Home ফিচার হিম শির শির হেমন্ত -হারুন ইবনে শাহাদাত

হিম শির শির হেমন্ত -হারুন ইবনে শাহাদাত

আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। ছোট্ট এই দেশের রূপবৈচিত্র্যের শেষ নেই। সময়ের চাকা ঘুরে আসে  বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফালগুন, চৈত্র নামে বারটি মাস। প্রতি দুই মাসে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত নামের ছয় ঋতুর পালা বদলে চলে নানান রূপের খেলা। প্রকৃতি সাজে নতুন নতুন রঙে নতুন রূপে। প্রকৃতির রঙের সাথে সাথে দেশের মানুষের মনেও লাগে রঙের ছোঁয়া।
হেমন্তকাল আসে সোনালি রঙের বাহার নিয়ে। হেমন্তকালে মাঠে মাঠে থাকে সোনালি ধান। হিম হিম বাতাসে সোনালি ধানের শিষে ঢেউ খেলে আসে হেমন্ত। বাংলা বর্ষপঞ্জিকা অনুসারে প্রতি দু’মাসে একটি ঋতু বা কাল। তোমরা নিশ্চয়ই জানো, ‘ঋতু বলতে কী বোঝায়? হ্যাঁ। ঠিক বলেছো।’ ঋতু হলো, ‘বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে আমাদের এই পৃথিবীর কোন একটি দেশ বা অঞ্চলের জলবায়ুর ধরন। ইংরেজিতে যা ঝবধংড়হ বলা হয়। মহাকাশে সূর্যের অবস্থান অনুসারে পৃথিবীর অক্ষের অবস্থানের পরিবর্তনের কারণে কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে ঋতু পরিবর্তন সংঘটিত হয়। আমাদের দেশে হেমন্তকাল  বাংলা বর্ষের চতুর্থ ঋতু। বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ  এই দুই মাস হেমন্তকাল। ঈসায়ী ক্যালেন্ডার যা আমাদের দেশে ইংরেজি সন বলে পরিচিত সেই অনুসারে মধ্য অক্টোবর  থেকে মধ্য ডিসেম্বর সময়কাল হেমন্ত ঋতু। মূলত হেমন্তকাল হচ্ছে শরৎ ও শীতকালের মধ্যবর্তী একটি পরিবর্তনশীল পর্যায় তাই ইংরেজিতে একে খধঃব অঁঃঁসহ বলা হয়। মজার ব্যাপার কি জানো? ইউরোপে হেমন্তের শুরু ১লা সেপ্টেম্বর থেকে। সেখানে হেমন্তকে বলা হয় বৈচিত্র্যময় রঙের ঋতু। হেমন্তকালে পুরাতন পাতা ঝরা শুরু হয়। ব্ল্যাক ফরেস্টের নানা ধরনের ঝাউ গাছগুলো ছাড়া আর সব গাছেরই পাতা এ সময় ঝরে পড়ে। শীত আসার আগেই সব গাছ-পালাই পাতাশূন্য হয়ে যায়।
আমাদের দেশে হেমন্তের আগের ঋতু বর্ষা আর শরৎ। হিম অর্থাৎ ঠাণ্ডা শব্দ থেকে এসেছে হেমন্ত। কারণ হেমন্ত হিম হিম বাতাসের সাথে শীতের আগমনবার্তা নিয়ে আসে। সোনার আরেক নাম হেম। এই প্রকৃতি সোনালি রঙে সাজে সে জন্যও এই সময়কে হেমন্তকাল বলা হয়। হেমন্তের শিশির ঝরা রাতে ফোটে গন্ধরাজ, মল্লিকা, শিউলি আর কামিনী। হেমন্ত কালে পুকুর, বিলে, ঝিলে  ফোটে কত না রঙের শাপলা, শালুক আর পদ্ম। ধানক্ষেতে দোল খায় পাকা ধানের ছড়া। এ সময় চাষিরা ক্ষেত থেকে ধান কেটে ঘরে আনেন। ঘরে ঘরে শুরু হয়  নবান্ন উৎসব। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায়-
‘এই হেমন্তে কাটা হবে ধান
আবার শূন্য গোলায় ডাকবে ফসলেরই বান।’
শুধু কৃষকের শূন্য গোলায় ফসলের বান ডাকে না। মনেও আসে খুশির জোয়ার। নতুন ধানের গন্ধের সাথে সাথে নবান্ন উৎসবের পিঠা, পুলি আর মুড়ি-মোয়ার আয়োজনে মৌ মৌ আমেজে ভরে ওঠে গ্রাম-বাংলা। কবিতার ভাষায়Ñ
‘উঠান গেছে ভরে হিম শোভা ধানে
মন ভাসে খুশির জোয়ার বানে,
নবান্ন উৎসবে শেষ দুঃখের পালা
আসে সুখ কেটে যায় পেটের জ্বালা।
হিম হিম বাতাসে ভাসে পিঠার ঘ্রাণ
সকালের মিষ্টি রোদে জাগে শত প্রাণ,
কৃষক কাস্তে হাতে মাঠে যায় চলে
পা ধুয়ায় তার ভোরের শিশির জলে।
কিষাণীর হাতে সময় নেই ব্যস্ত সারা বেলা
ধান আর চালের সাথে রাত দিন চলে তার খেলা,
চালের গুঁড়োকে দেয় কত শত সাজ
নানান স্বাদের পিঠার চলে কারুকাজ।
হেমন্ত কালে বাংলাদেশের এই সোনালি ছবি
লিখে গেছেন কত লেখক কত শত কবি।’
ধান কাটা, মাড়াই এবং কৃষকের গোলায় তোলা উপলক্ষে গ্রাম-বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় নবান্ন উৎসব।
নবান্ন উৎসব (ঘবি জরপব ঋবংঃরাধষ) : নবান্ন মানে নতুন অন্ন বা ভাত। নতুন ফসল ঘরে তোলা উপলক্ষে কৃষকরা এই উৎসব পালন করে থাকেন। সাধারণত নবান্ন হয় অগ্রহায়ণ মাসে। সে সময় আমন ধান কাটা হয়। এই নতুন ধানের চাল রান্না উপলক্ষে নবান্ন উৎসব হয়ে থাকে। আগের দিনে কোন কোন অঞ্চলে ফসল কাটার আগে বিজোড় সংখ্যক ধানের ছড়া কেটে নিয়ে ঘরের চালে বেঁধে রাখা হতো এবং পরে ক্ষেতের বাকি ধান কাটার পর চাল করে নতুন চালের পায়েস করে নবান্ন করা হতো। ঐতিহাসিকদের গবেষণা থেকে জানা যায়, কৃষির মতই প্রাচীন এই নবান্ন প্রথা। এই ভারতীয় উপমহাদেশের বঙ্গদেশে বারো মাসে তেরো পার্বণেরই একটি নবান্ন উৎসব। নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই উৎসব এখনো হয়। পিঠা-পুলি, মজার মজার খাবার আয়োজন, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল আয়োজনের মাধ্যমে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘অঘ্রাণের সওগাত’ কবিতায় মুসলমান সমাজের নবান্ন উৎসবের ছবি সুন্দরভাবে চিত্রিত হয়েছে। কবির ভাষায় :
‘ঋতুর খাঞ্জা ভরিয়া এলো কি ধরণীর সওগাত?
নবীন ধানের অঘ্রাণে আজি অঘ্রাণ হলো মাৎ।
‘বিন্নি পলাশ’ চালের ফিরনি
তশতরি ভরে নবীনা গিন্নি
হাসিতে হাসিতে দিতেছে স্বামীরে, খুশিতে কাঁপিছে হাত।
শিরনি রাঁধেন বড় বিবি, বাড়ি গন্ধে তেলেসমাত।’
এই কবিতার পঞ্চম স্তবকে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন-
‘হেমন্ত-গায় হেলান দিয়ে গো রৌদ্র পোহায় শীত।
কিরণ-ধারায় ঝরিয়া পড়িছে সূর্য-আলো-সরিৎ।
দিগন্তে যেন তুর্কি কুমারী
কুয়াশা- নেকাব রেখেছে উতারি।
চাঁদের প্রদীপ জ্বালাইয়া নিশি জাগিছে একা নিশি।
নতুনের পথ চেয়ে চেয়ে হলো হরিৎ পাতারা পীত।’
বর্ষার পর শরতের শেষে নদী-নালা, খাল-বিলের পানি কমতে থাকে এবং তা অব্যাহত থাকে হেমন্তকাল পর্যন্ত। সেই কম পানিতে গ্রামের কিশোর-কিশোরীরা মেতে ওঠে মাছ ধরার উৎসবে। বড়রাও দল বেঁধে জাল নিয়ে নেমে পড়ে বিল, ঝিল, খাল, নদীর পানিতে। বোয়াল, শোল, রুই, শিং, মাগুর, কাতলা মাছ ধরে ঘরে ফিরে। বাড়ির পাশের ক্ষেতগুলোতে শোভা পায় হলুদ মটর আর সাদা-নীলে রাঙা খেসারির ফুল। বাড়ির উঠানে ভোরে শিউলি গাছের নিচে পড়ে থাকে রাতে সুবাস ছড়ানো শিশির ভেজা সাদা সাদা ফুল। এই ঋতুতে দিনের শেষে তাপমাত্রা খুব বেশি কমে যায়। ফলে নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে থেকেই বিকেলে ঠাণ্ডা পড়তে থাকে। ঘাসের ওপর জমে শিশির; কুয়াশাও দেখা যায় প্রায়ই। তাই একটু অসর্তক হলেই সর্দি, কাশি, জ্বর প্রভৃতি রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিশোর বন্ধুরা, সাবধান বিকেলবেলা এবং খুব ভোরে ঠাণ্ডা লাগাবে না।

SHARE

Leave a Reply