Home নিয়মিত রহস্যভেদ পোড়োবাড়ির রহস্যবুড়ো -জিয়াউল আহ্সান

পোড়োবাড়ির রহস্যবুড়ো -জিয়াউল আহ্সান

গত সংখ্যার পর

জমিদার বাড়িটা ঘুরে দেখলাম, সুমন বললো।
শুধু বাড়ি তো না, এইহানে ছেলো নারানের কয়পুরুষির জমিদারি। মুর্শিদ কুলি খাঁর খুব বিশ্বস্ত ছেলো নারানের পূর্ব পুরুষ। তারাই প্রত্থম তালুক পায়। সেপাই যুদ্ধের সোময় ইংরাজগে সাহায্য কর‌্যা আরো অনেক সয়-সম্পত্তির মালিক হয় নারানের বাপ। নারানের হাতে জমিদারি আস্লি সব উচ্ছন্নে যাতি থায়ে। নারানের কোনো গুণ ছেলো না। দুই হাতে টাকা উড়াতো। আয়ের চে’ ব্যয় ছেলো বেশি। বেশি টাকার জুন্যি বেশি বেশি অত্যাচার ক’রতো। তার উপর সে ধর্ম নিয়া খুব বাড়াবাড়ি করতো। গরু জবাই নিষিদ্ধ ছেলো। অধিকাংশ প্রজাই তার মুসলমান। কিন্তু তাগে নিয়া সে ভাবতো না। তার মতের বিরুদ্ধে কেউ গেলি সর্বনাশ কর‌্যা ছাড়তো। শ্যাষে নিজির দোষেই নির্বংশ হলো।
সুমন প্রশ্ন করে, আপনি জমিদার বাড়ির সব জায়গায় গেছেন?
আমার কাজই ছেলো গাছ কেনা। যেহানে গাছ পাওয়া যাতো, সেহানেই আমার যাওয়া লাগতো। তয় আমাগে দলে ছেলো সদরুল মুন্সি। মুন্সির দাদা জমিদারের পেয়াদা ছেলো। তার কাছে শুনছি, জমিদারবাড়ির মাটির তলেও ম্যালা কতগু’ল ঘর ছেলো। সবাই সেহানে যাতি পারতো না। সবচে’ নিচির তালায় ছেলো জেলখানা। জমিদার যাগে পছন্দ ক’রতো না, তাগে ধর‌্যা নিয়া সেহানে আটকায় রাখতো। বলেশ্বর নদীর কুলি একসো’ম বিশাল এট্টা দোতালা বাগানবাড়ি ছেলো। বাগানবাড়ি বানাইছেলো নারানের বাপ, যশোধর চক্রবর্তী। আমরা যহন ছোটো ছেলাম তহন দেখ্ছি বাগান বাড়ি জঙ্গলে ভর‌্যা গেইছে। বাগানের সিঁড়ি দ্য নদীতি নামা যাতো। আমরা শুনছি, জমিদারবাড়ি থিক্যা এট্টা সুড়ঙ্গ দিয়্যা ঐ বাড়িতি যাওয়া যাতো। ঐ পথ দিয়্যা পলাতি গিয়া জমিদারের ছোট মাইয়া সরস্বতী ধরা পড়ে। বাগানবাড়ির পাশে গোয়াল ঘাটে নৌ’ক নিয়্যা ছেলো মকবুল। তুমি মকবুলির কথা শোনো নাই?
হ্যাঁ, শুনেছি।
মুক্তিযুদ্ধের সো’ম মুক্তিযোদ্ধারা নদীতি নজরদারি র্কোতি ঐ বাড়িতি ক্যাম্প বানাইছেলো। নদীর পাড়ে এমন এট্টা উ’চ বাড়ি খুব কাজের ছেলো। যে জুন্নি পাকিস্তানি বাহিনী বলেশ্বরে ঢুকতি ভয় পাতো। পরে পাকিস্তানি গানবোট গোলা মার‌্যা বাড়িট্যা মাটিতি একদোম্ মিশ্যায় দেয়। সেই জা’গাটাও বলেশ্বর ভাঙ্গ্যা নিয়্যা গেইছে। এহন আর কিছু নাই। নদীর ভাঙনের পর যা আছে তা ইটির খোলার মোতো দেহ্যায়।
ফুপা বলেন, তুমি ধলাবুরুর কথা শোন্ছো?
শুনেছি।
কী শোন্ছো?
শুধু নাম শুনেছি। ধলাবুরু নাকি আবার গ্রামে এসেছে?
ফুপা এবার কালামের দিকে ফিরে বললেন, কিরে আইছে নিকি?
কালাম উদাসীনভাবে উত্তর দেয়, মোন্তাজ তো ক’লো শোনলাম।
ফুপা গল্প বলার ঢঙে একটু নড়েচড়ে বসেন। ধলাবুরুকে কেউ চিনতো না, কবে এসেছে, কোথা থেকে এসেছে, কেউ জানে না। মানুষটা সাদা ফক্ফকা। কতো বয়স বোঝা যায় না, তবে চুল দাড়ি সব সাদা, চামড়া ঝুলে পড়েছে। সন্ন্যাসীদের মতো দেখতে। উঁচু লম্বা মানুষটা কাপড়ও পরে সন্ন্যাসীদের মতো। একবার বড়ো বন্যায় জমিদারের বড়ো বাড়ি ছাড়া আট-দশ গ্রামের প্রায় সব বাড়িই ডুবে গিয়েছিলো। তখন কিছু মানুষ ঐ বাড়িতে আশ্রয় নেয়। তখনই জানা গেলো, মানুষটা কোথায় থাকে। আগে সবাই দেখতো ঐরকম একটা মানুষ রাস্তা দিয়ে যায় আসে। সন্ন্যাসী মানুষ, কারো কোনো আগ্রহ ছিলো না। মাঝে মাঝে উধাও হয়ে যেতো। অনেকদিন পর আবার দেখা মিলতো। এভাবেই রটে গেলো, ধলাবুরু হয়তো জমিদারের উত্তরসূরি। গ্রামের মানুষ একসময় বুঝতে পারলো, মানুষটা যখনই আসে, গ্রামে একটা না একটা অশান্তি হয়।
সেবার বন্যা নেমে গেলে ধলাবুরুও কোথায় চলে গেলো। আসলো দু’বছর পর।
সেবার মাহামুদকান্দা গ্রামে আগুন লাগলো। সে কি আগুন। আগুনে বাড়ির পর বাড়ি পুড়ে যাচ্ছে, গেরামের মানুষ এই দৃশ্য কখনো দেখে নাই। আশপাশের গ্রামের মানুষ ছুটে এলো আগুন নিভাতে। নাওয়া নাই, খাওয়া নাই, সবাই আগুন নিভাতে যা পেলো তাই ঢাললো। কিন্তু কাছাকাছি যে বাড়িগুলো ছিলো, তার একটাকেও বাঁচানো গেলো না। গোয়ালের গরুও পুড়ে অঙ্গার হলো। পরে শোনা গেল, ধানের আঁটি মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরছিলো বাশার মাঝি। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ধানের আঁটির বাড়ি লেগেছিলো সন্ন্যাসীর গায়। বাশার মাঝি বুঝতে পারে নাই। পেছনে কেউ একজন দেখেছিলো। সে শুনেছিলো, সন্ন্যাসী রাঙা চোখে হাতের বাঁকা লাঠি উঁচু করে অভিশাপ দিচ্ছে, তুই আমারে ব্যথা দিলি, এই ধান তোর কপালে নাই।
ঐ ঘটনার পর সবাই মানুষটাকে মোটামুটি ভয় পাওয়া শুরু করে। এর পরেরবার এলো কয়েকবছর পর। সেবার জমিদারের পুকুরে গোসল করতে গিয়ে হাসান-হোসেন দুই ভাই ডুবে মারা গেলো। দুই ভাই খুব ভালো সাঁতার জানতো। আরো মানুষ ছিলো, কেবল দুই ভাই উঠতে পারলো না। তারপরেরবার খরায় কেউ ফসল গোলায় তুলতে পারলো না।
ফুপা লোকটা কি আসলেই অশুভ।
কী জানি? গেরামে তো সবসময়ই এট্টা না এট্টা সমস্যা লাগ্যাই রোইছে। কা’র দোষ কোই। কা’র মোনো কি আছে, এক আল্লাহপাক ছাড়া আর কেউ জানে না।
ফুপা রেহানাকে পানের ডাবর আনতে বললো। বোঝা যাচ্ছে এখন তিনি কথা বলার মেজাজে আছেন। ডাবর আনার পর নিজেই আরেকটা পান বানিয়ে মুখে পুরে বললেন, জমিদার বাড়ি এতো বড়ো যে একদিনি সব দেইহা সারা যায় না। শ্মশানে গেলি দ্যাখ্বা বিশাল এট্টা জোইড় গাছ।
কী গাছ?
বট গাছ। জোইড় গাছরে তোমরা বট গাছ কও। আসল গাছটারে অ্যাহন আর দ্যাখবা না। ঝুরিগু‘ল অ্যাতো মোটা হোইয়া জড়ায় গেইছে যে মোনে অয় বিশাল অ্যাকখান মোটা গাছ। বয়স তিন-চাইর’শর কম অবে না। সেপাই যুদ্ধের সো’ম ইংরাজরা দিল্লির দখল নিলি, কয়জোন সেপাই ভাটি অঞ্চলে পলায় আইছেলো; নারানের বাপ তাগে ধরায় দেয়। ইংরাজরা জাহাজে কর‌্যা আস্যা এই জোইড় গাছের মোটা ডালে তাগে ঝু’লয় দিয়া যায়। নারানের বাপ, যশোধর চক্রবর্তী ইংরাজরা ক্ষেপতি পারে এই মোনে কর‌্যা লাশগু’লরে নামায় কবর পর্যন্ত দেয় নাই। একরাত্তিরি প্রচন্ড ঝড় অলো। নদীর পানি উথাল-পাথাল, কতো নৌ’ক যে তলায় গ্যালো তার ঠিক নাই। জোইড় গাছের অতো মোটা ডাল সেই ঝড়ে গোড়্যাদ্য ভাইঙা নদীতি ভাস্যা গ্যালো। এই ঘটনায় যশোধর ভয় পাইয়্যা শ্মশান ঘাটে ঠাউর বসায়।
(চলবে)

ঠাউর প্রতিষ্ঠা করতি নিয়মিত পূজ’র বন্দোবস্ত অরে। হরসন্ধ্যা পূ’জ অতো। বিশেষ মানত থাকলি তেন্নাথের ম্যালাও অতো। যশোধর এইহানে এই অঞ্চলের সব’চে বড়ো মন্দির গড়ছেলো। মন্দিরের ভিত্যারে পাথরের বড়ো বড়ো মূর্তি আমরাও দেখছি। নারানের সময় এই মন্দিরের চূ’ড় ভুমিকম্পে ভাইঙা পড়ে। মন্দির মেরামত করা অয়। নারান ডুব্যা মরার পরও ম্যালা দিন এইহ্যানে পূ’জ হতো। অ্যাহনো গেলি সেই মন্দির দেখতি পাবা। তয় সেই মন্দির নাই, অ্যাহন দ্যাখবা ইটির ভিট্যা। মূর্তিগু‘লন সব চুরি হোইয়্যা গেইছে। ভিট্যার ইটও তেমন নাই। যার যহন দরকার হোইছে সে তহন নিয়া গেইছে। অ্যাহোন অ্যাতো বেশি বোইন্যা (বন্যা) হয়, মানুষ নিজির ঘর পাকা কোরতি জমিদার বাড়ির ইট লাগায়। হায়দার কন্টাকটার রাস্তায় পুরণ (পুরনো) বাড়ির ইট লাগাইয়া বেশ সমস্যায় পড়ছেলো। সহজে বিল পায়নি। পরে ম্যালা টাহা ঘুষ দিতি অয়।
জমিদার বাড়িদ্য শ্মশান ঘাটে আসতি হাসান-হোসেনের ফু’য়র (পুকুর) পড়ে। বাশার মাঝির ছাওয়াল দুট্যা ডুব্যা মরার পর, ফু’য়রির নাম হোইয়া যায় হাসান-হোসেনের ফু’য়র। পাথরে বান্দা ঘাটলা। ঘাটলার ঘরটাও দেহার মোতো। কতো পু’রন, কিন্তু দেখলি মোনে অয় না।
এই ফু’য়রি অ্যাক সময় ধনের মাইট্ ভাস্যা উঠতো। ফুপুর কথায় সুমনের সম্বিত ফেরে। খাওয়া-দাওয়ার পালা শেষে তিনি কখন মা’কে নিয়ে এসে বসেছেন, সুমন খেয়াল করেনি।
ধনের মাইট্ কী?
ফুপু উত্তর দেন, ধনের মাইটে সোনার মোহর থায়ে। ফু‘য়রি দোষ অইয়া গেলি মুখ ঢাকা মাটির কলস, ঘটি, ঢাকনা দেয়া পেতলের বদনা কতো কিছু ভাস্যা ওঠে! ফুপা বলেন, পু‘রণ ফু‘য়র; কতো মান্ষির কতো দুঃখ-কষ্ট যে জড়ায় রোইছে! ফুপা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন।
কিন্তু ভেসে উঠতো কেন? এতে কী থাকে?
এগু’ল জীবন্ত অভিশাপ। তয় এগু’ল সবাই পায় না। যে পাতো, তার আগে সে স্বপ্ন দ্যাখতো। স্বপ্নে ঐ নির্দিষ্ট ফু‘য়রি আসতি কতো। ফু‘য়রি আস্যা বসলিই পানির তলদ্য শব্দ কর‌্যা বলক ছাড়তি ছাড়তি পা’র কাছে উঠ্যা আসতো। তহন ঢাকনা খুল্লি দেহা যাতো গলা তামাত্ (পর্যন্ত) বোঝাই সোনার মোহর। কিন্তু এগু’ল কেউ নেতো না। যে নেতো তার ছাওয়াল-মাইয়া বাঁচতো না।
তোমার গেদুবুড়ির কথা মোনে আছে? ফুপু বলেন। গেদুবুড়ি ফ’য়রি নাম্তি পারতো না, ফু’য়রির কাছে আসলিই ঘাটলার ধারে পানিতি বুড্ বুড্ কর‌্যা বলক ওঠতো, তারপর দ্যাহা যাতো সেহানে স্বপ্নের কথা মোতো কলস বা ঘটি ভাস্যা উঠছে। স্বপ্নে খালি কতো, আমারে নে, আমারে নে। সোনার মোহরের লোভ দ্যাহাতো। এই জুন্নি গেদুবুড়ির ছাওয়াল বাঁচতো না। শ্যাষে অ্যামোন হলো গেদুর মা খাল-বিল সবজা’গায় ধোনের মাইট্ দেখতি লাগলো; বুড়ি আর পানিতি নামতো না। বালতিতি পানি উ‘ঠয় পাড়ে বস্যা গোসল করতো। এই জুন্নি গেদুবুড়ির এট্টা ছাওয়াল আর পাঁচটা মাইয়া ছাড়া আর কেউ বাঁচেনি।
রাস্তা দিয়ে কথা বলতে বলতে কারা যেনো নেমে আসছে। পরে বোঝা গেলো, বাবা এবং সাথে দু’জন অপরিচিত; কথায় পরিচয় বোঝা যাচ্ছে না। সবাই গিয়ে বৈঠকখানায় বসলো। কালাম ফুপার কথায় চেয়ারটা বৈঠকখানায় তুলে দিয়ে আসলো।
জমিদারের পুকুরে এসব ছিলো? আপনি কখনো দেখেছেন?
আমি দেহি নাই। তয় শুনছি। আগেকার দিনির মানুষ সৎ ছেলো। এজুন্নি তারা ম্যালা কিছু পাতো।
জমিদারির ফু‘য়র শত শত বছর পু‘রন্। তাই দোষ হোইয়া গেইছে।
সোনার মোহরগুলো কি রাজা-বাদশাদের? এতোক্ষণে মিতু বললো।
হোতি পারে, দেহি নাই তো কহোনো।
কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ। ফুপু উঠে গেলেন। বলে গেলেন, নামাজ পড়বেন। আকাশের মেঘ সরে গিয়ে চাঁদ বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু সে আলোয় অন্ধকার আরো ঘন হয়ে ওঠে। মৃদু বাতাস বইছে। বাড়ির পেছনে বাঁশঝাড়ে দোলা লেগে ঠাস্ ঠাস্ শব্দ ওঠে। একটা কাক কোথায় যেনো কা কা করে উঠলো। অচেনা একটা পাখি অদ্ভুত শব্দে ডাকতে ডাকতে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায়। লেবু গাছটার পাশে দু’টো বাঁশ গেড়ে দড়ি টানিয়ে কাপড় নাড়ার ব্যবস্থা। কালাম সুমনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কালামের হাতের টর্চের আলো বাঁশের মাথায় গিয়ে পড়েছে। সুমন দেখে একটা পেঁচা বসে আছে। টর্চের আলোয় গোলাকার রক্তবর্ণ চোখ দুটো অস্বাভাবিক মনে হয়। আলো পড়ায় পাখিটা বোধ হয় বিরক্ত হয়। গম্ গম্ শব্দ করে উড়ে যায়। উঠানে কে যেনো এসে দাঁড়িয়েছে। লোকটার খালি গা, খালি পা। উঠানে বাতি না থাকায় আলো-আঁধারে লোকটা ছায়া-শরীরী হয়ে উঠেছে।
ফুপা বলে উঠলেন, কেরা-আ?
ভাইজান আমি মফিজ। ম্যাবাই আইছে শুন্যা দ্যাহা কোরতি আসলাম।
অ’ বসো।
মফিজ বসে না। বাবা দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। মফিজ বলে, ম্যাবাই ক্যামন আছেন।
বাবা ওকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।
ফুপা হঠাৎ বললেন, ফারুকির কাছে রূপার এট্টা পয়সা ছেলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ফারুক পয়সাডা অ্যাহোনো আছে?
ফারুক তোত্লা। ওর কথায় যা বোঝা যায় তাহলো, একসময় ছিলো, এখন নাই।
কোথায় পেয়েছিলে?
ও পায় নাই, কুদ্দুস মাটি কাটতি গিয়্যা পাইছেলো।
কুদ্দুস ফুপার সেজো ছেলে। ফারুকের পিঠাপিঠি। সারাক্ষণ কোনো না কোনো কাজ নিয়ে থাকে। সুমন ওকে কখনো কাজ ছাড়া দেখেনি। তাই ওকে বাড়িতেও খুব একটা দেখা যায় না। এবারও এসে শুনেছে, কোথায় মাটি কাটতে গেছে। ফুপার এই ছেলেটা লেখাপড়া শেখেনি; কিন্তু বোঝা হয়েও থাকেনি।
ফুপার পায়ের কাছে রেহানা দলা পাকিয়ে শুয়ে আছে। ঘুমের ভেতর মেয়েটা শব্দ করে ওঠে। ফারুক রেহানাকে কোলে করে বাড়ির ভেতর নিয়ে যায়।
বৈঠকখানা থেকে লোকগুলো বেরিয়ে এসেছে। বাবা দরজা থেকে সবাইকে বিদায় দিলেন।
ফুপাও উঠে পড়েন, আইজ থাক্ বা’জান। বেয়ানে গাতুল্তি (উঠতে) অ’বে।
একে একে সবাই চলে গেলে, শেষাবধি কালাম আর সুমন বসে রইলো।
কালাম, কাল যাবে?
একটু দ্বিধা নিয়ে কালাম বলে, ঠিকাছে। এট্টা জা’গায় যাওয়ার দরকার অবশ্য ছেলো। তারপর দ্বিধা ঝেড়ে বললো, ঐ কাজ পরে কোরলিও চলবেনে।
কী কাজ?
কালাম একটা রহস্যের হাসি দেয়। তোমারে পরে নিয়া যাবো।
তুমি ভোরে উঠে কোথায় যেনো যাও। সেই জায়গায়?
আরে না। সেতো বেয়ান ব্যালা একবার জমিতি যাতি হয়।
তাহলে কোথায়? সুমন একটু যেনো নাছোড় বান্দার মতো প্রশ্ন করে।
কালাম হেসে উত্তর দেয়, আমরা কয় বন্ধুতি মিল্যা একটা কেলাব ঘর বানাইছি। এট্টা লাইব্রেরি ক’রবো। তুমি বই দিতি পারবা? আমরা ঠিক কোরছি যারা বই বা টাকা দেবে তাগে নাম বোর্ডে লিখা রাখবো।
সুমনের মনে হয়, কালাম সত্যি কথা বলছে না। কষ্ট পায়। কালাম কেন তাকে বিশ্বাস করতে পারছে না?

এই যে দেখতিছো, বাবা কইছেলো, এইটা সেই পুকুর।
পুকুরটা বিশাল। ঢেউ নেই, টল টল করছে পানি। কচুরিপানা নেই, কেন নেই সেটাই রহস্য। গ্রামের প্রায় সব পুকুরেই কচুরিপানা দেখেছে। মাঝামাঝি বেশ কিছু শাপলা ফুটে আছে। পুকুরের ওপারে পাড় ঘেঁষে কলমি গাছ অনেকখানি জায়গা জুড়ে ভেসে আছে। আগাগুলো পানির ওপর সাপের মতো ফণা তুলে আছে। ঘাট চমৎকার বাঁধানো। ধাপগুলো পুকুরের অনেকটা ভেতরে পানিতে নেমে গেছে। পুকুরটা ব্যবহৃত হয়, তাই বোধ হয় ধাপগুলোতে শ্যাওলা নেই। তবে পাথর ক্ষয়ে গেছে। চৌকোনা পাড় একসময় বাঁধানো ছিলো। কিন্তু ইট বাঁধানো পাড় কয়েক জায়গায় নিশ্চিহ্ন হয়ে চতুর্ভুজের বাহুগুলোর অঙ্গহানি ঘটিয়েছে। আবার পাড় যেমন সমানভাবে উঁচু নয় তেমনি ভরাট হয়ে যাওয়ার লক্ষণও আছে। কয়েক স্থানে পাড় পানির স্তরের সমান্তরালে; হয়তো কোনো কারণে পাড় ধসে পড়েছে কিংবা ভরাট হয়ে এগিয়ে এসেছে। ঘাস-গুল্মের কয়েক বিঘত পুরু ও সবুজ-সতেজ চাদর খোলা পাড়ের প্রায় সবদিক ঢেকে রেখেছে। প্রায় হাত দুই উঁচু এই ঘাসের রাজত্বে সাপ-খোপ থাকা বিচিত্র না। পানি যেখানে পাড় ছুঁয়েছে সেখানে কচু গাছের প্রবল বিস্তার। কচুলতার পুরুষ্টু দেহ সাপের মতোন এঁকে-বেঁকে বিস্তর জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে।
ঘাটে যেতে হলে একটা ছোট দালানসদৃশ ঘরের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। ঢোকার দরজা দুই মানুষ সমান উঁচু। দরজায় পাল্লা নেই, হয়তো ছিলোও না। কোথাও কোথাও চুন-সুরকি খসে গিয়ে ইট বেরিয়ে পড়েছে। তবে বিভিন্ন সময় এটার মেরামত কাজ হয়েছে, বোঝা যায়। সিমেন্ট-বালুর আস্তরণ দেয়া স্থানে স্থানে। তবে তাও আলগা হয়ে পড়েছে। টোকা দিলে ঢক্ ঢক্ শব্দ হয়। মেরামত করতে গিয়ে দেয়ালের গায়ে যে অলঙ্করণ ছিলো, তা ঢেকে গেছে। ঢুকতেই দু’পাশে দুটো কক্ষ। পাঁচ-ছয় ধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। কালাম একটা কক্ষে ঢুকলো। উন্মুক্ত না, দরজায় পাল্লা ছিলো, এখন নেই। চৌকাঠের ভগ্নাবশেষ এখনো রয়ে গেছে। কক্ষের যে দিকটা পুকুরের দিকে সেদিকে একটা বড়ো জানালা। কালাম বলে, জমিদার বাড়ির মহিলারা এখানে কাপড় বদলাতো। বোঝাই যায় এসব কক্ষ কোন কাজে ব্যবহৃত হতো। এখান থেকে পুকুরটা বেশ নিচে। সুমন জানালা দিয়ে নিচের দিকে তাকায়।
সুমন হঠাৎ কালামকে ডাক দেয়, কালাম ভাই দ্যাখো, পুকুরের সিঁড়ির ধাপের পাশে পানিতে কেমন বুদ্ বুদ্ উঠছে।
কালাম বলে, দুর পাগল, এখন কি আর ধনের মাইট্ (পেট মোটা বড়ো ধরনের কলসি) আছে?
সুমন লজ্জা পায়, না তা বলিনি।
বিশাল পুকুর, সুমনের কেমন যেনো লাগে। একসময় এখানে সাধারণ মানুষ আসতে পারতো না। প্রতাপশালী যে মানুষগুলো এখানে হেঁটে চলে বেড়াতো, তারা এখন কোথায় চলে গেছে! কেউ আর বেঁচে নেই। সে সিনেমায় দেখেছে, জমিদার বাড়ির বৌ-ঝিরা গোসল করতে নেমে হাসতো-খেলতো, একে অপরের গায়ে পানি ছিটাতো। খুব অহঙ্কার ছিলো ওদের। সবার সাথে মিশতো না। সাধারণ মানুষদের ওরা মানুষ মনে করতো না। কিন্তু এখন কেন যেনো ওদের জন্য সুমনের কষ্ট লাগে। জমিদাররা ভালো ছিলো না, নিজের বাড়ির মেয়েদেরও কতো কষ্ট দিয়েছে।
মৃদু বাতাসে কলমির ডগা সাপের ফণার মতো মাথা নাচায়। সুমনের মনে হয়, ওরা যেনো তাকে ডাকছে। আচ্ছা কালাম, তুমি কি ধনের মাইটের কথা বিশ্বাস করো?
কালাম পাশে দাঁড়ানো। বিশ্বাস না করার কী আছে। আগে তো কতো কিছু ছেলো। এখন মানুষ বাড়ছে, খারাপ মানুষি সব ভর‌্যা গেইছে। ঐসব এহন আর নাই।
ফুপা বলেছে, ঐসব সোনার মোহরের নাকি জীবন ছিলো।
থাকতি পারে। তয় আমাগে কলেজের এক স্যার একবার কইছেলো, তখনকার দিনির বড়োলোক, জমিদার সবাই দুর্দিনির জুন্নি যার যার সামর্থ্য মোতো টাকা জমাইয়া মাটির নিচি, দেয়ালের ভেতর গোপনে লু’কয় রাখতো। যে কর্মচারীরা এই কাজ ক’রতো তাগে পরে মার‌্যা ফ্যালাতো। কখনো কখনো জমিদাররাও কারুর কাছে এই সম্পত্তির কথা কোইয়া যাওয়ার আগেই মারা যাতো। ম্যালাদিন পর মাটি সর‌্যা গিয়্যা, দেয়াল ভাইঙা পড়্যা এগু‘ল বারোয় (বেরিয়ে) পড়তো। যে পাতো সে আবার বড়োলোক হোইয়া যাতো। সবাইতো পাতো না। তাই এইসব নিয়্যা খালি গুজব রটতো।
সুমনের কাছে এই ব্যাখ্যা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। ওরা ওপাশের কক্ষটায় গেলো। একই রকম। যেনো ডুপ্লিকেট। এটারও জানালায় পাল্লা নেই। দেয়ালের ইটগুলো বেরিয়ে পড়েছে। ছাদে আগের কক্ষের মতো মাকড়সার ঝুলের রাজত্ব।
ঘাটের সিঁড়ির দু’পাশে চওড়া ছোট দেয়াল। বসার ব্যবস্থা হিসাবে চমৎকার। কালাম ওখানে বসলে, সুমনও পাশে বসে পড়ে। এ ধরনের পরিবেশে কথা বলা যায় না। একটু বেশি শান্ত, যেনো মনের ওপর চেপে বসে। বাশার মাঝির দুই ছেলের ডুবে মারা যাওয়ার কথা মনে পড়ে গেলো। গেদুবুড়ির কাছে কিভাবে ধনের মাইট্ আসতো? সুমন বিভিন্ন গল্প মনে করার চেষ্টা করে।
নিস্তব্ধতা ভেঙে কালাম বলে, এরোম্বায় (এভাবে) বস্যা থাকলি জমিদার বাড়ি দেইহ্যা শেষ করতি পারবো না। ওরা বেরিয়ে আসে।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কালাম বলে এই দুই পাশে যতো দালান দেখতিছো, সবগু‘লর এক একটা কাহিনী আছে। আমিও সব জানি না। তোমারে একটা দালান দেহাবানি। নারান জমিদারের সৎভাই থাকতো। খুব লেখাপড়া জানা মানুষ ছেলো। বিলাত থিকা ব্যারিস্টারি পাস কর‌্যা আইছেলো। জমিদার বংশের সবচে’ শিক্ষিত ব্যক্তি। জমিদারি নিয়্যা কোনোদিন মাথা ঘামায়নি। নারান যে ক্যান্ তারে অপছন্দ ক’রতো কেউ জানে না। কোইলকাতা হাইকোর্টের উকিল ছেলো। সাধারণ মান্ষির সাথে তার কিছুটা ওঠা বসা ছেলো। কোনো সমস্যায় পোড়লি সবাই জগদীশ চক্রবর্তীর কাছেই যাতো। সরস্বতীর ঘটনার কিছুদিন পর জগদীশ বাবু খুন হোইয়া যান। বলেশ্বরে তখন স্টিমার চলতো। কোইলকাতা থিকা স্টিমার খুলনা, স্বরূপকাঠি হোইয়া আসতো। তারপর ছাচ্যা বন্দর হোইয়া বলেশ্বর। আসতি আসতি রাইত হোইয়া যাতো। জগদীশ বাবু রাত্তিরব্যালা নামলেন, তার ঘোড়ার গাড়ি ঘাটেই ছেলো। পরেরদিন বেয়ানে মাইল দশেক দূর বিরান ডরের (চাষাবাদের জমি) পাটের ক্ষ্যাতে বাবুর লাশ পাওয়া গেলো। সারা গা’য় কাটাকুটির কোনো দাগ নাই, জামা-কাপুড় ফিটফাট, খালি গলায় কালশিরার দাগ পড়্যা গেইছে। বাড়ির মানুষ জানতো বাবু আসবেন। পাইক-বরকন্দাজ ছেলো, দুই ঘোড়ায় টানা গাড়িতি বাবু উঠলেন; তারপর কোই গ্যালেন, কেউ জানে না। বাবুর লাশ পাওয়া গ্যালো, ক্ষ্যাত্ ডলা দিয়্যা সোমান কর‌্যা থুইয়্যা কিছুদূরি গাড়ি কাইত হোইয়া ছেলো। ঘোড়া দু’ট্যা ছাড়া। পাইক-বরকন্দাজ যারা সেদিন গেইছেলো, কেউরি পাওয়া গেলো না। মোনে হয় অ্যাতোগু’ল মানুষ হাওয়ায় মিল্যায় গেইছে।
জগদীশ বাবুর সন্তানাদি ছেলো না। নারান মামলা ক’রলো। দুই-তিনবার পুলিশও আসলো। নারান যারে দুই চোহে দেখতি পারতো না, সেই পাগল জলিল ব্যাপারীরি পুলিশ ধ’রলো কয়বার। কিন্তু যতোবার ধরে, ততোবার ছাড়ে। মামলার তারিখ পড়তি পড়তি বিষয়টা তামাদি হোইয়া গ্যালো।
এরপর কালাম যে বাড়িটা দেখালো, সুমনের কাছে তা ইটের বিশাল স্তূপ ছাড়া কিছু মনে হলো না। সম্পূর্ণ বাড়িটাই ধসে পড়েছে। বাড়ির মাঝামাঝি বিশাল একটা গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এতো উঁচু যে মাথা পেছন দিকে হেলিয়ে দেখতে হয়। প্রায় গোলাকার লালচে বড়ো আকারের পাতা। কালামের কাছে শুনে নিলো, গাছটা কাঠ বাদাম। তেলাকুচা, বিভিন্ন ফার্নসহ ছোট-মাঝারি গাছ-গুল্মে ইটের স্তূপগুলো প্রায় ঢেকে গিয়ে ছোটখাটো টিলার আকৃতি নিয়েছে। দেখার কিছু নেই।
দূর থেকেই বটগাছের বিশালত্বের পরিচয় মেলে। কাছাকাছি হতে সুমন বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ে, বটগাছের শেকড় যে এতো বড়ো এবং ছবির মতো হতে পারে ধারণা ছিলো না। গাছটা নিজেই একটা দর্শনীয় বস্তু। কান্ড বিশাল মোটা, বস্তুত কান্ড বলতে ইয়া মোটা মোটা ঝুরির সমষ্টি। বিভিন্ন আকৃতির ঝুরিগুলো নিজেদের পেঁচিয়ে ধরে, ঝুলে থেকে জড়াজড়ি করে কান্ডের আকার নিয়েছে। মাটির একটা মস্ত ঢিবির ওপর গাছটা দাঁড়িয়ে আছে। বিভিন্ন আকৃতির শেকড় কখনো ঢেউ খেলে, কখনো মাথা উঁচিয়ে সমস্ত ঢিবি আঁকড়ে ¯্রােতের মতো নিচে নেমে এসেছে। গাছের নিচে অদ্ভুত রকমের ঠান্ডা। সারা শরীর জুড়িয়ে গেলো। এখানে এসে মনেই হয় না, এতোক্ষণ তীব্র রোদের ভেতর এতোখানি পথ পেরিয়ে আসতে হয়েছে। গাছের শাখা-প্রশাখা বহুদূর বিস্তৃত। গোড়ার দিকের ঝুরিগুলো এতোটাই মোটা, যেনো এক একটা স্বতন্ত্র কান্ড। কালাম কিছু না ধরেই শেকড় বেয়ে উঠতে থাকে। সুমনের জন্য অতোটা সহজ ছিলো না। কালাম কিছুটা উঠে যুৎসই মতো শেকড়ের ওপর বসে পড়ে। সুমনও তাই করে। শেকড়গুলোর ভেতর ফাঁক- ফোকর বিস্তর। সুমনের অস্বস্তি লাগতে থাকে। কিন্তু কালাম যেভাবে নিরুদ্বিগ্ন মুখ করে বসে আছে, দেখে সুমনের কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। কিছুদূরে চওড়া খালের মতো একটা শীর্ণ স্রোতস্বিনী বয়ে গেছে। এটাই বোধ হয় বলেশ্বরের শাখা। কালামও তাই বলে, পুরনো বলেশ্বর।
শশ্মান কোনটা।
এই জাগাটাই শশ্মান।
তা হলে ঐটাই কি সেই মন্দির?
কালাম হেসে বলে, ঠিক ধোরতি পারছো।
মোট মোটা দেয়ালগুলো একসময়ের বর্ধিষ্ণু এক জমিদারের প্রতাপের কথা মনে করিয়ে দেয়। ধ্বংসাবশেষ দেখে বোঝার উপায় নেই, একসময় এখানে বিশাল এক মন্দির ছিলো। এই শীর্ণ স্রোতস্বিনীও একসময় উত্তাল ছিলো। হরেক রকম নৌকা পাল তুলে কোথায় কোথায় হারিয়ে যেতো। সেই নৌকাও নেই, সেই মানুষগুলোও নেই।
উপাসনাগৃহটা টিলার মতো একটা উঁচু জায়গায় নির্মিত হয়েছিলো। সাধারণত ধ্বংসাবশেষের চারপাশে যেমন জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে ঢিবি তৈরি হয়, এর আশপাশে তেমন জঙ্গল নেই। এক জায়গায় কে যেনো কাঠ কেটে চলা বানিয়ে রেখে গেছে। জ্বালানি গ্যাসের সুবিধা গ্রামের মানুষ কখনো পায়নি।
চুপচাপ বসে থেকে সুমন মজা পায় না। সে ঘুরে ঘুরে দেখতে চায়। কিন্তু কালাম বসে থাকে। শেকড়ের ওপর দিয়ে হাঁটা কষ্টকর। একটু বেসামাল হলে শেকড়ের খোড়লে পা ঢুকে বিপদের সম্ভাবনা আছে। কতো বছরের পুরনো গাছ, ফাঁক- ফোকরে সাপখোপ থাকাও বিচিত্র না। শেকড় ধরে হাঁটা অনেকটা চার হাতপায়ে হাঁটার মতো। সুমন বেশ মজা পায়। হাসিও পায়। কিন্তু অল্পেই সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এভাবে হাঁটায় অভ্যস্ত না। কালাম চমৎকারভাবে শেকড়ের ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে চলে। সুমন একটা শেকড়ের ওপর বসে পড়ে। বেশ কিছুটা ঘুরে এসেছে। এখানে বসে কালামকে দেখা যায় না। যথেষ্ট পরিশ্রম হয়েছে। ক্লান্তি কমে এলে চারপাশে তাকিয়ে শেকড়ের এদিকটা বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মনে হয়। এবার গাছের নিচটা, শেকড় যেদিকে ঢালু হয়ে নেমে গেছে; দেখে সুমনের মনে হয়, বেশ ভালো করে লেপে রাখা হয়েছে। তার মানে এখানে মানুষ আসে। পেছনের দিকে তাকায়, তার শরীর কেঁপে ওঠে। গাছের কান্ডে সিঁদুর লেপে কে যেনো ‘ওঁ’ লিখে রেখেছে। হাতের লেখা ভালো না। তার নিচে কয়লা দিয়ে কিসব লেখা, নাকি ছবি আঁকা বুঝে ওঠা দুষ্কর। কয়েকটা মোমবাতি পুড়ে নিঃশেষ হয়ে শেকড়ে লেপ্টে আছে। আর তারই মাঝে ছোট একটা মাটির হাতলওয়ালা পাত্রে একগাদা ছাই।
কালাম এখানে আসোতো।
সুমনের কণ্ঠস্বর সম্ভবত ভয়ার্ত শুনিয়েছিলো। কালাম তড়িঘড়ি উঠে আসে। পূজার ব্যবস্থা দেখে কালামের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে। নিজেই আনমনে বলে, এইহানে কেরা পূজা কোরতি আসবে!
কালামের কথায় সুমনের গা শিরশির করে ওঠে। আশপাশে জনমানবের চিহ্ন নেই। বোধ হয় এ তল্লাটে মানুষ বলতে ওরা কেবল দু’জন। জ্বালানির জন্য চেরা কাঠের স্তূপের দিকে তাকায়। নিস্তব্ধ দুপুরে এই দৃশ্যকেও অস্বাভাবিক মনে হয়। ফুপা ভয়ের গল্প শোনানোর সময় বলতেন, ভর দুপুর সময়টা খারাপ। সুমন এসব কথা বিশ্বাস করে না। কিন্তু এখন কেন যেনো ভয় করছে।
কালাম চলো বাড়ি যাই।
যাবোতো, কিন্তু এহানে কেরা আসলো?
আসতে পারে না! আমি তো শুনেছি, হিন্দুরা বটগাছ পূজা করে।
তা ঠিক। কিন্তু আমি তো কয়দিন আগেও আইছালাম। কোই কেউরি (কাউকে) তো দেহি নাই।
কেমন যেনো লাগছে। হৃদপিন্ডটা গলার কাছে উঠে এসে ধক্ধক্ করছে। সুমন তাড়া দেয়, কালাম চলো বাড়ি যাই।
কালাম কি ভেবে উঠে দাঁড়ায়। এই সময় শুনতে পায়, কে যেনো বলছে, খোকা তোমরা কারা। এখানে কেন এসেছো?
অত্যন্ত শুদ্ধ উচ্চারণ। শান্ত কণ্ঠস্বর, কথাগুলো টেনে বলা। মনে হয় অনেক দূর থেকে কথাগুলো ভেসে আসছে। ওরা ঝট্ করে শব্দের উৎসের দিকে তাকায়। কাউকে দেখতে পায় না। সুমন দেখে এই শান্ত, ছাওয়া জায়গাতেও কালামের কপালে ঘাম জমে গেছে।
গেরুয়া রঙের কাপড় পেঁচানো, আগাগোড়া ঢাকা একটা লোক ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের টিলার নিচে দাঁড়িয়ে আছে। একটু আগেও তো ওখানে কেউ ছিলো না। লোকটা যেনো ভোজবাজির মতো উদয় হলো। হাতে একটা লাঠি। দন্ডটা সোজা না, সাপের শরীরের মতো ঢেউ খেলানো। উপরটা সাপের ফণার মতো। লোকটার হাতের তালুতে ফনা অনেকটা ঢাকা পড়ে গেছে। চুল দাড়ি গোঁফ ধবধবে ফর্সা। এমনকি ভ্রুজোড়াতেও একটা কাঁচা চুল নেই। লম্বা চুল মাথার ওপরে ঝুটির আকারে চূড়ো করে বাঁধা। প্রায় হাতখানেক লম্বা দাড়ির মাঝামাঝি মোটা একটা গিঁট। মোটা লম্বা গোঁফ দাড়ির জঙ্গলে এসে মিশে গেছে। মুখের চামড়া গালের ভেতর দেবে গেছে, কপালে পুরু বলি রেখা; গলা হাত কাঁধের চামড়ায় বয়সের ছাপ স্পষ্ট। কুচকুচে কালো লোকটার বয়স নিশ্চয়ই এক শ’র কাছাকাছি। কিন্তু এই বয়সেও কেমন ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে! দু’হাতে দুটো করে লোহার বালা। গলায় রুদ্রাক্ষের মালার কয়েক প্যাঁচ। পায়ে কাঠের খড়ম।
তোমরা কারা?
লোকটা ঠোঁট নাড়ে, শব্দগুলো যেনো বদ্ধ কলস থেকে বেরুচ্ছে। অথবা লোকটা কোনো কথা বলে না, কেউ যেনো তাকে দিয়ে বলিয়ে নিচ্ছে। কালাম আপনমনে বলে, ধলাবুরু। সুমন স্পষ্ট শুনতে পায়। তার মনে হয় সারা শরীর প্রচন্ড ভারি হয়ে শেকড়ে গেঁথে গেছে। ইচ্ছা করলেও এখন আর একটুও নড়াচড়া করতে পারবে না।
কালাম চিত্রার্পিতের মতো উত্তর দেয়, মু’ড়র বাড়ির।
কোন ঘর?
আমি ফজর আলির ছাওয়াল। সুমনকে দেখিয়ে বললো, আমার মামাতো ভাই। লোকটা আর কোনো কথা বলে না। কিন্তু দাঁড়ানোর ভঙ্গিতেও কোনো পরিবর্তন ঘটে না।
কালামকে দেখিয়ে বলে, বোঝাটা বেঁধে দাও।
কালাম নেমে আসে, পেছনে সুমন। চ্যালা কাঠের স্তূপের পাশে একটা দড়ি পড়ে ছিলো। কাঠগুলো দড়ির ওপর আড়াআড়ি করে রাখে, সুমন সাহায্য করে। অতঃপর বেঁধে দিয়ে দু’জন সোজা হয়ে দাঁড়ায়। লোকটা পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
দু’হাত বাড়িয়ে বলে, তুলে দাও।
কালাম ইতস্তত করে। বোধ হয় লোকটার শক্তি সম্বন্ধে সন্দেহ তৈরি হয়। লোকটা আবার বলে, দাও।
দু’জনে হাত লাগিয়ে টের পায়, বোঝাটা প্রচন্ড ভারি, যেনো চেরাইগুলো কাঠ নয় লোহা। অথচ লোকটা অবলীলায় কাঁধে তুলে নেয়। ওদের দিকে পেছন ফিরে ঘুরে দাঁড়ানোর আগে কেমন করে যেনো হেসে উঠে বলে, তোমরা এসে ভালো করোনি। এখানে কারো আসতে নেই।
সুমনের মনে হয় ধলাবুরুর হাঁ করা মুখের ভেতর সাপের মতো দু’ফালি কালো জিহ্বা লক্লক্ করছে। লোকটা হি হি করে হাসতে হাসতে চলে যায়।

ওরা কিভাবে যে বাড়ি ফিরে আসে, তা বলতে পারবে না।
সে রাতেই কালাম, সুমন জ্বরে পড়ে। দু’জনের প্রচন্ড জ্বর। গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রধান মেডিক্যাল কর্মকর্তা বাবার পরিচিত। ডাক্তার চাচা এলেন। কিন্তু দু’জনের কারোরই জ্বর নামছে না। এক শ’ চার ডিগ্রি জ্বরে সুমন আবোল-তাবোল বকতে থাকে। মা মুখের কাছে কান পেতে শুনতে পেলেন, সুমন বলছে, ঐ লোকটা আসছে। কালাম, দ্যাখো ক্যামন করে হাসছে।
বাবাকে ডেকে নিয়ে মা বললেন দ্যাখো, সুমন কিসব বলছে।
সুমনের মাথার কাছে বসে মা কেঁদে উঠলেন। বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েরা যে যার জায়গায় চুপচাপ, কোনো শব্দ করছে না। বড়োরা সবাই ভীষণ মনমরা হয়ে আছেন। বাবা ভাবছেন, বেড়াতে এসে একি বিপত্তি ঘটলো। মা ভাবছেন, আমি এজন্যই গ্রামে আসতে চাই না। ফুপু-ফুপা ভাবছেন, একি হলো। মিতুটা চুপচাপ বসে আছে। কারো খাওয়া-দাওয়ার ঠিক নেই। সারারাত যে কিভাবে গেলো, ওরা ছাড়া কেউ জানে না।
কালাম জ্বরের ঘোরে কথা বলছে না। তবে ঝিম্ মেরে শুয়ে আছে। শেষ রাতের দিকে দু’জনের জ্বর কিছু কমে গেলো।
বাবা জানতেন না ওরা কোথায় গিয়েছিলো। জ্বর নেমে যেতেই কালাম ভাত চাইলো। ফুপু নরম ভাত আর ঝোল এনে দিলেন। রান্না করাই ছিলো, শুধু গরম করে দিলেন। ভাত খেতে খেতে কালাম জানালো, ওদের সাথে ধলাবুরুর দেখা হয়েছিলো। ফুপু কেঁদে উঠে বললেন, তোরা ভয় পাইছিস? ভাত খাওয়ার আগে ক’বি না?
তিনি তৎক্ষণাৎ গ্রামের প্রথামতো লোহার দায়ে কাঁচা লবণ আর কাঠের একটা টুকরা রেখে আগুনে বেশ করে পুড়িয়ে কয়লা বানিয়ে পানিভর্তি জগে রাখলেন। কাঠের টুকরা কয়লা হয়ে জগের পানিতে ভাসছিলো। তারপর একে একে দু’জনকে উঠিয়ে বাইরে নিয়ে সেই পানি ফুপু গালভর্তি করে ওদের চোখ খোলা অবস্থায় মুখে পানির ঝাপটা মারলেন। ফুপুর মুখের পানির তোড়ে সুমন বিব্রত বোধ করে। এভাবে কয়েকবার পানির ঝাপ্টা দেয়া হলো। তারপর জগের পানি মুখে ঢেলে দেয়া হলো। মিতু পেছনে দাঁড়িয়ে মৃদু মৃদু হাসছিলো। ভাবছে, পরে ঢাকায় গিয়ে ভাইয়াকে খ্যাপাবে। মা এসব টোট্কা চিকিৎসার ব্যাপারে মৃদু আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে যান। বাবা বোঝেন ভয়টা মানসিক ব্যাপার। মনের শক্তি ফেরানোটাই আসল কথা। তাছাড়া আগুনে পোড়া কাঠ-কয়লা খুব একটা ক্ষতিকর না।
মসজিদের মাইকে আজান দিচ্ছে। শেষরাতের দিকে জ্বর আবার বেড়ে গেলো।
আজান শেষ হওয়ার কিছু পরে কালাম হঠাৎ উঠে বসলো। মা’কে জড়িয়ে ধরে বললো, মা আমি যাই। তারপর শুয়ে পড়লো। ফুপু চিৎকার করে কেঁদে উঠে সবাইকে ডাক দিলেন, তোমরা দেইখ্যা যাও আমার কালাম কী কোতিছে।
যে যেখানে ছিলো, দৌড়ে এলো। ডাক্তার চাচা এলেন। কিছু না বলে বৈঠকখানায় গিয়ে বসলেন। বাবাকে ডেকে বললেন, সুমনকে ঢাকায় নিয়ে যাও।
বাড়িতে কান্নার রোল উঠেছে। ফুপু-ফুপা ভাইবোনেরা কান্নাকাটি করছে। এদিকে মা কাঁদছেন, এক্ষুণি ঢাকা চলো। আমার সুমনকে ভালো ডাক্তার দেখাতে হবে।
বাবা দ্বিধায় ভুগছেন। এ অবস্থায় এ পরিবারকে রেখে কিভাবে যাবেন। অথচ যাওয়াটা জরুরি। ফুপা উঠে এলেন, বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ভাইজান আপনি অ্যাক্ষণ্ ঢাকা যান। চেষ্টার ত্রুটি কইরেন না।
বাবা গাড়ি বের করলেন। কয়েক মিনিটের ভেতর ওরা রওনা হলো। সামনের সিটে মিতু। পেছনের সিটে মা সুমনের মাথা কোলে নিয়ে বসলেন।
গাড়ি ঢাকার পথে ছুটে চলেছে। মিতু দেখে, বাবা গাড়ি চালাতে চালাতে চোখ মুছছেন। বাবাকে দেখে মিতুর চোখেও পানি চলে আসে। মা সুমনের মাথা কোলে নিয়ে অনবরত কেঁদে যাচ্ছেন, আর বিভিন্ন দোয়া-দরূদ পড়ে চোখে-মুখে ফুঁ দিচ্ছেন। মা’র চোখ দিয়ে যেনো বন্যা ছুটেছে। গাড়ি ছুটছে। গ্রামে ততোক্ষণে রটে গেছে, ধলাবুরু শ্মশান ঘাটে মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য দুটো বালক নিয়েছে। হ

SHARE

Leave a Reply