Home ধারাবাহিক: দুর্গম পথের যাত্রি দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ

দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ

গত সংখ্যার পর

উমরু চেষ্টা করছিল আলী রা:-এর পাকড়াও থেকে বাঁচার, কিন্তু নড়তে গেলেই গলায় খঞ্জরের চাপ বেড়ে যায়। নিচে পড়ে রাগে গো গো করছিল উমরু। কিছুতেই আলী রা:-এর সাথে কুলিয়ে উঠতে না পেরে সে আলী রা:-এর মুখে থুতু ছুড়ে মারল। এবার আলী রা:-এর চেহারায়ও এসে জমা হলো রাগ। তিনি খানিকক্ষণ ওভাবেই বসে রইলেন। শেষে রাগ কিছুটা কমলে তিনি উমরুর বুকের ওপর থেকে নেমে গেলেন। বিস্মিত উমরু উঠে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলো, ‘কি হলো আলী, তুমি আমাকে হত্যা করলে না কেন?’
আলী রা: কয়েক কদম সরে গিয়ে তলোয়ার তুলে নিতে নিতে বললেন, ‘তোমার বিরুদ্ধে আমার ব্যক্তিগত কোন আক্রোশ নেই। তোমাকে হত্যা করতে নেমেছিলাম দ্বীনের স্বার্থে। এই হত্যার বিনিময়ে আমি পেতাম আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের সন্তোষ। কিন্তু যখন তুমি আমার মুখে থুতু ছুড়ে মারলে আমার অন্তর ভরে গেল রাগে। ব্যক্তিগত রাগের বশে কাউকে হত্যা করার অনুমতি নেই আমাদের ধর্মে। তখন তোমাকে হত্যা করলে আমি হয়ে যেতাম একজন খুনি। এই খুন করা মহাপাপের কাজ। একজন মুমিন জেনেশুনে এ মহাপাপে নিজেকে জড়াতে পারে না। তাই থুতু দেয়ার পর তোমাকে হত্যা করতে পারিনি। এবার এসো, আঘাত করো। তখন তোমাকে হত্যা করতে আর কোনো বাধা থাকবে না।’
নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়ে উমরু বিন আবদুহু কিছুটা অবাক হয়েছিল। আলী রা:-এর বক্তব্য শোনার পর রহস্যের জট খুললো তার। ইসলামের সৌন্দর্য ও মানবিকতার এ অনন্য রূপের সাথে পরিচিত ছিল না ওরা। আলী রা.-এর হাতের জুলফিকারের ঝলক দেখে সম্বিত ফিরে এলো তার। তার মনে পড়ে গেল এইমাত্র সে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছে। আলী রা:কে হত্যা করতে না পারলে যে কোন সময় মরণ আবার তাকে কাবু করে ফেলতে পারে। সে অতর্কিতে আলী রা: ওপর হামলা করে বসলো। এ আকস্মিক আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না আলী রা:। দ্রুত তিনি ঢাল দিয়ে আঘাত ফিরালেন, তবে কাঁধে সামান্য আঘাত পেলেন। উমরুকে আর কোন সুযোগ দেয়া ঠিক হচ্ছে না, ভাবলেন আলী রা.। এই প্রথম তিনি আঘাত করলেন এবং রাসূলের দেয়া তলোয়ার জুলফিকারের এক আঘাতেই তার শাহরগ কেটে গর্দানেরও খানিকটা ফাঁক হয়ে গেল। উমরু আর কোন আঘাত করার সুযোগ পেল না, আলী রা.-এর দ্বিতীয় আঘাতে ধরাশায়ী হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো দৈত্যাকার উমরু বিন আবদুহু।
মুহূর্তে কাফের শিবিরের উল্লাস ও আনন্দধ্বনি থেমে গেল। এতোক্ষণ মুসলমানরা ছিল নিশ্চুপ, এবার তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো আল্লাহু আকবর ধ্বনি। আকরামা আগেই বলেছিল, ‘একজনকে হত্যা করতে পারলেই তোমরা বাকি ছয়জনকেও হত্যার অধিকার পেয়ে যাবে।’ উমরু পরাজিত হতে পারে এমনটা কেউ কল্পনাও করেনি। এই অভাবিত ঘটনায় সবার মত আকরামাও বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। কিন্তু মুহূর্তেই সে নিজেকে সামলে নিলো এবং ঘোড়ার মুখ খন্দকের দিকে করে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলো। বাকিরাও অনুসরণ করলো তাকে। আকরামার ঘোড়া খন্দক পার হতে পারলো না। ওপারের মাটিতে আছড়ে পড়ে গড়িয়ে খন্দকে পড়ে গেল। আকরামা মাটিতে বর্শা আটকে কোনমতে আত্মরক্ষা করলো এবং ওপারে পৌঁছলো। আকরামাসহ পাঁচজন খন্দক পার হলেও একজন ঘোড়াসমেত খন্দকে পড়ে গেল। মুজাহিদরা তাকে হত্যা করলো। এ অভিযানে পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ফিরতে পারলেও আকরামাকে হারাতে হলো তার দুই জাঁদরেল যোদ্ধাকে। মুসলমানরা তীর-ধনুক নিয়ে পাহারা জোরদার করলো। কাফেররা দ্রুত খন্দকের কাছ থেকে সরে পড়লো।
খালিদের স্পষ্ট মনে আছে সে ঘটনা। আকরামাকে পাঠিয়ে সে এপারে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। পুরো ঘটনাই সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে। অভিযানের খবর পেয়ে আবু সুফিয়ানও ছুটে এসেছিল সেখানে। খালিদের পাশে দাঁড়িয়ে সেও দেখেছে আকরামার শোচনীয় পরিণতি। আকরামা ফিরে এসে কারো দিকে না তাকিয়ে সোজা নিজের তাঁবুর ভেতর গিয়ে ঢুকেছিল। খালিদ তাঁবুতে ঢুকলে বলেছিল, ‘দোস্ত, আমাকে একটু একা থাকতে দাও।’
এ ঘটনার পর খন্দকের পাশে পাহারা আরও জোরদার করার হুকুম দিলেন মহানবী সা:। ফলে পাহারার জনবল দ্বিগুণ করা হলো। বিশেষ করে খন্দকের তুলনামূলক সরু অঞ্চলে পাহারা বাড়াবার সাথে সাথে নতুন ক্যাম্পও স্থাপন করা হলো।
এই সংঘাতের কোন প্রভাব পড়লো না দিনরাত্রির আবর্তনে। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে সময়মতো একটি অন্ধকার রাত এলো এবং রাতের পর আবারও সূর্য উঠলো আগের দিনের মত। ঘুমন্ত সৈনিকরা জেগে উঠলো। রোজকার মতো সৈন্যরা অংশ নিলো প্রভাতি কুচকাওয়াজে। আবু সুফিয়ান আজও প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন। তিনি দেখলেন গতকালের মতো আজও একটি অভিযানের প্রস্তুতি চলছে। খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে জড়ো হচ্ছে একদল সৈন্য। তিনি এগিয়ে গেলেন। খালিদের কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘এসব কী দেখছি খালিদ? এ রকম নিষ্ফল অভিযানের প্রস্তুতি তুমি নিতে পারো না। গতকালের কথা মনে নেই? আকরামার পরিণতির কথা এরই মধ্যে ভুলে গেলে? কেন তুমি কোরাইশ বংশের গায়ে কলঙ্কের কালিমা লেপন করতে চাও? তুমি কি মনে করো এভাবে বিজয় লাভ করা সম্ভব?’
‘জানি না। তবে পরাজয়ের কলঙ্ক নিয়ে মক্কায় ফিরে যেতে চাই না। বিজয় আনতে না পারলেও বীরের রক্তদানের সুযোগ থেকে তুমি আমাকে বঞ্চিত করতে পারো না।’
‘অবশ্যই পারি। আমি আমার এক সেনাপতিকে আবেগের দরিয়ায় ভাসতে দিতে পারি না। আবেগকে সংযত ও সংহত করো। বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে যুদ্ধের প্রতিটি চাল দিতে হবে তোমাকে। নইলে দুঃখজনক পরাজয়ের গ্লানি বইতে হবে। গতকাল আকস্মিক অভিযান চালিয়েও আকরামাকে পরাজয় মেনে নিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। আজ সেখানে পাহারা আরও জোরদার করা হয়েছে। আকরামা তো খন্দক পার হতে পেরেছিল, তুমি আক্রান্ত হবে খন্দক পেরোনোর আগেই। অতএব মাথা ঠান্ডা করো, আত্মঘাতী অভিযানের চিন্তা বাদ দাও মাথা থেকে।’
দূর থেকে আকরামা দেখতে পেলো তাদের। আবু সুফিয়ানের শেষের কথাগুলো কানে গেল তার। সে এসে খালিদের পাশে দাঁড়িয়ে বললো, ‘দোস্ত, তুমি যদি আমার গতকালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য অভিযান চালাতে চাও তবে আমি বলবো, বাদ দাও। আর যদি এ অভিযানের মধ্য দিয়ে তুমি সম্মিলিত বাহিনীর গৌরব বৃদ্ধি করতে পারবে বলে মনে করো তবে তোমার যা ইচ্ছা করতে পারো।’
‘কিন্তু আমরা যদি একজনের পরাজয় দেখে অন্যজন পিছিয়ে দাঁড়াই তবে সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন মুসলমানদের গোলাম হয়ে আমাদের বসবাস করতে হবে।’
‘না’। আবু সুফিয়ান বললো, ‘আমরা জয়-পরাজয় নির্ধারণ না করেই এবারকার মত ফিরে যাবো। আরও শক্তি সংগ্রহ করে মুসলমানদের ডেকে নেবো উন্মুক্ত প্রান্তরে। আজ নয়, সেদিনই নির্ধারিত হবে যুদ্ধের জয়-পরাজয়।’
এই তো সেদিনের কথা। তবু এর মধ্য দিয়ে পার হয়ে গেছে প্রায় দু’টি বছর। আজ মদিনার দিকে যেতে যেতে সেদিনের কথা মনে হওয়ায় নিজের মনেই হেসে উঠলো খালিদ বিন ওয়ালিদ। সত্যি, সেদিন বড়ই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। খালিদের মনে সেদিনের স্মৃতি আজও কেমন জ্বলজ্বল করে জ্বলছে।
আবু সুফিয়ানের কথার জবাবে খালিদ বললো, ‘স্বীকার করছি বাস্তবতা কঠিন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিলে মুসলমানদের পরাজিত করা যে একেবারেই অসম্ভব তা আমি মনে করি না। ভেবে দেখুন, মুসলমানদের সংখ্যা মাত্র তিন হাজার আর আমাদের সৈন্যসংখ্যা দশ হাজারের অধিক। এই তিন হাজার সৈন্য এক জায়গায় জমাট বেঁধে নেই। তারা মদিনা শহরের চারদিকে ছড়িয়ে আছে। তিন দিকের বিশাল এলাকা জুড়ে ছোট ছোট ক্যাম্প করেছে খন্দকের পাশে। একদলকে ডিউটি দিয়ে রেখেছে পাহাড়ের পাদদেশে। আমরা যদি আমাদের দশ হাজার সৈন্যকে চারদিকে ছড়িয়ে দেই তবে একদিকেই আমাদের সৈন্য থাকবে ওদের সব সৈন্যের সমান। আমাদের অস্ত্রের অভাব নেই, সৈন্যেরও কমতি নেই। জানি, আমরা এগিয়ে গেলে ওরা তীরবৃষ্টি করবে। কিন্তু কতক্ষণ? আমরাও তীরবৃষ্টি করে ওদের পিছু হটিয়ে দিয়ে খন্দক পার হয়ে শহরে প্রবেশ করার চেষ্টা করবো। যদি ওরা না হটে এবং অবিরাম তীরবৃষ্টি অব্যাহত রাখে তবে ততোক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করবো, যতোক্ষণ ওদের তীরের মজুদ শেষ না হবে। একদিকে খাদ্যঘাটতি অন্য দিকে অস্ত্রঘাটতি ওদেরকে এক সময় পিছু হটতে বাধ্য করবে। আর তখন বিজয় এসে আমাদের পায়ে চুমু খাবে।’
‘ওদের কী পরিমাণ তীর মজুদ আছে আমরা জানি না, জানি না কতদিন ওরা তীরের দেয়াল তৈরি করে রাখতে পারবে। আমরা যদি এতদিন বসে না থেকে প্রথম থেকেই লড়াই শুরু করতাম তবে তোমার এ চিন্তা ফলদায়ক হতো। কিন্তু এখনতো আমাদেরই খাদ্যঘাটতি শুরু হয়ে গেছে। আমরাইতো আর বেশিদিন এভাবে অবরোধ রাখার ক্ষমতা রাখি না। এ অবস্থায় কয়দিন আমরা যুদ্ধ করতে পারবো?’ বললেন আবু সুফিয়ান।
আকরামা বললো, ‘আপনি আমাদের প্রধান সেনাপতি। যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণের দায়িত্ব আপনার। আমি শুরু থেকেই লক্ষ্য করছি, আপনি লড়াই না করে মক্কায় ফিরে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন। এ অবস্থায় যুদ্ধ করা এবং সে যুদ্ধে জয়লাভ করা অসম্ভব। আপনি যদি আমার ও খালিদের পরামর্শ মতো যুদ্ধ শুরু করতেন তবে আমরা বুঝতে পারতাম মুসলমানদের বাহুর জোর কত? এখন আপনি ফিরে যেতে চাচ্ছেন, অথচ আমরা জানতেই পারলাম না, মুসলমানরা কী পরিমাণ শক্তি নিয়ে আমাদের মোকাবেলা করার জন্য তৈরি হয়েছিল।’
‘এখন তোমরা কী করতে চাও?’ জানতে চাইলেন আবু সুফিয়ান।
‘খালিদের পরিকল্পনা মত অন্তত একবার আমরা ওদের টোকা দিয়ে দেখতে চাই। যাওয়ার আগে আমরা যে এসেছিলাম সে কথা তাদের মনে করিয়ে দিয়ে যেতে চাই।’ বলল আকরামা।
‘তোমরা যা ভালো বোঝ, করো। এতে আমার সম্মতি অসম্মতির প্রশ্ন অবান্তর। তোমাদেরকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার দিলাম।’ আবু সুফিয়ান এ কথা বলে সেখান থেকে চলে গেলেন।
পরদিন ভোর। রণসাজে সজ্জিত হয়ে কাফেররা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। কাফেরদের যুদ্ধসজ্জা দেখে মুসলমানরাও সক্রিয় হয়ে উঠলো। তাদের একদল নেমে গেল পরিখার মধ্যে। সেখান থেকে তারা তীরবৃষ্টি শুরু করলো। অপর দল নিরাপদ দূরত্বে তীর নিয়ে অপেক্ষায় রইলো। ঝটিকা হামলা করে প্রথম দলকে এড়িয়ে কেউ যদি খন্দক পারও হতে পারে, সে যেন মুসলমানদের বিপদের কারণ না হয় সে ব্যবস্থা করার জিম্মা দ্বিতীয় দলের। মুসলমানদের তীরের জবাবে তীরবৃষ্টি শুরু করলো কাফেররা। খালিদ প্রথমে খন্দকের সরু অংশ দিয়ে খন্দক পার হওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু দেখলো, এখানকার প্রতিরোধ অনেক শক্তিশালী। এরপর সে গেল যেখানে খন্দকের পাশ বেশি সেদিকে। সেদিক দিয়ে পার হতে গিয়েও সে বিস্তর বাধার সম্মুখীন হলো। এরপর সে এমন একটি ভাব নিলো, যেন সে যুদ্ধ থেকে ফিরে যাচ্ছে। তার ধারণা ছিল, ওদেরকে ফিরে যেতে দেখলে মুসলমানরা পাহারায় ঢিল দেবে। তখন ছুটে এসে অতর্কিতে সে খন্দক পার হতে চেষ্টা করবে। কিন্তু তার এ চাল কোনো কাজে লাগলো না। মুসলমানদের প্রতিরোধে বিন্দুমাত্র ঢিল হলো না কোথাও।
দিনভর হাজার হাজার তীর এদিক থেকে ওদিক গেলো আর ওদিক থেকে এদিক এলো। অতিরিক্ত সাহস দেখাতে গিয়ে কাফেরদের কয়েকজন মারাও পড়লো। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না, মুসলমানদের সাহস তাতে বিন্দু পরিমাণ কমলো না।
বিকেল গড়িয়ে রাত নেমে এলো। রণক্লান্ত কাফেররা ফিরে গেল তাঁবুতে। সেই রাতেই ঘটলো এক মহা বিপর্যয়।
ক্লান্তশ্রান্ত সৈনিকরা রাতের খানার পর ঘুমিয়ে পড়েছে। সহসা শুরু হলো প্রচন্ড ঝড়। ঝড়ে উড়ে গেল তাদের তাঁবু। ভিজে গেল রসদসম্ভার। ঝড়ের তান্ডবে ছিঁড়ে গেল ঘোড়ার রশি। ঘোড়া ছুটলো দিগি¦দিক। ঘোড়ার পায়ের তলে পিষে মরলো ঘুমন্ত কিছু সৈনিক। মরুভূমির বিশাল বিস্তারে হারিয়ে গেল বেশকিছু ঘোড়া। ঝড়ের সাথে শুরু হলো বৃষ্টি। সে এক হুলুস্থূল কান্ড। কাফেরদের মনে হলো কেয়ামতের প্রলয় শুরু হয়ে গেছে। এভাবেই কেটে গেল রাত। সকাল হলো। তখনও একটু একটু বৃষ্টি হচ্ছে। সেনাপতিগণ ব্যস্ত হয়ে পড়লো সৈনিকদের খোঁজে। আকরামা আর খালিদও নিজ নিজ সৈন্যদের তালাশ করে ফিরছিল। খালিদের স্পষ্ট মনে আছে, তার সৈন্যরা ঝড়ের সময় শায়খীন পাহাড়ের কোলে আশ্রয় নিয়েছিল। ভোরে এই শায়খীন পাহাড়ের পাদদেশেই সে এসে সৈন্যদের সাথে মিলিত হয়েছিল।
খালিদ সেই সকালের কথা কোনদিন ভুলবে না। জীবনে সে খুব কমই ভয় পেয়েছে। কিন্তু সেদিন সকালের কথা মনে হলে এখনও তার গা কাঁটা দিয়ে ওঠে। প্রভাতের আলোয় মুসলমানরা তাকিয়েছিল তাদের তাঁবুগুলোর দিকে। রাতে যেখানে তাঁবু দেখেছিল সেখানে কোন তাঁবু নেই। অনেক তাঁবু দলা পাকিয়ে ঘোড়ার আস্তাবলের খুঁটিতে জমা হয়ে আছে। সৈন্যরা এলোমেলো। অস্ত্রপাতি ভিজা। এ সময় মুসলমানরা খন্দক পেরিয়ে যদি হামলা করতো তবে তাদের দশ হাজার সৈন্য মুসলমানদের এক হাজার সৈন্যের কাছেই পরাজিত হয়ে যেতো। মুসলমানদের হামলার আশঙ্কায় আতঙ্কিত ছিল খালিদ। একই অবস্থা ছিল আকরামারও। তারা দ্রুত সৈন্যদের সংগঠিত করে মুসলিম হামলা প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
আজ খালিদের মনে হচ্ছে, এটা কোন ঝড় ছিল না, একেই বলে আল্লাহর গায়েবি মদদ। সামান্য একটু ঝড় কিভাবে তছনছ করে দিয়েছিল এক বিশাল সেনাবাহিনী। মুসলমানরা যে বলে মুমিনের সাথে আল্লাহ থাকেন, এটা মিথ্যা নয়। বিশাল বাহিনীর হাত থেকে গুটিকয় মুসলমানকে সেদিন আল্লাহই রক্ষা করেছিলেন। এই পরিখা বা ঝড় উপলক্ষ মাত্র, মুসলমানদের মূল রক্ষক ছিলেন আল্লাহ। তিনিই তাদের মাথায় খন্দক খোঁড়ার অভিনব বুদ্ধি দিয়েছিলেন। আমরা যখন মুসলমানদের ওপর হামলা করলাম, আল্লাহ প্রচন্ড ঝড় দিয়ে আমাদের তছনছ করে দিলেন।
সেই ভোরের কথা মনে পড়লো খালিদের। ওরা যখন নিজেদের সৈন্য একত্রিত করার কাজে ব্যস্ত আবু সুফিয়ান এক উটের পিঠে চড়ে চিৎকার করে বলছিল, ‘বাহিনী, এখন, এই মুহূর্তে সবাই মক্কার পথ ধরো। এখানে আর এক মুহূর্তও নয়। সেনাপতি হিসাবে এটা আমার নির্দেশ। এই যে আমি রওনা হয়ে গেলাম। তোমরা আমার পিছু নাও।’
খালিদের জীবনে খন্দকের যুদ্ধ এক বিষাক্ত স্মৃতি হয়ে আছে। যখন তারা মক্কা থেকে রওনা হয়েছিল তখন বিশাল বাহিনী দেখে গর্বে বুক ফুলে উঠেছিল খালিদের। সহায়-সম্পদহীন, অস্ত্রবলহীন হাজার তিনেক মানুষকে ধ্বংস করার জন্য এতবড় বাহিনী দেখে খালিদের মনে হয়েছিল, এবার মুসলমানদের নিস্তার নেই। তিন হাজার মানুষ আরবের সম্মিলিত বাহিনীর মোকাবেলা করবে, এটা হতেই পারে না। তাই উদ্ধত মস্তকে বীরদর্পে তারা ছুটছিল মদিনার দিকে। কিন্তু যখন ফিরে যাচ্ছিল তখন তাদের মস্তক ছিল অবনত, চেহারা বিধ্বস্ত। পরাজিত সৈনিকের বিমর্ষতা লেপ্টে ছিল সারা অবয়বে। তারা পালাচ্ছিল ঊর্ধ্বগতিতে। ভয় তাড়া করছিল তাদের। এ বিধ্বস্ত অবস্থায় মুসলমানরা তাড়া করলে আর রক্ষা নেই। বাহিনী বিশাল হলেও কারো মোকাবেলা করার মানসিকতা নেই। তাই ওরা ছুটছিল ভয়ার্ত হরিণীর মতো।
নঈম এই পলায়নরত বাহিনীর সঙ্গী হয়নি। ওরা যখন পালাবার জন্য ব্যস্ত, তখন নঈম সবার অলক্ষ্যে খন্দক পার হয়ে চলে এসেছিল মুসলিম শিবিরে। রাসূলের দরবারে বসে বর্ণনা করেছিল কাফেরদের শোচনীয় পরিণতি।
মুসলমানদের কেউ কেউ প্রস্তাব করেছিল কাফেরদের পিছু ধাওয়া করার জন্য। কিন্তু মানবপ্রেমিক মহানবী সা: সে প্রস্তাব আমলে নেননি। তাঁর বক্তব্য ছিল পরিষ্কার, মানুষ হত্যা করার জন্য ইসলাম দুনিয়ায় আসেনি। ইসলাম এসেছে মানুষের জীবনকে সুন্দর ও পরিপূর্ণ করতে। নিশ্চিত পরাজয়কে যে মহান সত্তা বিজয়ে রূপান্তরিত করেছেন, সেজদায় লুটিয়ে পড়ে সেই মহান সত্তার শোকর আদায় করাই মুমিনের কর্তব্য। তিনি মুজাহিদদের একটা ছোট দলকে দূর থেকে তাদের অনুসরণ করতে বললেন। বললেন, যখন বুঝবে, চলে যাওয়াটা কোনো চাল নয়, সত্যি সত্যি ওরা ফিরে যাচ্ছে, তখন চলে আসবে। খালিদ দূর থেকে অনুসরণকারী সেই দলটিকে দেখেছিল। তাদের মতলব কী, তাদের  পেছনে আরও কোন বাহিনী আছে কিনা জানা ছিল না তার। তাই আশঙ্কার একটা কাঁটা তার মনে গেঁথেই ছিল, যদিও সে এ কথা কাউকে বলেনি।
খালিদের ঘোড়া ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছিল মদিনার দিকে। খালিদের মনে পড়লো, এ পথ দিয়েই সেদিন পালিয়েছিল তারা। পালাবার সেই দৃশ্য, সেই স্মৃতি এখনও তাকে যেন তাড়া করে ফিরছে।
অনুসরণকারী দল অনেক দূর পর্যন্ত তাদের অনুসরণ করলো। দলনেতা বললো, ‘খোদার কসম, রাসূল নিষেধ করেছেন, নইলে আমি ওদের ওপর হামলা করে বসতাম।’
তার সঙ্গী বলেছিল,  ‘যে আল্লাহ ইসলামের দুশমনকে না মেরে অক্ষত অবস্থায় তাড়িয়ে দিলেন তাদেরকে আক্রমণ করা ঠিক হবে না। ইসলাম তো প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য আসেনি। শোননি রাসূলের বাণী, ইসলাম এসেছে মানুষকে ভালোবাসা শেখাতে, প্রেম শেখাতে। পতিত শত্রুকে আঘাত করা অশোভন ও অমানবিক।’
ফিরে এলো অনুসরণকারী দল। তারা জানাল, ‘কাফেররা শুধু পালাচ্ছেই না, তারা ভয় ও আতঙ্কে যে যেভাবে পারে ছুটছে মদিনার দিকে। তাদের আর ফিরে আসার কোনোই সম্ভাবনা নেই।’
এ খবরে মহানবী সা. কোমর থেকে তলোয়ার খুলে একপাশে রাখলেন। তারপর গোসল করলেন। সাহাবীদের নিয়ে মসজিদে নববীতে গিয়ে দু’রাকাত নফল নামাজ পড়লেন। মুজাহিদরা আবার যার যার বাড়ি ও কর্মক্ষেত্রে ফিরে গেলেন। মদিনার ঘরে ঘরে বয়ে গেল আনন্দের বন্যা। রাস্তায় নেমে এলো শিশু ও যুবকরা। নারায়ে তাকবির ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠলো মদিনার অলিগলি। তাদের এ আনন্দের সাথে শরিক হলো মদিনায় বসবাসরত বনু কোরায়জার লোকজন। মুসলমানদের জয়কে তারা নিজেদের বিজয় মনে করছিল। বনু কোরায়জার এসব লোক মুহাম্মদের আনুগত্য মেনে নেয়ার প্রমাণস্বরূপ বার্ষিক সামান্য জিজিয়া দিত। বিনিময়ে তারা পেত নাগরিক সব সুযোগ সুবিধা ও নিরাপত্তা। মুসলমানদের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বের। কোরাইশদের হাত থেকে মদিনা রক্ষা পাওয়ায় তারাও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল। এ জন্য তারা ছিল খুশি। তাই তারা রাস্তায় নেমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আনন্দ উল্লাসে শরিক হয়েছিল।    (চলবে)

SHARE

Leave a Reply