিছুতেই ভারতের নৌরুট অন্য কারো কাছে প্রকাশ করে না। ভারতে যাওয়ার নৌরুট তখন ইউরোপের নাবিকদের কাছে পরম আরাধ্য একটি ব্যাপার।
বিজ্ঞানীদের কল্যাণে অনেকের কাছেই তখন এ তথ্য পৌঁছে গেছে যে পৃথিবীর আকার চ্যাপ্টা থালার মতো নয়, কমলালেবুর মতো গোলাকার। এই ভাবনা জেঁকে বসলো ইতালির এক ভাগ্যান্বেষী নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাসের মনে। তার কেবলই মনে হতে লাগলো, পৃথিবী যদি গোলাকারই হয়, তাহলে ইউরোপ থেকে নৌযানে চড়ে পূর্ব পানে অবস্থিত ভারতে যাওয়া অনেক সহজেই সম্ভব, শুধু সঠিক নৌপথটি খুঁজে বের করতে হবে। অনেক ভেবে ভেবে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে ইউরোপের পশ্চিম উপকূল থেকে জাহাজ ভাসিয়ে ক্রমাগত পশ্চিম দিকে গেলে এক সময় পূর্বে অবস্থিত ভারতে পৌঁছে যাওয়া যাবে, কারণ পৃথিবী তো গোলাকার। যেই ভাবা সেই কাজ। শুরু করে দিলেন নানান পরিকল্পনা।
কলম্বাসের জন্ম ইতালির জেনোয়াতে। জেনোয়া তখন ইতালির বিখ্যাত নৌবন্দর। সেখানেই তার নাবিকবিদ্যার হাতে খড়ি। কিন্তু তার ভাবনাটি বাস্তবে রূপ দিতে হলে যে পরিমাণ অর্থকড়ির প্রয়োজন, জেনোয়া থেকে তা সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে ধর্না দিলেন ইংল্যান্ড, ফ্যান্স, জার্মানির রাজ দরবারে। কোথাও সুবিধা করতে না পেরে অবশেষে পর্তুগালে। সাক্ষাৎ করলেন রাজা দ্বিতীয় জনের সাথে। রাজাকে তিনি বুঝালেন তার পরিকল্পনার কথা, আর চাইলেন প্রয়োজনীয় জাহাজ আর লোকবল। মুগ্ধ ও উত্তেজিত রাজা তাকে বললেন, আমি রাজি, তুমি আগামীকাল এসো। রাজা তার পারিষদবর্গের কাছে মতামত চাইলেন, তারা যুক্তি সহকারে প্রস্তাবটির অসারতা সম্পর্কে রাজাকে বুঝিয়ে বললেন। পরদিন যখন কলম্বাস এলেন, রাজা তাকে বললেন, দেখো, তুমি তো বললে যে পৃথিবী চ্যাপ্টা নয়, গোলাকার। কিন্তু ধরো, যদি পৃথিবীটা গোলাকার না হয়ে চ্যাপ্টাই হয়, তাহলে আমার জাহাজ লোকলস্কর এসব নিয়ে তুমি কোথায় গিয়ে বেঘোরে প্রাণ হারাবে বলতে পারো? না বাপু, জেনে বুঝে এত টাকা পয়সা পানিতে ফেলার মতো বোকা আমি নই। আর তোমাকেও বলি, জেনোয়ায় তো শুনেছি ভালো তাঁতের কাজ হয়, তুমি বরং এসব বাদ দিয়ে তাঁত চালাও গিয়ে। আশাহত কলম্বাস এসব কথা শুনে দমে যাওয়ার কথা, তাই না?
কিন্তু কলম্বাস দমলেন না, তিনি গিয়ে হাজির হলেন স্পেনে। রানী ইসাবেলা তখন সবেমাত্র স্পেনের সিংহাসনে পাকাপোক্ত হয়ে বসেছেন। নতুন করে রাজ্যপাট গোছানোর তুমুল আয়োজন চলছে, টাকা পয়সারও বেজায় প্রয়োজন। কলম্বাস তাকে বুঝালেন, একবার ভারতের নৌরুটটি আবিষ্কার হয়ে গেলে টাকার চিন্তা আর থাকবে না। ভারতের পথে প্রান্তরে ছড়িয়ে রয়েছে সোনা-দানা, মনিমাণিক্য, শুধু তুলে আনার অপেক্ষা। রানী ইসাবেলা রাজি হলেন। কথিত আছে যে, রানী ইসাবেলা নিজের গয়না বিক্রি করে এ অভিযানের খরচ বহন করেছিলেন।
রানীর দেয়া তিনটি জাহাজে চড়ে ভারত অভিযানে বের হলেন কলম্বাস, সাথে অভিজ্ঞ নাবিকবৃন্দ। নাবিকেরা অবশ্য সবাই অখুশি, কারণ তাদের ধারণা আটলান্টিকের পশ্চিম প্রান্তে ভারত নয়, রয়েছে মৃত্যুপুরী। কখনো সখনো পশ্চিম দিকে ভুল করে যেসব নাবিক গিয়েছিল, তাদের বর্ণনা ভয়াবহ। সেখানে সাগর থেকে আচমকা উঠে আসে বিপুলায়তন দৈত্য, গিলে ফেলে আস্ত জাহাজ। কখনো কখনো দেখা যায় দিগন্তের সর্বব্যাপী আগুনের লেলিহান শিখা। কুহক মায়াবী পাখিরা এসে নাবিকদের ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে যায় সেই অগ্নিকুন্ডে। সেই থেকে ইউরোপের নাবিকেরা ভুলেও আর পশ্চিমমুখো হয় না।
১৪৯২ সালের ৩ আগস্ট প্রধান জাহাজ সান্তা মারিয়া, সহযোগী দুই জাহাজ পিন্টা আর নিনা আর ৮৮ জন নাবিকসহ পালোস থেকে যাত্রা।
স্পেন থেকে যাত্রা শুরু করে, কথা ছিলো চার সপ্তাহের মধ্যে কোনো ভূমির সন্ধান না পেলে ফিরে যাবেন কলম্বাস। চার সপ্তাহ সময় পার হয়ে যাবার পর, কোনো ভূমির নাম-গন্ধও না দেখে, তার নাবিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিলো। ১০ অক্টোবর স্থির হয়, আর তিনদিন অনুসন্ধান শেষে কিছু দেখতে না পেলে, ফিরে যাবেন কলম্বাস আর তার সঙ্গী নাবিকরা। কিন্তু ১২ অক্টোবর মধ্যরাতের ঠিক দুই ঘন্টা পর, ‘পিন্টা’র নাবিক ‘রডরিগে ডি ত্রিয়ানা’ সর্বপ্রথম অনুধাবন করতে পারেন ভূমির অস্তিত্ব। ইতালিয়ান বংশোদ্ভূত, স্প্যানিশ নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস তার বহরের তিন জাহাজ ‘নিনা’, ‘পিন্টা’ আর ‘সান্টা মারিয়া’ নোঙর করালেন বর্তমান বাহামা দ্বীপেপুঞ্জের অন্তর্গত ‘সান সালভাদরে’।
ইন্ডিয়ার খোঁজে স্পেন থেকে পশ্চিমমুখী অভিযানে বের হওয়া এই দীপপুঞ্জকে প্রথমে মনে করা হয়েছিলো ‘ইন্ডিয়া’ আর দ্বীপের অধিবাসীদের মনে করা হয়েছিলো ‘ইন্ডিয়ান’। তাই পশ্চিমে পাওয়া এই ভুল ইন্ডিয়ার ভুল করে দেয়া নাম হয়ে যায় ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ’ আর অধিবাসীদের নাম হয় ‘রেড ইন্ডিয়ান’।
এই ওয়েস্ট ইন্ডিজ নামের ইতিহাসটিও বেশ মজার। একসময় ইউরোপীয়দের ধারণা ছিল এ অঞ্চলটিই ভারত। পরে তাদের সে ভুল ভেঙে গেলেও ইন্ডিয়া নামটি নানাভাবে আমেরিকা মহাদেশের সাথে যুক্ত রয়ে গেছে এখনও।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ। পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপমালা। আমেরিকা মহাদেশ দু’টির লাগোয়া ক্যারিব সাগর অঞ্চলের দ্বীপসমূহকে সামগ্রিকভাবে একসময় এরকম নামেই অভিহিত করা হতো। এখনো এ সকল দেশের সম্মিলিত একটি ক্রিকেট দল ওয়েস্ট ইন্ডিজ নামে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ঘরানায় প্রতিনিধিত্ব করছে।
তাদের সে-দিনের সেই আবিষ্কারের আনন্দ, কলম্বাস কিংবা তার নাবিকদের সে-দিনের সেই অনুভূতি হয়তো কিছুতেই ভাষায় প্রকাশ করার নয়। তৎকালীন ইউরোপ কিংবা এশিয়ার মানুষজনের স্বপ্নেও ছিলো না, এরকম একটি দ্বীপের অস্তিত্বের কথা।
বিজয়ী দল সর্বপ্রথম আধিপত্য বিস্তার করে পতাকা আর নাম পরিবর্তন দিয়ে। এখানেও তার ব্যতিক্রম হলো না। কলম্বাস একে একে ছোটো ছোটো দ্বীপগুলোর নাম পরিবর্তন করলেন- স্প্যানিশ রানী ইসাবেলা, রাজা ফার্দিনান্দ, বিভিন্ন সাধু, সন্ন্যাসীর নামে। কলম্বাসের ধারণা ছিল তিনি ভারতীয় অঞ্চলেরই কোন দূরবর্তী দ্বীপে এসে পৌঁছেছেন। কিন্তু এরপর পর্তুগিজ পরে নাবিক ভাস্কো দ্য গামা আফ্রিকা ঘুরে ভারতের নৌরুট আবিষ্কার করলে সবার ভুল ভেঙে যায়।
যখন বোঝা গেল যে কলম্বাস আসলে ইন্ডিয়া নয়, সভ্য মানুষের অজানা নতুন এক বিশাল ভূখন্ডের সন্ধান লাভ করেছেন, ততদিনে সে অঞ্চল পশ্চিম ইউরোপীয়দের কাছে ইন্ডিয়া হিসেবে পরিচিতি পেয়ে গেছে। আসল ইন্ডিয়া আবিষ্কারের পর দুই অঞ্চলই ইন্ডিয়া হিসেবে অভিহিত হতে থাকে, আসলটি পূর্বদিকে বিধায় ইস্ট ইন্ডিয়া, আর ভ্রমাত্মকটি পশ্চিম দিকে বিধায় ওয়েস্ট ইন্ডিয়া। পরে পর্তুগাল, ব্রিটেন, আর ফ্রান্স আমেরিকা মহাদেশ দুটির বিভিন্ন অংশে অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে, নামও তাদের মত করে দেয়। কিন্তু ক্রিকেট দলের কল্যাণে কলম্বাসের প্রথম পদচারণার দ্বীপগুলো এখনও ইন্ডিয়া নামটি ধরে রেখেছে।

সর্বোপরি, নতুন এই ভূমির আবির্ভাবে স্প্যানিশরা যেন শত শত বছর পর তাদের কল্পিত সেই দ্বীপ এন্টিলিয়াকেই খুঁজে পেলো। রহস্যের প্রতীক সেই এন্টিলিয়ার নামেই কালক্রমে নতুন এই ভূমির নাম হয়ে পড়লো এন্টিলিজ- গ্রেটার এন্টিলিজ ও লেসার এন্টিলিজ।
মানচিত্রে তুলনামূলকভাবে উপরের দিকে থাকা গ্রেটার এন্টিলিজ বসবাসকারী অধিবাসীরা ছিলো মূলত ‘তাঈনো’ সম্প্রদায়ের, অন্য দিকে নিচের দিকে থাকা লেসার এন্টিলিজ অধিবাসীদের বেশির ভাগ ছিলো ‘ক্যারিব’ সম্প্রদায়ের আদি অধিবাসী। যাদের নাম অনুযায়ী এ অঞ্চলকে বলা হয়ে থাকে ‘ক্যারিবিয়ান’।

যদিও কলম্বাসের অভিযানের উদ্দেশ্য ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখনকার দিনে স্পেন থেকে পূর্বমুখী জাহাজ চালিয়ে ইন্ডিয়া পৌঁছাতে হলে সমস্ত আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে তারপর যেতে হয় ইন্ডিয়া অভিমুখে।
বর্তমানে অবশ্য সমস্ত আফ্রিকা ঘুরে ইন্ডিয়া যেতে হয় না। কারণ, ভূমধ্যসাগর পার হয়ে, কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সুয়েজ খাল দিয়ে শর্টকাট পথ অনুসরণ করা যায়। ইউরোপ থেকে আফ্রিকা না ঘুরে এশিয়া যাবার সুয়েজ খাল ছাড়া অন্য আর কোনো সহজ পথ নেই। যার জন্য সুয়েজ খাল ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিকভাবে এতটা গুরুত্বপূর্ণ।
কলম্বাসের পরিকল্পনা ছিলো পশ্চিম দিকে জাহাজ চালিয়ে যদি ইন্ডিয়া পৌঁছা যায়, তাহলে ইউরোপের অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোকে পেছনে ফেলে ব্যবসায়িক দিক থেকে স্পেন এগিয়ে যেতে পারবে। এই প্রস্তাব দিয়েই কলম্বাস রানী ইসাবেলাকে অভিযানের খরচ জোগাড় করতে রাজি করিয়েছিলেন।
কলম্বাস যখন স্পেনে ফিরলেন, তখন তার নব আবিষ্কারের প্রমাণ হিসেবে নিয়ে এসেছিলেন সেখানকার বিভিন্ন উদ্ভিদ আর প্রাণীর স্যাম্পল, সেখানকার কয়েকজন আদিবাসীকেও সাথে নিয়ে এসেছিলেন। রানী ইসাবেলা সেই অভিযানের প্রাপ্তি দেখে প্রথমে হতাশ হয়েছিলেন, পরে অবশ্য সমগ্র আমেরিকা মহাদেশ দুটির অধিকাংশ দেশে স্পেনের উপনিবেশ স্থাপিত হয়েছিল। তাই এখনও সেসব দেশের ব্যবহারিক ভাষা স্প্যানিশ।

মজার ব্যাপার হলো এই অভিযানের ফলে, পরবর্তীতে যে দুটো মহাদেশের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় তার কোনোটির নামই কলম্বাসের নামে নয়। ইতালিয়ান বা রোমানরা এত এত ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে যে, তারা হয়তো প্রচার করতে ভুলেই গেছে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম দুই নাবিকের জন্ম এই ইতালিতেই। একজন ক্রিস্টোফার কলম্বাস, অন্যজন অ্যামিরিগো ভেস্পুচি। কলম্বাস তার প্রথম অভিযানের পরও আরো কয়েকবার একই পথে অভিযানে গিয়েছিলেন। কিন্তু, ১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের হয়ে অভিযানে যান অ্যামিরিগো ভেস্পুচি। যদিও বর্তমানে এই অভিযানের সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা হয়। তবে এটা ঠিক যে, আরো কিছুদিন পর বেশ কিছু অভিযানের দায়িত্বে ছিলেন অ্যামিরিগো ভেস্পুচি। ১৪৯৭ এর অভিযানে যান আর না-ইবা যান, ১৫০৭ সালে মানচিত্র নির্মাণকারী মার্টিন ওয়ার্ল্ডসিম্যুয়েলার এবং ম্যাথিয়াস রিংম্যান্ তাদের বিখ্যাত মানচিত্র ‘ইউনিভার্স্যালিস্ কসমোগ্রাফিয়া’তে অ্যামেরিগো ভেস্পুচির প্রতি সম্মান দেখিয়ে তার নামের প্রথম অংশ থেকে ‘অ্যামেরিকা’ শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন। সেদিন তাদের দেয়া সেই নামেই আজও সারা বিশ্বে পরিচিত ‘অ্যামেরিকা’।
যেদিন কলম্বাস বাহামার (সান সালভাদর) মাটিতে প্রথম পা রাখেন, সেদিন থেকে মানবজাতির ইতিহাসে মানুষের সাহস আর বীরত্বের কথা নতুন করে আবারও যুক্ত হলো। রচিত হলো দুর্জেয়কে জয় করার, অনতিক্রম্যকে অতিক্রম করার আরেক ইতিহাস।

SHARE

Leave a Reply