Home উপন্যাস জোসনা রাতের গল্প -সোলায়মান আহসান

জোসনা রাতের গল্প -সোলায়মান আহসান

[পর্ব-৪]

জ্যৈষ্ঠ মাস। আম-কাঁঠাল পাকার গরম পড়েছে। ঘরে প্রাণান্ত গতিতে চলা বিদ্যুৎচালিত পাখা স্বস্তি দিতে পারছে না। তাই খোলা ছাদে এসে জড়ো হয় একে একে।
প্রথমে দীনা, প্রতিদিনের রুটিন অনুসারে। তারপর প্রেমা ও জিশান, গরমের দোহাই দিয়ে। অনুমতিসাপেক্ষে। রহমান সাহেবও ঘরে তেমন স্বস্তি পাচ্ছিলেন না বলে ছাদে এসে বসেছেন। আরো পরে লেদু চাচাও হাজির হলেন। যথারীতি হাতে ছেনি-টুকরি নিয়ে।
আকাশ বেশ পরিষ্কার। ঝকঝকে। মেঘ থাকলেও ঘন নয়। ছেঁড়া ছেঁড়া। ছাদে বেশ বাতাস আছে। উলট পালট বাতাস। পাগলাটে। তবে সূর্যের তীব্র রশ্মিতে তেতে ওঠা পরিবেশ উলট পালট বাতাসে খানিকটা শীতল করে।
রহমান সাহেব উঠেই ছাদটা এক চক্কর লাগালেন। চলে এলেন টেলিস্কোপ ঘরে। টেলিস্কোপের আইপয়েন্টের কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল তাও সরিয়ে দেন। ব্যস, চোখের সম্মুখে মহাশূন্য। ঝিকমিক জ্বলা নক্ষত্ররা। অদ্ভুত মায়াবী এই তারার মেলা।
রহমান সাহেব খোঁজতে থাকেন এ মাসের তারাটিকে। অভিজিৎ। উত্তর-পূর্ব দিকে চোখ রাখেন। পাওয়া যায় না। আরেকটু রাত গভীরে প্রবেশ করলে তারাটিকে দেখা যাবে। এটাই নিয়ম। গভীর রাতে তারা দৃশ্যপটে ধরা দেয়।
রহমান সাহেব টেলিস্কোপ ঘুরিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মুখ করে খোঁজতে থাকেন আরেক বন্ধু তারাকে। তুলারাশির দেখা পেয়ে যান হঠাৎ। বাহ বেশ উজ্জ্বলভাবে ধরা দিয়েছে! আরো একটু পূর্ব দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে আনতেই পেয়ে যান বৃশ্চিককেও। বাহ শুধু অভিজিৎ ধরা দিলো না। এ মাসের আরো একটা তারা তার পেতে হবে।
রহমান সাহেব টেলিস্কোপের নল একবার দক্ষিণ আরেকবার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আচক্র ঘোরাতে থাকেন।
‘পেয়ে গেছি, পেয়ে গেছি’- আর্কিমিডিসের ইউরেকা-ইউরেকা বলার মতো রহমান সাহেব চিৎকার করে ওঠেন।
‘কী পেয়েছো আব্বু, কী পেয়েছো?’ প্রেমার প্রশ্ন।
একটু দূরে ওরা মোড়ায় বসে লেদু দাদার সাথে গল্প করছিল।
‘কী পেয়েছো আব্বু?’ জিশানেরও একই প্রশ্ন।
‘দেখে যাও তোমরা এসে!’ রহমান সাহেব রীতিমত উত্তেজিত।
ছুটে আসে জিশান ও প্রেমা একসঙ্গে।
একজন একজন করে দেখতে হবে। টেলিস্কোপে আলতোভাবে হাত রেখে ডান চোখটা নলে রাখতে হবে। নড়াচড়া কম। শ্বাস-প্রশ্বাস ধীরে ধীরে। রহমান সাহেব চেয়ার ছেড়ে বসলেন।
প্রথমে জিশান চোখ রাখল।
‘কী দেখছো জিশান, কয়েকটা তারার মাঝে একটা উজ্জ্বল তারা।’
হ্যাঁ, আব্বু, উজ্জ্বল তারাটি দেখছি, কিন্তু মাঝে মাঝে নিভে যাচ্ছে।’
‘ঐ তারার নাম জ্যৈষ্ঠ, বুঝলে, জিশান? আর ঐ তারার নামেই এ মাসের নামকরণ হয়েছে জ্যৈষ্ঠ মাস।’
‘আব্বু আমিও দেখবো।’ প্রেমার আবদার।
অবশ্য এসব ব্যাপারে রহমান সাহেব উদার। আকাশরাজ্যের সঙ্গে ছেলেমেয়েদের পরিচয় করিয়ে দিতে চান। তাই এবার প্রেমার পালা। জিশান চোখ সরিয়ে নিয়ে জায়গা ছেড়ে দিলো ছোট বোন প্রেমার জন্য। প্রেমা এগিয়ে এসে চেয়ারটায় উঠে বসে। স্বাভাবিকের চেয়ে একটু উঁচু চেয়ারটা। প্রেমার জন্য চট করে বসা সম্ভব নয়। রহমান সাহেব দু’হাত ধরে বসিয়ে দেন প্রেমাকে।
প্রেমা চোখ রাখে টেলিস্কোপের আইপয়েন্টে। ঝিকমিক তারার আকাশে প্রেমা হারিয়ে যায় যেন। কোন অজানা দেশে। অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। মুখে বলল, ‘ওরে বাপ্রে কতো তারা। আমি তারাদের দেশে যাবো!’
‘কতো তারার মধ্যে তোমাকে দেখতে হবে একটিকে, সেটা হলো এ মাসের আকাশের অতিথি জ্যৈষ্ঠ তারা। দেখতে পাচ্ছ তুলা বৃশ্চিক রাশির মাঝে একটা উজ্জ্বল তারাকে?’
হ্যাঁ, এটা বেশ উজ্জ্বল এবং অন্যান্যদের চেয়ে বড়ো।’ প্রেমা বলল।
‘এবার নেমে এসো।’
প্রেমাকে নামিয়ে দেয়া হলো। রহমান সাহেব আবার গিয়ে বসবেন এমন সময় প্রেমা বলে উঠল, ‘আব্বু তুমি কিন্তু ফাঁকি দিচ্ছ।’
‘কী রকম?’ রহমান সাহেব চেয়ারে না উঠে প্রেমার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।
‘তুমি বলেছিলে না, পরীদের গল্প শোনাবে? ছোটকালে তুমি পরী দেখেছো, সে গল্পটা।’
‘শোনাবো তো, বলেছি যখন অবশ্যই শোনাবো, কিন্তু তা আজই?’
‘হ্যাঁ আব্বু, আজই’- প্রেমার কণ্ঠে আবদার।
‘আজই শোনাও আব্বু, আমরা পরীর গল্প শুনতে চাই।’ জিশান বলল।
‘তাহলে চলো, আমরা অন্য জায়গায় গিয়ে বসি!’
রহমান সাহেব টেলিস্কোপ ঘর গুটিয়ে ফেললেন। কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে ঢাকনা লাগিয়ে দরোজা টেনে দিলেন। এক পাল্লার দরোজা। ছোট একটা তালাও আছে। কিন্তু তা লাগালেন না। একটু পর আবার এসে বসবেন এই ভেবে। দীনা ছাদে পায়চারি চালিয়ে যাচ্ছিল। লেদু চাচা গোলাপ গাছের কাছে একটা মোড়ায় বসে গুন গুন করে গান গাইছিলেন। লেদু চাচার গলা ভালো। গলায় গান আছে। সিলেটের মরমিশিল্পী সাধক আরকুম শাহ-শীতলংশাহের গান বেশ গায়।
রহমান সাহেব একটা শীতল পাটি পেতে প্রথমে বসলেন। প্রেমা জিশান এরপর বসল গুটিশুটি মেরে।
শীতল পাটিটা এনেছিলেন দীনা তার নানাবাড়ি থেকে। সিলেটের ঐতিহ্য বেতের আসবাবপত্র ও শীতল পাটি। রহমান সাহেব এসব ভালোবাসেন। দীনাও খুব কদর করে বলে যখনই বাড়ি যান ঐতিহ্যের জিনিসপত্র সংগ্রহ করে আনেন।
‘খুব গরম পড়েছে সেবার। মফস্বল শহর। এখন যেভাবে সব শহুরে হয়ে উঠছে। তেমন ছিল না। এখন যেভাবে উপজেলা এবং জেলা শহর, তখন ছিল থানা এবং মহকুমা শহর। তাই তখন ব্রিক সলিং রাস্তা। তাও খুব প্রশস্ত নয়। দুটো রিকশা পাশাপাশি যেতে হলে একটিকে মাটিতে চাকা নামাতে হয়। আমাদের বাসা ছিল টিনের। ওপরে টিন। চারিধারে টিন। গরমকালে বেশ গরম লাগতো। অবশ্য টিনের চালের ওপর একটা বিশাল আমগাছ। সূর্যের রশ্মির তাপ থেকে খানিকটা বাঁচাতো।’
‘ভূমিকাটা অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে আব্বু!’ জিশান হাসতে হাসতে বলল।
‘কিন্তু আমি যে সময়ের, যে স্থানের গল্প শোনাবো তা যে অনেক বছর আগের। তোমাদের চেনাজগতের চোখের অভিজ্ঞতা দিয়ে তা বুঝতে পারবে না। এখন যেভাবে সব দ্রুত বদলে যায়, তখন এমন দ্রুত বদলে যেত না। অনেক বছর একই অবস্থা একই পরিবেশ আমরা দেখতে পেতাম।’
‘তারপর বলো কী হলো?’ প্রেমার তাগিদ।
‘আমার তখন বয়স নয় কি দশ, জিশানের বয়সের সমান। সে সময় মানুষের ঘরবাড়ি ছিল দূরে দূরে। সন্ধ্যার পর রাস্তা ফাঁকা। নীরব হয়ে পড়ে পরিবেশ। আমাদের বাসার পাশ দিয়ে চলে গেছে শহরের প্রধান রাস্তা। রাস্তার এ পাশে প্রধান ডাকঘর, যার প্রধান অর্থাৎ পোস্ট মাস্টার তোমার দাদাজান ছিলেন। অপর প্রান্তে রেজিস্ট্রি অফিস। জমিজমা বিক্রির পর দলিল করা হয় এখানে। রেজিস্ট্রি অফিস রেখে পাবলিক লাইব্রেরি। অফিসার্স ক্লাব এবং ক্লাবসংলগ্ন লন টেনিস গ্রাউন্ড। পোস্ট অফিসটি বিল্ডিং। তার সামনে একটা বড় মাঠ। মাঠ পেরিয়ে মুন্সেফ কোর্ট। বিচার-আচার হয়। দিনের বেলা মানুষের পদচারণায় মুখর থাকলেও সন্ধ্যার পর সুনসান নীরব সব। শোনা যায় লক্ষ্মীপেঁচার ডাক। পু- উত্- পু- উত্ – পু-উত্।
‘হলো, বুঝেছি, ভয় ভয় করছে’- প্রেমা বলল।
‘গরম বলে আমরা সবাই মিলে হাঁটতে বেরিয়েছি। তোমার দাদি-দাদাজান এবং আমরা পাঁচ ভাইবোন মিলে। এভাবে এক সঙ্গে বেড়ানো আমাদের তখন প্রায়ই হতো। তখন মফস্বল শহর ছিল নিরিবিলি এবং ভয়হীন। ছিল না মানুষের ভয়। চোর ডাকাত-গুন্ডার ভয় ছিলো না। ভয় ছিল জিন-পরীর।’
‘তারপর কী হলো, বলো না-’ প্রেমার কণ্ঠে উষ্মা।
‘আমি এবং আমার বড় ভাই আদেল দলছুট হয়ে হাঁটতে থাকি। ইচ্ছে করেই। উদ্দেশ্য টেনিস গ্রাউন্ডে গিয়ে বসা। টেনিস গ্রাউন্ডের আরেক পাশে একটা রাস্তা। রাস্তার ও পাশেই আমাদের হাইস্কুল। শহরের নামী স্কুল।
আকাশে চাঁদ ছিল। চাঁদনি আলোয় সাদা সাদা চারিধার। তবে বড়ো বড়ো গাছের জন্য সেই চাঁদের আলো সরাসরি এসে পড়ছে না। গাছের ডাল-পাতার আকৃতি হয়ে চাঁদের আলো নকশা এঁকে দিয়েছে। সেই নকশার ওপর দিয়ে হেঁটে টেনিস গ্রাউন্ডে এসে বসেছি আমরা দু’জন।’
‘টেনিস গ্রাউন্ডে মানুষ ছিল?’ প্রেমার প্রশ্ন।
‘না কোন মানুষ ছিল না, আমরা দু’জন ছাড়া। আমাদের ইচ্ছা ছিল অফিসার্স ক্লাবের সামনে ফুলের বাগান থেকে টকটকে লাল গোলাপ, গন্ধরাজ, চন্দ্রমল্লিকা, বড় বড় রাজ গাঁদা ফুল কুড়িয়ে আনা।’
‘লোক ছিল না ক্লাবে?’ জিশানের প্রশ্ন।
‘ছিল কি না জানি না। তবে এতো রাতে বন্ধই থাকে।’
‘তারপর কী হলো?’ প্রেমার কণ্ঠ বুজে এসেছে ।
‘বলছি। আমরা টেনিস গ্রাউন্ডে বসে ভাবছি কিভাবে ফুলের বাগানে ঢুকবো। চারিধারে বাঁশের বুননের বেড়া, খুব উঁচু নয়, ডিঙানো সহজ। ধীরে ধীরে এগোচ্ছি। পেছন দিকে শর্টকাট রাস্তা আছে সেই পথে।’
‘বেড়া ডিঙাবে কিভাবে?’ জিসানের প্রশ্ন।
‘এদিকের পথটি বেড়া নয়, একটা দেয়াল। তিন ফুট সাড়ে তিন ফুট উঁচু। এগিয়ে যাচ্ছি ধীরে ধীরে। যখন আমরা বাগানের কাছাকাছি চলে এসেছি এমন সময় আমার চোখে পড়লো বাগানের মাঝখানে একটি ফোয়ারা। চিনামাটির কাজ করা। সেই ফোয়ারার পাশে সাদা মানুষের মতো দু’জন দাঁড়িয়ে। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম দু’জন মেয়ে। মানুষ হলেও দুই কাঁধের সাথে পাখাযুক্ত। খুব বড় নয়, চার ফুটের মত উচ্চতা মেয়ে দু’টির। আমার বুকে কে যেন ঠান্ডা বরফ ঘষে দিলো। চেতনা হারাতে যাচ্ছি বুঝি।’
বড় ভাইকে বললাম- ‘বাগানে পরী।’ ইশারায় থামতে বললাম।
বড় ভাই সত্যিই তো, বলেই অ্যাবাউট টার্ন। ‘চল বাড়ি ফিরে যাই।’
দ্রুত হাঁটতে থাকি। দৌড় দেয়ার শক্তিও নেই তখন।
তারপর?
টেনিস গ্রাউন্ড পেরিয়ে এসে দূর থেকে দাঁড়িয়ে আরেকবার পেছন দিকে ভিতু দৃষ্টিতে তাকালাম। কিন্তু এত ভয় পেয়েছি দৃষ্টি বেশি দূর এগোলো না।’
‘পরীই ছিলো তা কিভাবে ভাবলে, তোমাদের মতো ফুলকুড়ানো মেয়েও তো হতে পারে?’ জিসানের কথা।
‘না, পরীই ছিলো, আমি পরী দেখেছি আরো- আরেক দিন সেই গল্পটা বলবো। এবার চলো নিচে।’
‘কী তোমাদের গল্প শেষ হলো?’ দীনা দূর থেকে জানতে চায় ।
‘আপাতত শেষ হলো।’ রহমান সাহেব জবাব দেন।
রহমান সাহেব উঠে পড়েন। প্রেমা ও জিশানও ওঠে। লেদু চাচা এশার আজান শুনে অনেক আগেই চলে যান। তাই পাটি গুটিয়ে নেন রহমান সাহেব। চিলেকোঠায় তা রেখে নেমে পড়েন দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে। দীনা নামেন পরপর।     (আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

SHARE

Leave a Reply