Home উপন্যাস রত্নদ্বীপের আতঙ্ক -আহমেদ বায়েজীদ

রত্নদ্বীপের আতঙ্ক -আহমেদ বায়েজীদ

জেটির দিকে বাইনোকুলারের ফোকাস অ্যাডজাস্ট করলো মাহি। লেন্স ঘুরিয়ে জুমটা বাড়িয়ে নিতেই এক লাফে চোখের সামনে চলে এলো জেটি। চেঁচিয়ে উঠলো সাথে সাথে- ‘ইয়াহু, আমরা এসে গেছি। অয়ন ভাইয়া, আমি জেটি দেখতে পাচ্ছি আর বেশিক্ষণ লাগবে না পৌঁছতে।’
অয়ন বললো- ‘আমরা আরও আগেই দেখতে পেয়েছি। পাঁচ মিনিট লাগবে।’
‘কিভাবে তোমরা দেখলে, তোমাদের চোখে তো বাইনোকুলার নেই?’
‘তোমার চোখে না থাকলে তুমিও আরও আগে দেখতে পারতে। ওটা চোখ থেকে নামিয়ে সামনের দিকে তাকাও।’ বললো ফাহাদ।
‘আরে তাইতো! এতক্ষণ তো খেয়ালই করিনি।’ বাইনোকুলার নামিয়ে বললো মাহি। ‘কিন্তু…আসল জিনিসটাই তো দেখা হলো না।’ বলতে বলতে মুখটা কালো করে ফেললো সে।
‘পারবে, এখানে যেহেতু এসেছো সবই দেখতে পারবে। একটু অপেক্ষা করো। সুন্দরবনে গেলেই তো আর বাঘ সামনে এসে দেখা দেয় না। তাকে খুঁজে নিতে হয়।’ সান্ত্বনা দিল অয়ন।
প্রায় বিশ মিনিট ধরে এক ট্রলারের ছাদে বসে জেলে নৌকাগুলোর ওপর চোখ রাখছে মাহি। এ নৌকা থেকে ও নৌকা ঘুরেছে চোখ। এখন ভাটার শেষ সময়, আর কিছুক্ষণ পরই জোয়ার আসবে। জাল টেনে নিচ্ছে জেলেরা। অনেক দিন ধরে যেন এই সময়টার অপেক্ষায়ই ছিল সাজিন। জ্যান্ত ইলিশ মাছ জালে উঠছে এটা কেবল টিভির পর্দায়ই দেখেছে। এবার স্বচক্ষে দেখা চাই। গত কয়েকটা দিন শুধু এই এক প্যাচালে কান ঝালাপালা করেছে অয়নের। ঘড়ি দেখলো অয়ন। পঁয়ত্রিশ মিনিট হলো ট্রলারে উঠেছে ওরা। মাঝিরা বলেছে চল্লিশ মিনিটে পৌঁছাতে পারবে, হলোও তাই। দেখতে দেখতে জেটির একেবারে কাছে চলে এলো ট্রলার। ট্রলারের বিরক্তিকর ভট ভট আওয়াজ বন্ধ হলো, যেন প্রাণ ফিরে পেল কান দুটো, কয়েক মুহূর্ত সময় নিলো স্বাভাবিক হতে। ছাদ থেকে নেমে এলো তিনজনে। নিচের যাত্রীরা এরই মধ্যে নামার জন্য প্রস্তুত হয়েছে। যাত্রী বলতে ঢাকা থেকে আসা চারজন ছাত্রের একটি দল। একজন ব্যবসায়ী আর তার সহকারী। একজন মাঝবয়সী সম্ভবত দ্বীপেই থাকে, পর্যটক হলে হাতে ভারী ব্যাগ থাকার কথা। আর কয়েকজন জেলে যারা মেইনল্যান্ডে গিয়ে মাছ বিক্রি করে ফিরে আসছে। ছাত্রদের দলটির সাথে অয়ন ট্রলারে ওঠার সময়ই পরিচিত হয়েছে। অয়ন রত্নদ্বীপ সম্পর্কে ওর জানা তথ্য দিয়ে ওদের সাহায্য করলো। দ্বীপ সম্পর্কে অয়নের জ্ঞান দেখে একজন জানতে চাইলো- তুমি নাকি আগে এখানে আসোনি কখনও, তাহলে দ্বীপ সম্পর্কে এতকিছু জানো কিভাবে?
অয়ন হাসলো- ‘আসলে সবই কৌতূহল থেকে জেনেছি। যদিও আগে আসিনি তবু জায়গাটি আমার কাছে একেবারে নতুন নয়।’
সব শুনে বেশ খুশিই হলো চারজনের দলটি। বললো- যেহেতু একসাথে আছি কয়েকদিন, নিশ্চয়ই তোমার কাছ থেকে আরও সাহায্য পাবো।’
প্রথমবার এলেও রত্নদ্বীপের সাথে অয়নের পরিচয় আরও তিন-চার বছর আগে থেকে। আব্বুর কাছে থেকে রতœদ্বীপের গল্প শুনতে শুনতে এ দ্বীপের কোথায় কী আছে তা প্রায় ওর মুখস্থ। অনেকদিন থেকে আসার ইচ্ছা থাকলেও পড়াশুনার কারণে আসা হয়নি। এবার এসএসসি পরীক্ষা শেষ হতেই আর দেরি করেনি। ঢাকা থেকে একাই এসেছে। বরিশাল এসে জুটিয়ে নিয়েছে দু’জন সঙ্গী। খালাতো ভাই মাহি আর ফাহাদ। ওরা বরিশালেই থাকে। মাহি মেজো খালার ছেলে আর ফাহদ ছোট খালার।
সমুদ্রকন্যা কুয়াকাটা থেকে পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে সমুদ্রের বুকে এই রতœদ্বীপের অবস্থান। উনিশশো একানব্বইয়ের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর এ দ্বীপটি ধীরে ধীরে মাথা তুলে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। দ্বীপের স্থায়ী বাসিন্দা বলতে ত্রিশ চল্লিশটি জেলে পরিবার আর বেড়াতে আসা পর্যটকদের জন্য তৈরি কয়েকটি হোটেল-রেস্টুরেন্টের কর্মচারীরা। আর রয়েছে কয়েকজন শৌখিন ধনীর ব্যক্তির বাংলো। সব মিলিয়ে চার-পাঁচশো লোক আছে দ্বীপে। দুই বছর আগে অয়নের আব্বুর প্রতিষ্ঠান দ্বীপটি সরকারের কাছ থেকে লিজ নেয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ার জন্য। ইতোমধ্যে তারা কাজও শুরু করেছে। আর এ কারণেই দ্বীপটি অয়নের কাছে এত পরিচিত। শুরুতে দ্বীপটির নাম ছিলো ভাসা দ্বীপ। আসলে ঘূর্ণিঝড়ের পর হঠাৎ ভেসে ওঠায় স্থানীয় লোকজন এই নামেই ডাকতে শুরু করে। পরবর্তীতে অয়নের আব্বু স্থানীয় প্রশাসনকে বলে রতœদ্বীপ নামটি চালু করেন। তার ভাষায় সমুদ্রের বুকে এটি বাংলাদেশের জন্য এক টুকরো অমূল্য রতœ। তার বিশ্বাস রতœদ্বীপকে ঘিরেই নতুন করে জেগে উঠবে দেশের পর্যটন শিল্প।
ঘাটে উঠে ছাত্রদের দলের একজন জানতে চাইলো তোমরা কোথায় উঠবে? নিজেদের বাংলোর কথা জানালো অয়ন। ওরা জানালো হোটেল সৈকতে থাকবে। যাবার সময় তাদের একজন নিচুস্বরে অয়নকে জিজ্ঞেস করলো- ‘শুনলাম দ্বীপের পরিবেশ নাকি খুব একটা সুবিধের নয়! প্রায়ই নাকি ডাকাতি হয়।’
‘কে বললো এই কথা আপনাদের?’ অয়ন পাল্টা প্রশ্ন করলো।
‘ঐ লোকটা…’ হাত দিয়ে সামনে হেঁটে যাওয়া এক লোককে দেখালো সে। অয়ন চিনতে পারলো লোকটাকে। ট্রলারেই এসেছে ওদের সাথে। জিন্স আর টি শার্ট পরা, পায়ে কেডস। তবে পর্যটক নয়, মনে হয় দ্বীপেই থাকে।
‘কই আমিতো এরকম কিছু জানি না। আর কিছু বলেছে সে?’
‘বলেছে এই কারণেই নাকি দ্বীপে খুব একটা পর্যটক বেড়াতে আসে না। আমাদেরকে সাবধানে থাকতে বললো। তোমরাও সাবধানে থেকো।’ বলে বিদায় নিল দলটি।
যার যার ব্যাগ নিয়ে অয়নরা হাঁটতে শুরু করলো বাংলোর দিকে। ততক্ষণে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে প্রায়। জেটি থেকে একটি রাস্তা সোজা পশ্চিম দিকে গেছে। সেটা ধরে হাঁটতে শুরু করলো তিনজনে। কতদূর এসে একটি চৌরাস্তায় মিশেছে রাস্তাটি। দ্বীপের চার প্রান্ত থেকে চারটি রাস্তা এসে এখানে মিশেছে। কিছু দোকান আছে জায়গাটায়, পাশাপাশি কয়েকটি বিল্ডিং। নাম দেখে বুঝলো আবাসিক হোটেল এগুলো। হোটেল সৈকতকেও দেখলো এর মধ্যে। এটাই দ্বীপের প্রধান এলাকা। উত্তর দিকের পথ ধরলো অয়ন। পশ্চিম দিকটা জেলেপল্লী। উত্তর দিকে পায়ে হাঁটা পাঁচ-সাত মিনিটের পথ বাংলো। কয়েকটি বাড়ি চোখে পড়লো রাস্তার পাশে। সবগুলোই ইটের দেয়াল করা তবে উপরে টিনের চালা। প্রায় সবগুলো বাড়িই খালি। দু’একটিতে লোক থাকার ছাপ রয়েছে। একটি বাড়ির গেটে থামলো অয়ন। নাম ‘সমুদ্র বাড়ি’। ওদেরকে দেখে বাড়ির ভেতর থেকে মাঝ বয়সী এক লোক দৌড়ে এলো। এসে বললো- ‘আপনারা কি ঢাকা থেকে আসছেন?
অয়ন বললো-‘জি, আপনি কি সালাম ভাই?’ আর কিছু বলতে হলো না। ওরা না দিতে চাইলেও সালাম জোর করে তিনজনের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকলো।
‘স্যার পরশু ফোনে বলছে আপনারা আসবেন। আমি সব কিছু ঠিকঠাক কইরা রাখছি। কোন সমস্যা নাই।’ বললো সালাম মিয়া।
‘এখানে তো মোবাইলের নেটওয়ার্ক নাই। আব্বু ফোন করলো কিভাবে সালাম ভাই!’ অয়ন আশ্চর্য।
‘ঠিকই শুনছেন, তয় স্যার তো ফোন করে নাই। আমি দুই একদিন পর পর বিচে যাই দরকারি জিনিসপাতি আনতে। তখন স্যারের কাছে ফোন করি।’
অয়ন জানে দ্বীপের বাসিন্দারা কুয়াকাটাকে ‘বিচ’ বলেই ডাকে। ওদের ঘরটা বেশ বড়। দুই পাশে জানালা। একটি বড় ও একটি মাঝারি খাট। একটি টেবিল, আলনা সহ দরকারি জিনিস সবই আছে ঘরে। আলোর জন্য সৌরবিদ্যুৎ বসানো হয়েছে।
‘কোন কিছু লাগলে আমারে ডাইকেন। যাই আমি গিয়া রান্না বসাই।’
‘আপাতত কিছু লাগবে না। আমরা এখন কাপড় ছেড়ে লম্বা ঘুম দেবো। রান্না হলে আপনি খাওয়ার জন্য ডাকবেন।’
কিন্তু ঘুম হলো না। এমনিতে নতুন বিছানপত্র, তার ওপর নতুন জায়গায় বেড়াতে আসার উত্তেজনা। তবে শুয়ে শুয়ে গল্প করে কাটালো তিনজনে। অয়ন ওদের দু’জনকে দ্বীপ সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা দিল। রাত ৯টার দিকে সালাম মিয়া রাতের খাবার নিয়ে এলো। সালামকে নিয়ে একসাথে খেল সবাই। খাওয়া শেষে শুতে গেল সবাই। মাহি আর ফাহাদ এক খাটে। অয়ন একা আরেক খাটে। লাইট বন্ধ করতে গেল অয়ন। হাত সুইচ স্পর্শ করতে যাচ্ছে এমন সময় একটি চিৎকার শুনে থেমে গেল। আ…. আ…. ওমা গেলাম রে..
পুরুষ কণ্ঠের চিৎকার। কান খাড়া করে শুনতে চেষ্টা করলো অয়ন। মাহি আর ফাহাদও উঠে বসেছে বিছানায়। কিন্তু আর কিছুই শুনতে পেল না। কয়েক মুহূর্ত কাটলো একদম নিঃশব্দ। এরপর আবার চিৎকার করে উঠলো সেই কণ্ঠটি-
ডাকাত….ডাকাত…ডাকাত…ডাকাত…।

২.
ততক্ষণে রুমের দরজা খুলে ফেলেছে অয়ন। এক লাফে সামনের রুমে চলে এলো। ওপাশের রুম থেকে সালাম মিয়া বেরিয়ে এসেছে। হাতে টর্চলাইট।
‘কোথা থেকে চিৎকার এলো সালাম ভাই?’ প্রশ্ন করলো অয়ন।
‘শুইনাতো মনে হয় সামনের বাড়িডা থেইক্যা। মনে হয় ডাকাইত পড়ছে।’
মাহি আর ফাহাদও বেরিয়ে এসেছে। একটি স্পিডবোট স্টার্ট নেয়ার শব্দ পেল অয়ন। শব্দটা হঠাৎ বেড়ে আবার ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল শব্দটা।
আধা মিনিটের মধ্যেই ওরা ঢুকলো বাড়িটাতে। অয়নের বাংলো থেকে একশো গজ দক্ষিণে রাস্তার উল্টো পাশে। টিনের চালা দেয়া সেমি পাকা ঘর। সামনের রুমে সৌরবিদ্যুতের বাল্ব জলছে। দরজা খোলাই ছিল। ওরা ঢুকে আরও কয়েকজন লোককে দেখলো। আশপাশের বাসিন্দা। বাড়িতে মোট দুইজন লোক থাকে। ঢাকা থেকে আসা একজন গবেষক আর তার সহকারী। দুই মাস আগে বাড়িটা ভাড়া নিয়েছেন গবেষক ভদ্রলোক। সহকারীকে চিনতে পারলো অয়ন। কুয়াকাটা থেকে ওদের সাথে একই ট্রলারে এসেছে। ঘটনা সম্পর্কে সংক্ষেপে যা শুনলো তা হলো- গবেষকের সহকারী লাভলু কোন কাজে সামনের দরজা খুলতেই মুখোশধারী চার-পাঁচ জন লোক অস্ত্র হাতে ঘরে ঢুকে পড়ে। অস্ত্রের মুখে দু’জনকে জিম্মি করে সব টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয় তারা। একজনের হাতে পিস্তল আর সবার হাতে বড় ছুরি। দুই থেকে তিন মিনিট ঘরে ছিল ডাকাতরা। কাজ সেরে আবার সামনের দরজা দিয়েই বেরিয়ে যায়। লাভলু বাধা দিতে গেলে তার মাথায় পিস্তলের বাঁট দিয়ে আঘাত করে ডাকাতরা। কথা বলার সময় লাভলুকে মাথায় হাত বুলাতে দেখলো অয়ন। লোকটার দিকে চেয়ে কী যেন একটা মনে করতে চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না। কিছু একটা কথা মনে আসি আসি করেও আবার হারিয়ে যাচ্ছে।
গবেষক ভদ্রলোক বিষণœ মনে একটি চেয়ারে বসে আছেন। রাশভারি চেহারা, সাদা গোঁফ আর কয়েকদিনের শেভ না করা হালকা দাড়ি। তবে চেহারায় ব্যক্তিত্বের ছাপ স্পষ্ট। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিচ্ছেন, তা ছাড়া চুপচাপ। লাভলুই সব বলতে লাগলো। ঘরের চারদিকে চোখ বুলালো অয়ন। সামনের রুমে আসবাব বলতে একটি খাট, একটি টেবিল, দুটো চেয়ার। উঁকি দিলো ভেতরের রুমে। সামনের রুমের তুলনায় এটি বেশ গোছানো। আসবাবপত্রও বেশি। খাট, টেবিল- চেয়ার, ওয়ারড্রব আর বেশ কিছু বইপত্র। একটি টেবিলে কিছু গবেষণার জিনিসপত্রও রয়েছে। তবে রুমের সবকিছুই এলোমেলো। একটি আলমারির দরজা খোলা। ভেতরে দু’টি ড্রয়ারও খোলা, কিছু কাগজপত্র এলোমেলো হয়ে আছে মেঝেতে। সারা বাড়িই খুঁজেছে ডাকাতরা। তবে নগদ টাকা ছাড়া আর কিছুই নেয়নি। সালাম মিয়া লাভলুকে বললো কাল সকালেই থানায় গিয়ে মামলা করতে। ভবিষ্যতে সাবধান থাকার নানা উপদেশ দিয়ে অন্য প্রতিবেশীরা একে একে বিদায় নিলো। ফিরে আসতে আসতে সালাম মিয়া বললো- ‘কী যে শুরু হইছে দ্বীপে আল্লাহই জানে। আমি তো আমাগো স্যাররে আগেই বইলা দিছি বেশি টাকা পয়সা এই বাড়িতে না রাখতে।’
তার মানে যা শুনেছে একেবারে মিথ্যা নয়। দ্বীপে ছিনতাই বা ডাকাতি মাঝে মধ্যেই হচ্ছে। বাংলোয় ফিরে ঘুমাতে গেল তিন কিশোর।
সালাম মিয়ার ডাকেই ঘুম ভাঙলো পরদিন সকাল সকাল। এক ঘুমেই রাত পার হয়েছে সবার। একে তো দীর্ঘ যাত্রার ধকল তার ওপর দ্বীপের ঠান্ডা বাতাস শীতের আমেজ এনে দিয়েছে ঘুমে। হাত-মুখ ধুয়ে আসার আগেই নাশতা রেডি হয়ে আছে। নাশতা করলো তিনজন। তারপর বের হলো দ্বীপটা ঘুরে দেখার জন্য। তবে দ্বীপ দেখার আগে ডাকাতি হওয়া বাড়িটা দেখবে বলে ঠিক করেছে অয়ন। বাড়ি থেকে বের হয়েই ঢুকলো গবেষকের বাড়িতে। বাড়িটা আয়তনে বেশ বড়। কাল রাতের অন্ধকারে এতকিছু চোখে পড়েনি। লাভলুকে দেখলো আঙিনায় একটা মোড়া পেতে বসে আছে। ওদের দেখে চিনতে পারলো লাভলু। দু-একটা কথার পর অয়ন জানতে চাইলো কারা হতে পারে ডাকাত লাভলু ভাই, দ্বীপের নাকি বাইরের?
‘এখানে আর ডাকাতি করার লোক কই! কেন কাল রাতে স্পিড বোটের শব্দ পাওনি তোমরা!’ স্পিড বোটেই তো আসে ডাকাতরা।’
কাল রাতে স্পিড বোটের শব্দ শোনার কথা মনে পড়লো অয়নের। খালটির কথাও ও শুনেছে আগে। সমুদ্র থেকে একটি খাল দ্বীপের এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। দ্বীপটাকে প্রায় মাঝামাঝি দুই ভাগে ভাগ করেছে খালটি। সমুদ্রে ঝড় উঠলে জেলে নৌকাগুলো এই খালে আশ্রয় নেয়। কথা না বাড়িয়ে চলে এলো অয়নরা। আসার সময় লাভলু বললো-
‘তোমরা তো দ্বীপে বেড়াতে এসেছো, সাবধানে থাকবা। ডাকাতরা কিন্তু টুরিস্টদের টার্গেট করে। তা ছাড়া তোমার আব্বা দ্বীপে ব্যবসা করে। টাকা পয়সার লোভে ওরা কিন্তু খুনও করতে পারে।’
লাভলুর শেষ কথাগুলো কেমন যেন বেসুরো লাগলো অয়নের কাছে। এক মুহূর্ত চিন্তা করলো, তারপর বললো- ‘জি থাকবো, সাবধান করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।’
সারাদিন ঘুরে ঘুরে দ্বীপ দেখলো ওরা। রাতে যথারীতি সালাম মিয়ার রান্না করা খাবার খেয়ে ঘুমাতে গেল।
পরদিন সকালেই ঘটলো আরেকটি ঘটনা। বেলা করে ঘুম ভাঙলো অয়নের। সকালে সালাম মিয়ার ডাকে ঘুম ভাঙবে এমনটা ভেবেই ঘুমাতে গিয়েছিল। কিন্তু ব্যতিক্রম দেখে অবাক হলো। হাতমুখ ধুয়ে সঙ্গীদের ঘুম থেকে উঠালো। সালাম মিয়ার খোঁজে গিয়ে অবাক হলো। তার রুমে তালা। এত ভোরে কই গেল সে! একবার ভাবলো হয়তো বাজারে গেছে, কিন্তু মন তাতে সায় দিল না। কোন সমস্যা হয়নি তো! নাকি শুধু শুধুই মনের মধ্যে সন্দেহ ঢুকিয়ে বসে আছে। যাই হোক সালাম এলেই দেখা যাবে। রুমে ঢুকতে যাবে এমন সময় রাস্তায় চোখ পড়লো। সালাম মিয়াকে দেখেই থমকে দাঁড়ালো। ব্যস্তভাবে বাড়িতে ঢুকছে। চেহারা কেমন যেন উদভ্রান্তের মত দেখাচ্ছে।
‘সালাম ভাই কোন সমস্যা হয়েছে? কোথায় গিয়েছিলেন সাত সকালে।
‘হ মারাত্মক সমস্যা হইছে, আমারে অহনই বিচে যাইতে হইবো। স্যারের কাছে ফোন করতে হইবো।’
‘বিচে যাবেন কেন, কী হয়েছে?’
‘খুন হইছে ভাইজান, খুন!’
অয়নকে আর কোন কথা না বলার সুযোগ দিয়েই নিজের ঘরে ঢুকলো সালাম। পেছন পেছন তার ঘরে গেল অয়ন। ঘরে ঢুকে সালামের সামনে দাঁড়ালো- ‘সালাম ভাই, খুলে বলুনতো কী হয়েছে।’
‘এসব আপনার শুইনা কাম নাই। আপনি ঘরে যান। আমি বিচ থেইক্যা আসতাছি।’
‘কী যা তা বলছেন!’ রেগে গেল অয়ন। ‘আমি কি ছোট নাকি, বলুন কী হয়েছে।’
ধমক খেয়ে একটু দমলো সালাম। বললো- ‘বজলু মিস্ত্রি খুন হইছে।’
‘বজলু মিস্ত্রি কে?’
‘আমাগো সাইডের হেড মিস্ত্রি। রাইতের বেলা তারে যেন কারা মাইরা রাখছে ঘরের মধ্যে। কেউ টেরও পায় নাই।’
এতক্ষণে বিষয়টা বুঝতে পারলো অয়ন। দ্বীপের দক্ষিণাংশে ওর আব্বুর পর্যটন কেন্দ্র প্রজেক্টের কনস্ট্রাকশনের কাজ শুরু হয়েছে। তার হেড মিস্ত্রি হচ্ছে বজলু। আব্বুর মুখেও দু-একবার নামটা শুনেছে। কিন্তু বজলু খুন হবে কেন? এখানে তার শত্র“কে। আর এই শান্তির দ্বীপে হঠাৎই বা মানুষ খুন হওয়ার ঘটনা ঘটবে কেন? মাথার মধ্যে দ্রুত চিন্তা খেলা করছে অয়নের। সালাম মিয়াকে দেখলো কাপড় পাল্টে দৌড়ে বের হয়ে যেতে।

৩.
নিজের ঘরে এলো অয়ন। ফাহাদ আর মাহিকে জাগালো ঘুম থেকে। খুনের ঘটনা জানালো ওদেরকে। আর কিছু বলতে হলো না। দ্রুত উঠে হাত মুখ ধুয়ে নিলো সবাই। সকালে রান্না করেনি সালাম। ঘরে থাকা কিছু মুড়ি আর বিস্কুট খেয়ে নিলো ঝটপট। অয়নকে কাপড় পাল্টাতে দেখে ওরাও বাইরে যাবার কাপড় পরে নিলো। মাহি আর ফাহাদ বুঝে গেছে অয়ন এখন কোথায় যাবে। কয়েক মিনিটের মধ্যে বের হয়ে গেল তিনজন। পনের মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেল ঘটনাস্থলে।
বাজার এলাকা থেকে রাস্তাটা সোজা দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। রাস্তার পাশ দিয়েই বয়ে গেছে খালটা। কতদূর গিয়ে একটা জায়গায় এসে দুই দিকে ভাগ হয়ে গেছে। খালটা সোজা দক্ষিণ দিকে গিয়ে সাগরে মিশেছে। আর রাস্তাটা ডানে বাঁক নিয়ে পশ্চিমে চলে গেছে। খাল আর রাস্তা যেখানে নব্বই ডিগ্রি কোণ সৃষ্টি করে দুই দিকে চলে গেছে সেখানেই অনেকখানি জায়গা নিয়ে পর্যটন স্পট নির্মাণের কাজ চলছে। এক জায়গায় অনেক লোকের ভিড় দেখে এগিয়ে গেল ওরা। টিন দিয়ে তৈরি কয়েকটি অস্থায়ী ঘর। মিস্ত্রিদের থাকার জন্য তৈরি করা হয়েছে। আলাদা একটি কক্ষে থাকতো বজলু মিস্ত্রি। ভিড় ঠেলে ঘরের ভেতরে গেল অয়ন। একটি খাটিয়ায় চাদর দিয়ে ঢাকা লাশ। আশপাশের লোকদের দেখে নির্মাণশ্রমিকই মনে হলো। পাশের একজনকে জিজ্ঞেস করে ঘটনা শুনলো অয়ন।
শোনার মত খুব বেশি কিছু নেই। সকালে বজলু মিস্ত্রি ঘুম থেকে উঠছে না দেখে তার সহকারীরা ডাকতে আসে। অনেক ডাকাডাকির পরও ঘুম না ভাঙায় সন্দেহ হয় তাদের। দরজা ভেঙে দেখে খাটিয়ায় পড়ে আছে মৃত বজলু। বুকে ছুরির আঘাত। তাদেরই একজন খবর দেয় সালাম মিয়াকে। বিছানায় রক্তের দাগ দেখতে পেল অয়ন। তবে আক্রমণকারীরা যে অনেকটা নিঃশব্দেই কাজ সারতে পেরেছে তা বোঝা যায়। কারণ পাশের ঘরেই অন্য মিস্ত্রিরা ঘুমিয়ে ছিল, কিন্তু কেউ কিছু টের পেল না। ঘরের যে পাশে বজলু মিস্ত্রির খাটিয়া তার বিপরীত দিকের টিনের বেড়া অনেকখানি ফাঁকা। ঐ পথেই খুনি ঘরে ঢুকেছে। উপস্থিত লোকজন সবাই খুনের সম্ভাব্য কারণ নিয়ে কথা বলছে। কেউ সাম্প্রতিক সময়ে দ্বীপে ছিনতাই-ডাকাতির অংশ হিসেবে মনে করছে একে। কেউ বলছে মিস্ত্রিদের কাছে ডাকাত আসার কী কারণ থাকতে পারে!
শেষের যুক্তিটা অয়নেরও মনে ধরলো। আসলেই তো একজন রাজমিস্ত্রির কাছে ডাকাত কেন আসবে? মন বলছে এটা কিছুতেই ডাকাতি নয়, অন্য কিছু আছে এর মধ্যে। সেই অন্য কিছুটা কি হতে পারে। ঘর থেকে কিছুই হারানো যায়নি, অবশ্য নেইও যাওয়ার মত কিছু। উপরন্তু একটা লাশ পড়ে আছে। একরকম জোর করেই মাথা থেকে তাড়ালো বিষয়টাকে। মাহি আর ফাহাদকে নিয়ে ফিরে এলো বাংলোয়।
দুপুরের দিকে সালাম মিয়া ফিরলো কুয়াকাটা থেকে। অয়নের আব্বুকে জানানো হয়েছে খুনের কথা। তিনি আজকেই রওনা করবেন এখানে আসার উদ্দেশ্যে। পুলিশকেও জানানো হয়েছে। ওদের তিনজনের জন্য দুপুরের রান্না করে সালাম মিয়া আবার ছুটে গেল প্রজেক্টে। নিজেরাই খেয়ে নিলো অয়নরা। খেতে খেতে ফাহাদ খুনের কথাটা তুললো আবার- ‘এই রকম তরতাজা একটা মানুষ খুন হয়ে গেল, অথচ কেউ কিছু টেরও পেল না।’
‘আমার মনে হয় খুবই দক্ষলোকের কাজ। এত নিখুঁত!’ মাহি বললো।
‘আচ্ছা অয়ন ভাইয়া…’ অয়ন কিছু বলছে না দেখে খোঁচালো ফাহাদ। ‘তোমার কি ধারণা, কিছু বলছো না যে।’
‘নাহ রে, আমি কিছুই আন্দাজ করতে পারছি না। আসলে এতবড় একটা ঘটনায় কিছু না জেনে মন্তব্য করা ঠিক নয়।’ ধীরে ধীরে বললো অয়ন।
‘ধুত্তুরি বাদ দাও ওসব। বেড়াতে এসেিেছ, কয়দিন আর থাকবো। বেড়ানো শেষ হলে সব ভুলে যাবো। চলো তার চেয়ে যে কয়দিন আছি দ্বীপটা দেখে চলে যাই।’ মাহির কণ্ঠে অনীহা।
‘বাদ দিতে চাইলেও সব বিষয় বাদ দেয়া যায় না। আর আমরা এর সাথে তো জড়াইনি ইচ্ছে করে। আমদেরকে জড়ানো হয়েছে।’ গলার স্বর পাল্টে গেল অয়নের।
‘আমাদের কিভাবে জড়ানো হয়েছে?’ মাহি অবাক।
‘তোরা কি ভুলে গেছিস যে বজলু মিস্ত্রি আমার আব্বুর কাজ করতে গিয়ে খুন হয়েছে? এটা সামলানোর দায়-দায়িত্ব এখন আব্বুর ওপর বর্তাবে।’
ফাহাদ বললো ‘আরে তাইতো! এসব কথা তো আমার মাথায়ই আসেনি এতক্ষণ।’
মাহি বললো- ‘তাহলে তো ভাইয়া ঠিকই বলেছে, বিষয়টায় আমাদের গুরুত্ব দেয়া উচিত। তবে একটু থেমে আবার বললো ‘আমরা কিই বা করতে পারবো এখানে। গুন্ডা-পুলিশের কেস।’
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply