Home তোমাদের গল্প স্বপ্নপরীর দেশে পারভেজ মোশাররফ

স্বপ্নপরীর দেশে পারভেজ মোশাররফ

স্কুলব্যাগ কাঁধে ঘরে এসে দাঁড়াল সাজিদ। একটু আগে স্কুল ছুটি হয়েছে। মাত্রই এসেছে বাড়িতে। মুখটা শুকনো। সেই সকালে খেয়েছে, এর মাঝে আর খাওয়া হয়নি। তাই এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক।
কিন্তু ঘরে ঢুকে যা দেখল তাতে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল মাজিদ। দুই হাতে চোখ কচলালো ও। ভাবছে হয়তোবা চোখের ভুল। কিন্তু না ঠিকইতো দেখছে! আমি ভুল দেখছি না তো? নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে সাজিদ। কিন্তু!
সাজিদ দেখতে পেল ওর বাবা আব্দুর রহমান চেয়ারে বসে কিছু একটা পড়ছেন। কিন্তু এ সময়তো বাবার বাড়িতে থাকার কথা নয়। তাহলে বাবা বাড়িতে কেন? মনে মনে ভাবল। আসলে এ সময় আব্দুর রহমান বাড়িতে থাকেন না, তাই আজ অসময়ে বাবাকে বাড়িতে দেখে সাজিদের এতটা বিস্ময়!
তাই এর রহস্য জানতে চুপি চুপি সাজিদ এসে বাবার পাশে দাঁড়াল। তারপর বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বাবা বলে চেঁচিয়ে উঠল। আব্দুর রহমান ঘাড় ফিরিয়ে ছেলেকে দেখে হেসে ফেললেন। সাজিদ বাবার গলা ছেড়ে পাশের চেয়ারে বসল। তারপর এক রাশ বিস্ময় নিয়ে বাবাকে প্রশ্ন করল।
– বাবা একটা কথা বলো তো?
– কী?
– আজ এ সময় বাড়িতে কেন?
– আজ লাঞ্চের পর অফিস ছুটি তো তাই।
– তাই নাকি? ওয়াও! তাহলে তো আজ অনেক মজা হবে।
– আনন্দে হতবাক হয় সাজিদ।
– বাবা আজ কিন্তু তুমি আমার সাথে খেলবে।
– আচ্ছা খেলব।
এরই মাঝে এসে হাজির হন সাজিদের আম্মু। সাজিদকে দেখে তিনি বলে উঠলেন,
কিরে স্কুলে থেকে এলি, ড্রেস পাল্টিয়ে ফ্রেশ হবি। আর তা না করে বাবার পাশে বসে গল্প করছিস?
– না মানে আম্মু।
– থাক আমাকে মানে বোঝাতে হবে না। যা ফ্রেশ হয়ে আয়।
– হ্যাঁ আম্মু যাচ্ছি। বলে কাঁধের ব্যাগটা টেবিলে রেখে ফ্রেশ হওয়ার জন্য চলে গেল সাজিদ।
সাজিদ চলে যেতেই ওর আম্মু আব্দুর রহমানকে উদ্দেশ করে বললেন,
– অ্যাই, তুমি কেমন বাবা বলতো? ছেলে স্কুল থেকে এলো, কোথায় ওকে ফ্রেশ হতে বলবে আর তা না করে ছেলের সাথে গল্প করছো।
– তাহলে?
– সেই যে সকালে খেয়েছে ছেলেটা। এতক্ষণে হয়তবা ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে।
– আরে দুর, বাপ-বেটার গল্পের কাছে ক্ষুধা কিছুই না, বাপ-বেটার গল্পের মজাই আলাদা, বুঝলে।
– ও আচ্ছা তাই!
– হ্যাঁ।
– রান্নাবান্না শেষ, খেতে চলে এসো। বলেই চলে গেলেন সাজিদের আম্মু।
বাবা-মায়ের সাথে খেতে বসেছে সাজিদ। ওর খাওয়া প্রায় শেষ। খাওয়া শেষে ও গিয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। এরপর বিকেলবেলা ঘুম থেকে উঠে বন্ধুদের সাথে খেলবে। এটাই ওর নিত্যদিনের রুটিন। আজও তাই করবে। খাওয়া শেষ করে নিজের রুমের উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করল। রুমে এসে দক্ষিণ পাশের জানালাটা খুলে দিল। তারপর সটান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। জানালা দিয়ে ঝিরি ঝিরি বাতাস আসছে। ঘুম নেমে এলো সাজিদের দুই চোখে। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে তা বলতে পারে না।
হঠাৎ কারো ডাকে ঘুম ভাঙল ওর। কেউ একজন যেন কানের কাছে ওর নাম ধরে ডাকছে। চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসল সাজিদ। ঘাড় ফিরিয়ে পাশের দিকে তাকিয়ে আচমকা চমকে উঠল ও। ভয়ের একটা শিহরণ জেগে উঠল ওর মনের মাঝে। সাজিদ দেখতে পেল ওর পাশে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পিঠে দুটো পাখা। তার মানে এটা পরী। মনে মনে ভাবল সাজিদ। কিন্তু আর কিছু ভাবতে পারল না ও। হঠাৎ কথা বলে উঠল পরীটি,
– সাজিদ তুমি আমার সাথে যাবে? ভয়ার্ত গলায় সাজিদ জবাব দেয়,
– কোথায়?
– আমাদের দেশে, ঘুরতে।
সাজিদের অনেক দিনের ইচ্ছে পরীর দেশে যাওয়ার, কিন্তু ওকে নিয়ে আবার মেরে ফেলে যদি। সাত-পাঁচ ভাবতে লাগলো ও। তারপর পরীকে লক্ষ্য করে বলল,
– তোমার সাথে যেতে পারি। কিন্তু একটা শর্ত আছে।
– কী?
– তুমি আমাকে আবার এখানে এনে রেখে যাবে তো?
– অবশ্যই রেখে যাবো।
– প্রমিজ।
– প্রমিজ।
– ঠিক আছে, তাহলে চলো।
পরীর পাখায় উঠে বসল সাজিদ। উহ! কী কোমল পরীর পাখা। যেন কোন এক তুলার বিছানা। উড়তে শুরু করল পরী। হাওয়ার সাথে উড়ে চলছে দ্রুতগতিতে। অবাক হয়ে দেখছে সাজিদ। হঠাৎ হঠাৎ করে আকাশে জ্বলে উঠছে জোনাকির দল। কী দারুণ লাগছে জোনাকিদের আলো। সাগরের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে পরী। সাজিদ চোখ মেলে নিচের দিকে তাকালো। পরক্ষণই ভয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেললো। অনেকক্ষণ পর চোখ খুললো। চোখ মেলেই দেখতে পেল চারদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে পাখায় নিয়ে উড়ে যাচ্ছে পরীটা। কী অবাক করা দৃশ্য! চোখ বন্ধ এবার নামতে পারো সাজিদ। আমরা এসে গেছি, বলল পরীটি। লাফ দিয়ে পরীর পাখা থেকে নামল সাজিদ। তারপর তো অবাক! চারদিকে কী মনমাতানো দৃশ্য! বাতাসে ভাসছে কি আশ্চর্য! চারদিক থেকে হাজারো রঙবেরঙের প্রজাপতি এসে ঘিরে বসল ওর চার পাশ। যেই ধরতে যায় ওমনি উড়ে যায়। কোন কোনটা উড়ে এসে ওর পিঠে, কাঁধে বসে, সুরসুরি লাগে ওর।
চারদিকে কত হাজারো রকমের পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে মনের সুখে।
হঠাৎ শুনতে পেল কোকিলের কুহু কুহু ডাক, কত অবাক করা সুরে ডাকছে কোকিল। সাজিদ দেখতে পেল কৃষ্ণচূড়ার মগডালে বসে মনের সুখে ডাকছে কোকিল। কী সুন্দর লাগছে কোকিলের ডাক শুনতে।
আহ! কী সুন্দর এই দেশ। আমাদের পৃথিবী যদি এমন সুন্দর হতো। মনে মনে ভাবে সাজিদ।
সাজিদ, অ্যাই সাজিদ তাড়াতাড়ি ওঠ। নামাজ পড়তে যাবি না। মায়ের ডাকে ঘুম ভেঙে যায় সাজিদের। চোখে কচলাতে কচলাতে উঠে বসল। তার মানে এতক্ষণ আমি স্বপ্ন দেখছিলাম। ভাবল সাজিদ। আসলে রাতে পরীর গল্প পড়তে পড়তে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে তা খেয়াল নেই। তাই হয়তোবা এমন স্বপ্ন দেখা। তারপর মনে মনে ভাবল যাই হোক স্বপ্নে তো পরীর দেশ দেখা গেলো, তা-ও ভালো।

SHARE

Leave a Reply