Home ভ্রমণ এ জার্নি টু জাফলং -সাবিনা সিদ্দিকী শিবা

এ জার্নি টু জাফলং -সাবিনা সিদ্দিকী শিবা

‘দেখা হয় নাই দু’চোখ মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া’
স্মৃতির পাতার ঝাঁপি খুললে মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া কত না ঘটনা বহুল স্মৃতি মনে পড়ে। আজ-কাল এসব ঘটনা মনে পড়লে চোখের পাতা ঝাপসা হয়ে আসে। আমাদের এ দেশটিকে মহান আল্লাহ যেন তার অপার মহিমা দিয়ে নিপুণ হাতে তৈরি করেছেন। এতো রূপ, গন্ধ পৃথিবীর আর কোথাও খুঁজে পাবো না। মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট দুই হাত তুলে মুনাজাত করি, শুকরিয়া আদায় করি, এদেশে জন্ম গ্রহণের সুযোগদানের জন্য।
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য লিখতে গেলে সাদা কাগজ আর কালো কলমের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আজ আমি আমাদের পারিবারিক একটি ভ্রমণকাহিনী তুলে ধরছি, যা আমার লেখা জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা। এ ঘটনা মনে হলে আজও আমার দুই চোখের পাতা বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে অঝোর ধারায়।
প্রতি ঈদের ছুটিতে আমাদের কোথাও না কোথাও ঘোরার প্রস্তুতি থাকে। এবং কে কে যেতে চায় তাদের একটি তালিকা তৈরি করি। ২০১৫ সালের রোজার ঈদের পরদিন আমরা ঠিক করলাম সিলেট হয়ে জাফলং যাবো। যেমন ভাবা তেমন কাজ। আমার বাবা একজন রেলওয়ে কর্মকর্তা। তিনি পনেরো বছর সিলেটে চাকরি করেছেন। আমরা বাবাকে ধরে বেঁধে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। দলে বাবাসহ সাতজন। আমার ছোট বোন, ওর স্বামী আর ওদের একমাত্র মেয়ে নাইশা মণি। আমার সাথে এক কাজিন আর আমার একমাত্র ছেলে সাদমান সার্জিল হোসাইন তিস্তান। আজকের এ লেখাটা শুধু আমার ছেলের উৎসাহের কারণে লিখছি। আমি নামমাত্র একজন ছোটখাটো লেখিকা। নিয়মিত কালেরকণ্ঠে শুভসংঘের পাতায় লিখি এবং কালেভদ্রে বাংলাদেশ প্রতিদিনে। সদস্য হওয়ার কারণে প্রথম আলোর বন্ধুসভার পাতায় লেখা ছাপা হয়। এ নিয়ে আমার ছেলে খুব গর্ব করে। ওর বন্ধুদের আমার যত লেখা আসে সব দেখানো চাই-ই। তাই আমি আজ ওর এবং নারায়ণগঞ্জ আদর্শ স্কুলের বন্ধুদের উৎসর্গ করে লিখছি। তো যাই হোক সবাই ঠিক করলাম ঈদের পরদিন আমরা সিলেট যাবো। চাঁদা তুলে বাবার পকেট ভারী করলাম। আমাদের কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা হলে উৎসাহের কোনো কমতি থাকে না। রাস্তায় পছন্দের কোনো জিনিস দেখলে কার আগে কে কিনবে তার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। আমাদের ছেলে আর ভাগনে দু’জনের ঈদের সেলামি সব জমা করে রেখেছে। ওদের ভাবনার শেষ নেই। দেখতে দেখতে রোজা শেষ। ঈদ বাকি মাত্র দুই দিন। আমরা ঘুরতে যাওয়ার জন্য তৈরি। কোনো রকমে ঈদের দিনটি পার করলাম। আমাদের অপেক্ষার কাক্সিক্ষত দিনটি হাজির হলো। ঈদের পরদিন রাত ১০টায় আমাদের ট্রেন। আমাদের সবার বাড়ি ফতুল্লা রেলস্টেশনে। সন্ধ্যা ৭টায় সবার ল্যাগেজ নিয়ে ফতুল্লা থেকে ট্রেনে কমলাপুর রেলস্টেশনে হাজির হলাম। স্টেশনে উপচে পড়া ভিড়। সবাই ট্রেনের অপেক্ষায়। বাবা আমাদের সবার জন্য টিকিট কিনতে গেলেন। বাবার বন্ধুদের সেদিন যাদের ডিউটি ছিলো তারা আমাদের সাদরে আমন্ত্রণ জানালেন তাদের সাথে যাওয়ার জন্য। প্রচন্ড ভিড়ে কোনো রকম দু’টি সিট ব্যবস্থা করা গেল। ছয়জনে চাপাচাপি করে বসে পড়লাম। বাবা তার বন্ধুদের খাবার বগিতে গিয়ে গল্পে ব্যস্ত। এদিকে আমরা গরমে ঘেমে একাকার। তবুও সারা সময় হাসি আনন্দে মেতে রইলাম। ট্রেন ছাড়তেই সবার মনে প্রশান্তি দেখা দিল। আমি মনের অজান্তে গেয়ে উঠলাম ‘চলো না ঘুরে আসি অজানাতে।’ ট্রেন চলতে চলতে একেক স্টেশনে থামে। মানুষ নামার চেয়ে বেশি উঠতে লাগল। আমাদের অবস্থা যাচ্ছেতাই। না পারছি নড়তে, না পারছি চড়তে, ধাক্কাধাক্কিতে চিঁড়াচেপ্টা হওয়ার দশা। লোকজন পারে তো আমাদের কোলে উঠে বসে।
রাত ২টা। এসময় আমাদের জন্য এতো বড় চমক ছিলো যা ভাবতে আমরা আবেগপ্রবণ হয়ে যাই। ঘুমে আমরা ঢুলো ঢুলো অবস্থা, এর মাঝে বাবা আমাদের ডেকে লোকাল কামরা থেকে কেবিনে নিয়ে গেলেন। কেবিনের ওপর নিচে চারটা সিট। জানালা দিয়ে হু হু করে বাতাস বইতে লাগলো। আমরাও দু’জন দু’জন করে ঘুমিয়ে পড়লাম। আমার সকালে ওঠার অভ্যাস। তাই খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেলো। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। দেখি হালকা বৃষ্টি পড়ছে। সবাই ঘুমে বিভোর। আমি একটু ভাবুক, তাই ফের জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগলাম। সেকি অপূর্ব দৃশ্য! না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। ট্রেন তার আপন গতিতে ছুটে চলেছে। আর দুই পাশের বড় বড় পাহাড়, গাছপালা পালা করে দৌড়ের প্রতিযোগিতা করছে। আঁধারের চাদর সরিয়ে ভোরের আলো ফোটার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে সময়টা কি যে অপূর্ব লাগছে বাইরের দৃশ্যাবলি! যা আমার লেখার ভাষায় বুঝাতে পারবো না। মনে হয় এ দৃশ্য আমার এ জীবনেও দেখি নি। বাকি জীবনে দেখবো কি না আল্লাহই জানেন। ভোর ৫টায় আমরা সিলেটের পবিত্র স্থানে পা রাখলাম এবং সিলেট স্টেশনের রেল হাউজে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। দোতলায় বিশাল রুম। রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিচে হোটেলে গিয়ে ঢুকলাম। ততক্ষণ ক্ষুধায় পেটে ড্রাম বাজতে লাগল। পেটপুরে নাশতা করলাম। রুমে ফিরে বিশ্রামের পালা। দশটার দিকে রিকশা নিয়ে হযরত শাহ্জালাল (রহ)-এর মাজার জিয়ারত করতে গেলাম। ঘুরে ঘুরে সব দেখলাম। কিনলাম অনেক কিছু। অনেক ….কিনে গেলাম মরহুম নায়ক সালমান শাহের কবর দেখতে। দু’চোখ ভরে এতো কিছু দেখলাম তবুও সব দেখা হয় না। তারপর গেলাম শাহ পরাণ (রহ)-এর মাজারে। সবাই ওপরে উঠে জিয়ারত করতে গেল। কিন্তু বেশি উঁচু হওয়ার কারণে আমি যাইনি। অনেককে হাদিয়া দিতে দেখলাম। ইয়াসিন সূরার তাবিজ, এটা-সেটা কিনছে অনেকে। মাজারের পাশে ছোলা, ভোনা আর ভাজি দিয়ে সবাই দুপুরের খাওয়া সারলাম।
এবার ফেরার পালা। কিন্তু তখনও আমরা জানতাম না সামনে আমাদের জন্য কত বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। আমরা একটি সিএনজি ভাড়া করলাম। সবাই পেছনে বসতেই আমার ছেলে তিস্তান গিয়ে বসলো ড্রাইভারের পাশে। সারা রাত জার্নির ক্লান্ত শরীর। তারপর আবার এতো সময় ঘোরাঘুরি করলাম। গাড়ি ছাড়ার পর কোন সময় যেন আমার ছেলে হাতল ছেড়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। তারপর যা দেখলাম- সেটা যেন মহান আল্লাহ কোন মাকে দ্বিতীয়বার না দেখান। আমরা সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম শরতের কাশফুলের পাপড়িগুলো যেমন ছিটকে এদিক সেদিক চলে যায়, তেমনি আমার ছেলে ছিটকে ব্যস্ত রাস্তার মাঝখানে পড়ে গেলো। এবং আল্লাহর কি অসীম রহমত! হঠাৎ চলন্ত গাড়িগুলোকে কেউ যেন রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে থামিয়ে দিয়েছে। আমাদের সিএনজি থামতেই সবাই দৌড়ে ওর কাছে চলে গেলাম। রক্তে চার পাশ মাখামাখি। লোকজনের হাঁক ডাক। আর আমার আকাশ ফাটানো চিৎকারে এক ভয়াবহ অবস্থা। সবাই আমাদের ড্রাইভারকে মারার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আমার বাবা নিষেধ করায় বেচারা সে যাত্রা রক্ষা পেলো। রোডের পাশে ওকে এক ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে গেলো সবাই। রক্ত পড়া বন্ধ করে হাতে-পায়ে ব্যান্ডেজ করে দিলেন। এবং এক গাদা ওষুধ নিয়ে আমরা রুমে ফিরে এলাম। সবাই ওকে নিয়ে ব্যস্ত। পেইন কিলার আর অনেক ওষুধ খেয়ে ছেলে ঘুমিয়ে পড়ল। আমাদের আর বেড়ানোর মুড রইল না। যে যেখানে পারল অলস ভঙ্গিতে শুয়ে পড়ল। রাতে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, সকালেই সবাই ঢাকা ফিরে আসবো। জাফলং যাওয়ার প্ল্যান বাতিল। দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার কারণে সারা রাত আমার ছেলে ঘুমিয়ে কাটালো। আর আমরা ঘুমিয়ে, না-ঘুমিয়ে কাটালাম। কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে সকালে আমার ছেলে সবাইকে ডেকে উঠালো এবং জাফলং যাওয়ার জন্য তৈরি হতে বললো। তার অটুট মনোবলের কারণে কারো ূউৎসাহ না থাকলেও বাধ্য হয়ে সবাই যাওয়ার জন্য তৈরি হলাম। আমার ছেলে পায়ে বেশি জোর দিয়ে হাঁটতে পারছে না। তবুও কী মনোবল সেটা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না! সকালে নাশতা খেয়ে সবাই জাফলং রওনা দিলাম।
পাহাড়িয়া আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে পেটমোটা গাড়ির মতো হেলে দুলে গাড়িটি চলতে লাগল। আর আমরা জানালা দিয়ে অপূর্ব সব দৃশ্য উপভোগ করছি। উঁচু থেকে দুধের মতো সাদা সাদা জলরাশি গড়িয়ে পড়ছে। মনে হয়ে দুধের পাহাড়। এসব দেখতে দেখতে জাফলং গিয়ে পৌঁছলাম। কিছু খেয়ে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লাম পিয়াই নদীর অপূর্ব জলের কোলে। আমাদের সবাই ব্যস্ত। আমি যে কখন মাঝ-নদীতে চলে গেছি খেয়াল করিনি। ¯্রােতের টানে ফিরতেও পারছি না। আমাকে দেখার সময় কারো নেই। আমি বাঁচার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছি। না পেরে বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করতে লাগলাম। আমার চিৎকার আমার লোকজনের কানে না পৌঁছালেও অন্যের কানে ঠিকই পৌঁছেছে। অতি সাহসী কয়েকজন ছেলে সাবধানে সাঁতরে আমার কাছে চলে এলো। এবং আমাকে টেনে নদীর কিনারায় নিয়ে এলো। সবার সেবায় আমি মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে আল্লাহর দরবারে লাখ লাখ শুকরিয়া আদায় করছি। সবাই কেনাকাটায় ব্যস্ত, আমিও সাবান, শোপিস, কয়েকটি পাহাড়িয়া ওড়না ও চাদর কিনলাম। কয়েক কেজি চা-পাতার প্যাকেট কিনলাম। গাড়িতে এসে ধরা খেলাম চা-পাতির কারণে, কেননা রঙ-গন্ধের কোনো নাম-গন্ধও নেই। গোছল শেষে কেউ কাপড় বদলাতে পারিনি। তপ্ত রৌদ্রে গায়েই শুকিয়েছি। ফেরার পথে হোটেল থেকে ভূঁরিভোজ সেরে রওনা হলাম। বিকেলে সিলেটের সত্যিকারের চা-বাগান ঘুরে দেখলাম। কমলার বাগানও সাথে দেখা হয়ে গেলো। কুলির অনুমতি নিয়ে কয়েক কেজি কাঁচা চা-পাতা চিড়ে ব্যাগে ভরলাম।
ফেরার পথে শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে ঘুরে দেখলাম। কী সুন্দর পরিপাটি! সন্ধ্যার আগে রুমে ফিরে এসে গোছল করলাম সবাই। তারপর গোছগাছে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। কেননা পরদিন ভোর সাড়ে ৭টায় আমাদের ঢাকা ফেরার ট্রেন। রাতে শেষবারের মতো পেটভরে সিলেটের খাবার খেলাম। কিন্তু বাবার খুব আপনজন ছিলেন হোটেলের মালিক। তাই বিল দিতে দিলেন না। ধন্যবাদ জানিয়ে রুমে এসে যে যার মতো বিছানায় শুয়ে পড়লাম। সারা দিনের কর্মক্লান্ত শরীর বিছানায় রাখতেই দু’চোখ আপনা থেকেই বুজে এলো। সবাই ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলাম। ভোরে উঠে ফ্রেশ হয়ে ট্রেনে গিয়ে উঠলাম। সকালের নাশতাটা ট্রেনেই সারলাম। মনে মনে ভাবতে লাগলাম কী অসাধারণভাবে কেটে গেলো তিনটি দিন। আমরা ঢাকায় ফিরে আসছি ঠিকই কিন্তু আমাদের মন পড়ে রইল সুন্দরময় সিলেট । নিজেদের কী সুন্দর একটি দেশ! আমার মন বারবার বলতে লাগল- ‘এমন দেশটি কোথায় খুঁজে পাবে নাকো তুমি/ সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।’ কিংবা অন্য আরো গানের কলি। এভাবে শেষ করলাম আনন্দ-বেদনা মিলিয়ে একটি ভ্রমণ।

SHARE

Leave a Reply