Home স্মরণ হৃদয়ের নায়ক -আফসার নিজাম

হৃদয়ের নায়ক -আফসার নিজাম

শিশু থেকে কিশোর জীবনে পা রাখতেই মনের ভেতর কেমন পরিবর্তন আসে। নিজেকে শিশু ভাবতে খারাপ লাগে। বড় ভাবতে বেশ সুখ বোধ হয়। নিজেকে কেমন নায়ক নায়ক মনে হয়। মনের ভেতর যে নায়ক বাস করে তাকে সামনে এনে দেখতে ইচ্ছে করে। এ নায়ক যেমন মনের ভেতর থাকে তেমনি নায়ক থাকে রূপালি পর্দায়। টিভি মিডিয়ায়। কিশোর মন সেই মিডিয়ার নায়ককে আইডল করে মনের মাধুরী মিশিয়ে নিজের ভেতরকার নায়ককে সাজিয়ে তোলে। এই নায়ক যে শুধু চলচ্চিত্রের তা নয়। কারো নায়ক বিজ্ঞানী, কারো নায়ক কবি, কারো নায়ক সাংবাদিক, কারো নায়ক ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার।
আমরা আজ এমন এক নায়কের কথা শোনবো যে ছিলো ঝলমলে রূপালি পর্দার নায়ক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র। সেই নায়ক দেখতে সুপুরুষ। ঠিক ছোটবেলায় তুমি যেরকম নায়ক চিন্তা করো নিজেকে। আমাদের নায়ক ঠিক সে রকম। তার নাম মিঠুন। পুরো নাম শেখ আবুল কাসেম মিঠুন। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫১ সালের ১৮ এপ্রিল। কে সেই মিঠুন। আমাদের খুব জানতে ইচ্ছে করে। তাই না! তাহলে বলি শোন-
সে অনেক অনেক দিন আগের কথা। প্রায় চারশো বছর আগের কথা। সুদূর বাগদাদ থেকে শেখ মোহাম্মদ শাহ বাগদাদি রহ: নামক একজন ইসলামপ্রচারক সুন্দরবনের সন্নিকটে সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি নামক স্থানে আসেন। এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখে তিনি মুগ্ধ হন। স্থানীয় মানুষ এ সুফি দরবেশ মানুষটাকেও খুব ভালোবাসে। তার কাছে দীক্ষা গ্রহণ করে। দীর্ঘদিনের লালিত কুসংস্কৃারাচ্ছন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ছেড়ে ইসলামে দাখিল হয়। আর এলাকার নামকরণ করেন দরগাহপুর। এ দরবেশের আগমনকে সম্মান করেই দরগাহপুর রাখা হয়।
নিরহঙ্কারী মানুষের কাছে মানুষ দলে দলে দীক্ষা গ্রহণ করার কথা সারা বাঙলা মুলুকে ছড়িয়ে পড়ে। তখনকার দিল্লির বাদশাহ আওরঙ্গজেবের সুবেদার সালাহউদ্দীন মাহমুদ খাঁ দরগাপুরে আসেন এবং সেই সময়ের ৫টি পরিবারকে লাখেরাজ সম্পত্তি দিয়ে যান। শেখ আবুল কাসেম মিঠুন কিন্তু শেখ মোহাম্মদ শাহ বাগদাদি রহ:-এর অধস্তন ৯ম পুরুষ।
নায়কের বাবার নাম শেখ আবুল হোসন। আর বংশের প্রায় সবাই দেশের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি। বাংলায় বুখারী শরীফের বাংলা অনুবাদ করেন শেখ বজলুর রহমান দরগাহপুরী, যিনি পশ্চিম বাংলার বিধানসভার সদস্য ছিলেন। শিশু-কিশোর পত্রিকা ‘গুলবাগিচা’র সম্পাদক মাওলানা আবদুল ওহাব সিদ্দিকী। কারী শেখ মাহমুদ আলী, ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিক আনিস সিদ্দিকী, মনোয়ারা বেগম, নিগার সুলতানা নার্গিস।
নায়ক শুধু নায়কই ছিলেন না! তিনি ছিলেন সাংবাদিক, আসলে তিনি সাংবাদিকই হতে চেয়েছিলেন। বংশীয় ঐতিহ্য হিসেবে সাংবাদিকতা পেশায় তাঁর অনেক আত্মীয়ও ছিলেন সাংবাদিক। তিনি প্রথমে খুলনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক কালান্তর পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা ও লেখালেখি শুরু করেন। তখন ছিলো ১৯৭৮ সাল। সাংবাদিকতার উৎকর্ষের কারণে তিনি ঐ পত্রিকার কার্যনির্বাহী সম্পাদক পদটি লাভ করেন। তারপর সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক, পরে দৈনিক আবর্তন পত্রিকার সহসম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকায় আসেন নায়ক। ঢাকায় এসে বিনোদন সাংবাদিক হিসেবে এফডিসিতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে চিত্রপরিচালক হাফিজ উদ্দিন ও আলমগীর কুমকুমের আমন্ত্রণে অভিনয়ে প্রবেশ করেন। সেই শুরু। এরপর থেকে শুধু সামনেই চলা- তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র অভিনয় ‘তরুলতা’ নামক চলচ্চিত্রে। তিনি তখন নায়ক। এরপর নায়ক অভিনয় করেন বহু সুপারহিট চলচ্চিত্রে। ঈদ মোবারক, গৃহলক্ষ্মী, নরম-গরম, সারেন্ডার, নিঃস্বার্থ, বাবা কেন চাকর, বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না, নিকাহ, গাড়িয়াল ভাই, রঙ্গিলা, ভাগ্যবতী, ধনবান, কুসুম কলি, ‘ভেজা চোখ, অর্জন, ত্যাগ, বাদশাহ ভাই, জেলহাজত, ত্যাজ্যপুত্র।
তিনি ছিলেন গান রচয়িতা মানে গীতিকার, তরুলতা নামক চলচ্চিত্রে তিনি গীতিকার হিসেবেও গান রচনা করেন। তা ছাড়া তিনি খুলনায় থাকতেই খুলনা বেতারে নিয়মিত গীতিকার হিসেবে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেন। কিন্তু তার মূল আকর্ষণ ছিলো চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা করা। লেখালেখি তার মজ্জাগত হওয়ায় তিনি লেখালেখি থেকে কখনই দূরে থাকতে পারেননি। তিনি নায়কের অভিনয় করলেও সারাক্ষণ মন পড়ে থাকতো খাতা আর কলমে। লিখতে লিখতে হাতে কড় ফেলে দিতেন। তবুও লেখালেখিতে তার কোনো ক্লান্তি ছিলো না। তাই তো তিনি চলচ্চিত্রে প্রায় দুই শ’ স্ক্রিপ্ট লিখেন। স্ক্রিপ্ট হলো চলচ্চিত্রটি কিভাবে চিত্রায়িত হবে। কী তার গল্প থাকে। কোথায় অভিনেতারা গান পরিবেশন করবেন। কোন জায়গায় সুটিং হবে, অভিনেতারা কী ধরনের পোশাক পরবেন, কী রঙের পোশাক পরবেন। ইত্যাকার বিষয় নিয়েই তৈরি হয় স্ক্রিপ্ট। আর সেই স্ক্রিপ্ট লিখেই বেশ মজা পেতেন নায়ক। তার করা কয়েটি চিত্রনাট্য মাসুম, অন্ধবধূ, দস্যু ফুলন, স্বর্গ-নরক, জিপসী সর্দার, প্রেম-প্রতিজ্ঞা, চাকর, দিদার, কসম, পরিবর্তন, বিধাতা, কালনাগিনীর প্রেম ও আহবান।
চলচ্চিত্র জগতে তিনি ধারাবাহিকভাবে যেসব সংগঠনের সাথে ছিলেন-
জনাব মিঠুন ১৯৮৯-৯১ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির প্রচার ও দফতর সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন এবং শিল্পী সমাজের জন্য বিশেষ অবদান রাখেন।
জনাব মিঠুন ১৯৯৩-৯৫ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ‘আন্তর্জাতিক সম্পাদক’ হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ভারতসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের সাথে সম্পর্কন্নোয়নে ভূমিকা রাখেন।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির পক্ষে ১৯৯৩ সালে জনাব মিঠুন জাতীয় চলচ্চিত্র নীতিমালার সুপারিশ (ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ) রচনা করেন, যা তৎকালীন শিল্পী সমিতির নির্বাহী কমিটিতে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়, বাংলাদেশ সরকারের আহবানে তথ্য মন্ত্রণালয়ে সে নীতিমালা তিনি পেশ করেন।
জনাব মিঠুন ১৯৯৮ সাল থেকে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র লেখক সমিতি গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং ২০০০ সালে লেখক সমিতির সহসভাপতি এবং ২০০১ সালে সভাপতি পদে নির্বাচিত হন।
জনাব মিঠুন ২০০২ সালে চলচ্চিত্র শিল্পের সকল সংগঠন মিলে ‘ফিল্ম ফেডারেশন’ গঠনে গঠনতন্ত্র রচনায় ভূমিকা রাখেন এবং ফেডারেশনের সহমহাসচিব হিসেবে নির্বাচিত হন।
জনাব মিঠুন ১৯৯৪ সালে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির জন্য গঠনতন্ত্র পরিবর্ধনকল্পে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।
কর্মপ্রচেষ্টা ও চলচ্চিত্র শিল্পীসমাজের জন্য সর্বতোভাবে উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখাসহ, নিজস্ব পেশাগত কর্ম সততার সাথে সম্পাদন করা আজীবন প্রয়াসের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পীসমিতি ১৯৮৬ সালে এফডিসিতে অনুষ্ঠিত এক মনোজ্ঞ ঝলমলে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অন্যান্যদের সাথে জনাব মিঠুনকেও বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করে।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির পক্ষ থেকে ২০১৪ সালে জনাব মিঠুনের সারা জীবনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আজীবন সদস্যপদ প্রদান করা হয়েছে।
তিনিই সম্ভবত প্রথম ৭৪-এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে আঞ্চলিক ভাষায় উপন্যাস রচনা করেন যার নাম ‘আমরাই’, যেটি ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয়। এরপর তার দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘শিক্ষা ও সংস্কৃতির নেতৃত্ব : সঙ্কট ও সংঘাত’ বইটি প্রকাশিত হয় আমারই তত্ত্বাবধানে ২০০৬ সালে। তা ছাড়া ২০০৪ সালে বিখ্যাত কথাশিল্পী নিগার সুলতানা নার্গিসের লেখা ‘রজনী গন্ধার মেয়ে’ শীর্ষক গল্পগ্রন্থটি প্রকাশ করেন।

আহা মূল কথাতো বলিনি তিনি পড়ালেখা করেন কিসে? পড়ালেখা করেন- তিনি নিজের গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাতে খড়ি নেন, পরে রাড়–লি হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯৬৯ সালে দরগাহপুর হাইস্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাস করে খুলনায় এসে সিটি কলেজে ভর্তি হন। পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন।
নায়ক শেষ জীবন অতিবাহিত করেছেন সারাদেশে সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করে। বাংলাদেশ সংস্কৃতিকন্দ্রের উপপরিচালক হিসেবে শেষ দায়িত্ব পালন করেছেন। উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ইসলামী সঙ্গীত রচয়িতা সংগঠক কবি মতিউর রহমান মল্লিকের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সারাদেশ চষে বেড়িয়েছেন। যাতে করে ঐতিহ্য ধারা সংস্কৃতি মানুষের মনে গ্রথিত হয়। তরুণরা যেনো বিপথগামী না হয়। সে জন্য মাঠে ময়দানে বক্তৃতা করে ফিরেছেন। তৈরি করেছেন টেলিফিল্ম, নাটক, গানের ভিসিডি। বাংলায় ডাবিং করেছেন আন্তর্জাতিক ইসলামী চলচ্চিত্রগুলো। এই মহান নায়ক আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ২০১৫ সালের ২৫ মে। আমরা তার জান্নাত কামনা করি। আল্লাহ যেনো তাঁকে সেই জান্নাত দেন যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় দুধের নহর। আমিন।

SHARE

Leave a Reply