Home প্রচ্ছদ রচনা বিশ্ব শিশু দিবস ও আমাদের শিশুরা -মঈনুল হক চৌধুরী

বিশ্ব শিশু দিবস ও আমাদের শিশুরা -মঈনুল হক চৌধুরী

প্রতি বছর সারা বিশ্বে অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার বিশ্ব শিশু দিবস হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য-সুখ স্বাচ্ছন্দ্য, আনন্দ অধিকার ও উন্নয়ন ভাবনার জন্য এই দিনটি নির্ধারিত। তাই বিশ্বের সকল শিশুর জন্য এই দিনটির তাৎপর্য অপরিসীম। ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।’ অর্থাৎ আজকে যে শিশু, সে-ই একদিন পরিপূর্ণ মানুষ হবে। আর এই পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার জন্য শিশুর চাই কতগুলো জিনিস। যেগুলো শিশুর পক্ষে একা কখনোই অর্জন করা সম্ভব নয়। বড়রা যদি সে সুযোগ সৃষ্টি করে না দেয়। যেমন- একটি পরিবারের আশ্রয়, পুষ্টির জন্য খাদ্য, রোগ নিরাময়ের জন্য চিকিৎসা, সর্বোপরি স্নেহপ্রীতি-ভালোবাসাময় পরিবেশ। প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলায় বড়রা যতটুকু শক্তি প্রয়োগ করতে পারে, শিশুরা ঠিক ততটুকু অসহায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে, যুদ্ধ-বিগ্রহে শিশুরাই আক্রান্ত হয় সবার আগে। শিশুদের এই অসহায়ত্ব দূর করতে পারে বড়রা প্রয়োজনীয় কিছু চাহিদা মিটিয়ে। ওই চাহিদাগুলোই হলো শিশুর অধিকার। আজ যারা শিশু, ভবিষ্যতে তারাই হবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্ণধার, শিশুর পিতা। এই ভবিষ্যৎ নাগরিকরা যাতে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারে, সে জন্য উপযুক্ত ভাবে তাদের গড়ে তুলতে হবে। এই গড়ে ওঠার সর্বোত্তম সময়টি হচ্ছে শৈশব। শৈশবে যদি শিক্ষা থেকে কেউ বঞ্চিত হয়, যদি কেউ উপযুক্ত খাদ্য পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়, যদি কেউ ভালোবাসা ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে কী হবে? ভবিষ্যতে সমাজ একজন অশিক্ষিত, দুর্বল স্বাস্থ্যের, আত্মবিশ্বাসহীন, কখনো কখনো নিষ্ঠুর প্রকৃতির একজন নাগরিক পাবে। বিপরীতভাবে বললে সমাজ একজন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, সুশিক্ষিত আত্মবিশ্বাসী ও সৃজনশীল প্রকৃতির একজন মানুষকে হারাবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে সে হয়তো অনেক কিছুই করতে পারতো। এ জন্য শৈশব এতো গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য, প্রথম মহাযুদ্ধে মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হলে ১৯২৪ সালে লিগ অব নেশনস্ প্রথম শিশু অধিকারের ওপর জেনেভা কনভেনশন ঘোষণা গ্রহণ করে। অবশ্য এর আগে শিশু অধিকার সম্পর্কে বহু দেশে অনেক আলোচনা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ভেঙে যায় লিগ অব নেশনস। জাতিসংঘ ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ ঘোষণা করে। সেই সনদে প্রথমেই বলা হলো শিশুদের কথা। প্রতিটি শিশুরই মানুষের মত মানুষ হওয়ার অধিকার রয়েছে। শিশুদের আহার-আশ্রয় ও সামাজিক নিরাপত্তার সাথে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের নিশ্চয়তা চাই। অগণিত, অসহায় অবহেলিত শিশুর সব রকমের সমস্যা সমাধান হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। জাতিসংঘ ঘোষিত এই সনদে শিশুর বেশ কয়েকটি মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, শিশুদের এই মৌলিক অধিকারগুলোর সাথে বিশ্বের সমাজসচেতন মানুষ একাত্মতা প্রকাশ করেন। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রয়োজন অনুভব করেন। এ লক্ষ্যেই গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক শিশুকল্যাণ ইউনিয়ন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর চাইল্ড ওয়েলফেয়ার বা ইউনিসেফ) ১৯৫২ সালে বিশ্বব্যাপী শিশু দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয় ইউনিসেফ।
দিনটি পালনের জন্য নির্ধারিত হয় অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার। উল্লেখ্য, ১৯৫৩ সালের ৫ অক্টোবর বিশ্বের ৪০টি দেশ প্রথম বিশ্ব শিশু দিবস উদযাপন করে। ১৯৫৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ গ্রহণ করে শিশু অধিকার ঘোষণা। এই ঘোষণা তখন জাতিসংঘের ৭৮টি দেশ গ্রহণ করে। ফলে সময়ের সাথে সাথে শিশু অধিকারের প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে। ১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আবার গ্রহণ করে শিশু অধিকার সনদ। তখন জাতিসংঘের সদস্যসংখ্যা ছিল ১৬০টি। শিশু অধিকার সনদে সংযুক্ত ৫৪টি ধারা সম্পর্কে দশ বছর ধরে আলোচনার পরই সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় এই সনদ। এতে ১৮ বছর পর্যন্ত সব ছেলেমেয়েকে শিশু-কিশোর হিসেবে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ পূর্ণবয়স্ক হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত সবাই শিশুদের এই বিশেষ অধিকারগুলো ভোগ করতে পারবে। এই সনদ অনুমোদনকারী ২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ১৯৯০ সালে শিশু অধিকার সনদ সারা বিশ্বে চালু হওয়ার পর প্রতি বছর শিশু অধিকার সপ্তাহ পালন করা হয় ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে। সারা বিশ্বে শিশু অধিকার বিষয়টি আজ ব্যাপকভাবে আলোচিত। কিন্তু প্রকৃত কথা হলো, শিশুরা কতটুকু তাদের অধিকারগুলো ভোগ করছে? নাকি তা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমিত রয়েছে। এ বিষয়টি এখন বিশেষভাবে ভাবার সময় এসেছে। আজকের শিশু আগামী দিনের আলোকিত পৃথিবী গড়ার কারিগর। আজকে যে শিশু একদিন সে পৃথিবীকে চালিত করবে। দুঃখের বিষয় যে শিশু একদিন দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করবে সে শিশুকে আমরা বড় অবহেলায় অনাদরে লালন করছি। তার বেড়ে ওঠার পরিবেশ তত পরিচ্ছন্ন নয়। অবহেলা অনাদরে আমাদের শিশুরা বড় হয়। আমাদের সব শিশু সমানভাবে সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে না। বড় হওয়ার সুন্দর পরিবেশ অনেক শিশুরই নেই, সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার পথে নানান বাধাবিঘœতা, অনেক শিশু ফোটার আগেই কুঁড়িতেই ঝরে যায়। ফুল হয়ে বিকশিত হয়ে সৌরভ ছড়াতে পারে না। অনেক মায়ের সন্তান ভালোভাবে বড় হওয়ার সুযোগ পায় না। সুন্দর পরিবেশে বেড়ে ওঠা অনেকের ভাগ্যে জুটে না। অবহেলা অনাদরে আমাদের শিশুরা বড় হচ্ছে। শিশু অধিকারের প্রতি একটু সচেতনতা, পৃষ্ঠপোষকতা আমাদের শিশুর সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠায় সহায়ক হতে পারে। শিশুদের মুক্তমনের বিকাশের অভিভাবক ও শিক্ষকদের অধিক সচেতন হতে হবে। শিশুর মেধা মনন সৃজনশীলতা বিকাশে ভালো বই তার হাতে তুলে দিতে হবে। বাবা-মার অসচেতনতার দরুন শিশুমনের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। শিশুর মন কল্পনাপ্রবণ, কত কিছু করতে চায়। তার কল্পনাশক্তির বিকাশের পথকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। গল্প, ইতিহাস, ঐতিহ্য, জীবনীবিষয়ক বই তাকে পড়তে দিতে হবে, যাতে করে তারা আলোকিত মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারে। প্রত্যেক শিশু কিছু অধিকার নিয়েই জন্মায়। শিশুর সেই অধিকার প্রাপ্তিতে বাধার সৃষ্টি হলে শিশুর প্রতিভা বিকাশের পথ অবরুদ্ধ হয়ে যায়। তাই শিশুর অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশু অধিকারের মধ্যে প্রধান হলো শিক্ষা, মুক্তমনের বিকাশের সহায়তা, খেলাধুলা, কাজ করার স্বাধীনতা ও জীবনধারণের প্রয়োজনীয় সহায়তা। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বহু সংস্থা শিশুর সুন্দর পরিবেশে বেড়ে ওঠার বিষয়ে তথা শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করছে। শিশুকে ফুলের মতো বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বহু সংস্থা ও ব্যক্তি। অবশ্য, শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার প্রতি আমাদের সরকার যথেষ্ট মনোযোগী, নানাবিধ সুযোগ দিয়ে শিশুদের স্কুলমুখী করার সরকারে উদ্যোগের কমতি নেই। বাংলাদেশ সরকারের নানাবিধ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এখনো শিশুশ্রম বন্ধ হয়নি। শিশুশ্রম বন্ধ না হওয়ার মূলে রয়েছে বাবা-মার আর্থিক অসচ্ছলতা। অনেক গরিব মা-বাবার সন্তান শিশু বয়সেই কলকারখানার কাজে লেগে যায়। কলকারখানাসহ গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ, নানা রকম কুটির শিল্পে এখন বহু শিশুশ্রমিক কাজ করছে। কম বয়সে পরিশ্রমের কাজ করলে শরীর স্বাস্থ্য ভেঙে যায়, রোগাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের আইনে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও তা পুরোপুরি পালন করা হয় না।
শিশুরা কলকারখানাসহ নানা জায়গায় কাজ করে নিজেদের উপার্জনে দুস্থ পঙ্গু অসহায় বাবা-মাসহ নিজেরা কোনো মতে বেঁচে আছে। সেই সব অসহায় শিশুর প্রতি নজর দিতে হবে। তাদেরকে পড়ালেখার সুযোগ করে দিতে হবে। বাংলাদেশ শিশুশ্রম প্রচলিত আইনগুলোর শিশুর কল্যাণ চিন্তাপ্রসূত, আইন লঙ্ঘনে শাস্তির বিধান রয়েছে। তারপরও শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত দেখা যায়, কারণ শিশুদের বেশি মজুরি দিতে হয় না। তবে আশার কথা, বাংলাদেশ সরকার শিশুকল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে নিরন্তর। বলা যায়, শিশুর কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার সদাসচেষ্ট। সরকারের পাশাপাশি সমাজের সকলকে শিশুর প্রতি আরো অধিক সচেতন, দায়িত্বশীল হতে হবে, তাদের দুঃখ-কষ্ট নিরসনে সহানুভূতির সাথে এগিয়ে আসতে হবে। ফুলের মতো একটি শিশুকে যেন ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে আত্মনিয়োগ না করতে হয় সে জন্য আমরা সবাই আসুন আরো সচেতন হয়ে একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই। কুসুম কলিটিকে ফোটার সুযোগ করে দিই। শিশুদেরকে শুধু লেখাপড়ার চাপে না রেখে সময় সময় তাদের ইচ্ছেমতো কিছু করতে দেয়া উচিত। শিশুর নিজস্ব একটা কল্পনার জগৎ আছে, তাকে অন্তত কিছু সময়ের জন্য তার জগতে পদচারণায় সুযোগ দিতে হবে। শিশুমনের ঘরের দরজা খুলে দেয়া সব অভিভাবকেরই কর্তব্য। এতে করে শিশুর মৌলিক মনের বিকাশের সহায়ক হয়। পড়ালেখা, খেলাধুলা যেমন অধিকার, তেমনি টেলিভিশনে কার্টুন বা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখারও শিশুর অধিকার, এ অধিকারে বাধা দেয়া মানে তার মনে কষ্ট দেয়া। এতে করে শিশুর মনের বিকাশে বিঘ্ন ঘটে। শিশুরা কোমলমতি, শিশুমন বড় স্পর্শকাতর, শিশুর মনের বিকাশে ¯েœহ-মমতাকে বেশি প্রাধান্য দিতে হবে।
শিশুর প্রাপ্য অধিকারের প্রতি সবাই সচেতন হতে পারলে শিশুর মেধা, মনন, সৃজনশীলতা বিকাশ তথা শিশুর প্রতিভা বিকাশ সহায়ক হবে।

SHARE

Leave a Reply